বসার ঘরে এসে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন জাফর সাহেব। মনটাই খারাপ হয়ে আছে। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের ঘুর্নির সাথে তার নিজস্ব চিন্তাভাবনাগুলোও একটা আবর্তে মিলিয়ে যাচ্ছে বারবার। রাতে ঘুম হয়না একেবারে, চোখ বন্ধ করলেই দম বন্ধ হয়ে আসে, বাকী নি:স্বাসটুকুতেও অঙ্েিজনের পরিমান কমে আসে কোন এক অজানা কারণে। বুকের ভেতরের ভাজে ভাজে অনেকগুলো বুদবুদ জমে জমে আবদ্ধ হয়ে আছে। এরা সারাণই একটা বিচিত্র খেলা খেলে চলেছে তাঁর সাথে। এরা অনেক সময় নিজেদের মাঝেই কথা বলাবলি করে, তর্কে মত্ত হয়। বুকেরই কোন কোন অংশে কেউ কেউ আকারে বিশাল হয়ে আবার হয়তো মিলিয়েও যায়। খুব তেষ্টা পায় তাঁর তখন। গ্লাস গ্লাস জল খেয়েও সে তেষ্টা মেটেনা। যখন তখনই একটা শীতল ঘামের স্রোত বেয়ে যায় শরীরে। মাথার ভেতরের মগজের টুকরোগুলো যেন বাজপাখী হয়ে ওড়াল দেয় আকাশে। গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হয় না তখন। তারপরেও সফরুদ্দীন কেমন করে যেন টের পেয়ে যায় মনিবের কষ্ট। বাছে এসে শান্ত গলায় আওয়াজ দেয় মনিবকে। তাতেও না হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পরম মমতায়। জাফর সাহেব আবার জেগে ঢক্ ঢক্ করে জল খান গ্লাসের পর গ্লাস। তারপর বাকী রাতটুকু জেগে জেগে বারবার ঘড়ি দেখেই কাটিয়ে দিতে হয়।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে আবারো জলতেষ্টা পেল তাঁর। বরাবরের মতো সফরুদ্দীন না ডাকতেই একজগ বরফদেয়া ঠান্ডা জল ও গ্লাস রেখে গেল টেবিলে। কোন কথা না হলেও সফরুদ্দীনের চেহারার কাটা দাগটা দেখে জল খেতে খেতেই আবার অতীতে তলিয়ে গেলেন জাফর সাহেব।
এ বাড়ীর সবচে' পুরোনো চাকর সফরুদ্দীন। মায়ের মৃতু্যর পর অন্যান্য চাকর বাকর ও দুরের আত্বীয় স্বজনরা একে একে এ বাড়ী ছেড়ে চলে গেলেও সফরুদ্দীন রয়েই গেল। এ বাড়ীর ইটপাথরের ভাজে ভাজে লুকানো শীতল শঙ্কা, মানুষগুলোর বুকের ভেতরে লুকানো আর্তনাদ, কোনকিছুই তাকে এ বাড়ী থেকে বের করতে পারেনি। বাবার চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত মুখ নিয়েও সবার ফুট ফরমাস খেটে খেটেই কেমন যেন এ বাড়ীর ইট পাথরের মতোই বাড়ীরই একটা অংশ হয়ে গেল সে। সফরুদ্দীনই এ বাড়ীর একমাত্র লোক, যার সাথে সারাদিনে একটা দু'টো হলেও কথা বলা যায়। সফরুদ্দীনই এ বাড়ীর একমাত্র লোক, যার উপর এ বাড়ীর জমাট বাঁধা শীতলতা তার বাইরের বাঁধনে ছোঁয়াচ লাগালেও ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি।
ওকে ডাকলেন জাফর সাহেব। সফরুদ্দীন কোন উত্তর না দিয়ে নি:শব্দে এসে দাঁড়াল। গ্রাম থেকে তার বাবার অসুস্থতার খবর এনেছিল কোন এত আত্বীয়।
-- কি রে, তোর বাবা কেমন আছে ?
-- বাবা মরে গেছে।
নিরুত্তাপ উত্তর তার। এরকম একটা মৃতপুরীতে এতটুকু প্রভাব তো পড়াই স্বাভাবিক।
-- কবে মারা গেল ?
-- কাল।
-- তুই দেশে যাবি না ?
-- দেশে গিয়ে কি হবে ?
-- কবর দিবি না ?
-- কবর ওরাই দিয়েছে।
ওরা কারা সে প্রশ্ন করলেন না জাফর সাহেব। এটুকু কথাই বা তাঁর সাথে কে বলে ! কিছুন দাঁড়িয়ে থেকে আবার নি:শব্দেই চলে গেল সফরুদ্দীন। জাফর সাহেব নীরবে তাকিয়ে থাকলেন সে অপসৃয়মান দেহটির দিকে।
মা মারা যাবার পর থেকে আরো যেন শীতল হয়ে গেছে এ বাড়ীর বাতাস। তাঁর মৃতু্যটা তেমন স্বাভাবিক ছিলনা বলেই হয়তো। মা যতটা পারতেন, আনন্দে রাখতে চাইতেন সবাইকে, বাবার চোখের আড়ালে হলেও। বাবা রাগারাগি করতেন, শারিরীক অত্যাচারও করতেন মায়ের উপর। কিন্তু মায়ের আপ্রান চেষ্টা থাকত, এসব যাতে বাইরে প্রকাশ না পায়। কিন্তু অনেক সময়েই মায়ের চেহারায় ও চাকর বাকরদের কথাবার্তায় গোপন থাকত না সবকিছু। কোন এক বৃষ্টিভেজা সকালে দশ বছরের ছেলেকে একা রেখে হঠাৎ একদিন মায়ের লাশ বেরুলো বাবার ঘর থেকে। বাবাকে অন্যান্য দিনের মতোই গম্ভীর, কিন্তু শোকাক্রান্ত মনে হলনা। খাটিয়ায় চেপে মা বাড়ীর বাইরে বেরুতে পারলেও কোন কানাঘুষা এ বাড়ীর চৌহদ্দি পেরিয়ে খুব একটা দুরে যেতে পারল না। বাড়ীর নিরুত্তাপ, মৃত পরিবেশের দাপটে সফরুদ্দীন ছাড়া চাকর বাকররাও সবাই একজন একজন করে বিদায় নিল। আর ত্রানকর্তী হিসেবে মায়ের ভুমিকার অবসানের পর তাঁর অনেক সময় কেটেছে ওই চিলেকোঠায়। বাবার দেয়া শাস্তিতে বন্ধ ঘরে একা একা তালাবন্ধ অবস্থায়। বাইরে পাহারা দেয়ার ও খাবার দেবার দ্বায়িত্বে থাকত দগদগে কাটা ঘা মুখে নিয়ে সফরুদ্দীন।
বুকের ভেতরের জলন্ত ক্রোধ নিয়ে চিলেকোঠা থেকে মুক্তির পর সে রাগ গিয়ে পড়ত সফরুদ্দীন এর উপর। কোন রকম অত্যাচারই বাদ পড়ত না। কোন না কোন দোষ খুঁজে বের করা হতো। আর তা পাওয়া গেলে বাপ ছেলের কোন মতবিরোধ থাকত না। ওদের দুজনেরই একঘেয়ে জীবনের একমাত্র আনন্দের উৎস ছিল সফরুদ্দীনের উপর নিত্য নুতন আবিস্কৃত নির্যাতন। পাশপাশি ওদের কথা বলার ও একমাত্র সঙ্গী ছিল একই সফরুদ্দীন।
ঢং ঢং করে দেয়াল ঘড়িটা বেজে উঠতেই হঠাৎ যেন কেঁপে উঠলেন জাফর সাহেব। সে মুহুর্তেই দেয়াল থেকে একটা টিকটিকি কোন কিছুর তাড়া খেয়ে ছিটকে পড়ল তার জলের জগে। রাগে যেন অন্ধ হয়ে গেলেন জাফর সাহেব। জগটাকে দু'হাতে তুলে ছুড়ে মারলেন সামনের দেয়ালে। পুরোনো দেয়ালের পলেস্তারা খসিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল জগটা। সফরুদ্দীন কে ডাকলেন।
-- হারামজাদা, ঘরবাড়ী ঠিকমতো পরিস্কারও রাখতে পারিস না। এসব পোকা মাকড় আসে কি ভাবে ঘরে। দেখতে পারিস না হারামজাদা।
কোন কথা বলল না সফরুদ্দীন। মেঝেতে ছড়ানো কাঁচের টুকরোগুলোর দিকে ধীর চোখে তাকাল মাত্র এক ্বার। জাফর সাহেবের রাগ বেড়ে গেল আরো। মেঝ থেকে চটিটা নিয়ে চটাস করে মারলেন গালে।
-- শুয়োরের বাচ্চারা যেন সারাদিন তালা দিয়ে রাখে মুখে !
কিন্তু তারপরেও নি:শ্চুপই রয়ে গেল সফরুদ্দীন। শুধুমাত্র মখের কাটা দাগটা লাল হয়ে উঠল বেশী। ধীরপায়ে এসে একটা ঝাটা দিয়ে পরিস্কার করে নিয়ে গেল সে। দু'মিনিট পর আরেকটা ভরা জলের গ্লাস রেখে গেল টেবিলে।
দেয়াল ঘড়িতে চোখ পড়ায় কিছুটা শান্ত হলেন তিনি। বিকেল সোয়া পাঁচটা তখন। শীতের সময়ে অন্ধকার নামে তাড়াতাড়ি, আর এ বাড়ীতে তো আরো বেশী। জল খেয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতেই আবার ছেলের কথা
মনে হলো তার। চটিটা পায়ে গলিয়েই ছুটলেন ছেলের ঘরের দিকে।
(চলবে.........)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


