somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: অন্ধরাতের ঘোড়া (2)

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ রাত ৩:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

( অন্ধরাতের ঘোড়া (2) পোষ্ট করলাম। আপনাদের নজর পেলে বাধিত হবো )

বসার ঘরে এসে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন জাফর সাহেব। মনটাই খারাপ হয়ে আছে। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। ফ্যানের ঘুর্নির সাথে তার নিজস্ব চিন্তাভাবনাগুলোও একটা আবর্তে মিলিয়ে যাচ্ছে বারবার। রাতে ঘুম হয়না একেবারে, চোখ বন্ধ করলেই দম বন্ধ হয়ে আসে, বাকী নি:স্বাসটুকুতেও অঙ্েিজনের পরিমান কমে আসে কোন এক অজানা কারণে। বুকের ভেতরের ভাজে ভাজে অনেকগুলো বুদবুদ জমে জমে আবদ্ধ হয়ে আছে। এরা সারাণই একটা বিচিত্র খেলা খেলে চলেছে তাঁর সাথে। এরা অনেক সময় নিজেদের মাঝেই কথা বলাবলি করে, তর্কে মত্ত হয়। বুকেরই কোন কোন অংশে কেউ কেউ আকারে বিশাল হয়ে আবার হয়তো মিলিয়েও যায়। খুব তেষ্টা পায় তাঁর তখন। গ্লাস গ্লাস জল খেয়েও সে তেষ্টা মেটেনা। যখন তখনই একটা শীতল ঘামের স্রোত বেয়ে যায় শরীরে। মাথার ভেতরের মগজের টুকরোগুলো যেন বাজপাখী হয়ে ওড়াল দেয় আকাশে। গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হয় না তখন। তারপরেও সফরুদ্দীন কেমন করে যেন টের পেয়ে যায় মনিবের কষ্ট। বাছে এসে শান্ত গলায় আওয়াজ দেয় মনিবকে। তাতেও না হলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় পরম মমতায়। জাফর সাহেব আবার জেগে ঢক্ ঢক্ করে জল খান গ্লাসের পর গ্লাস। তারপর বাকী রাতটুকু জেগে জেগে বারবার ঘড়ি দেখেই কাটিয়ে দিতে হয়।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে আবারো জলতেষ্টা পেল তাঁর। বরাবরের মতো সফরুদ্দীন না ডাকতেই একজগ বরফদেয়া ঠান্ডা জল ও গ্লাস রেখে গেল টেবিলে। কোন কথা না হলেও সফরুদ্দীনের চেহারার কাটা দাগটা দেখে জল খেতে খেতেই আবার অতীতে তলিয়ে গেলেন জাফর সাহেব।

এ বাড়ীর সবচে' পুরোনো চাকর সফরুদ্দীন। মায়ের মৃতু্যর পর অন্যান্য চাকর বাকর ও দুরের আত্বীয় স্বজনরা একে একে এ বাড়ী ছেড়ে চলে গেলেও সফরুদ্দীন রয়েই গেল। এ বাড়ীর ইটপাথরের ভাজে ভাজে লুকানো শীতল শঙ্কা, মানুষগুলোর বুকের ভেতরে লুকানো আর্তনাদ, কোনকিছুই তাকে এ বাড়ী থেকে বের করতে পারেনি। বাবার চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত মুখ নিয়েও সবার ফুট ফরমাস খেটে খেটেই কেমন যেন এ বাড়ীর ইট পাথরের মতোই বাড়ীরই একটা অংশ হয়ে গেল সে। সফরুদ্দীনই এ বাড়ীর একমাত্র লোক, যার সাথে সারাদিনে একটা দু'টো হলেও কথা বলা যায়। সফরুদ্দীনই এ বাড়ীর একমাত্র লোক, যার উপর এ বাড়ীর জমাট বাঁধা শীতলতা তার বাইরের বাঁধনে ছোঁয়াচ লাগালেও ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি।

ওকে ডাকলেন জাফর সাহেব। সফরুদ্দীন কোন উত্তর না দিয়ে নি:শব্দে এসে দাঁড়াল। গ্রাম থেকে তার বাবার অসুস্থতার খবর এনেছিল কোন এত আত্বীয়।
-- কি রে, তোর বাবা কেমন আছে ?
-- বাবা মরে গেছে।
নিরুত্তাপ উত্তর তার। এরকম একটা মৃতপুরীতে এতটুকু প্রভাব তো পড়াই স্বাভাবিক।
-- কবে মারা গেল ?
-- কাল।
-- তুই দেশে যাবি না ?
-- দেশে গিয়ে কি হবে ?
-- কবর দিবি না ?
-- কবর ওরাই দিয়েছে।
ওরা কারা সে প্রশ্ন করলেন না জাফর সাহেব। এটুকু কথাই বা তাঁর সাথে কে বলে ! কিছুন দাঁড়িয়ে থেকে আবার নি:শব্দেই চলে গেল সফরুদ্দীন। জাফর সাহেব নীরবে তাকিয়ে থাকলেন সে অপসৃয়মান দেহটির দিকে।

মা মারা যাবার পর থেকে আরো যেন শীতল হয়ে গেছে এ বাড়ীর বাতাস। তাঁর মৃতু্যটা তেমন স্বাভাবিক ছিলনা বলেই হয়তো। মা যতটা পারতেন, আনন্দে রাখতে চাইতেন সবাইকে, বাবার চোখের আড়ালে হলেও। বাবা রাগারাগি করতেন, শারিরীক অত্যাচারও করতেন মায়ের উপর। কিন্তু মায়ের আপ্রান চেষ্টা থাকত, এসব যাতে বাইরে প্রকাশ না পায়। কিন্তু অনেক সময়েই মায়ের চেহারায় ও চাকর বাকরদের কথাবার্তায় গোপন থাকত না সবকিছু। কোন এক বৃষ্টিভেজা সকালে দশ বছরের ছেলেকে একা রেখে হঠাৎ একদিন মায়ের লাশ বেরুলো বাবার ঘর থেকে। বাবাকে অন্যান্য দিনের মতোই গম্ভীর, কিন্তু শোকাক্রান্ত মনে হলনা। খাটিয়ায় চেপে মা বাড়ীর বাইরে বেরুতে পারলেও কোন কানাঘুষা এ বাড়ীর চৌহদ্দি পেরিয়ে খুব একটা দুরে যেতে পারল না। বাড়ীর নিরুত্তাপ, মৃত পরিবেশের দাপটে সফরুদ্দীন ছাড়া চাকর বাকররাও সবাই একজন একজন করে বিদায় নিল। আর ত্রানকর্তী হিসেবে মায়ের ভুমিকার অবসানের পর তাঁর অনেক সময় কেটেছে ওই চিলেকোঠায়। বাবার দেয়া শাস্তিতে বন্ধ ঘরে একা একা তালাবন্ধ অবস্থায়। বাইরে পাহারা দেয়ার ও খাবার দেবার দ্বায়িত্বে থাকত দগদগে কাটা ঘা মুখে নিয়ে সফরুদ্দীন।

বুকের ভেতরের জলন্ত ক্রোধ নিয়ে চিলেকোঠা থেকে মুক্তির পর সে রাগ গিয়ে পড়ত সফরুদ্দীন এর উপর। কোন রকম অত্যাচারই বাদ পড়ত না। কোন না কোন দোষ খুঁজে বের করা হতো। আর তা পাওয়া গেলে বাপ ছেলের কোন মতবিরোধ থাকত না। ওদের দুজনেরই একঘেয়ে জীবনের একমাত্র আনন্দের উৎস ছিল সফরুদ্দীনের উপর নিত্য নুতন আবিস্কৃত নির্যাতন। পাশপাশি ওদের কথা বলার ও একমাত্র সঙ্গী ছিল একই সফরুদ্দীন।

ঢং ঢং করে দেয়াল ঘড়িটা বেজে উঠতেই হঠাৎ যেন কেঁপে উঠলেন জাফর সাহেব। সে মুহুর্তেই দেয়াল থেকে একটা টিকটিকি কোন কিছুর তাড়া খেয়ে ছিটকে পড়ল তার জলের জগে। রাগে যেন অন্ধ হয়ে গেলেন জাফর সাহেব। জগটাকে দু'হাতে তুলে ছুড়ে মারলেন সামনের দেয়ালে। পুরোনো দেয়ালের পলেস্তারা খসিয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল জগটা। সফরুদ্দীন কে ডাকলেন।
-- হারামজাদা, ঘরবাড়ী ঠিকমতো পরিস্কারও রাখতে পারিস না। এসব পোকা মাকড় আসে কি ভাবে ঘরে। দেখতে পারিস না হারামজাদা।
কোন কথা বলল না সফরুদ্দীন। মেঝেতে ছড়ানো কাঁচের টুকরোগুলোর দিকে ধীর চোখে তাকাল মাত্র এক ্বার। জাফর সাহেবের রাগ বেড়ে গেল আরো। মেঝ থেকে চটিটা নিয়ে চটাস করে মারলেন গালে।
-- শুয়োরের বাচ্চারা যেন সারাদিন তালা দিয়ে রাখে মুখে !
কিন্তু তারপরেও নি:শ্চুপই রয়ে গেল সফরুদ্দীন। শুধুমাত্র মখের কাটা দাগটা লাল হয়ে উঠল বেশী। ধীরপায়ে এসে একটা ঝাটা দিয়ে পরিস্কার করে নিয়ে গেল সে। দু'মিনিট পর আরেকটা ভরা জলের গ্লাস রেখে গেল টেবিলে।

দেয়াল ঘড়িতে চোখ পড়ায় কিছুটা শান্ত হলেন তিনি। বিকেল সোয়া পাঁচটা তখন। শীতের সময়ে অন্ধকার নামে তাড়াতাড়ি, আর এ বাড়ীতে তো আরো বেশী। জল খেয়ে ঘড়ির দিকে তাকাতেই আবার ছেলের কথা
মনে হলো তার। চটিটা পায়ে গলিয়েই ছুটলেন ছেলের ঘরের দিকে।

(চলবে.........)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মায়ের বুকের ওমে শেষ ঘুম

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৩ রা মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৯



আমার নাম তৃশান। সবে তো স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। আজ আমার খুব আনন্দ! বাবা-মা, দিদি আর দাদু-দিদুন মিলে আমরা মস্ত বড় একটা নৌকায় ঘুরছি। দিদি বলছিল এই জায়গাটার নাম জবলপুর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭

আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×