somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: অন্ধরাতের ঘোড়া (1)

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ দুপুর ১২:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

( আমার এই গল্পের প্রথম অংশটুকু পোষ্ট করলাম। আশা করি পড়বেন কেউ। বাকী অংশগুলো ধীরে ধীরে পোষ্ট করবো )

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বারবার ঘড়ির দিকে তাকানো বহুদিনের পুরানো অভ্যাস জাফর সাহেবের। বারবারই মনে হয় কোথায় কি একটা যেন হারিয়ে গেল। সেটা যে শুধুমাত্র সময়ই হতে হবে এমন কোন কথা নয়। যা কিছু হতে পারে তা, টাকা পয়সা, কাপড় জামা বা পকেটের কলম। মাঝে মঝে মনে হয় কোন কোন মানুষই হারিয়ে গেল এভাবে। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকালেই হঠাৎ যেন সে নেই নেই ভাবটা দুর হয়ে যায়। পকেটের কলমটা যেন পকেটেই ফিরে আসে, আলমারীতে জামাটা আগের জায়গাতেই খুঁজে পাওয়া যায়, হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে আর হারানো মনে হয়না।

আজও কিছু একটা নেই নেই বলে মনে হচ্ছিল আর সে সাথে অসহ্য জলতেষ্টা। অজান্তেই চোখ গেল ঘড়ির দিকে। তুনি মনে হলো নিজের ছেলের কথা। ছেলেটাকে যে বাড়ীতে এতন একা রেখে এসেছেন, ভুলেই গিয়েছিলেন। মনে হতেই সামান্য ভেবে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলেন তিনি। পেছনের একটা লোকের সাথে ধাক্কাই লেগে যেত, কোনক্রমে সামলে নিলেন। মনটা কেমন যেন ভার ভার, অন্যরকম হয়ে গেল। যে খাবারটুকু রেখে এসেছিলেন তা খেল কি না, নাকি এতোন উপোষ করলো বেচারা, তা ভেবে বুকের ভেতর একটা কষ্ট এসে জেঁকে বসল শক্ত হয়ে। কষ্টটাকে কমাতে তাই সামনের দোকান থেকে বেশ দাম দিয়েই একটা খেলনা এরোপ্লেন কিনে নিলেন। তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার জন্যে স্কুটার খুঁজছিলেন, না পেয়ে রিঙ্াই নিতে হলো। মাথার উপর তখন কড়া রোদ। কিন্তু রিক্সার হুড তুললেন না, এমনকি তেষ্টার কথাও ভুলে গেলেন। রিক্সাওয়ালাকে বারবার তাগাদা দিলেন তাড়াতাড়ি চালানোর জন্যে।

বাসায় ফিরে ছাতাটা ঘরের কোনে রেখেই ছুটলেন জাফর সাহেব ছেলের ঘরের দিকে। সিড়ি বেয়ে ছাদের দিকে ওঠার সময় পিছলে ছড়ে গেল পায়ের চামড়া অনেকটা জায়গা জুড়ে। কিন্তু সেদিকে নজরই গেল না। ছেলে চুপ করে বসে বিছানায় খোলা জানলাটার দিকে চোখ রেখে। একরাশ বিভিন্ন কমিকের বইপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারপাশে। কিন্তু কেউ খুলেছে বা পড়েছে বলে মনে হলোনা। সকালের দেয়া নাস্তাটাও যেমনি দেয়া হয়েছিল তেমনি পড়ে আছে অবহেলায় একপাশে। হাতের খেলনাটার দিকেও কোন নজর গেলনা। জাফর সাহেবের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল জানলার দিকে। তিনি নিজেই খুললেন বাক্সটা।
-- নে বাবা, তোর জন্য এনেছি। কি সুন্দর উড়োজাহাজ !
কোন উত্তর দিলনা ছেলে। চোখের তারায় নির্লিপ্ত বিষন্নতা আর কান্তি।
-- নে, নে, হাতে নিয়ে দেখ, কি সুন্দর জাহাজ !
কিন্তু ছেলে মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। ক্লান্ত মাথাটা এলিয়ে দিল বিছানার লাগোয়া দেয়ালের গায়ে। চুলগুলো এলোমেলো, মুখের কোনে লালার দাগ। জাফর সাহেবের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল ছেলের চেহারা দেখে। খেলনাটাকে একপাশে রেখে জগ থেকে হাতে জল নিয়ে মুছে দিলেন মুখ, টেবিল থেকে চিরুনী নিয়ে আঁচড়ে দিলেন চুল। তারপর সকালের খাবারটাই এগিয়ে দিলেন ছেলের দিকে। ছেলে আস্তে করে মাথা নেড়ে না বললো। জাফর সহেব যত্ন করে ব্যাটারী লাগালেন খেলনাটার। সুইচ টিপতেই শোঁ শোঁ আওয়াজ করে বিচিত্র সব বাতি জ্বালিয়ে বিছানার উপর চলতে শুরু করল উড়োজাহাজ। কিছুক্ষন সোজা, তারপর ডানদিক বাঁ দিক ঘুরে আবার পেছন দিকে। নিজেই বেশ মজা পেলেন জাফর সাহেব।
-- কি রে, পছন্দ হয়েছে ?
ছেলে তাকাল জাফর সাহেবের দিকে। কিন্তু সে দৃষ্টিতে কোন আলো নেই, প্রতিফলন নেই কোনকিছুর। বরফের মত মৃত, শীতল সে দৃষ্টি। এই কি সেই ছেলে, যার চোখে একসময় ছিল এত আনন্দ, এত বিস্ফুরিত কৌতুহল ? জাফর সাহেব হাত রাখলেন ছেলের কাঁধে। সে যেন চমকে উঠল। ছেলের চমকানো দেখে রাগ হল তাঁর।
-- বল্ পছন্দ হয়েছে কি না। কতোবার বলেছি, যা বলার স্পষ্ট বলতে !
এবারও কোন উত্তর দিলনা ছেলে। হাজারটা লাল পিপড়ে যেন একসাথে কামড়ে ধরলো জাফর সাহেবের মগজের প্রতিটি কোষ। মাথা থেকে সে ব্যাথা ক্রোধ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল শরীরে। ছেলের দু'কাঁধে ধরে ঝাকুনি দিলেন কয়েকটা। মাথাটা একটু ঠুকে গেল দেয়ালে।
-- যা বলতে বলেছি বল !
ছেলের চোখের শুন্যতাকে সরিয়ে এবার বাসা বাঁধল ভয়। জাফর সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে হ্যা বলল।
-- এইতো লক্ষী ছেলের মত কথা। তুই কিছু না বললে, আনন্দে না থাকলে আমার যে খুব কষ্ট হয় জানিস ?
এবারও সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল ছেলে। সামান্য দ্বিধা করে খেলনাটা নিল হাতে।

এতেই খুশী হলেন জাফর সাহেব। বেশ মায়া হল তাঁর ছেলের জন্যে। ক'দিন ধরেই তো বেশ ঝড়ঝাপটা যাচ্ছে বেচারার উপর। এতটুকু ছেলে, কতটুকুই বা তার সহ্যক্ষমতা ! কিন্তু তাঁর নিজের ও তো অন্য কিছু করার পথ ছিলনা। মানুষের মত মানুষ হওয়া, জীবনকে সঠিকভাবে চালানোর জন্যে নিজেকে তৈরী করা তো সহজ নয়! নষ্ট মানুষ, ব্যর্থ মানুষ হয়ে বেঁচে থেকে কি লাভ ? সুতরাং সময় থাকতেই শোধন দরকার। আর সে শোধনের পথটা অনেক সময় কষ্টের বৈকি। জীবন আর মরণ তো সবারই রয়েছে। জীবন মরনের কথা তাঁর ভাবনার সুতোতে গাঁথা পড়তেই একটা সরিসৃপ কিলবিল করে উঠল জাফর সাহেবের মগজে। অজান্তেই
ঘড়ির দিকে তাকালেন তিনি। কোন একটা ভুলে যাওয়া কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। খেলনাটা একপাশে রেখে খোলা জানলার দিকে আবারো শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ একটি পরিচ্ছন্ন শৌচাগার

লিখেছেন রাজসোহান, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮



বাড়িটা দেখতে বাড়ির মতো না, যেনো একটা ঘোষণা। দ্যাখো, আমি কে।

গেটে দুইটা সিংহ, পাথরের, মুখ হাঁ করা; সিংহ দুইটা কী পাহারা দিচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। ভিতরে উঠান... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মক্তব চালু করলে শিশুরা ফিরে আসবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪২


ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। মুসা বিন শমসেরের ছেলে। মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পুরো দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন, নতুন নতুন আইডিয়া দিচ্ছেন। মনে হয়,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধনের কেন ফেমিকন লাগে !!!

লিখেছেন অপলক , ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪



বাঁধন এখন বন্ধন মুক্ত। মিডিয়া পাড়ায় সরব উপস্থিতি। উপর মহলের ডাকে সারা দিতে হয়। কাজেই ফেমিকন লাগতেই পারে। মানে ফেমিকনের এ্যাড করা লাগতেই পারে। মিডিয়া আইকন হিসেবে জনসচেতনাতা বাড়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“উন্নয়নের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ”

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৮



বাং/লাদেশের মূর্খ জনগণ উন্নয়নের চেয়ে কথিত ফ্যাসিবাদকে বড় করে দেখেছে কিন্তু “উন্নয়নের দুর্ভিক্ষ” কি জিনিস তা দেখেনি।

দেখতে থাকুক….। আর ভাতের দুর্ভিক্ষ শুরু হলে বলে…..।

ফ্যাসিবাদ দূর করতে গিয়ে উন্নয়নই "নাই"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×