তারপরেও মাঝে মাঝেই তার দৃষ্টি পড়ছিলো ও দিকে। মাকে এতোটা সুখী ও আনন্দিত দেখে তার এতোটা ভালো লাগছিলো যে, তার বন্ধুর চলে যাওয়ার পরও সে কিছুন ওখানে বসে থাকতে চাইলো। এক সময় নজর পড়লো তার দিকে অসি চাচার। তিনি অবাক হ'লেন কিছুটা ও হেসে শুভকে কাছে যেতে ইশারা করলেন। সে এগিয়ে গেলো ওদের টেবিলের দিকে।
কি রে ? কখন এলি ?
অনেক্ষন। উত্তর করলো শুভ।
আমাদের সঙ্গে বসলি না যে ? অসি চাচার নির্মল আন্তরিকতা ভালো লাগলো শুভর।
এক বন্ধু সাথে ছিলো।
ওকে সাথে নিয়ে তো আসতে পারতি ! বাজারের একটা ফর্দ ব্যাগ থেকে বের করে সেখানে চোখ বুলিয়ে বললেন শাহিদা।
আয়, বোস আমাদের সাথে। বলে অসি চাচা একটা চেয়ার এগিয়ে দিলেন ওকে।
শুভ বসলো খানিকটা দ্বিধা নিয়েই। অসি চাচা একটা কফির অর্ডার দিয়ে ওর কাস ও পড়াশোনার খবরাখবর নিলেন। মা চুপচাপ থাকলেও কিছুটা বিব্রত ও জড় মনে হলো শুভর। তাই জড়তা ভাঙ্গার জন্যেই প্রশ্ন করলো সে,
তুমি কখন বেরুলে মা ?
মা আনমনে অসি চাচার সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে নাড়চাড়া করছিলেন। হঠাৎ প্রশ্নে চমকে তাই শুভর দিকে তাকালেন।
এইতো, কিছুন আগে। বলেই মা অসি চাচার দিকে তাকালেন। হাসলেন ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে। তারপর বললেন,
কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলাম, হঠাৎ ওনার সাথে দেখা হয়ে গেলো।
অসি চাচার চেহারায় খুব নস্থায়ী এক ঝলক মেঘের ছায়া দেখতে পেলো শুভ। একটা অপমানের গা্লনি যে সে মেঘের আড়ালে ছিলো, সেটাও তার কাছে পরিস্কার হয়ে প্রকাশিত হলো। তার নিজের মনের আনন্দটুকুও যেনো নিভে গেলো কোন এক দমকা বাতাসে। মায়ের মিথ্যে অসি চাচার বুকে যতোটা বাজলো, তার নিজের বুকেও এরচে' কম বাজলো না। দ্রুত কফিটা শেষ করে বিদায় নিলো ওদের কাছ থেকে তাই। কাসে যেতে আর ইচ্ছে করলো না ওর। 'ভার্সিটির চত্তরেই একটা গাছের ছায়ায় বসে অনেক ভাবলো। ভেবে ভেবে মায়ের প্রতি একটা অভিমান মেশানো মমতায় বিলীন হয়ে গেলো সে।
মা'র সারা জীবনটাই যেনো কেটেছে কোন এক ফাঁকির মাঝে। নিজের ভেতরের চেহারাটা নিকটতম মানুষগুলোর কাছ থেকেও লুকিয়ে রাখতে গিয়ে নিতে হয়েছে তাঁকে ফাঁকির আশ্রয়। তারপর তা বেড়ে বেড়ে এক অসুস্থ উন্মাদনার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। মা'র জন্যে তার কষ্ট হয় খুব। মাঝে মাঝে মনে হয়, মা নিজেই নিজের খোলসের মাঝে দমবন্ধ হয়ে আছেন। ইচ্ছে হয় খুব তাঁর জন্যে মুক্তি খোজার। কিন্তু শুভর সে সাধ্য কি আছে ? হয়তো বাবা পারতেন। কিস্তু পারলেও কি সে ইচ্ছে আছে তাঁর। বাবার সামাজিক সম্মানের তো মা ই সবচে' বড় হাতিয়ার। মাকে সবার মাঝে ঠেলে দিয়ে, মার পাশাপাশি নিজেকেও মধ্যমনি করে, বাবার যে আত্মতৃপ্তি, শুভ তা নিজেও টের পেয়েছে অনেকবার। এসব ভেবে বাবার প্রতি যতোই তার রাগ বাড়ে, ততোই জাগে মার প্রতি তার এক অদ্ভুত মমতাবোধ। মাকে মনে হয় তার গহন অরন্যে পথ হারানো কোন এক বালিকার মতো।
কিস্তু মা'র এ চরিত্রের কারণে শুভকে ছোটবেলা থেকেই মাঝে মাঝে ভুগতে হয়েছে। বেশ কয়েক বছরের পুরোনো হলেও তার একটা কথা এখনও মনে পড়ে। ছোট খালাকে খুব পছন্দ করতো শুভ। সে খালা এলেন তাদের বাড়ীতে এমনি এক দিনে, যেদিন শুভর স্কুল খোলা। তার খুব মন খারাপ দেখে মা ফোন করলেন স্কুলে। সে একটা সুন্দর দিন কাটালো খালার সাথে, বেড়াতে গেলো বিভিন্ন জায়গায়। পরদিন গেলো স্কুলে। বন্ধুদের কাছে খালা ও সুন্দর দিনটি নিয়ে গল্প করতে চাইলো অনেক। কিন্তু ওরা হাসাহাসি করলো শুভকে নিয়ে। ও প্রথমে কারণ না খুঁজে পেলেও পরে পেলো। মা নাকি গতকাল স্কুলে ফোন করে, শুভর জ্বর বলে ছুটি নিয়েছেন। খুব লজ্জা পেয়েছিল ও সে'দিন।
এমনি ঘটনা আরো অনেকবারই ঘটেছে। বন্ধুরা দেখা করতে এলো একদিন। ও ঘরেই ছিলো। মা বলে দিলেন, বাবার সাথে সিনেমায় গেছে। অথচ বাবা তাকে কোনদিনও কোথাও নিয়ে যাননি। কোথাও নিয়ে যাওয়ার হলে, মা বা অসি চাচাই তা করতেন। বন্ধুদের সাথে স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা দেখতে যেতে চাইলো একদিন, মা বললেন ছোটখালার আসার কথা। কিন্তু খালাও এলেন না সে'দিন, ক্রিকেট খেলাও দেখা হলোনা শুভর। পরে জানলো খালার তখন আসার কথাই ছিলোনা। কিন্তু এসব নিয়ে মায়ের উপর রাগ হলেও মা'র প্রতি তার ভালোবাসা কি কমেছে ? শুভর তা মনে হয়না। অসি চাচা যে এসব নিয়ে খুব কষ্ট পান, সে বোঝে, কিন্তু বাবা কি ভাবেন ? শুভর মনে হয়, বাবা অন্যের কাছে মায়ের প্রশংসা শুণেই তৃপ্ত, এর চেয়ে বেশী কিছু তলিয়ে ভাবার অবকাশ কি তাঁর আছে ? কিন্তু মায়ের প্রশংসা যারা করতো, তারাও মায়ের এ দোষ জেনে তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করতে ছাড়েনি। শুভর সামনেই তা অনেকবার প্রায় অপমানের পর্যায়েই চলে গিয়েছিল। মা কে এ নিয়ে কষ্ট পেতে সে অনেকবারই দেখেছে। বাবা এদেরকে কখনো কিছু বলেছেন বলে তার মনে হয়না। কেনো যে অসি চাচা এসব অনুষ্ঠানে থাকতে চাইতেন না, এসব দেখেই শুভ বুঝতে পেরেছে এর কারণ। তারপর সে নিজেও ওখানে থাকতে চাইতো না।
-0-0-
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


