somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুর্গত মানুষ এবং মোনাজাতউদ্দিন; আমাদের আবেগ, ভালোবাসা এবং কোম্পানীগুলোর ব্যবসা

২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন তাঁর এক লেখায় বলেছেন,

মাথা উঁচু করে পথ হাঁটি। কিন্তু মাথা নত হয়ে যায় বিবেকের কাছে। সাংবাদিকতার নামে এ আমি কি করছি! এটা কি রীতিমতো একটা ব্যবসা হয়ে যাচ্ছে না?

মানুষের দুর্ভোগ-দুর্গতি নিয়ে ব্যবসা। অনাহারী মানুষ আমার ব্যবসার পুঁজি। দুস্থ-দুঃখী মানুষ আমার সুনাম এবং অর্থ। তারাই স্বর্ণপদক, ফিলিপস পুরস্কার, আইডিই পুরস্কার, ইত্যাদি। এইতো কিছুদিন আগের কথা। গেছি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে। সেখানে খাদ্যাভাবে মারা গেছে ৮ জন। আক্রান্ত দেড়শ। ছবি তুললাম যে-লোকটি ৭ দিন অনাহারে থাকবার পর আধসের চাল পেয়েছে আর আর তা-ই ৭ সদস্যের পরিবারটি ভাগ করে খেয়েছে, তার। ছবি তুললাম এক বৃদ্ধার যে নাকি খাদ্যাভাবে ভাত বা রুটির পরিবর্তে অনাহারী পেটে গতকাল খেয়েছে দু'টি কাঁচাকলা সেদ্ধ।
ঐ ছবি তুলে আনলাম। ঝিনাইগাতী থেকে শেরপুর, শেরপুর থেকে জামালপুর হয়ে ঢাকা। সংবাদে এসেই জমা দিলাম সচিত্র প্রতিবেদন। প্রতিবেদন পড়ে কনগ্রাচুলেট করলেন বেশ ক'জন পাঠক। বেশ ভালো হয়েছে লেখা। ছবি, সে তো আরো খুব ভালো। 'থ্যাংক ইউ মোনাজাতউদ্দিন'।

ছবি ছাপা হয়। প্রশংসা যেমন পাই, তেমনি আবার ছবির বিল জমা দেই। বিল পাশ হয়ে যায় অল্প সময়েই। একেকটা ছবির জন্য পঞ্চাশ টাকা। একসাথে মোটা টাকা তুলি আমাদের হিসাব বিভাগ থেকে। দুপুরে খেতে যাই। শুভ্রায়, অথবা সংবাদ অফিসের নিচে মহুয়া রেস্তোরাঁয়।
খাই মুরগীর রান কিংবা খাসির কলিজা। কোনোদিন থাকে মাছ। থাকে গরুর ভুনা মাংস। গরম ভাত থেকে ধোঁয়ার সাথে সাথে উবে যায় সব স্মৃতি। অতীত উধাও, দুদিন আগে শেরপুরের কোনো অভাবী গ্রামে ছিলাম, ভুলে যাই। ভুলে যাই দীর্ঘদিন বেকার মজুর ভাদুর কথা, বিস্মৃতি হয় কাঁচাকলা সেদ্ধ-খাওয়া সেই বৃদ্ধা। যে-গ্রামে ক্ষুধা আজও আছে, যেখানে অনাহারজনিত অপুষ্টিতে মারা গেছে নরনারী শিশু, তারা কোথায়? কই? খাবারের টেবিলের ধারে ওদের ছবির টাকা আছে, ওদের নিয়ে লেখা ছবি-প্রতিবেদনের প্রশংসাবাক্য স্মরণ আছে, কিন্তু ধারে কাছে নেই আমার পণ্য। আমি যখন দুপুরে ভরপেট খাচ্ছি, তারাতো এই শহর থেকে অনেক দূরের গ্রামে আছে উপবাসী। তারা থাকুক কি মরুক, আধসের চালের ভাত ৭ জনে ভাগ করে খাক কিংবা কেউ খাক কাঁচাকলা সেদ্ধ, আমার যেন কিছু আসে যায় না! মানুষের কলিজাখাদক জনৈক খলিলুল্লাহ, অনেকদিন আগে ধরা পড়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কাছে থেকে। সে খেত মৃত মানুষের কলিজা। খেত প্রকাশ্যে। আর আমি, অসম সমাজের আমি, সম্পদের সুষম বণ্টনহীন সমাজের আমি, জ্যান্ত মানুষের দুর্গতি-দুভাগ্য পণ্য করে খাই। এবং এই কাজটি করি কৌশলে, সবার চোখের আড়ালে, ফর্সা কাপড়ে দেহ ঢেকে। আমার মেকআপ খুব কড়া। ধরা যায় না।


( মোনাজাতউদ্দিন এর "পথ থেকে পথে" গ্রন্থ থেকে নেওয়া।
অপ্রকাশিত। ২২ ডিসেম্বর '৯০ )


কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, আমরা যারা গাজায় ইসরাইলের বর্বর হামলার নিন্দা জানাতে গাজার সাধারণ মানুষদের রার আবেদন জানিয়ে কিংবা ইসরাইলের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়া টি-শার্ট পরি। অথবা "যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই"-জাতীয় শ্লোগান বুকে নিয়ে বেরাই। স্বাধীনতার পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে নানা কবিতা, গান বা কথামালা সমৃদ্ধ টি-শার্ট পরি, অথবা চে'র বা অন্যান্য আদর্শ পুরুষদের ছবি সমৃদ্ধ টি-শার্ট গায়ে দেই, এই আমাদের পুঁজি করে কেউ ব্যবসা করে না তো? আমাদের বিশ্বাসকে, আবেগকে, ভালোবাসাকে ইস্যু, কখনও কখনও বিজ্ঞাপন বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয় না তো কোম্পানীগুলো?
আর আমরা সরল বিশ্বাসে তাদের সহায়তা করছি না তো?

চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন খুব সহজ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। কিন্তু এই ব্যবসায়িক কোম্পানীগুলো কি এটা কখোনো বলবে, মেনে নেবে?
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:১৩
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক: একটি প্রগতিশীল (?) অগ্রযাত্রা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১:০৮


আমি আসলে জন্মগতভাবেই খুব আশাবাদী মানুষ। সত্যি বলছি। ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে যখন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা জারি করল, আমি মনে মনে বললাম , অবশেষে কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষের জন্যে আপনি কি করতে পারেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:২৫



পৃথিবীতে অনবরত বিভিন্ন ধরণের কাণ্ড ঘটে চলেছে, যা একজন মানুষের মনকে ভারাক্রান্ত করতে বাধ্য। হামে কাছের মানু্ষ মারা যাচ্ছে, দুর্ঘটনায় বন্ধুর মৃত্যু কিংবা ইরান - যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতে প্রাণহানি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×