somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পলাতক (একটা পুরনো গল্প)

০৩ রা মার্চ, ২০১১ রাত ৩:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২/৩ বছর আগে কলেজ বার্ষিকীর জন্য লেখা একটা গল্প শেয়ার করলাম -কাউকে ছোট করা এই গল্পের উদ্দেশ্য নয় -


আমাদের গল্পের প্রধান চরিত্র ,ধরা যাক তার নাম শ্যামলী ।উত্তরায় একটা গার্মেন্টসে চাকরি করতো ।হঠাৎ দেখলে চট করে কারো পক্ষে আলাদা করে চেনা মুশকিল -খানিকটা ময়লা রং ,কাঁধে নেমে আসা চুল ,কটা চোখ -একটু ছোটখাট গড়নের ।
সেদিন ডিউটি শেষে একটু আগেভাগেই বের হল শ্যামলী । বেতন হয়েছে সেদিন ।কাল ভাইটার জন্মদিন ।একটা থ্রি-কোয়ার্টারের জন্য বায়না ধরেছে -অনেকগুলো করে নাকি পকেট থাকে ।গত ঈদে ভাইটাকে কিছুই দিতে পারেনি -পরশু নাহয় একটু শিশুপার্কে নিয়ে যাওয়া যাবে ।

বিকেলের হলদে রং যখন লালচে হতে শুরু করেছে ,আর সব ক্লান্ত পাখিদের মত শ্যামলীও উঠে এলো ঘরের পথে ।কানে একজোড়া সস্তা ধরণের দুল -একটা ফুটপাতের দোকান থেকে কিনে পরেই ফেলেছে -ভাইয়ের জন্মদিন ছাড়া এসব পরবার সুযোগ আর কটাই বা আসে ।সাভার বাসা শ্যামলীদের -জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটির ঠিক আগে ।আজ হয়তো পৌঁছাতে রাত হয়ে যাবে ।ব্যস্ততার ক্লান্ত পায়ে সাভারের বাসে উঠলো ও ।

বাস থেকে নেমে শ্যামলী দেখলো ,তাহের দাঁড়িয়ে আছে ।ওকে দেখে এগিয়ে এলো -এমনভাবে ,যেন ওর জন্যই অপেক্ষা করছিলো ।একটু অবাক হলো ও ।তাহের আগে ওর গার্মেন্টসেই গার্ডের চাকরি করতো -মাস দুয়েক হলো ছেড়ে দিয়েছে ।এখন নবীনগরের রাস্তায় মটর সাইকেল হাঁকিয়ে বেড়ায় ।টাকা পায় কোত্থেকে ব্যাটা ওড়ানোর -ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে গেলো শ্যামলী ।

-কিরে তাহের ,কি খবর ?এখানে কি করোস ?
-আরে ম্যাডাম ,অয়েলকাম ,অয়েলকাম ।আইজক্যা কপালডাও ভালো ,তোমারে সময়মতো পাইয়া গেলাম ।
-ক্যান ,কি দরকার ?
-ক্যান ,দরকার ছাড়া পাড়ার মাইনশের খবর নেওয়া যায়না ?
-তাও ,দরকার ছাড়া খোঁজ খবর কইরা বেড়ানোর টাইম আমগো মত গরীবগো কই ?
-যাক গিয়া ,রাবেয়া তোমারে খুঁজে -কিয়ের নাকি টাকা পাও তুমি ।অয় তো কালকে মুন্সীগঞ্জ যাইবগা ।
-ইয়ে ...আইজকা তো সন্ধ্যা নাইম্যা গ্যাছে ,ভার্সিটির ভিতরে গেলে ফিরতে আন্ধার জাঁইকা বসবো ।কাইল যাই ?
-কইলাম না অয় কাইলকা যাইবগা ?আরে চলো চলো ,আমিও ওইদিকেই যামু অখন ,পরে বাসায় পৌঁছায় দিমু নে ।


জাবির হোস্টেলে পেছনটা এক বিশাল এলাকা -জঙ্গলই বলা চলে ।কেউ খুব একটা যায়না ওদিকটায় ।শ্যামলীর একটু কেমন যেনো করতে লাগলো ,কি যেন একটা ঠিক নেই ।
-কিরে ,রাস্তা দিয়া হাঁট ।ঐদিক যাস ক্যা ?

জবাবে পেছন থেকে একটা শক্ত হাত ওর গলা চেপে ধরলো ।কোমরে স্পর্শ করলো ধাতব কিছু একটা ।ভার্সিটির নির্জন রাস্তায় ছুটে এসে বাঁচাবার কেউ নেই তখন ।আতঙ্কে পাথর হয়ে গেলো শ্যামলী ।

-চোপ হারামজাদী ,একটা সাউন্ড করবিনা ।আগে হাঁট ।

টানতে টানতে জঙ্গলের গহীনে একটা কাঁটাঝোপের ওপর ওকে ফেললো হাতটা ।জামা ছিঁড়ে গেলো অনেকটা ।এতক্ষণে দেখতে পেলো শ্যামলী ,তাহেরসহ ওরা তিন জন ।

-তাহের...ভাইরে ,ও ভাই...তোর কসম লাগে ...
-চোপ হারামজাদী !!চোপ !!
-আম্মা ,আম্মাগো...

একজন ওর পা দুটো চেপে ধরলো -ঠিক যেভাবে কুরবানির সময় গরুকে ধরা হয় ।হাতের ওপর চড়ে বসলো অসহ্য ভারী দুটো পা । তাহের নামের অতিকায় পোকাটা এগিয়ে আসছে আস্তে আস্তে ...আঁধার হয়ে এলো শ্যামলীর চেনা জগতটা ।
*****
তারপর ??
পরের অংশটুকু আমি নিজেই বর্ণনা করি -গল্পের ভাষায় কাহিনীটা ঠিকমত আসবে না ।গণ ধর্ষণের পর মৃতপ্রায় শ্যামলীকে টেনে জঙ্গলের আরো গভীরে নিয়ে গেলো ওরা ।রক্তাক্ত তলপেটে ,মুখে বারবার পড়লো জুতা আর ডালের আঘাত ।অচেতন শ্যামলীর সারা দেহে কেরোসিন ঢেলে অগ্নিসংযোগ করলো পশুরা ।পুড়তে থাকা শরীরটার ব্যবস্থা পরে করা যাবে ভেবে চলে গেলো ওরা ।
দুদিন পরের এক রাত ।কিছুক্ষণের জন্য চেতনা ফিরে এলো শ্যামলীর ।সারা শরীর ঝলসে গেছে ,নড়বার শক্তিটুকু নেই ।নির্জন জঙ্গলে কেউ শুনলো না ওর নীরব কান্না ।শুনলো শুধু পিঁপড়া সম্প্রদায় ,যারা এসেছিলো "মৃতদেহ" টার সদ্ব্যবহার করতে ।আর একটা শেয়াল ,চারপাশে ঘুরঘুর করছিলো ।অসহ্য যন্ত্রণায় আবার জ্ঞান হারালো মেয়েটা ।


পরদিন সকালে আবারো চেতনা ফিরে এলো শ্যামলীর ।আরো ঘন হয়ে এসেছে পিঁপড়ার স্তর ।কিছু মানুষের কন্ঠস্বর হঠাৎই শুনতে কানে এলো ওর ।শরীরের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে নড়ে উঠতে চাইলো ও সাহায্যের আশায় ।

প্রকৃতি সময়ে সময়ে মানুষকে নিয়ে খানিকটা নির্মম কৌতুক করে ।সেদিন এসেছিলো ওর তিন "সাহায্যকারী" -তাহের ,আর তার দুই বন্ধু ।শরীরের এখনো স্পন্দন আছে দেখে হতবাক হয়ে গেলো তারা ,তবে অবাক ভাবটা কাটিয়ে উঠতে বেশি সময় নিলোনা ।শ্যামলীকে "সাহায্য" করলো তারা -পুরো শরীরে এসিড ঢালা হলো ,ছুরি চালানো হলো গলার কাছটায় ।

আমার কথা আপনাদের অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে ,কিন্তু সত্যি সত্যি তখনো মারা গেলোনা শ্যামলী ।খোলা চোখ দুটো সোজা আকাশের দিকে তাকিয়ে ।এসিডের কারণে পিঁপড়াগুলোও তখন চলে গেছে ।একটুখানি বৃষ্টি হলো সেদিন রাতে ।তখন অপেক্ষা শুধু নষ্টপ্রায় দেহ ঘড়িটা বন্ধ হবার ।সময় যাচ্ছে ,আরো ধীর হয়ে আসছে সেটা -টিক...টিক...টিক...
হতভাগ্য শ্যামলীকে পাঁচ দিনের মাথায় উদ্ধার করা হলো জাবির ঘন জঙ্গল থেকে ।ক্যাম্পাসের বৃদ্ধ ঝাড়ুদার জালাল মিয়া জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখতে পান জীবন্মৃত দেহটা ।তারপর শুরু হয় এক অসম লড়াই ।হাসপাতালের বিছানায় একুশ দিন লড়াই চলে মৃত্যু আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ।জাবির জঙ্গলে জবাই হুওয়া ,দগ্ধ ,এসিডে ঝলসানো যে মেয়েটা পাঁচটা দিনের অসম্ভব জীবনযুদ্ধে টিকে ছিলো ,অবশেষে তার ঠাঁই হয় শূন্যতায় ।মৃত্যুর আগে এক এক করে সবার নাম বলে যায় সে ।চারমাস পর এক অলস দুপুরে সাভার থানার এসআই হাই তুলতে তুলতে কেস ফাইলে বড় করে লেখেন -পলাতক ।
****
আমি জানি ,আপনারা অনেকেই কাহিনীটা পড়া শেষ করে "ধ্যাত্তেরী" বলে ব্লগটা বন্ধ করবেন ।হয়তোবা খুব উঁচু দরের হয়নি লেখাটা ।কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় ,আজ যদি আমার (বা আপনার) হাসিখুশি একটা বোন থাকতো ,আর তার ধর্ষিত -দগ্ধ দেহটা পাওয়া যেতো জাবির ঘন জঙ্গলে ,তবে সেটা কেমন হতো !প্লিজ ,আমরা কেউ যেনো পাথর হয়ে না যাই -আমরা যেনো অমানুষ হয়ে না যাই !!
( সত্য ঘটনা অবলম্বনে ।)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১১ রাত ৩:০৪
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×