নানাভাইয়ের সাথে শুভর খুব মধুর একটা সম্পর্ক ছিলো। তিনি নিজেও শুভকে নানাভাই বলেই ডাকতেন। তিনি যে একজন বড় লেখক, তা সে ছোটবেলা থেকেই জানতে শিখেছে, এমনকি লেখক কি, সেটা বোঝার আগেই। তারপর নিজে যখন পড়তে শিখলো, তখন নানাভাইয়ের লেখা আরো বইপত্র পড়ে, নিজেরই লেখক হতে সাধ জাগলো। সে সাধ পূরণ করার জন্যে ছোটবেলা থেকেই কবিতা লিখে নানাভাইকে দেখাতো। ওনি নিজেও সেগুলো মনযোগ দিয়ে পড়তেন ও শুভকে আরো লেখার জন্যে উৎসাহ দিতেন। ওনার উৎসাহেই সে এইটে পড়ার সময় একটা কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ও দ্বিতীয় পূরষ্কার পায়। নানাভাই খুশী হয়ে একটা পাইলট কলম উপহার করেছিলেন । এখনও লেখালেখির সময় সে ওনার দেয়া কলমটিই ব্যাবহার করে। নিজের লেখা কবিতা নিয়ে এখনও তার আদানপ্রদান হয় নানাভাইয়ের সাথে। যদিও আধুনিক কবিতার বর্তমান ঢং তাঁর পছন্দ নয়, তারপরেও তাঁর যথেষ্ট আগ্রহ শুভর কবিতা নিয়ে আলোচনায়। ইংরেজী সাহিত্যে সে ভর্তি হয় সে অনেকটা তাঁর প্রভাবেই। বাবা এ নিয়ে অনেক সময় নানাভাই প্রতি তাঁর ােভও প্রকাশ করেছেন। বাবার ইচ্ছে ছিলো সে ব্যাবসা সংক্রান্ত কোন বিষয়ে পড়াশোনা করে। মা তার এসব স্বাধীনতায় কখনো হাত দেয়ার চেষ্টা করেননি।
বিয়ের কারণে ুব্ধ থাকলেও নিজের বাবার উপর প্রতি ভালোবাসার কোন কমতি ছিলোনা মায়ের, বরং খুব গর্ব ছিলো তাঁকে নিয়ে। সবার কাছেই তাঁর নানারকম গল্প করতেন। এসব গল্পের সময় মায়ের চেহারায় যে আলো সে দেখকে পেতো, তাতে তার মায়ের সত্যিকারের ভেতরের রূপ প্রকাশ হতো তার সামনে। তাঁর ভেতরের লুকোনো যন্ত্রণার একটা ছবি দেখতে পেতো সে। সে ছবি তৈরী হতো দুটো পরস্পরধর্মী জীবনের সংঘাতে। নিজের বাবার কাছ থেকে যতোটা সুশিা ও সেকারণেই সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নে যতোটা উদার মনোভাব নিয়ে বড় হয়েছেন তিনি, শ্বশুরবাড়ীতে সে উদারতা একেবারে ছিলনা বললেই চলে। তারপর যখন শ্বশুরবাড়ী ছেড়ে স্বামীর সাথে নিজের সংসার গড়লেন, সেখানেও এতই কারণে বিরাট ফাঁক থেকে গেলো। কিছুদিনের মাঝেই টের পেলেন, তাঁর অনেক স্বাধীনতায় স্বামী হস্তপে না করলেও, তার পেছনে যতোটা না উদারতা ছিলো, তারচে' বেশী ছিলো একটা নিস্পৃহ মনোভাব। আর স্বামীর সে নিস্পৃহ মনোভাব মায়ের মতো একজন মানুষের জন্যে, যার ভেতর সবার মাঝে মধ্যমনি হওয়ার প্রবল ঝোঁক, ভয়াবহ একটা যন্ত্রনার উৎস হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু মা তাঁর নিজস্ব কৌশলেই যন্ত্রনার মুখগুলো বিভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারলেন। তাতে দু'জনের মাঝে বাহ্যিক একটা শান্তি এলেও ফলাফল হিসেবে কঠিন একটা দেয়াল গড়ে উঠলো তাঁদের মাঝে।
কিন্তু নানাভাইয়ের প্রশ্নে মায়ের একটা দিক ভালো লাগতো না শুভর। মা ওনার সম্পর্কে অনেক কিছু বাড়িয়ে বলতেন। আর মাঝে মাঝে এই বাড়িয়ে বলার ভেতরে কিছু পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থাকার কারণে ধরা পড়ে যেতেন মা। মায়ের গানের আসরের বন্ধুরাই এ নিয়ে আড়ালে বলাবলি করতেন, মা কে, নানাভাই কে নিয়ে হাসাহাসি করতেন। এর কি কোন দরকার ছিলো ? নানাভাই মানুষ হিসেবে যেমন, সামাজিক, সাহিত্যক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর যা অবদান, সেটা শুভ তাঁকে ছোটবেলা থেকে তাঁর কাছাকাছি হয়ে ও বিশেষ করে 'ভার্সিটিতে পড়ার সময়ে সাহিত্যের কয়েকটা সেমিনার করেই বুঝেছে। ওনি তো তাঁর নিজের পরিচয়েই অনেক উঁচুতে স্থান গড়ে নিয়েছেন। সেেেত্র তাঁর সম্পর্কে বাড়িয়ে বলে তাঁকে হাস্যস্পদ করা কি মায়ের এক ধরণের বিকৃতি নয় ? নানাভাইয়ের সাথে অসি চাচারও ভালো পরিচয় ছিলো এবং দু'জনেই দু'জনকে পছন্দ করতেন।
-0-0-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


