২০০৭ সালে যখন ইংমার বার্গম্যান মারা গেলেন তখনই আমি প্রথম এই চলচ্চিত্রকার সম্বন্ধে জানতে পারি। সুয়েডীয় এই চলচ্চিত্র পরিচালক ঠিক কি ধরণের মুভি করেন তা তখনও জানতে পারিনি। পরে দেখলাম তার মূল আগ্রহ মানব জীবনের মনোবৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব এবং সাইকো ধরণটি নিয়ে তিনি বেশ কিছু কাজ করেছেন। মুভি ফ্রি ডাউনলোড করে দেখতেই বেশী ভাল লাগে, কারণ এভিআই ফাইলের প্রিন্ট হয় সেই রকম ভাল। পাশাপাশি সাবটাইটেল পাওয়া যায় সহজে। তাই বার্গম্যানের মুভি ডাউনলোড করার পরিকল্পনা করি। পারসোনা মুভিটি ঠিক কি দেখে পছন্দ করেছিলাম তা মনে নেই। তবে ডাউনলোড করে যে লস হয়নি তা দেখার পর বুঝলাম।
১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই মুভির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে মঞ্চ অভিনেত্রী এলিসাবেট ফোগলারের মানসিক ভারাম্যহীনতা দিয়ে। কিন্তু মুভিটি প্রথমবার দেখার পর ভাল লাগানো বেশ কষ্টের কাজ, কিছু বোঝা যায়না। একবার দেখার পর উইকিপিডিয়া থেকে কাহিনীসূত্র এবং তত্ত্বগুলো পড়তে হল। দেখা গেল, বিশেষজ্ঞরাও এর কাহিনীর ব্যাপারে খুব একটা স্বচ্ছ নন। সাধারণত তিনটি কাহিনী ধরে নেয়া যেতে পারে বলে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন। এলিসাবেটের চকিৎসার দায়িত্ব দেয়া হয় আলমা নামক এক নার্সের উপর। ডাক্তার অবশ্য বলেছেন, এলাসাবেটের কোনরকম শারীরিক বা মানসিক অসুস্থতা নেই। সমস্যাটি ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। তিনি কারও সাথে কোন রকম কথা বলেন না। অবস্থার পরিবর্তনের জন্য এলিসাবেট ও আলমাকে উপকূলবর্তী এক মোটেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোটেলে কেবল এলিসাবেট এবং আলমা। আলমা কেবল কথা বলে, আর এলিসাবেট শুনে যায়। কখনও কোন শব্দ করেনা। মুখের অভিব্যক্তি থেকে মাঝে মাঝে কিছু বোঝা যায়।
এভাবে একসাথে থাকতে থাকতে কখন যে এলিসাবেটের সত্ত্বার সাথে নিজের সত্ত্বাকে বিলীন করে ফেলেছেন, আলমা তা বুছে উঠতে পারেননি। দর্শকরাও অবশ্য তখন বুঝতে পারবেননা। বোঝার মত অবস্থা সৃষ্টি হয় একটি চিঠি পাঠের পর থেকে। এলিসাবেট হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে একটি চিঠি লিখে। আলমার দায়িত্ব তা পোস্ট অফিসে পৌঁছে দেয়া। পৌঁছে দিতে গিয়ে আর স্থির থাকতে পারেনি আলমা। পড়ে ফেলে চিঠিটি। চিঠিতে লিখা ছিল, কিভাবে আলমা এলিসাবেটের সত্ত্বার সাথে বিলীন মধ্যে যাচ্ছে, নিজের অজান্তেই। অথচ এলিসাবেট তা বুঝতে পারছে। আর সে ডাক্তারকে জানাচ্ছে এসব কথা যা আলমার পেশার জন্য খুব বিপজ্জনক হতে পারতো। আলমা এতে রেগে যায়। চিঠিটি পোস্ট না করে পিরে এসে এলিসাবেটকে টর্চার করে। এলিসাবেট যেন ব্যথা পায় সেজন্য মেঝেতে ব্লেড গেঁথে রাখে। এক পর্যায়ে তার শরীরে গরম পানি ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তখনই প্রথম এলিসাবেট কথা বলে উঠে। তাই পানি ঢালা আর হয়ে উঠেনা।
সে রাতেই প্রথম দুজনের সত্ত্বার আদান-প্রদান বা একীকরণের বিষয়টি পরিচালক দর্শকদের গোচরীভূত করেন। এমনটি করতে গিয়ে এখানে চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফি ব্যবহার করা হয়েছে। না দেখলে বোঝা যাবেনা। তারা এক হয়ে যায়। কে আলমা আর কে এলিসাবেট তা বোঝা কঠিন হয়ে উঠে। অবশ্য এলিসাবেট কিন্তু আগের মতই নিশ্চুপ ছিল। এমন পর্যায়ে এলিসাবেটের অন্ধ স্বামী এসে আলমাকে নিজের স্ত্রী বলে সনাক্ত করে বসে। এলিসাবেটও মেনে নেয়। সেও কি আলমার সত্ত্বায় বিলীন হয়ে যায়নি। মনে হয়না। বেশ কিছুদিন পর তারা হাসপাতালে ফিরে আসে। হাসপাতালে যে ধরণের সিনেমাটোগ্রাফির আশ্রয় নেয়া হয়েছে তা থেকে মনে হয়েছে আলমা ও এলিসাবেট আসলে একই ব্যক্তি।
সিনেমার একটি কাহনী রূপায়নে বলা হয়েছে, আলমা ও এলিসাবেট আসলে একই ব্যক্তি। এলিসাবেট হল তার ভিতরের রূপ, কারণ মন থেকে সে আসলে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায়। আর আলমা হল তার বাইরের রূপ। কারণ আলমা কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে তুলে ধরতে বাধ্য হয়। হাসপাতালে টেবিলের দুই পাশে বসা দুজনের কথাবার্তার একটি শট খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই ডায়ালগ দুজন বলে যায়। একেকবার একেকজনের মুখ দেখানো হয়। যখন একজনের মুখ দেখানো তখন অন্যের এক্সপ্রেশন বোঝানো হয়। এভাবে একসময় আলমার মুখের অর্ধেক সরে গিয়ে এলিসাবেটের মুখের অর্ধাংশের সাথে লাগে। উল্টো প্রেক্ষিতটিও ঘটতে দেখা যায়। এক হয়ে যায় দুজনে।
এলিসাবেট কেন মন থেকে এমন থাকতে চাইত। কারণ হিসেবে মানব সমাজের বিপর্যয় ও হিংস্রতাকে ইংগিত করা হয়েছে। সিনেমার একেবারে শুরুর দিকে দেখা যায় এলিসাবেট টিভিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চিত্র দেখে চমকে উঠছে। পরিচালক সমগ্র চলচ্চিত্র দিয়ে অনেক কিছুই হয়ত বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু কে কিভাবে বুঝবে তা অন্য ব্যাপার। আমি বিভাবে বুঝেছি সে বিষয়ে আমি এখনও নিশ্চিত নই। ইচ্ছা আছে সিনেমার ডায়ালগগুলো বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা সাবটাইটেলের মাধ্যশে আবার দেখার। তখন হয়ত পরিষ্কার হবে।
ইংমার বার্গম্যানের পারসোনা (প্রথম কিস্তি)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
লাভ কার হলো?
দীর্ঘদিন একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে, সরকারের ভেতর এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দেশের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করতে ব্যস্ত থাকে। বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা ছিল।
২০২৪ সালের আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন
হায়রে জীবন!
হায়রে জীবন!
যারা বছরের পর বছর রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে মানুষ গুম করেছে, নির্যাতন করেছে, পরিবার ধ্বংস করেছে, রাষ্ট্রকে ভয় ও আতঙ্কের কারখানায় পরিণত করেছে- তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন আজ “ভিআইপি আসামি”।
কারাগারেও... ...বাকিটুকু পড়ুন
রসময় গালগল্প

প্রতিদিন ভাবি তুমি এলে বেশ জমিয়ে করবো-
রসকষহীন কাঠখোট্টা গল্প!
আমার সঞ্চয়ে নেই কোনো রসময় গালগল্প-
যা থেকে পেতে পারো যৎকিঞ্চিত উষ্ণতা।
আমি ঠিক নিশ্চিত নই আদৌ তুমি আসো কিনা!... ...বাকিটুকু পড়ুন
ঈদযাত্রায় সচেতন হোন, নিরাপদ থাকুন

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে সারা বছরের কর্মব্যস্ততা পেছনে ফেলে শেকড়ের টানে নীড়ে ফেরার চিরন্তন আকুলতা। প্রিয় মুখগুলোকে বুকে জড়িয়ে অপার্থিব শান্তি অনুভব করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন
মেঝ দা


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।