কয়েক বছর আগের কথা। আমাদের একটা পোষা ষাঁড় ছিল। যেমন ছিল উঁচা তেমনি ছিল লম্বা। আর শক্তি ছিল, ঘোড়ার মত। কার বাপের সাধ্য আছে যে আমাদের ষাঁড়টাকে একা কন্ট্রোল করে। ষাঁড়টার গলায় সব সময় দু'টো দঁড়ি বাঁধা থাকতো। দু'জন দু'দিক থেকে টেনে ধরে ষাঁড়টাকে বাইরে বের করতো। গ্রামের কত মানুষ যে আমাদের ষাঁড়ের দাবড়ানি খেয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। আমাদের ষাঁড়ের সামনে দিয়ে অন্য সব গরম্ন লেজ গুটিয়ে যেত। গ্রামের কি এমন কোন মেয়ে গরু আছে যে আমাদের ষাঁড়ের সমনে দিয়ে তার ইজ্জত নিয়ে ফিরে যেতে পেরেছে? পারে নাই। আমাদের এবং আশে পাশের গ্রামে যত গাভীর বাচ্চা হয়েছে বা হবে হবে করছে তা আমাদের ঐ ষাঁড়ের কল্যাণে। তাইতো আমাদের বাড়ির আশে-পাশে অনেককে তাদের গাভী নিয়ে ঘুর ঘুর করতে দেখা যেত। গাভীকে গর্ভবতী করতে আমাদের ষাঁড়ের ডিমান্ড ছিল অনেক। তাইতো নজরানা হিসাবে গাভীর মালিকরা আমাদের ষাঁড়টাকে কয়েক কেজি করে ভুসি দিয়ে যেত। এই ষাঁড়টাকেই কিনা আমার বাবা আগামী কুরবাণীর ঈদে কুরবাণী দেবেন বলে ঘোষণা দিলেন। ঘোষণাটা শুনে গ্রামবাসীর মাথায় হাত পড়লো। তাদের গাভীগুলোর এখন কি হবে? কে দেবে তাদের গাভীর পেটে স্বাস্থ্যবান বাচ্চা। খবরটা শুনে আমারও মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল। এমন একটা বিখ্যাত ষাঁড়ের অকাল মৃত্যূ হবে ভাবতেই খারাপ লাগে। তাই বাবাকে বললাম ষাঁড়টাকে কুরবাণী না দিলে হয় না। বাবা বললেন তাহলে এটাকে কি করবো, বলদ বানিয়ে হালের গরু বানাবো? আমি মনে মনে বললাম বলদ হয়ে বাঁচার চেয়ে ঈদে কুরবাণী হওয়া অনেক ভালো, অনেক সম্মানের।
ঈদের রাতের আগের রাতে আমাদের ষাঁড়ের ডাকে বাবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাবা টর্চ হাতে বাইরে বের হয়ে দেখেন আমাদের উঠানে ষাঁড়টা দাঁড়িয়ে আছে। ষাঁড়ের কাছে গিয়ে টর্চের আলো ফেলতেই বাবা দেখতে পেলেন ষাঁড়টার পাশে একটা লোক মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে। লোকটার একটা পা ষাঁড়ের দঁড়ি দিয়ে বাঁধা। বাবার চিৎকারে আমরা সবাই ঘুম থেকে উঠে উঠানে গেলাম। উঠানে আশে-পাশের আরো অনেক লোক জড়ো হয়েছে। পড়ে থাকা লোকটাকে দঁড়ির বাঁধন থেকে খুলে বিছানায় শোয়ানো হলো। রাতে ডাক্তার এনে দেখানো হলো। সকাল বেলা লোকটা একটু সুস্থ হলো। বাবা তাকে জিজ্ঞাস করলো ঘটনা কি? লোকটা যা বললো তা হলো- আমি এবং আমার এক বন্ধু আপনাদের গোয়াল ঘরের বেড়ার কেঁটে ষাঁড়টাকে চুরি করে জমির মাঁঝ বরাবর হেঁটে যাচ্ছি। কিছু দূর যাবার পর আমার বন্ধু বললো- দোস্ত আমার একটু হাগা লাগছে তুই গরুটা একটু ধরে থাক আমি হেগে আসি। আমি একা গরুটার দঁড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবলাম একটা বিড়ি খেয়ে নেই। তাই আমি জমির আইলের মধ্যে বসে গরুর দঁড়িটা আমার এক পায়ের সাথে বেঁধে, বিড়িটা মুখে দিয়ে যেই না ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়েছি
আশে-পাশের গ্রাম থেকে লোকজন ছুটে আসতে লাগলো আমাদের ষাঁড়টাকে এক নজর দেখার জন্য।
ঈদের দিন সকালে এই বিখ্যাত ষাঁড়টাকে কুরবাণী করা হলো। কেন জানি বুকের মধ্যে ষাঁড়টার জন্য কষ্ট হতে লাগলো। সবাই ষাঁড়টার মাংস অনেক মজা করে খেল শুধু আমি ছাড়া।
মুন রেহমান
কারমাইকেল কলেজ, রংপুর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


