আমি অন্ধ,বোবা, বধির।
পৃথিবী রঙ্গিন,রঙ্গিন পৃথিবীর রং নিয়ে খেলতে আমরা সবাই ভালোবাসি।
কিন্তু এই রঙ্গিন পৃথিবীর কোন রং এ যে আজ আমাকে স্পর্শ করতে পারে না। কারণ আমি যে অন্ধ,বোবা, বধির।
রং হীন এই সত্তার মাঝেও অনুভূতি নামক এক উষ্ণ পদার্থ আমাকে গ্রাস করে রাখে সূর্য উদয় থেকে সূর্যাস্ত পযন্ত।
জন্মগত ভাবে আমি কিন্তু অন্ধ, বধির বা বোবা ছিলাম না। জন্মের পর পরেই রঙ্গিন পৃথিবীর সমস্ত রং যেন এসে হেলে পড়ছিল আমার শরীরে। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি এসে ডলে পড়ছিল আমার কপালে। আশেপাশের মানুষের আমাকে নিয়ে প্রশংসা শুনতে শুনতে আমি তখন থেকেই ক্লান্ত।ওয়া ওয়া করে আমি জানান দিচ্ছিলাম রঙ্গিন পৃথিবীর সব রং আমি অনুভব করতে পারছি।সেইদিনের সেই অনুভব থেকে আমার মাঝে জন্ম নিয়ে নিল অনুভূতি নামক এক উষ্ণ পদার্থের।
এই অনুভূতির পাঠাতলে পৃষ্ঠ হয়েই আমি আজ অন্ধ,বধির ও বোবা।
জন্মের পর আমারও বাড়ির উঠান রক্তে প্লাবিত হয়েছিল, আমার বাড়ি থেকেও বের হয়েছিল মাংসের ঘ্রান। যা আমি আমার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করতে পেরেছিলাম সেদিন। সেই দিন আমার উচ্চাসিত মা, বাবা আমার নাম রেখেছিল মোহাম্মদ রহিম যার অভিপ্রায় দয়ালু, করুণাময় কিংবা সহানুভূতিশীল।কিন্তু সদ্য গাড়ি চাপা পড়ে মারা যাওয়া আমারই পাশের বাড়ির ঈরিশ চক্রবর্তীর ৬ বছরের বাবা হারা শিশু শুভ্র যখন ক্ষুধার জ্বালায় কান্না করে তা আমার চোখে পড়ে না। কারন আমি যে অন্ধ, শুভ্রের কান্নার ভারি বাতাস আমার কান পযন্ত আসে না কারণ আমি বধির, যথেষ্ট টাকা থাকার শর্তেও শুভ্রের মাকে গিয়ে আমি বলতে পারি না এই নিন টাকা এই টাকা দিয়ে ওর ক্ষুধা মেটানোর মত কিছু খাবার নিয়ে আসুন, কারন আমি যে বাক্শক্তিহীন। অক্ষমতা যেন আমাকে চর্তুদিক থেকে গ্রাস করে রেখেছে। তবে তাতে কিইবা যায় আসে আমি তো সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ তাইনা।তাও আবার পুরুষ মানুষ। সব চাইতে বড় কথা হল মস্তিষ্কের কেশ থেকে পাদদেশের নখর পযন্ত আমার ভরপুর অনুভূতি আছে।
ও আচ্ছা আগেই বলে রাখা ভালো আমার কাছে যে অনুভূতি আছে তা কিন্তু খুবই স্পর্শকাতর।এমনকি সামান্য গঠনমূলক কথাও মোমবাতির মত গলিয়ে দিতে পারে আমার পুরু শরীর ভর্তি অনুভূতি।
যাই হোক মূল কথায় আসা যাক যেহেতু আমার পুরুদস্থ শরীর জুড়েই অনুভূতি, তাই একজন অনুভূতি সম্পূর্ন মানুষ হিসাবে অন্য আরেক জন অনুভূতি সম্পূর্ন মানুষের মনের ভাব বা অভিপ্রায় বুঝতে খুব বেশী কষ্ট হওয়ার কথা নয়।কিন্তু হয়েছে হীতে বিপরীত, আমার অনুভূতি ছাড়া আমি অন্য কারও অনুভূতি অনুভবই করতে পারি না। তাহলে বলতে পারেন আমি কি সংকীর্ণচিত্ত মানুষ?
হুম সংকীর্ণচিত্ত মানুষ। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রা আমাকে গ্রাস করে পেলেছে।
নিজেকে বহির্দিকে অভিক্ষিপ্তাবস্থা নিতে নিতে আমি যেন হয়ে গেছি পৃথিবীর সবচাইতে ঘৃনিত ব্যাক্তি নাৎসি বাহিনীর প্রধান হিটলারের মত।
শুধুমাত্র বিদ্বেষই যেন হয়ে উঠেছে আমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাসার দেয়ালে ৮২" টেলিভিশন নামক বোকা বাক্সে যখন দেখি কোন সন্ত্রাসীকে পুলিশ রাতের আধারে গুলিকরে হত্যা করেছে তখন খুব বেশি উচ্চাসিত হই, মাঝে মাঝে তালিও দেই। এতদিনে পুলিশ কাজের মত কাজ করেছে বলে মন্তব্যকারীদের সাথে তাল মিলাতে এখন আর আমার কোন ইতস্ততা লাগে না। আবার মেজর সিনহার মত কোন বীর সৈনিকের পুলিশের তথাকথিত বন্ধুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনায় প্রতিবাদ বা মর্মাহত হওয়ার অভিনয় করতেও কিন্তু ভুল করি না। কিংবা সেই দিন সদ্য ধর্ষিতা মেয়েটি যখন আদালতের বারান্দায় হাটতে হাটতে নিজের জুতা ক্ষয় করে পেলে তখন ন্যয় বিচারের চেয়ে ধর্ষক দেখতে কেমন সেটাই যেন আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মাঝেমধ্যেতো কোন কোন ধর্ষককে সুদর্শন বলে আখ্যায়িত করতেও আমি কার্পণ্য করি না।আর মেয়ের পোশাক যদি ছোট থাকে আমার আর বুঝতে একটুও কষ্ট হয় না যে দোষটা আসলে কার ছিল।ধর্ষিতা মেয়ে ও তার মায়ের চরিত্রের অভ্যন্তরে ঠুকে চরিত্র হননে ব্যাস্ত হয়ে পড়ি। হয়ত ভাবছেন শুধু তার মায়ের চরিত্র নিয়ে কেন আমার সন্দেহ , বাবারও নয় কেন?
কারন আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যৌনতা অনুভবের অধিকার শুধুমাত্র পুরুষদেরেই আছে।এটাই আমি অনুভব করি আর এই অনুভব থেকেই আজ আমার এ অনুভূতি।
আচ্ছা বলুনতো এই যে আমার অনুভব বা অনুভূতি এটি নিয়ে কি আমার নিজের প্রতি খুব ঘৃনা হওয়া উচিত বা অনেক বেশি লজ্জিত ?
না আমারতো তা মনে হয় না, আমিতো আমার এই অনুভব বা অনুভূতি নিয়ে বেশ গর্ববোধ করি। কারণ আমার অনুভব বা অনুভূতি যদি এতটাই ঘৃনিত হয় বা হত তাহলে তা তো আর সমাজে স্বীকৃতি পেত না।
যে সমাজের দেয়ালে লেগে আছে আধুনিকতার প্রলেপ। যেখানে বাস করে আধুনিক মর্ডারেট শিক্ষিত মানুষ। বিংশ শতাব্দী পার করে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি আধুনিক সমাজ বিনির্মানে আমার মত কত শত আধুনিক মতাদর্শের লোকের প্রয়োজন তা কি আপনি কখনো ভেবে দেখেছেন?
এতকিছু দেখা বা শুনার পর আপনার কাছে মনেই হতে পারে আমার অনুভূতি বড্ড বৈচিত্র্য। যদি এমনটাই মনে হয় তাহলে আমি আপনার সাথে কিছুটা একমত পোষণ করে বলব বৈচিত্র্যময় চিত্র আঁকতে যেমন অনেক রং এর প্রয়োজন হয়। তেমনি আমার অনুভতিও কিন্তু বেশ রঙ্গিন।
যেমন আমার ভুখন্ডে কোন ধর্মীয় প্রতিবাদ সভায় অংশ নিয়ে কোন মন্দির , গির্জায় কিংবা প্যাগোডা আগুন জ্বালিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নিতে আমি যেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, তেমনি অনিকেত প্রান্তের শেষে কাটাতারের বিপরীতে মানুষ গুলোর এই জ্বালাময়ী আগ্রাসন আমাকে খুব হতাশ করে।ঠিক তখনেই ফেইসবুকের ওয়ালে ঢলে দেই আমার সব প্রতিবাদের ভাষা।
কারণ আমি যে একজন মানবিক মানুষ। মুখবইয়ে আমার এই মানবিকতার প্রতিবাদ দেখে মন্তব্যের ঘরে কোন কোন তথাকথিত সুশীল মন্তব্য করে আমি নাকি হিপোক্রেট।
মন্তব্যের ঘরে আমাকে হিপোক্রেট বলা তথাকথিত সুশীলদের আমি প্রশ্ন করি, আমাকে হিপোক্রেট বলার সময়তো আপনি আপনার আয়নার সামনেই থাকেন, তাহলে আপনার সামনের আয়নায় আমাকে হিপোক্রেট বলার জন্য আমার প্রতিচ্ছবি কিভাবে দৃশ্যমান হয়?
এতকিছু বলার পরো যদি আপনি আমার স্পর্শকাতর অনুভূতি অনুভব করতে ব্যার্থ হন তাহলে বলতেই হয় যে, আপনার অনুভূতি ভোতা হয়ে গিয়েছে।
আর যদি উল্ট আপনার অনুভূতিতে আঘাত লেগে যায়। তাহলেও আমার কিছু করার নেয়, কারন ঐ যে প্রথমেই বল্লাম আমি অন্ধ, বোবা ও বধির।কার অনুভূতি স্পর্শ করার মত ইন্দ্রিয় যে আমার অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০২১ রাত ২:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




