somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মুবিন খান
অদৃষ্টরে শুধালেম, চিরদিন পিছে, অমোঘ নিষ্ঠুর বলে কে মোরে ঠেলিছে?সে কহিল, ফিরে দেখো। দেখিলাম থামি, সম্মুখে ঠেলিছে মোরে পশ্চাতের আমি।

গল্প: কবর

০৬ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ১:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এক
মালেক মোহাম্মদ কাঁধ থেকে কোদালটা নামিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে সুনিপুণ লম্বালম্বি চারকোণা দাগ কাটল। তারপর কাদেরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নে, শুরু কর্।’

কাদের পাশে দাঁড়িয়ে দাগ দেয়া দেখছিল। মালেক মোহাম্মদের নির্দেশ শুনে মাটি থেকে নিজের কোদালটা তুলে নিল। চারকোণা দাগটার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোদালটা মাথার ওপর তুলে গায়ের সব শক্তি এক করে মারল এক কোপ। কিন্তু মাটিতে বসল না কোপটা। উল্টো স্প্রিঙয়ের মতো তার দিকেই ছুটে যেন এল কোদালটা। যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে কোদাল। শক্তি দিয়েই কোদালকে প্রতিহত করতে হলো কাদেরকে। ভয় পেয়ে গেল কাদের।

ছুটে এল মালেক মোহাম্মদ, ‘আরে আরে করস্ কি! মাডি কাটস্ নাই জীবনে? এইটা খালি মাডি কাটার কাম না। এইটা কব্বর। উত্তরে মাথা থাকে, উত্তর দিকেত্তে শুরু করা লাগবে। এই দেখ্ এমনে...বিসমিল্লা’ বলে দাগের ওপর একটা কোপ দিল মালেক মোহাম্মদ। এবার ছিটকে এল না কোদাল, ফলার অর্ধেকটা আমূল বসে গেল মাটিতে।

চাড় দিয়ে মাটিটা তুলে মালেক মোহাম্মদ বলল, ‘শোন্, এইটা তো সাধারণ কাম না। এই কামে ভুল হইলে মাটিয়ে গোস্বা হয়।’

বুঝতে পেরেছে বোঝাতে মাথা ঝাঁকায় কাদের। কোদাল হাতে এগিয়ে যায় আবার।

মালেক মোহাম্মদ বলে, ‘অনেক কাম রে কাদের। তিনশ’ কব্বরের কনটাক্। মানুষও কম। থাকব কেমনে সব তো মরতেছে। তর ভাগে পড়ছে তিরিশ কব্বর। তেরো দিনে তিরিশ কব্বর কাটতে পারবি রে কাদের?

'আল্লা ভরসা।' বলে কোদাল তুলে নেয় কাদের।

মালেক মোহাম্মদ নিজের জায়গায় ফিরতে থাকে। কাদের উত্তরদিকের দাগ বরাবর কোপ দেয়। তারপর দাঁড়িয়ে পড়ে হঠাৎ। মালেক মোহাম্মদের উদ্দেশে বলে ওঠে, 'আইচ্ছা মিয়াবাই, মাইনষে যেমনে মরতেছে, আমরা কি আর থাকুম তাইলে!'

মালেক মোহাম্মদ ঝুঁকে মরা আগাছা পরিষ্কার করছিল। কাদেরের কথা শুনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঘাড় উঁচু করে একবার চাইল আকাশের দিকে, তারপর তাকাল কাদেরের দিকে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল, 'আমরা তো আল্লার কাম করতেছি। তার বান্দাদের তিনি ডাকছেন, আমরা হেই যাওনের রাস্তার মধ্যিখানের কাম করতেছি। যহন আমাদের ডাকবেন, আমাদেরেও চইলা যাওয়া লাগবে।'

কাদের যেন সন্তুষ্ট হয় না মালেক মোহাম্মদের কথায়। বলে, 'মিয়াভাই, আমরা যখন মইরা যাব তহন কি আমাদেরেও এইসব কব্বরে মাডি দিব?'

'হ, কই আর দিব, মাইনষে মাইনষে ফারাক তো খালি দুইন্যায়। নইলে দেখ সকলে আহেও ল্যাংটা যায়ও ল্যাংটা। আবার কব্বরেরও কোনও বড়লোক গরিব নাই।' বলে একটা দার্শনিক ভাব উদয় হয় মালেক মোহাম্মদের মনে। দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দূরে তাকিয়ে থাকে সে।

'মিয়াবাই, একটা কথা...', একটু ইতস্তত করে বলে কাদের।
'ক কাদের', বলে মালেক মোহাম্মদ।

কাদের বলে, 'মিয়াবাই, এইটা আমার পরথম খুদা কব্বর, আমি মইরা গেলে আমারে এই কব্বরটায় মাডি দিয়ো।'

'দুরো ফাজিল।' প্রশ্রয়ের হাসি হাসে মালেক মোহাম্মদ। তারপর বলে, 'আজাইরা কথা থুইয়া অ্যালা কাম শুরু কর্‌, সময় কইলাম কম।'
.
দুই
এক মাস পর। দুজন লোক স্ট্রেচারে লাশ নিয়ে গোরস্তানে ঢুকেছে। লোক দুজনের আপাদমস্তক অদ্ভুতরকম এক পোশাকে ঢাকা। গামছা দিয়ে মুখ বাঁধা মালেক মোহাম্মদ তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে। নির্দিষ্ট কবরটার কাছে এসে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় মালেক। লোক দুজন কবরের লম্বালম্বি পাশে দাঁড়ায়, তারপর খুব সাবধানে কাত করে স্ট্রেচারটা। স্ট্রেচারে থাকা লাশটা গড়িয়ে পড়ে কবরে। তারা হাত তুলে মালেক মোহাম্মদকে ঈশারায় মাটি ভরাট করতে বলে।

মাথা ঝাঁকায় মালেক মোহাম্মদ। মোনাজাতে দু হাত তোলে। বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে। তারপর কোদাল তুলে নেয় হাতে। এক কোদাল মাটি কবরে ফেলে বিড়বিড় করে বলে, 'অনেক নেকি করছিলি রে কাদের! দ্যাশের এই মড়কের কালেও তোর শ্যাষ ইচ্ছা পূরণ অইলো। নিজের পরথম খুদা কব্বর পাইলি। অ্যালা শান্তিতে ঘুমা।' বলেই কাশতে থাকে মালেক মোহাম্মদ।

'ভাগ্যিস কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করবার সময় গোরস্তানের পেছন দিক থেকে আরম্ভ করেছিল, নয়ত এই কবরটা ফাঁকা থাকবার কথা নয়।' কাশির দমকে কবরে মাটি ফেলতে ফেলতে ভাবে মালেক মোহাম্মদ। তার এখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে খুব। ◉
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ১:০৮
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৪৫ বছরের অপ-উন্নয়ন, ইহা ফিক্স করার মতো বাংগালী নেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৫:০৫



প্রথমে দেখুন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো; উইকিপেডিয়াতে দেখলাম, ১০৩ টি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে; ঢাকা ইউনিভার্সিটি যাঁরা যেই উদ্দেশ্যে করেছেন, নর্থ-সাউথ কি একই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে? ষ্টেমফোর্ড ইউনিভার্সিটি কি চট্টগ্রাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ মাতানো ব্লগাররা সবাই কোথায় হারিয়ে গেল ?

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৪

ইদানিং সামু ব্লগ ব্লগার ও পোস্ট শূন্যতায় ভুগছে। ব্লগ মাতানো হেভিওয়েট ব্লগাররা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।কাজের ব্যস্ততায় নাকি ব্লগিং সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমি কিছু ব্লগারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ৬৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৫



সুরভি বাসায় নাই। সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছে।
করোনা ভাইরাস তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তবে এবার সে অনেকদিন পর গেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর। আমি বলেছি, যতদিন ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ অমঙ্গল প্রদীপ (পাঁচশততম পোস্ট)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:১৪

প্রদীপের কাজ আলো জ্বালিয়ে রাখা।
কিন্তু টেকনাফের একটি ‘অমঙ্গল প্রদীপ’
ঘরে ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে আসতো,
নারী শিশুর কান্না তাকে রুখতে পারতো না।

মাত্র বাইশ মাসে দুইশ চৌদ্দটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া দেশে চাকরি সংকট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১২:২০



গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া সরকার মন্ত্রী পরিষদে কতোজান বিসিএস অফিসার আছেন? তাছাড়া সততার সাথে সোমালিয়া সরকার চাইলেও সঠিক ও যোগ্য মন্ত্রীপদে কতোজন বিসিএস অফিসার দিতে পারবেন?

(ক) মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - একজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×