somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিজের অন্ধকার থেকে অর্বাচীনদের যে দৃষ্টিপাত, সে দৃষ্টিপাত আমার নয়

১১ ই মার্চ, ২০০৭ ভোর ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইউরোপীয়ান সমাজে একটা ছেলে বা মেয়ের বয়েস আঠারো থেকে কুড়ি হবার পর ওদের কোন গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড না থাকলে বাবা মায়েরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। ভাবেন, তাদের সন্তানের সামাজিক পদক্ষেপে নিশ্চয়ই কোন সমস্যা রয়েছে। এখানকার দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করতে গেলে, ভাবনায় পড়ারই কথা। এখানে জীবন সঙ্গী নিজেকে খুজে বের করতে হয়। অযোগ্য কোন বড়লোকের ছেলেকে টাকার জোরে কোন গরীব পরিবারের গুনী সুন্দরী কন্যার সাথে মিলিয়ে দেয়া যায়না। যারা নিজেরা নিজেদের সঙ্গী খুজে বের না করতে পারে, ভালো কোন ম্যাচ মেকারের সাহায্য না পেলে তাদেরকে সারাজীবন একাই থেকে যেতে হয়।

এটা ভালো কি মন্দ, তার বিচার করার অধিকার আমাদের নেই, ভালো মন্দ রূপকে চোখের সামনে ধরা যেতে পারে, বলা যেতে পারে ,এখানকার সমাজ ও তার বিন্যাসের প্রেক্ষিতে এটাই ঠিক। আমাদের সমাজের জন্যে এটা ঠিক না ও হতে পারে। পাশাপাশি বিচারে এটাই সে সমাজ, যে সমাজ চিন্তা ভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিচারে প্রথম সারিতে স্থান দেয়া যেতে পারে। এখানকার সমাজের সাধারণ স্তরে যে সততার প্রভাব, আমাদের কাছে তা রূপকথার মতো। এখানেই বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে মিছিল করা হয়, প্রতীক প্রতিবাদ হিসেবে মোমবাতি হাতে ছেলে, বুড়ো, জোয়ান সহ সবাই বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। এখানে রাস্তায় বা কোথাও মুলবান কিছু হারিয়ে গেলে আবার ফেরৎ পেলে অবাক হতে হয়না। এখানে রাস্তায় রেরুলে সন্ত্রাসীয় ভয়ে ম্রিয়মান থাকতে হয়না। একজন নাগরিক হিসেবে যে অধিকার প্রতিটি মানুষের প্রাপ্য, তার বেশী পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যেতে পারে বলে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

তারপরও যেসব আমাকে পিড়া দেয়, তার কথাও বলতে চাইছি। দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলো মানুষের জন্যে যন্ত্রনাদায়ক হলেও মানুষকে কোন এক সুত্রে এক সুতোয় বাঁধে। সমস্যা নিয়ে সংলাপের মাঝে আত্মিক সংলাপের পরিধিও বিস্তারিত হয়। এখানে তা নেই বা কম বলে প্রতিটি মানুষই তার একক সত্বার প্রভাবেই বেশী প্রভাবাহ্নিত। আত্মিক যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার প্রভাবে একসময় একাকীত্ব স্থান করে নেয় মানুষের ভেতরে। সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে অনেকেই।

ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেলে এখানকার বাবা মায়েরা একাই থাকেন। তারপর যখন বৃদ্ধ হন, তখন যাদের সামর্থ আছে, তারা বাইরের সাহায্য নিয়ে নিজেদের চারদেয়ালে থাকেন, অনেকে ওল্ড হোমে স্থান খুঁজে নেন। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, বুড়োরাও নিজেরা একা একা থাকতেই পছন্দ করেন। তবে এখানকার বৃদ্ধদের কথা ভাবলে আমার কষ্ট হয়। আমাদের সমাজের চেয়ে তারা অনেক দ্রুত অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েন। আর্থিক সমস্যা না থাকলেও একাকীত্বের ভারে দুর্বিসহ হয় জীবন। তবে পাশাপাশি একটি কথাও খেয়াল রাখতে হবে যে, এখানে বৃদ্ধত্ব শুরুও হয় অনেক দেরীতে।

অন্যান্য সমাজের মতো এখানকার সমাজে হোমোসেক্সুয়ালিটি রয়েছে। তাদেরকে আলাদা ভাবে দেখা হলেও ও বাবা মায়েরা বিচলিত হলেও সমাজের উদার চিন্তার কারনে হোমোদের একঘরে করা হয়না। অনেক সময় তাদের ভেতরে বিয়েও মেনে নেয়া হয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে নানা ধরণের হোমো আন্দোলনের কারনে। আমাদের সমাজে হোমোসেক্সুয়ালিটিকে দোষ হিসেবে দেখা হয়, এখানকার সমাজে এটাকে আত্ম ও শরীরতাড়িত প্রবনতা হিসেবে দেখা হয়, যার উপর সে মানুষটির কোন প্রভাব নেই। একজন, যার ডান হাতের চেয়ে বাঁহাত বেশি ক্রীয়াশীল, সেজন্যে তাকে দায়ী করা যেতে পানে না। এটা একটা তুলনা মাত্র। এখানকার সমাজ এটার এ বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে সেভাবেই দেখে এই মানুষগুলোকে। আমার নিজের ভাল না লাগলেও আমি এর মাঝে খারাপ কিছু দেখি না।

আমাদের বাংলাদেশের সমাজের বর্তমান চেহারা নিয়ে নতুন করে আলোচনা টানতে চাইনা। যে প্রশ্ন সামনে দাঁড়ায় বারবার, তা হলো, এখানকার সমাজের যে দিকগুলো আমরা দেখি, তার থেকে ভাল ভাল গুলে বেছে নিয়ে, সেগুলো তুলে এনে আমাদের সমাজে সমাজে বসিয়ে দেয়া যেতে পারে কি? আমার তা সম্ভব মনে হয় না, যদিও কিছু কিছু এ সমাজের বিরুদ্ধবাদীরা অপবাদই দিয়ে থাকেন যে আমরা সেটাই চাই। যেহেতু তারা সাদা কালো চশমা পড়ে থাকতে ভালবাসেন, সেহেতু তারা তারা তাদের অপরিচিত পরিধিকে কালো হিসেবেই দেখেন। আর তাদের সেই কালো দৃষ্টির গরল ছড়িয়ে যাচ্ছেন যত্রতত্র। আমি সে গরল ছড়াতে চাইনা। আমি বলতে পরি এটা আমার জন্য গ্রহনযেগ্য বা গ্রহনযোগ্য নয়। ঢালাওভাবে ভালোর ঘরে বা মন্দের ঘরে ঢুকিয়ে দেবার অধিকার আমার আছে বলে আমি মনে করি না। অনেকের চোখে চিন্তার সে সুক্ষতাটুকু ধরা পড়ে না বলে, তারা তাদের সাধ্যনুযায়ী একটি সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেন। তরে সঠিক সিদ্ধান্তের কাছাকাছি আসার আগে যে চশমাটি খুলতে হয়, সেটা তারা ভুলে যান প্রতিবারই। আমাদের চোখে সাদাকালো চশমা নেই, সেহেতু বোঝার চেষ্টা করি, কতোটা পারিপার্শিক প্রভাবে প্রভাবাহ্নিত হয়ে একটি সমাজ তৈরী হয়। সেকারনে নিজেদের জন্যে যা গ্রহনীয় নয়, তাকে সাথে সাথেই খারাপ বলি না। দুটো সমাজের সমাজের গ্রহনীয় দিকগুলোর মাঝে আদানপ্রদান ঘটতে পারে, কিন্তু একটি সমাজকে এনে অন্য সমাজের ঘাড়ে বসিয়ে দেয়ার মতো মুঢ়তা আমাদের মাঝে কখনোই নেই, আগেও ছিলনা। কিন্তু কিছু কিছু লোক তাদের সীমিত দৃষ্টিক্ষমতার পরিধিতে আমাদেরকে সে অপবাদ দিতেই প্রয়াসী হন।

কান টানলে মাথা আসে। আমাদের সমাজে একটা তথাকথিত শিক্ষিত দল রয়েছে। তারা চিন্তা ভাবনায় উৎকট ধর্মান্ধ। তাদের ধর্মান্ধতার বিপক্ষে কোন কথা বলা হলেই তারা পশ্চিমা সমাজের কোন বিভ্রান্তির কথা অযুহাত হিসেবে দাঁড় করান। ধর্মনিরপেক্ষতা কথা বলা হলে ধর্মহীনতার অযুহাতে সত্য মিথ্যা মিশিয়ে তাদের পছন্দ অনুযায়ী এক খিচুড়ী পরিবেশন করার চেষ্টা করেন। নারী অধিকারের প্রসঙ্গ আসলে নিজের সুবিধাবাদী পুরুষীয় অবস্থানকে সর্বাগ্রে টানেন। মেয়েদেরকে অন্তরীন করে রেখে নিজেদের সামাজিক ও আর্থিক উৎকর্ষের পথ খোঁজেন। তাদের জলন্ত উৎকট উদাহরণ আমাদের ব্লগে রয়েছেন। তার নারী বিদ্বেসী বক্তব্যের প্রতিবাদে পোষ্ট দিয়েছিলাম বিশেষ কয়েকটি ছত্র চিহ্নিত করে। চিহ্নের বাইরের ঢালাও যে বক্তব্য রয়েছে, তার উত্তরও আমি আমার এই লেখার মাধ্যমে রাখতে চেয়েছি।

অনেকদিন ধরেই এই ইউরোপীয়ান সমাজে বাস করছি। এর ভাল মন্দ দুটোই দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এখানকার সমাজে আমাদের দেশের তুলনায় সহজলভ্য সেক্স রয়েছে, নগ্নতা রয়েছে। এখানে এলকোহল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে নিষেধ নয়। আথচ আঠারো বছরের কারো কাছে সিগারেট ও মদ বিক্রি করা বেআইনি। এখানে বারো বছরের উপর সীমানা বেঁধে দেয়া ছবিতে সীমিত যৌনতা থাকতে পারে, কিন্তু খুনোখুনি সন্ত্রাস যে ছবিতে আছে, সেগুলো আঠরো বছরের নীচে কারো দেখা বেআইনি। যে কোন পোষাক পরেই বের হোক না কেন, রাস্তায় একটি মেয়েকে অপমান করার সাহস কারো নেই। তারপরও এর মাঝে ফাঁক রয়েছে, ব্যাতিক্রম রয়েছে। এ সমাজের অন্ধকার দিকগুলোও রয়েছে। তারপরও এখানে ভালবাসাও রয়েছে, আমাদের মতোই এখানকার প্রেমিকারাও প্রেমিকের জন্যে কাঁদে। সন্তানের প্রতি বাবামায়ের ভালবাসা এখানেও কম নয়।

এ সমাজকে আমাদের সমাজে ইমপোর্ট করে চাপিয়ে বসিয়ে দেয়া হবে, এমন দাবী বা দুরাশা আমার কখনোই কোন বক্তব্যের মাঝে টানিনি। এখানকার নগ্নতা আমাদের সমাজকে তার বসন খুলে ন্যংটো করবে, এমন সপ্ন কেউ দেখেনি। আমি আশা করি, আরো যারা আমার মতো মুক্তমনা আছেন, তারাও এ ধরণের ইমপোর্ট নীতিতে বিশ্বাসী। তারপরও কেন ও উৎকট অভিযোগ? স্বাধীনতা বলতে কাপড় খেলার অভিযোগ যারা আনেন, তারা স্বাধীনতার মর্মই বোঝেন নি। হয়তো তারা তাদের অবচেতন মনে ও ধরনের সপ্ন দেখে থাকেন। এখানে যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ্যে করা হয়, আমাদের দেশ তা করা হয় সাবধানে, সমাজের অগোচরে। হোমোসেক্সুয়ালিটি আমাদের সমাজেও আছে, তেমনি নগ্নতাও। কিন্তু অনেক লুকিয়ে চুরিয়ে। তাদের মতো হয়তো অন্ধকারে যা কিছু চোখে না পড়ে, সবই ভালো। সেজন্যে তাদের অন্ধকার দরকার। আমার তার দরকার ণেই। সাদা কালো চশমা পড়ে অন্ধকার থেকে উঁকি মেরে পরিচিত, অপরিচিত সমাজের প্রতি অর্বাচীনদের যে দৃষ্টিপাত, সে দৃষ্টিপাত আমার নয়।

সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০০৭ দুপুর ২:৩২
১৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারেক রহমানের চীন সফর, অশ্বডিম্ব।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৭

বাংলাদেশী মিডিয়া সোসাল মিডিয়াতে তোলপার
তারেক রহমানের চীন সফরে ভারত উদ্বিগ্ন।
এখন তো দেখলাম অশ্বডিম্ব।
কোন অর্থায়ন চুক্তি নেই, নতুন কোন ঋন দিবে না
বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে কোন চুক্তি বা মামুলি সমঝোতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরাগের বুকে আমার ছোট ভাইদের লাশ ২০২৪-এর উপহার ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৩



২০২৪ আমাদের নতুন করে শত্রু মিত্র চিনতে শিখিয়েছে। আমি কোনো করুনা, সান্ত্বনা কিংবা বিচারের দাবি নিয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র পোস্ট লিখতে চাই না।শুধু সময়ের স্বাক্ষী হিসেবে একটু আচর কেটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম গেল ছালাও গেল

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩


আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌর বিদুৎ।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:১৮


আমি বিটিভি দেখতে ভালোবাসি। একদিন বিটিভিতে একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। এটি কোনো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ছিল না। সেখানে তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী/মন্ত্রী সোলার বিদ্যুৎ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলছিলেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×