বাবার অসি চাচার প্রতি বড় কোন ঈর্ষা ছিলনা, বরং বাবা অনেক বিষয়েই ওনার উপর পুরোপুরিভাবে নির্ভর করতেন। ঈর্ষা না করার কারণ ছিল, দু"জন এতোটাই আলাদা যে, তুলনা করাও চলতো না। নির্ভর করার কারণ ছিল, অসি চাচার অনেক বিষয়ে ভালো জানাশোনা ও ভালো পরামর্শ দেয়ার প্রচেষ্টা। কিন্তু ওনার সারল্য নিয়ে বাবা মাঝে মাঝে হাসাহাসিও করতেন, মা ও তাতে যোগ দিতেন কখনো কখনো। শুভর খুব কষ্ট হতো এতে ছোটবেলা থেকেই। এসময়গুলোতে সে বাবা, মা'র কাছাকাছিই থাকতে চাইতো না। অসি চাচার উপরও রাগ হতো। মনে মনে চাইতো, ওনি যেনো আর এ'বাড়ীতে না আসেন।
সেদিন বিকেলে ড্রয়িং রুমে মা কে দেখে অবাক হলো শুভ। সাধারণত: মা' র এ সময়ে ঘরে থাকার কথা না। শাহিদা সোফায় বসে একটা বই পড়ছিলেন। শুভকে দেখে ডাকলেন কাছে। ও কাছে গিয়ে বসলো। কিন্তু কোন কথা বললো না। শাহিদা ও তার বইপড়া নিয়ে ব্যাস্ত থাকলেন কিছুটা সময়।
মা, তুমি অসি চাচাকে বিয়ে করার কথা কখনো ভেবেছ ? হঠাৎ প্রশ্ন শুভর।
শাহিদা চমকে ওর দিকে তাকালেও মনে হলোনা অবাক হয়েছেন।
কি পাগলের মতো বলছিস্, আমি তাঁকে বিয়ে করতে যাব কেন ? তোর বাবার কি হবে তাহলে ?
তুমি তো বাবা কে ভালোবাস না।
কে বলেছে আমি তাঁকে ভালোবাসি না ? ছাড় তো এসব আজেবাজে কথা !
বলেই সোফা ছেড়ে উঠে গেলেন শাহিদা । অনেকগুলো ডিস্ক খুঁজে খুঁজে ঠিক ডিস্কটি না পেয়ে ওগুলোকেই একটু মিষ্টি বকাঝকা করে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট ঢোকালেন। আবার এসে বসলেন সোফায়। স্থির দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকিয়ে বললেন,
তোর কি মনে হয় তোর অসি চাচার মতো সরল মনের মানুষ আমাকে সামলাতে পারতেন ?
তুমি তো খারাপ নও মা ! শুভও তাঁর দিকে তাকিয়ে বললো।
আমি খারাপ নইরে শুভ, কিস্তু জটিল। তাই মনে হয়, ওনি আমাকে না পেয়ে যতোটা কষ্টে আছেন, পেলে সে কষ্ট বাড়তো বই কমতো না।
শুভ কিছুন চুপ করে থাকলো। ক্যাসেটে বাজছে- যেদিন সকল মুকুল গেল ঝরে, আমায় ডাকলে কেন গো । গানের সেই বেদনা শুভর ভেতরেও সঞ্চারিত হয়ে মিলে মিশে এক হয়ে গেলো ওর দেহের, আত্মার সাথে।
তোমার কষ্ট হয়না মা ?
আমার ? আমার কোন কষ্ট নেই। আমি তো সবই পাচ্ছি।
শুভ মায়ের মুখের দিকে তাকালো। পাথরের মতো শক্ত সে মুখ। মা যে অবলীলায় সবার কাছ থেকে সব পেয়ে যাচ্ছেন, কথাটা ভুল নয়। মা দেখতে সুন্দর। নিজের সৌন্দর্য ও গুনকে কাজে লাগাতেও জানেন তিনি। কিন্তু এ পাওয়াই কি সব, এ পাওয়ার জন্যেই বেঁচে থাকে মানুষ ? দেয়ার মাঝেও যে সুখ আছে, সে সুখ না পেলে কি পরিপূর্ন হয় কোন পাওয়া ?
কিস্তু আমার একটা কথা মনে হয় মা।
বল্। শাহিদা শুভর দিকে তাকালেন।
তোমরা এক হ'লে তোমাদের চারপাশের পৃাথবীই তোমার ভেতরের জটিলতা দুর করতো।
মায়ের চেহারায় বেদনার ভাব উঠেই মিলিয়ে যেতে দেখল শুভ। সামনে খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি কতোটা সময়। তারপর খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
তুই তোর অসি চাচার জন্যে এতো ভাবিস্, নিজের বাবার কথা ভাবিস না ?
জানিনা মা। বাবার কথা সত্যিই বেশী ভাবি না। ছোটবেলা থেকে তুমি আর অসি চাচাই তো আমার সব।
শাহিদা কিছু বললেন না। শুভও কতোন চুপ করে থাকলো। উপরে ঘুরন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকলো অনেকন। জানলার কার্নিসে একটা কাক দু'বার কা কা করে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেলো। শুভর সামনে টেলিভিসনের কাঁচটি হঠাৎ করেই যেনো সমুদ্র হয়ে আবার আগের চেহারায় ফিরে এলো। কিন্তু শুভ সেই সমুদ্রের সামনে থেকে নড়তে চাইলো না সহজে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


