somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নোয়ার গল্প ঃ মেটাফোর নয়, মুখফোড়!

২৩ শে মার্চ, ২০০৬ রাত ৯:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নোয়াকে সবাই জানতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে। সফেদ দাড়ি, মিষ্টি ব্যবহার, সবার জন্যে জাননেসারি, বিশ্বপ্রেমিক নোয়াকে ভালোবাসতো সকলেই। এমনকি মেয়রের কাছে প্রস্তাব গিয়েছিলো, শহরের খালটার নাম নোয়ার নামে করতে। কিন্তু নোয়াখাইল্যা গালি খাবার ভয়ে খালপাড়ের ওয়ার্ড কমিশনার আপত্তি জানিয়েছিলো বলে আর তা করা হয়ে ওঠেনি।

কিন্তু আচমকা এক গরমের দিনে নোয়ার মাথা গেলো বিগড়ে, সে চত্বরে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করতে লাগলো, "পাপ, পাপ, মহাপাপ! নগরবাসী, তোমরা পাপী! ঈশ্বরের সাথে মামদোবাজি করো তোমরা! সময় থাকতে ভালো হয়ে যাও, নইলে কিন্তু পস্তাতে হবে!"

এক কুলপিমালাইঅলা সস্নেহে নোয়াকে একটা মালাইকাঠি ধরিয়ে দেয়, সেটা চুষতে চুষতে নোয়া হনহনিয়ে কোথায় চলে যায়।

কিন্তু দুদিন যেতে না যেতে আবার, বাজারের এক কোণে নোয়া হাত আকাশের দিকে তুলে গোল হয়ে দৌড়ায়। "মহাপাপী তোমরা! ধ্বংস হয়ে যাবে সব কিছু। হুঁশিয়ার!"

এবার এক শসাওয়ালা নুনমশলা মাখিয়ে একটা শসা ছুলে দেয় নোয়াকে, চপচপিয়ে খেতে খেতে নোয়া চলে যায় কোথায় যেন।

এভাবে মাসভর নোয়ার পাগলামি চলতে থাকে, কখনও তেলেভাজার দোকানের পাশে গিয়ে সে চিৎকার করে, তারপর গরমাগরম গোটা চারেক সিঙ্গারা সান্তবনা পুরস্কার পেয়ে চলে যায় কোথায় যেন; আবার কখনও বিরিয়ানির ম' ম' গন্ধে মাতোয়ারা খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মাতম জুড়ে দেয় সে, মালিক ভালোবেসে একটু কাচ্চি খাইয়ে ঠান্ডা করেন তাকে।

কিন্তু তেপান্তরের মাঠের দক্ষিণ দিকটায় ঠায় দাঁড়ানো ঝাঁকড়া কড়ই গাছটাকে যেদিন শায়িত অবস্থায় পাওয়া যায়, পাশে করাত হাতে নোয়াকেও কাঠি নিয়ে মাপজোক করতে দেখা যায়, লোকজন বোঝে, নোয়ার মাথা ঠিক খিলিয়েপিলিয়ে ঠান্ডা করার নয়, শক্ত প্যাঁদানোর সময় হয়ে এসেছে।

নগরপাল কৈফিয়ৎ চান, বলেন, "নোয়া, বৃক্ষনিধন করলে যে বড়?"

নোয়া বলে, "হুঁ। রেইনট্রি বা কড়ই গাছ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তবে এর কাঠ দিয়ে ভালো জাহাজ তৈরি হয় শুনেছি।"

নগরপাল বলেন, "নোয়া, তোমার যে চীনা আদার আড়ৎ আছে বাজারে, ভুলে গেলে? তোমার কি জাহাজ নিয়ে মাথা ঘামানো মানায়?"

নোয়া বলে, "হুঁ। তোমাদের পাপ সীমা ছাড়িয়েছে। সামনে ভয়াবহ বন্যা। সময় থাকতে নৌকা বানাও।"

নগরপাল দলবল নিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।

দিন যায়। নোয়া একটা "সহজ জাহাজ নিমর্াণ শিক্ষা" নামের চটি বই দেখে দেখে কড়ই গাছের তক্তা দিয়ে একটা জাহাজ তৈরি করে ফেলে। একদিন নোয়া আলকাতরা মাখাচ্ছে খোলের গায়ে, নগরের নৌপরিবহন কর্মকতর্া এসে হাজির। সে বলে, "ফিটনেস সার্টিফিকেট বার করো তো নোয়া!'

নোয়া আকাশ থেকে পড়ে। কিন্তু কর্মকতর্া মানতে নারাজ। বলে, সার্টিফিকেট ছাড়া এ জিনিস আমরা ভাসাতে দোবো না। নোয়া বলে, মহাপ্লাবন এলে এ জিনিস আপনা থেকেই ভাসবে। কর্মকতর্া হাসে, বলে, খুব ধূমপান করেছো দেখি!

নোয়া অনেক তর্কাতর্কি করে, কিন্তু লাভ হয় না, নোয়ার জাহাজ কোন ছাড়পত্র পায় না। পরিবেশ কর্মকতর্া বৃক্ষনিধনের দায়ে পরিবেশ ছাড়পত্র দেয় না, নৌপরিবহন কর্মকতর্া লাইসেনস আটকে দেয়, দিনের পর দিন নোয়ার জাহাজ মাঠের কোণায় পড়ে পড়ে রোদবৃষ্টি খায়। আরারাত ক্রীড়া চক্রের ছেলেপুলেরা ফুটবল খেলা শেষে মাঝে মাঝে জাহাজে চড়ে গুলতানি দেয়, নোয়া লাঠি হাতে তেড়ে যায় তাদের দিকে।

মহাপ্লাবন আসে না, নোয়ার জাহাজও ভাসে না, কিন্তু লোকজন দারুণ আমোদ পায় নোয়ার কাজকর্মে, তারা ইঙ্গিত করে শুঁড়িখানায় নোয়ার আনাগোনার দিকে। তার গেলাসে একটু বেশি দারু ঢেলে শুঁড়ি মোটা গলায় হাসে, "এহহে, গেলাসে তো মহাপ্লাবন হয়ে গেলো হে নোয়াদা! উপচে পড়ে গেলো সব! জাহাজ আনবো নাকি?" নোয়া দাঁত কিড়মিড় করে বলে, "পাপ, পাপ, মহাপাপ!"

দিন যায়। নোয়া বিমর্ষ মুখে আদার ব্যবসা করে যায়, তেপান্তরের মাঠে তার জাহাজ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি হয়। মহাপ্লাবন আসে না, জাহাজও ভাসে না। কিন্তু লোকমুখে নোয়ার কাহিনী গ্রাম থেকে গ্রাম, গঞ্জ থেকে গঞ্জে, নগর থেকে নগরে ছড়িয়ে পড়ে। আর চীনা ফিসফাসের মতো তাতে রং চড়তে থাকে। শেষে এক বৃষ্টির বিকেলে গলিতে পানি জমে গিয়ে এক সরাইখানার গল্পবলিয়ে ছোকরার পাৎলুন ভিজে যায় কোমর অব্দি, সে মোমের আলোয় সরাইখানার আধো আধো মাতালদের সামনে পানপাত্তর উঁচু করে বলে, "সুধী মদ্যপের দল, আজ আপনারা শুনবেন নোয়ার মহাপ্লাবনের গল্প!"


কয়েক হাজার বছর পর নোয়ার জাহাজ খুঁজে পায় একদল গবেষক গল্পশিকারী। তেপান্তরের মাঠের ওপর দিয়ে কত ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে এই কয়েক হাজার বছরে, কড়ই কাঠ শুকিয়ে পাত্থর হয়ে গেছে একেবারে। গবেষকের দল ঠুসঠাস ফটো তোলে, তারপর দেশে ফিরে গিয়ে পত্রিকায় বড় করে প্রবন্ধ লেখে। নোয়ার গল্পে মুগ্ধ মদ্যপদের নেশা কাটে না এই কয়েক হাজার বছরে, তারা খুশিমনে জপ করে যায়।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Victims of enforced disappearances পার্সন হিসেবে আমার বক্তব্য.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:২১

গত ২৫ এবং ২৬ এপ্রিল ২০২৬ এ মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার' এবং World Organization Against Torture (OMCT) এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় “The Prevention of Torture and the Implementation of UNCAT and... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ০৫ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:২৯

পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় এবং এর ফলে উদ্ভূত আদর্শিক পরিবর্তন কেবল ভারতের একটি প্রাদেশিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪




আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক হাঁটছি, চলছি, পড়ছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কথা ছোট বোনটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×