............................
ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অনেক্ষন একা একা হাঁটলেন জাফর সাহেব। দোকানপাটগুলোতে তখন আলো জলেছে সবেমাত্র। এ এলাকায় কোন কারনে ভোল্টেজ কম থাকায় আধো সন্ধ্যায় বাতির আলোগুলোকে আরো বেশী মরা মরা মনে হয়। লাল গেটওয়ালা বাড়ীর কাছে আসতেই ভেতরটা কেমন যেন গুমড়ে উঠল। চোখের সামনে সেই বারো বছরের শিশুর নি:স্পাপ চেহারাটা ভেসে উঠল। স্কুলের ব্যাগ কাঁধে প্রাণবন্ত উদ্দাম আনন্দ। সেই সাথে আর কিছু মুখ। কিন্তু তারপরেও একটা চেহারাই গেঁথে রইল তাঁর মনের ভেতর। একটা পোড়োবাড়ীর ভুতুরে রূপ নিয়ে লাল দালানটা তাঁর সামনে। কোন একটা শোকের যেন মুর্তিমান বহিপ্রকাশ বাড়ীটা এই ভর সন্ধ্যায়। ক'দিন যাবৎই বাড়ীটার এমনি চেহারা, এমনকি দিনের বেলাতেও। প্রখর রোদের আলোও যেন এ বাড়ীর সীমানার কাছাকাছি এলে তার শক্তি হারিয়ে ফেলে সোডিয়ামের রং ধরে। জাফর সাহেবের মাথার ভেতর থেকে একগুচ্ছ পোকা গলার স্পর্শকাতর জায়গাগুলো বেয়ে বেয়ে বুকের ভেতর নেমে আসতে চাইল। চোখের সামনে লাল দেয়ালগুলো কোন একটা ঘুর্নির আবর্তে চেপে ধরতে চাইল তাঁকে। তার প্রভাবেই হয়তো রাস্তার পাশে বসেই বমি করলেন তিনি। তারপর উঠে পকেটের রুমাল দিয়ে মুখ মুছে ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে ফিরলেন নিজের বাড়ীর দিকে।
অন্ধকার তখন অনেকটা জেঁকে বসেছে রাস্তার পাশের বাড়ীগুলোর কোনায় কোনায়। এরই মাঝে হেঁটে চলেছেন জাফর সাহেব তাঁর বাড়ীর দিকে নতমুখে। তার কাঁধে যেন অনেক দিনের জমান কোন ভার। জাফর সাহেবের ভর সন্ধ্যার এই আরো ম্লান করে দিল চরপাশকে। সেসাথে আধো আধো মেঘলা আকাশ তার ছায়া প্রকৃতিতে ফেলে আরো ভুতুড়ে করে দিল শহরটাকে। একজন লোক উল্টো দিক থেকে এসে তাঁকে চিনতে পেরে যেন ভয়েই পাশ কাটিয়ে গেল দ্রুত। জাফর সাহেব সেটা যেন বুঝতে পেরে আরো বেশী কুজো হয়ে গেলেন।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বসার ঘরের দেয়ালে টানানো নিজের বাবা মায়ের ছবিটার কথা হঠাৎ করেই মনে হল তার। দাপুটে বাবার ছবির পাশে ছোট্টখাট্ট সাদামাটা মায়ের ছবিটা নিতান্তই বেমানান হলেও টানানো হয়েছে যত্নের সাথেই। বাবা শহর থেকে ক্যামেরাম্যান আনিয়ে ছবিটা তুলিয়েছিলেন। মা বাইরের লোকের সামনে এভাবে ছবি তুলতে রাজী ছিলেন না। কিন্তু বাবার জোরের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ছবিটাতো ছোট একটা ব্যাপার ছিল, সব ব্যাপারেই জোর খাটাতেন বাবা। কাছের মানুষদের উপর, কর্মচারীদের উপর, এমনকি পশুপাখীদের উপরও বাবার জোর খাটানোর কোন কমতি ছিল না। বাড়ীতে একবার চোর ঢুকেছিল বলে একবার নিজের পোষা কুকুরকেই গুলি করে মেরে ফেলেছিলেন। কুকুরটা ছিল তার ছোটবেলার নিত্য সঙ্গী। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া পাড়ার ভালমন্দ যেকোন ছেলের সাথেই মেশা বারণ ছিল তার। এমনকি স্কুলের মেলামেশার খবরগুলোও মাঝে মাঝে পেঁৗছে যেত বাবার কাছে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন শাস্তির ব্যপারে বাবার উদ্ভাবনী শক্তি ছিল প্রখর।
সফরুদ্দীন দরজা খুলে দিল। জাফর সাহেব ধীরে ধীরে ঢুকলেন ঘরে। সফরুদ্দীন দরজা বন্ধ করল।
-- ভাত দেব ?
-- রান্না করেছিস্ ?
-- না, দোকান থেকে কিনে এনেছি।
জাফর সাহেবের মেজাজটা আবারো নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছিল প্রায়। কিন্তু সফরুদ্দীনের কাছে বার বার হেরে যেতে চাইলেন না।
-- গরম জল কর। আগে গোসল করব।
-- গরম জল করা আছে।
-- ঠিক আছে, এবার সর চোখের সামনে থেকে।
কোনক্রমে খাওয়া শেষ করলেন জাফর সাহেব। খাবারটা গলার কাছে এসেই কেমন করে তেতো হয়ে যাচ্ছিল বারবার। দোকান থেকে কেনা খাবার বলে নয়, যে কোন খাবারই এমনি তেতো হয়ে যায় গলার কাছাকাছি এলেই। ডাক্তারদের কাছে গিয়েছেন অনেক। তাঁরাও অনেক ধরণের পরীক্ষা করেই দেখেছেন। কিন্তু কোন কাজই হয়নি। বরং আরো বেড়েছে। স্ত্রী যখন বেঁচে ছিলেন, তখনই একই সমস্যা ছিল। খেতে না পেরে রেগে যেতেন তাঁর উপরেই। তারপর মারধোর। মার খেয়ে একটা শব্দও করতেন না সালেহা। মারের প্রতিক্রিয়া না দেখানোর একটা অলিখিত চুক্তিই যেন ছিল সালেহা আর সফরুদ্দীনের মাঝে।
একেবারে একা একা মৃতু্যকে গ্রহন করলেন বাবা। কেউ ছিলনা কাছাকাছি, এমনকি সফরুদ্দীন ও না। দুপুরের খাবার খেয়ে নিজের ঘরে ঢুকেছিলেন বিশ্রামের জন্যে। সবসময় দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে ঘুমোনোর অভ্যাস ছিল তার। বিকেল বেলাও অনেক ডাকাডাকির পর কোন সাড়া না পেয়ে দরজা ভাঙ্গে সফরুদ্দীন। বাবার মৃত চেহারাটা প্রথম চোখে পড়ে তারই। ঘরের এক কোনে উবুসুবু অবস্থাতেই বিদায় নিয়েছে প্রাণ। দেখেই বোঝা যায়, খুব কষ্ট পেয়েছেন মৃতু্যর আগের মূহুর্তেও। কিন্তু ডাকেন নি কাউকেই। হয়তো কাউকেই ডাকার মতো কাছের ভাবেন নি বা নিজের অসহায়ত্বকে নগ্ন করতে চাননি। বাবার মৃতু্যতে তেমন কোন শোকের ছায়া পড়ল না বাড়ীতে। শুধুমাত্র সফরুদ্দীন বাবার ঘরের মেঝেতে পড়ে পড়ে কাঁদল অনেকন।
...চলবে
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


