somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

(ছোটগল্প) সমুদ্র সুখ - 4

২২ শে মার্চ, ২০০৬ রাত ১২:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অসি চাচাকে শুভ ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে। শুভর বয়েস যখন সাত বছর, থেকে তিনি এ বাড়ীতে আসা যাওয়া শুরু করেছেন। শুভর এখনও আবছা আবছা মনে পড়ে। কোন এক গানের অনুষ্ঠানে নাকি মায়ের সাথে ওনার পরিচয়। মা বেশ ভালো গান করতেন, বিশেয করে রবীন্দ্রসংগীত, এখনও করেন। ক'মাস বিশ্বভারতীতে নাকি গানের কাশও করেছিলেন। অসি চাচাও গাইতেন, কিন্তু মায়ের মতো এতোটা ভালো গলা ও গানের তালিম তাঁর ছিলনা। তাদের পরিচয় হয় এমনি একটা অনুষ্ঠানে যেখানে মা নন, বরং অসি চাচাই গাইছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে তাদের আলাপ হয় ও মা তার নিজের গানের কথা অসি চাচাকে জানান। পরে একসময় অসি চাচা বাড়ীতে আসেন ও মায়ের গান শোনেন। এই গানের সুবাদেই পরে ওনার আসা যাওয়া শুরু মায়ের কাছে। বাবা নিজে গানের এতোটা পাগল ছিলেন না ও সংস্কৃতিক চিন্তাভাবনতেও এতোটা সজাগ ছিলেন না। মা এ নিয়ে অনেকবারই তাঁর ােভ প্রকাশ করেছেন। মায়ের জীবনের এ শুন্যতা পূরণ করলেন অসি চাচা। বাবারও এ নিয়ে আপত্তি ছিলনা তেমন, কথায় মাঝে মাঝে সামান্য ঈর্ষার আভাস পাওয়া গেলেও, এ ব্যাপারটি অন্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে তিনি তাঁর ব্যাবসার দিকে আরো বেশী মনযোগী হন। প্রায়ই মায়ের গানের ও সামাজিক আসর বসতো এদিক সেদিক। এ ধরণের আসরে যারা আসতেন, তাঁরাও যে বাবার চেয়ে বেশী সাংস্কৃতিমনা ছিলেন, তা ও নয়, কিন্তু তারপরও সেখানে মধ্যমনি হতে মা বেশ আনন্দই পেতেন। অসি চাচা এসব আসরে খুব একটা থাকতেন না, অনেকসময় মা চাইলেও। আর কখনো থাকলেও থাকতেন খুব অল্প সময়ের জন্যেই। শুভর সামনেই তাঁদের এ নিয়ে অনেকবার রাগারাগি হয়েছে। অসি চাচা যে মা কে ভালোবাসতেন শুভ সেটা টের পেলেও মা'র মনে কি ছিল, সেটা শুভ এতোদিনেও বুঝে উঠতে পারেনি। হয়তো মা'র মনে ছিল ভালোবাসা ও খেলার একটা অদ্ভূত মিশ্রণ। এই ভালোবাসা ও খেলার মধ্যে, কোনটির প্রাধান্য কতোটা বেশী, নির্ভর করতো, মা ও বাবার সম্পর্কের মাঝে যে শীতল হাওয়া বইতো, তার উপর।

বাবার অসি চাচার প্রতি বড় কোন ঈর্ষা ছিলনা, বরং বাবা অনেক বিষয়েই ওনার উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভর করতেন। ঈর্ষা না করার কারণ ছিল, দু"জন এতোটাই আলাদা যে, তুলনা করাও চলতো না। নির্ভর করার কারণ ছিল, অসি চাচার অনেক বিষয়ে ভালো জানাশোনা ও ভালো পরামর্শ দেয়ার প্রচেষ্টা। কিন্তু ওনার সারল্য নিয়ে বাবা মাঝে মাঝে হাসাহাসিও করতেন, মা ও তাতে যোগ দিতেন কখনো কখনো। শুভর খুব কষ্ট হতো এতে ছোটবেলা থেকেই। এসময়গুলোতে সে বাবা, মা'র কাছাকাছিই থাকতে চাইতো না। অসি চাচার উপরও রাগ হতো। মনে মনে চাইতো, ওনি যেনো আর এ'বাড়ীতে না আসেন।

সেদিন বিকেলে ড্রয়িং রুমে মা কে দেখে অবাক হলো শুভ। সাধারণত: মা' র এ সময়ে ঘরে থাকার কথা না। শাহিদা সোফায় বসে একটা বই পড়ছিলেন। শুভকে দেখে ডাকলেন কাছে। ও কাছে গিয়ে বসলো। কিন্তু কোন কথা বললো না। শাহিদা ও তার বইপড়া নিয়ে ব্যাস্ত থাকলেন কিছুটা সময়।

মা, তুমি অসি চাচাকে বিয়ে করার কথা কখনো ভেবেছ ? হঠাৎ প্রশ্ন শুভর।
শাহিদা চমকে ওর দিকে তাকালেও মনে হলোনা অবাক হয়েছেন।
কি পাগলের মতো বলছিস্, আমি তাঁকে বিয়ে করতে যাব কেন ? তোর বাবার কি হবে তাহলে ?
তুমি তো বাবা কে ভালোবাস না।
কে বলেছে আমি তাঁকে ভালোবাসি না ? ছাড় তো এসব আজেবাজে কথা !
বলেই সোফা ছেড়ে উঠে গেলেন শাহিদা । অনেকগুলো ডিস্ক খুঁজে খুঁজে ঠিক ডিস্কটি না পেয়ে ওগুলোকেই একটু মিষ্টি বকাঝকা করে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট ঢোকালেন। আবার এসে বসলেন সোফায়। স্থির দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকিয়ে বললেন,
তোর কি মনে হয় তোর অসি চাচার মতো সরল মনের মানুষ আমাকে সামলাতে পারতেন ?
তুমি তো খারাপ নও মা ! শুভও তাঁর দিকে তাকিয়ে বললো।
আমি খারাপ নইরে শুভ, কিস্তু জটিল। তাই মনে হয়, ওনি আমাকে না পেয়ে যতোটা কষ্টে আছেন, পেলে সে কষ্ট বাড়তো বই কমতো না।
শুভ কিছুন চুপ করে থাকলো। ক্যাসেটে বাজছে- যেদিন সকল মুকুল গেল ঝরে, আমায় ডাকলে কেন গো । গানের সেই বেদনা শুভর ভেতরেও সঞ্চারিত হয়ে মিলে মিশে এক হয়ে গেলো ওর দেহের, আত্মার সাথে।

তোমার কষ্ট হয়না মা ?
আমার ? আমার কোন কষ্ট নেই। আমি তো সবই পাচ্ছি।

শুভ মায়ের মুখের দিকে তাকালো। পাথরের মতো শক্ত সে মুখ। মা যে অবলীলায় সবার কাছ থেকে সব পেয়ে যাচ্ছেন, কথাটা ভুল নয়। মা দেখতে সুন্দর। নিজের সৌন্দর্য ও গুনকে কাজে লাগাতেও জানেন তিনি। কিন্তু এ পাওয়াই কি সব, এ পাওয়ার জন্যেই বেঁচে থাকে মানুষ ? দেয়ার মাঝেও যে সুখ আছে, সে সুখ না পেলে কি পরিপূর্ন হয় কোন পাওয়া ?

কিস্তু আমার একটা কথা মনে হয় মা।
বল্। শাহিদা শুভর দিকে তাকালেন।
তোমরা এক হ'লে তোমাদের চারপাশের পৃাথবীই তোমার ভেতরের জটিলতা দুর করতো।

মায়ের চেহারায় বেদনার ভাব উঠেই মিলিয়ে যেতে দেখল শুভ। সামনে খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি কতোটা সময়। তারপর খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন,

তুই তোর অসি চাচার জন্যে এতো ভাবিস্, নিজের বাবার কথা ভাবিস না ?
জানিনা মা। বাবার কথা সত্যিই বেশী ভাবি না। ছোটবেলা থেকে তুমি আর অসি চাচাই তো আমার সব।

শাহিদা কিছু বললেন না। শুভও কতোন চুপ করে থাকলো। উপরে ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকলো অনেকন। জানলার কার্নিসে একটা কাক দু'বার কা কা করে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেলো। শুভর সামনে টেলিভিসনের কাঁচটি হঠাৎ করেই যেনো সমুদ্র হয়ে আবার আগের চেহারায় ফিরে এলো। কিন্তু শুভ সেই সমুদ্রের সামনে থেকে নড়তে চাইলো না সহজে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×