......................................
জাফর সাহেবের রাতের সপ্নগুলো খাওয়ার চেয়েও আরো বেশী কষ্টকর, আরো বেশী বিভৎস। তাঁর জীবনীশক্তিতে চুষে চুষে ছিবড়ে বানিয়ে ক্রমশ:ই আরো বেশী ভয়ংকর হয়ে উঠে এই সপ্নগুলো। তাই রাতকে ভীষন ভয় তার। পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টায় সারারাত বাতি জ্বলে তার ঘরে। বারবারই চীৎকার করে জেগে ওঠেন, আর প্রতিবারই সফরুদ্দীন এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে যায়।
আজও সপ্নে সালেহা কে দেখলেন তিনি। সাথে তার অনেক অনেক সঙ্গী। ওদের পরণে কালো কাপড়ের বিষন্নতার ঘন ছায়া। তাদেরকে চারপাশে নিয়ে শীতল একটা বাতাস ছড়িয়ে সালেহা এসে দাঁড়ালেন সামনে। সে বাতাসে কোন এক অজানা ফুলের নিবিড় গন্ধ। কিন্তু সে গন্ধের নিবিড়তায় আনন্দে ভরে ওঠে না মন, বরং ভয়ের হীমশীতল বাতাস কাঁপুনি আসে বুকের ভেতরে। মনে হয় শরীর থেকে সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খসে পড়বে এক এক করে সে গন্ধের তীব্রতায়। এতোটা অসাঢ় হয়ে গেলেন জাফর সাহেব যে, চাদরে মুখ ঢাকবেন, সে ক্ষমতাও রইল না। ভয়ে কাঠ হয়ে সালেহার সঙ্গীদের দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন,
-- এরা কারা ?
-- এরা কেউনা, এরা তুমি।
-- তুমি ছেলেকে রেখে আমাকে পাঠালে কেন ওখানে ?
সালেহার এই প্রশ্নের সাথে সঙ্গীরাও একসাথে বলে উঠল,
-- পাঠালে কেন ওখানে, পাঠালে কেন ওখানে , পাঠালে কেন ওখানে ......
ভীষন ভয় পেলেন জাফর সাহেব। বিছানার পাশের টেবিলের জলের গ্লাসটির দিকে হাত বাড়াতে চেয়েও সে শক্তিটি পেলেন না নিজের ভেতরে। তারপরেও ক্ষীন আওয়াজে বললেন,
-- তোমরা কেউ আমার সাথে কথা বলনি, তাই ?
সালেহার সঙ্গীরা এবার সুর না মেলালেও মুখ চাওয়াচাওয়ি করল একজন আরেকজনের। সালেহা তাদেরকে হাতের ঈশারায় স্থির হতে বললেন।
-- তুমি তো মুখ বন্ধ করে রেখেছ সবার, কথা বলতে দিয়েছ কাউকে ?
সঙ্গীরাও একসাথে বলে উঠল,
-- কথা বলতে দিয়েছ কাউকে, কথা বলতে দিয়েছ কাউকে, কথা বলতে দিয়েছ কাউকে .....
আবারো খুব কষ্টে উত্তর দিলেন জাফর সাহেব। মুখের ভেতরটা কাঠ হয়ে আছে শুকিয়ে। কথা বলতে গেলে ঠোঁটের সাথে প্রায় আঠা লেগে যায় ঠোঁটের।
-- তুমি নিজেও তো বোবা ছেলে আনলে ঘরে।
-- তবুও আমি ভালোবাসতাম ছেলেকে, কথা বলতাম, তুমি তাও পারনি ?
সঙ্গীরাও একসাথে বলে উঠল,
-- তুমি তাও পারনি, তুমি তাও পারনি, তুমি তাও পারনি .....
এবার কোন উত্তর দিতে পারলেন না জাফর সাহেব। তা বুঝতে পেরেই যেন কোন এক রহস্যময় হাসি সালেহার চেহারায়। সঙ্গীদের দিকে তাকালেন একবার।
-- তাহলে তাকে তুমি আটকে রাখলে কেন।
সঙ্গীরাও একসাথে বলে উঠল,
রাখলে কেন, রাখলে কেন, রাখলে কেন ------
-- আমি তাকে কথা বলাতে চেয়েছি।
তী্ন কাচভাঙ্গা হাসিতে চৌচির হয়ে উঠল চারপাশ। হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরলেন সালেহা। তার সঙ্গীরাও যোগ দিল সে হাসিতে।
-- কথা বলাবে ? সে তুমি পারবেনা, সেতো এখন আমারই কাছে, ...আমারই কাছে
বলতে বলতে হাসতে হাসতেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন সালেহা। তার সঙ্গীরাও তাকে অনুসরন করল। জাফর সাহেব জ্ঞান হরালেন। সফরুদ্দীন কোন এক অজানা কারণে টের গেলনা কিছু।
কোত্থেকে কে খবর দিল জানা গেলনা। পরদিন পুলিশ এসে প্রতিবেশী বাড়ীর ছেলেটিকে উদ্ধার করল জাফর সাহেবের চিলেকোঠার ঘর থেকে। ছেলেটি তখন ভয়, ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মৃতপ্রায়। খুন ও অপহরণের অভিযোগে জাফর সাহেবকে গ্রেপ্তার করা হল। কিন্তু তার মুখ খেকে কোন কথা উদ্ধার করা গেলনা । বোবা হয়ে গেলেন তিনি। শোবার ঘরের আলমারীতে পাওয়া গেল তাঁর ছেলের রক্তমাখা সার্ট ও ড্রয়ারে কোরোফর্মের শিশি। ছেলেটির ও তাদের বাড়ীর বাসিন্দাদের বাড়ীতে আসার যাওয়ার সময়গুলোও একটা পুরোনো ডায়েরীর ভেতর টোকা। চিলেকোঠা থেকে যখন ছেলেটাকে নিয়ে যাওয়া হলো, সেদিকে বোকার মত তাকিয়ে থাকলেন ফ্যালফেলিয়ে। বাগানের একটা জায়গাটায় বাগানে ঘুরেফিরে বিড়বিড় করছিল সফরুদ্দীন। ধরে এনে তাকে জেরা করা হল তাকে। ঠিক সে জায়গাতেই খুঁড়ে লাশ পাওয়া গেল জাফর সাহেবের বোবা ছেলের। সে লাশ গর্ত থেকে বের করে আনতেই উন্মাদ হয়ে গেল সফরুদ্দীন। তাকে পাঠানো হল পাগলা গারদে।
সকালে রোদ উঠল ঝিলমিলিয়ে। লাল গেট বাড়ীর লাল দেয়াল সে রোদের আলোতে অন্যান্য বাড়ীগুলো থেকে আরো বেশী আলোকিত মনে হলো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


