somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

(ছোটগল্প) সমুদ্র সুখ - 5

২২ শে মার্চ, ২০০৬ রাত ১২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অথচ অসি চাচা ও মাকে একা একসাথে দেখা গেলে, বাইরের কোন প্রভাব না থাকলে, বোঝা যেতো, কতোটা গভীরতা ওদের এই সম্পর্কের ভেতরে রয়েছে। একজনের সাথে আরেকজনের কথা বলার ভঙ্গি, চোখের দৃষ্টি, মৃদু হাসি- সবকিছুর মাঝেই ফুটে উঠতো, কতোটা গাঢ় ওদের এই যোগাযোগ। এমনি এক সময়ে শুভ ওদেরকে এক রেষ্টুরেন্টে দেখেছে। ও গিয়েছিল একদিন 'ভার্সিটির কাশ শেষে, এক বন্ধুর সাথে একটা ক্যাফেতে। কফির কাপ নিয়ে বসেছে মাত্র, হঠাৎ একটু আড়ালে একটা টেবিলে মা ও অসি চাচাকে দেখতে পেলো। নিজেদেরকে নিয়ে এতোটা ব্যস্ত ছিলেন যে, শুভর উপস্থিতি টের পেলেন না ওঁরা। অসি চাচার কোন একটা কথায় ছেলেমানুষের মতো হাসছিলেন মা খুব। মাঝে মাঝে গালে হাত ঠেকিয়ে মনযোগে শুনছিলেন। এতোটা তারল্য, এতোটা ছন্দময় ভাবালুবতা ওদের দু'জনের মাঝে কখনো দেখেনি শুভ। অন্যদের দৃষ্টিও পড়ছিল ওদের দিকে। কিন্তু সে দৃষ্টিতে কোন অসম্মান বা অসৌজন্যের চিহ্ন ছিলনা। বরং ছিল, যা কিছু সুন্দর, তার প্রতি এক প্রচ্ছন্ন ভালোলাগা ও সস্মানবোধ। ও ওদেরকে বিরক্ত করতে চাইলো না। তাই অসি চাচার সাথে দেখা করার ইচ্ছে থাকলেও বন্ধুর সাথে আলাপে ব্যাস্ত থাকলো।

তারপরেও মাঝে মাঝেই তার দৃষ্টি পড়ছিলো ও দিকে। মাকে এতোটা সুখী ও আনন্দিত দেখে তার এতোটা ভালো লাগছিলো যে, তার বন্ধুর চলে যাওয়ার পরও সে কিছুন ওখানে বসে থাকতে চাইলো। এক সময় নজর পড়লো তার দিকে অসি চাচার। তিনি অবাক হ'লেন কিছুটা ও হেসে শুভকে কাছে যেতে ইশারা করলেন। সে এগিয়ে গেলো ওদের টেবিলের দিকে।

কি রে ? কখন এলি ?
অনেক্ষন। উত্তর করলো শুভ।
আমাদের সঙ্গে বসলি না যে ? অসি চাচার নির্মল আন্তরিকতা ভালো লাগলো শুভর।
এক বন্ধু সাথে ছিলো।
ওকে সাথে নিয়ে তো আসতে পারতি ! বাজারের একটা ফর্দ ব্যাগ থেকে বের করে সেখানে চোখ বুলিয়ে বললেন শাহিদা।
আয়, বোস আমাদের সাথে। বলে অসি চাচা একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন ওকে।

শুভ বসলো খানিকটা দ্বিধা নিয়েই। অসি চাচা একটা কফির অর্ডার দিয়ে ওর কাস ও পড়াশোনার খবরাখবর নিলেন। মা চুপচাপ থাকলেও কিছুটা বিব্রত ও জড় মনে হলো শুভর। তাই জড়তা ভাঙ্গার জন্যেই প্রশ্ন করলো সে,

তুমি কখন বেরুলে মা ?
মা আনমনে অসি চাচার সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে নাড়চাড়া করছিলেন। হঠাৎ প্রশ্নে চমকে তাই শুভর দিকে তাকালেন।
এইতো, কিছুন আগে। বলেই মা অসি চাচার দিকে তাকালেন। হাসলেন ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে। তারপর বললেন,
কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলাম, হঠাৎ ওনার সাথে দেখা হয়ে গেলো।

অসি চাচার চেহারায় খুব নস্থায়ী এক ঝলক মেঘের ছায়া দেখতে পেলো শুভ। একটা অপমানের গা্লনি যে সে মেঘের আড়ালে ছিলো, সেটাও তার কাছে পরিস্কার হয়ে প্রকাশিত হলো। তার নিজের মনের আনন্দটুকুও যেনো নিভে গেলো কোন এক দমকা বাতাসে। মায়ের মিথ্যে অসি চাচার বুকে যতোটা বাজলো, তার নিজের বুকেও এরচে' কম বাজলো না। দ্রুত কফিটা শেষ করে বিদায় নিলো ওদের কাছ থেকে তাই। কাসে যেতে আর ইচ্ছে করলো না ওর। 'ভার্সিটির চত্তরেই একটা গাছের ছায়ায় বসে অনেক ভাবলো। ভেবে ভেবে মায়ের প্রতি একটা অভিমান মেশানো মমতায় বিলীন হয়ে গেলো সে।

মা'র সারা জীবনটাই যেনো কেটেছে কোন এক ফাঁকির মাঝে। নিজের ভেতরের চেহারাটা নিকটতম মানুষগুলোর কাছ থেকেও লুকিয়ে রাখতে গিয়ে নিতে হয়েছে তাঁকে ফাঁকির আশ্রয়। তারপর তা বেড়ে বেড়ে এক অসুস্থ উন্মাদনার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা'র জন্যে তার কষ্ট হয় খুব। মাঝে মাঝে মনে হয়, মা নিজেই নিজের খোলসের মাঝে দমবন্ধ হয়ে আছেন। ইচ্ছে হয় খুব তাঁর জন্যে মুক্তি খোজার। কিন্তু শুভর সে সাধ্য কি আছে ? হয়তো বাবা পারতেন। কিস্তু পারলেও কি সে ইচ্ছে আছে তাঁর। বাবার সামাজিক সম্মানের তো মা ই সবচে' বড় হাতিয়ার। মাকে সবার মাঝে ঠেলে দিয়ে, মার পাশাপাশি নিজেকেও মধ্যমনি করে, বাবার যে আত্মতৃপ্তি, শুভ তা নিজেও টের পেয়েছে অনেকবার। এসব ভেবে বাবার প্রতি যতোই তার রাগ বাড়ে, ততোই জাগে মার প্রতি তার এক অদ্ভুত মমতাবোধ। মাকে মনে হয় তার গহন অরন্যে পথ হারানো কোন এক বালিকার মতো।

কিস্তু মা'র এ চরিত্রের কারণে শুভকে ছোটবেলা থেকেই মাঝে মাঝে ভুগতে হয়েছে। বেশ কয়েক বছরের পুরোনো হলেও তার একটা কথা এখনও মনে পড়ে। ছোট খালাকে খুব পছন্দ করতো শুভ। সে খালা এলেন তাদের বাড়ীতে এমনি এক দিনে, যেদিন শুভর স্কুল খোলা। তার খুব মন খারাপ দেখে মা ফোন করলেন স্কুলে। সে একটা সুন্দর দিন কাটালো খালার সাথে, বেড়াতে গেলো বিভিন্ন জায়গায়। পরদিন গেলো স্কুলে। বন্ধুদের কাছে খালা ও সুন্দর দিনটি নিয়ে গল্প করতে চাইলো অনেক। কিন্তু ওরা হাসাহাসি করলো শুভকে নিয়ে। ও প্রথমে কারণ না খুঁজে পেলেও পরে পেলো। মা নাকি গতকাল স্কুলে ফোন করে, শুভর জ্বর বলে ছুটি নিয়েছেন। খুব লজ্জা পেয়েছিল ও সে'দিন।

এমনি ঘটনা আরো অনেকবারই ঘটেছে। বন্ধুরা দেখা করতে এলো একদিন। ও ঘরেই ছিলো। মা বলে দিলেন, বাবার সাথে সিনেমায় গেছে। অথচ বাবা তাকে কোনদিনও কোথাও নিয়ে যাননি। কোথাও নিয়ে যাওয়ার হলে, মা বা অসি চাচাই তা করতেন। বন্ধুদের সাথে স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা দেখতে যেতে চাইলো একদিন, মা বললেন ছোটখালার আসার কথা। কিন্তু খালাও এলেন না সে'দিন, ক্রিকেট খেলাও দেখা হলোনা শুভর। পরে জানলো খালার তখন আসার কথাই ছিলোনা। কিন্তু এসব নিয়ে মায়ের উপর রাগ হলেও মা'র প্রতি তার ভালোবাসা কি কমেছে ? শুভর তা মনে হয়না। অসি চাচা যে এসব নিয়ে খুব কষ্ট পান, সে বোঝে, কিন্তু বাবা কি ভাবেন ? শুভর মনে হয়, বাবা অন্যের কাছে মায়ের প্রশংসা শুণেই তৃপ্ত, এর চেয়ে বেশী কিছু তলিয়ে ভাবার অবকাশ কি তাঁর আছে ? কিন্তু মায়ের প্রশংসা যারা করতো, তারাও মায়ের এ দোষ জেনে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করতে ছাড়েনি। শুভর সামনেই তা অনেকবার প্রায় অপমানের পর্যায়েই চলে গিয়েছিল। মা কে এ নিয়ে কষ্ট পেতে সে অনেকবারই দেখেছে। বাবা এদেরকে কখনো কিছু বলেছেন বলে তার মনে হয়না। কেনো যে অসি চাচা এসব অনুষ্ঠানে থাকতে চাইতেন না, এসব দেখেই শুভ বুঝতে পেরেছে এর কারণ। তারপর সে নিজেও ওখানে থাকতে চাইতো না।
-0-0-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রতিদ্বন্দ্বী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪৮


গফুর মিয়া অভাবের তাড়নায় গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসেছিল। সংসারে মানুষ মোট ছয়জন, গফুর, তার স্ত্রী আর চার সন্তান। দুই সন্তান হওয়ার পর তার স্ত্রী আর সন্তান নিতে চায়নি। সে গফুরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জজ মিয়া চিত্রনাট্য নিয়ে নির্মিত হোচ্ছে ভয়ংকর নতুন সিক‍্যুয়াল!!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৪:৪৭



বিএনপির পুলিশ এতো করিৎকর্মা যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে । খুনের তদন্ত করে একেবারে আদালতের রায় সহ রিপোর্ট দিয়ে দেয় ! পৃথিবীর সবচেয়ে আপগ্রেডেড আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন শিলং সালাউদ্দিনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাসওয়ার্ড রিসেট করতে সমস্যা এবং ওয়েবসাইটে ক্যাপচা এরর (Invalid site key) সংক্রান্ত।

লিখেছেন চারাগাছ, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:১৪


পাসওয়ার্ড রিসেট করতে সমস্যা এবং ওয়েবসাইটে ক্যাপচা এরর (Invalid site key) সংক্রান্ত।


প্রিয় সামু সাপোর্ট টিম,
আশা করি ভালো আছেন। আমি সামহোয়্যার ইন ব্লগের একজন নিয়মিত পাঠক ও লেখক। দীর্ঘদিন ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালবেলার মুগ্ধতা থেকে নবকুমারের গ্ল্যামার দুনিয়ায়

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০



সমরেশ মজুমদার আমার বরাবরই প্রিয় লেখকদের একজন। কৈশোর আর যৌবনের এক বড় অংশ জুড়ে তিনি ছিলেন আমার মনোজগতে। বই কিনে পড়া, পাড়ার লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার যদি ৩% হারে লোন দেয় দেশের প্রতিটি বাড়ীর ছাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করলে বিদ্যুের কস্টের অনেকটাই কিছুটা সমাধান হইতে পারে।

লিখেছেন নতুন, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:০৬


দেশে বর্তমানে Net Metering Guideline–2025 অনুযায়ী অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া যায় এবং তা বিলের সঙ্গে সমন্বয় হয়। এটা খুবই ভালো একটা ব্যবস্থা, সরকারের উচিত এটাকে আরো উতসাহিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×