somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: অন্ধরাতের ঘোড়া (3)

২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ দুপুর ১২:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(কারো কারো কাছে 1ম ও দ্্বীতিয় অংশ ভালো লেগেছে বলে 3য় অংশটি দ্রুতই পাঠালাম। আশা করি অন্যদেরও ভালো লাগবে )
............................
ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অনেক্ষন একা একা হাঁটলেন জাফর সাহেব। দোকানপাটগুলোতে তখন আলো জলেছে সবেমাত্র। এ এলাকায় কোন কারনে ভোল্টেজ কম থাকায় আধো সন্ধ্যায় বাতির আলোগুলোকে আরো বেশী মরা মরা মনে হয়। লাল গেটওয়ালা বাড়ীর কাছে আসতেই ভেতরটা কেমন যেন গুমড়ে উঠল। চোখের সামনে সেই বারো বছরের শিশুর নি:স্পাপ চেহারাটা ভেসে উঠল। স্কুলের ব্যাগ কাঁধে প্রাণবন্ত উদ্দাম আনন্দ। সেই সাথে আর কিছু মুখ। কিন্তু তারপরেও একটা চেহারাই গেঁথে রইল তাঁর মনের ভেতর। একটা পোড়োবাড়ীর ভুতুরে রূপ নিয়ে লাল দালানটা তাঁর সামনে। কোন একটা শোকের যেন মুর্তিমান বহিপ্রকাশ বাড়ীটা এই ভর সন্ধ্যায়। ক'দিন যাবৎই বাড়ীটার এমনি চেহারা, এমনকি দিনের বেলাতেও। প্রখর রোদের আলোও যেন এ বাড়ীর সীমানার কাছাকাছি এলে তার শক্তি হারিয়ে ফেলে সোডিয়ামের রং ধরে। জাফর সাহেবের মাথার ভেতর থেকে একগুচ্ছ পোকা গলার স্পর্শকাতর জায়গাগুলো বেয়ে বেয়ে বুকের ভেতর নেমে আসতে চাইল। চোখের সামনে লাল দেয়ালগুলো কোন একটা ঘুর্নির আবর্তে চেপে ধরতে চাইল তাঁকে। তার প্রভাবেই হয়তো রাস্তার পাশে বসেই বমি করলেন তিনি। তারপর উঠে পকেটের রুমাল দিয়ে মুখ মুছে ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে ফিরলেন নিজের বাড়ীর দিকে।

অন্ধকার তখন অনেকটা জেঁকে বসেছে রাস্তার পাশের বাড়ীগুলোর কোনায় কোনায়। এরই মাঝে হেঁটে চলেছেন জাফর সাহেব তাঁর বাড়ীর দিকে নতমুখে। তার কাঁধে যেন অনেক দিনের জমান কোন ভার। জাফর সাহেবের ভর সন্ধ্যার এই আরো ম্লান করে দিল চরপাশকে। সেসাথে আধো আধো মেঘলা আকাশ তার ছায়া প্রকৃতিতে ফেলে আরো ভুতুড়ে করে দিল শহরটাকে। একজন লোক উল্টো দিক থেকে এসে তাঁকে চিনতে পেরে যেন ভয়েই পাশ কাটিয়ে গেল দ্রুত। জাফর সাহেব সেটা যেন বুঝতে পেরে আরো বেশী কুজো হয়ে গেলেন।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বসার ঘরের দেয়ালে টানানো নিজের বাবা মায়ের ছবিটার কথা হঠাৎ করেই মনে হল তার। দাপুটে বাবার ছবির পাশে ছোট্টখাট্ট সাদামাটা মায়ের ছবিটা নিতান্তই বেমানান হলেও টানানো হয়েছে যত্নের সাথেই। বাবা শহর থেকে ক্যামেরাম্যান আনিয়ে ছবিটা তুলিয়েছিলেন। মা বাইরের লোকের সামনে এভাবে ছবি তুলতে রাজী ছিলেন না। কিন্তু বাবার জোরের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ছবিটাতো ছোট একটা ব্যাপার ছিল, সব ব্যাপারেই জোর খাটাতেন বাবা। কাছের মানুষদের উপর, কর্মচারীদের উপর, এমনকি পশুপাখীদের উপরও বাবার জোর খাটানোর কোন কমতি ছিল না। বাড়ীতে একবার চোর ঢুকেছিল বলে একবার নিজের পোষা কুকুরকেই গুলি করে মেরে ফেলেছিলেন। কুকুরটা ছিল তার ছোটবেলার নিত্য সঙ্গী। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া পাড়ার ভালমন্দ যেকোন ছেলের সাথেই মেশা বারণ ছিল তার। এমনকি স্কুলের মেলামেশার খবরগুলোও মাঝে মাঝে পেঁৗছে যেত বাবার কাছে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন শাস্তির ব্যপারে বাবার উদ্ভাবনী শক্তি ছিল প্রখর।

সফরুদ্দীন দরজা খুলে দিল। জাফর সাহেব ধীরে ধীরে ঢুকলেন ঘরে। সফরুদ্দীন দরজা বন্ধ করল।
-- ভাত দেব ?
-- রান্না করেছিস্ ?
-- না, দোকান থেকে কিনে এনেছি।
জাফর সাহেবের মেজাজটা আবারো নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছিল প্রায়। কিন্তু সফরুদ্দীনের কাছে বার বার হেরে যেতে চাইলেন না।
-- গরম জল কর। আগে গোসল করব।
-- গরম জল করা আছে।
-- ঠিক আছে, এবার সর চোখের সামনে থেকে।

কোনক্রমে খাওয়া শেষ করলেন জাফর সাহেব। খাবারটা গলার কাছে এসেই কেমন করে তেতো হয়ে যাচ্ছিল বারবার। দোকান থেকে কেনা খাবার বলে নয়, যে কোন খাবারই এমনি তেতো হয়ে যায় গলার কাছাকাছি এলেই। ডাক্তারদের কাছে গিয়েছেন অনেক। তাঁরাও অনেক ধরণের পরীক্ষা করেই দেখেছেন। কিন্তু কোন কাজই হয়নি। বরং আরো বেড়েছে। স্ত্রী যখন বেঁচে ছিলেন, তখনই একই সমস্যা ছিল। খেতে না পেরে রেগে যেতেন তাঁর উপরেই। তারপর মারধোর। মার খেয়ে একটা শব্দও করতেন না সালেহা। মারের প্রতিক্রিয়া না দেখানোর একটা অলিখিত চুক্তিই যেন ছিল সালেহা আর সফরুদ্দীনের মাঝে।

একেবারে একা একা মৃতু্যকে গ্রহন করলেন বাবা। কেউ ছিলনা কাছাকাছি, এমনকি সফরুদ্দীন ও না। দুপুরের খাবার খেয়ে নিজের ঘরে ঢুকেছিলেন বিশ্রামের জন্যে। সবসময় দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে ঘুমোনোর অভ্যাস ছিল তার। বিকেল বেলাও অনেক ডাকাডাকির পর কোন সাড়া না পেয়ে দরজা ভাঙ্গে সফরুদ্দীন। বাবার মৃত চেহারাটা প্রথম চোখে পড়ে তারই। ঘরের এক কোনে উবুসুবু অবস্থাতেই বিদায় নিয়েছে প্রাণ। দেখেই বোঝা যায়, খুব কষ্ট পেয়েছেন মৃতু্যর আগের মূহুর্তেও। কিন্তু ডাকেন নি কাউকেই। হয়তো কাউকেই ডাকার মতো কাছের ভাবেন নি বা নিজের অসহায়ত্বকে নগ্ন করতে চাননি। বাবার মৃতু্যতে তেমন কোন শোকের ছায়া পড়ল না বাড়ীতে। শুধুমাত্র সফরুদ্দীন বাবার ঘরের মেঝেতে পড়ে পড়ে কাঁদল অনেকন।
...চলবে
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মায়ের বুকের ওমে শেষ ঘুম

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৩ রা মে, ২০২৬ সকাল ১০:৪৯



আমার নাম তৃশান। সবে তো স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। আজ আমার খুব আনন্দ! বাবা-মা, দিদি আর দাদু-দিদুন মিলে আমরা মস্ত বড় একটা নৌকায় ঘুরছি। দিদি বলছিল এই জায়গাটার নাম জবলপুর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭

আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×