আমিনাদের গল্প গুচ্ছ
লাল শাড়ির ঘোমটা দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে নামলো আমিনা।
জীবনের নুতুন অধ্যায়ের শুরু। সে জানেনা তার জন্য কি অপেক্ষা করছে।
শহুরে জীবনে অভ্যস্ত সে। বাবার বাড়িতে পড়াশুনা খুবই গুরুত্ব পূর্ণ । বিলাসিতা মোটেও ছিলনা বটে কিন্তু ছিল একটা শিক্ষিত পরিবেশ এবং শিক্ষার চর্চা। বাবার ছিল একটা বিরাট লাইব্রেরী । নানান ধরনের বইয়ের সংগ্রহ । নিয়মিত খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিন আসার একটা নিয়ম ।
ব্রিটিশ আমলে মাহেনও,বেগম এবং পরবর্তী তে বিচিত্রা ।
এখানে সেসবের কোন বালাই নাই। বইয়ের গন্ধ নাই । খবরের কাগজ তো দূরের কথা।আমিনা জানে এখানে তাকে থাকতে হবেনা। যাই হোক সে মিশে যায় যারা বেশ সহজ তাদের সাথে। কেমন হয় গ্রামীণ জীবন প্রখর দৃষ্টিতে অবজার্ভ করতে থাকে। করতে থাকে মানুষজন দের আচরণ। এবং পারসোনালিটি ।
চার দিকে ধানক্ষেত পুকুর আর বিল । পানের বরজ। সারি সারি সুপরি গাছ। সামনে গোয়াল ঘর। আধা পাকা ঘর। মোটামুটি সব কিছু নিজেদের উৎপাদিত । গ্রামের মধ্যে অবস্থা ভালো হলেও সে সময় গোছল খানা বা পাইখানা থাকত না । থাকলেও বাইরে শুধু মাত্র পুরুষদের জন্য।
সবচেয়ে কষ্ট করত মেয়েরা রান্না ঘরে, কারন ধুয়া বের হওয়ার কোন ব্যাবস্থা নাই পানি সরবরাহের ব্যাবস্থা নাই আর পানির কল থাকলেও সবসময় নষ্ট । সে সময় বিদ্যুতের লাইন যায় নাই বলে ঘরে আলো সরবরাহ বা সিলিং পাখার কোন ব্যাবস্থা ছিলনা।ওপেন ফ্যায়ার বা পাটখড়ির চুলা দিয়ে শাশুড়ি মা কে সারা দিন রাঁধতে হতো । কারন প্রায় চল্লিশ জন লেবার বা খেত মজুর এবং নিজেদের বিরাট পরিবারের তিন বেলার রান্না তাকে করতে হতো।
আমিনার গ্রাম যে ভালো লাগেনা তা নয় কিন্তু সংস্কার আর ধর্মীও গোঁড়ামি খুব বেশি । যাতে সে অভ্যস্ত নয়। টিভি নাই এবং তা কেনা যাবেনা কেননা টি ভি তে নারী দেখানো হয় আর তার দিকে তাকানো পুরুষের হারাম। হাজার গরম হলেও জানালা খোলা যাবেনা বাতাসের জন্য কারন বাইরে দিয়ে হাঁটা পুরুষ মানুষের দৃষ্টি আস্তে পারে। বাইরে মেয়েদের বেরুনো একেবারে নিষিদ্ধ ।
শাশুড়ী মাকে তার খুব ভালো লেগে যায়। তার সাথে শাশুড়ি মাও তাকে পছন্দ করতে থাকে , আমিনার খুব কষ্ট হয় তার জন্য তার জীবনের অনেক গল্প তিনি শেয়ার করেন আমিনার সাথে। কেমন ছিল তার বিবাহিত জীবন এবং কেমন করে কত পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে এই সব । আমিনা নিজে তো দেখছে। দুপুরের রান্না খাওয়া দাওয়া শেষে আমিনা তার চূল শুকিয়ে দিতো বা নামাজে বসলে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতো ।
তিনি যেন নিষ্পেষিত এক নারীর জীবন্ত উদাহরণ। যেখানে একজন নারী নিরীহ ভদ্র হয়েও উপযুক্ত সন্মান পাইনি কোন দিন।
আস্তে আস্তে তাদের পারসোনালিটি বের হতে শুরু করে। আমিনা বুঝতে থাকে কে কেমন।এখানে নারীরা যেন জীবন থেকেও মৃত। তাদের কোন দাম নাই। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নাই। তার কাজ অগুনিত সন্তানের জন্ম দেয়া এবং বিরাট এক হোটেলের রান্নার সেফ হওয়া।
তার হাতে কোন টাকা পয়সা থাকা নয়, লেজার বা অবসর বিনোদন কি জিনিস তা তিনি জানেন না। না বলার কোন ক্ষমতা নাই । কেউ তাঁর হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনা। কারন তিনি একজন মেয়ে। তাঁর কাজেই তো এই । সেবা আর সেবা করা। সন্তান রাও বাপ বাপ করে বেশি কারন জমি জমা সব তাঁর হাতে তাকে অসন্তুষ্ট করলে জমির ভাগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় থাকে। সব কিছুর সাথে তো স্বার্থ জড়িত।
গবেষণায় দেখা গেছে হাতী বা রাইনো একটা বাচ্চা ঠিক ঠাক মতো বড়ো হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আর একটা বাচ্চা নায়না। যাতে সেই বাচ্চা ঠিক ঠাক মতো যত্ন আত্তি পায় । কিন্তু আমিনার শাশুড়ি মার বেলায় এই নিয়মের কোন বালায় ছিলনা। প্রতি ২/১ বছর পর পরেই গর্ভ ধারণ এবং বাচ্চা জন্মদান করতে করতে তিনি পরিশ্রান্ত ।
আমিনার শাশুড়ী আম্মা একজন নিরেট সাদা মনের নিরীহ মানুষ । অথচ তাঁর কোন কিছুতেই ক্ষমতা নাই। যেন হাত পা ভাঙ্গা একটা মানুষ কিংবা বলা যায় ডানা ভাঙ্গা পাখী যে উড়তে চাইলেও উড়তে পারবেনা।
তাঁর কাছ থেকে শুনা নিজের বাবার বাড়ি থেকে লোক আসলে তাদের আনা জিনিস উঠানে ছুড়ে ফেলতেন তাঁর স্বামী ।তার সাথে তো অবমূল্যায়ন অত্যাচার এবং অসন্মান আছেই ।
তারপর এই রকম খারাপ ব্যাবহার আমিনার সাথেও আরম্ভ হয়। বাবামা তুলে কথা বলে অপমান করা তো আছেই তার সাথে যোগ হতে থাকে আমিনাকে ব্যাবহার করে টাকা কামানোর ব্যাবস্থা করা। আমিনাকে কাজে লাগতে হবে, টাকা কামাতে হবে এবং সে টাকা তার হবেনা । আমিনার স্বামীকে দিয়ে দিতে হবে এবং তা হবে ছেলের টাকা এবং সেই টাকা তারা নিবে।ঘুরে ফিরে এই এক কথা শ্বশুর বাবা রিপিট করতেই থাকে।
আমিনা নিজের এক্যাউন্ট খুলতে পারবেনা। নিজের টাকা নিজের হবেনা। বাড়ি করলে সেখানে শ্বশুরের যতো ছেলেমেয়ে আছে তারাকে রেখে পড়াতে হবে। শ্বশুরকে পাঠানো টাকা দিয়ে জমি কিনলে তা হয় শ্বশুরের নামে। তাদের নামে আর হয়না। সেগুলো কোনদিন চাইতেও পারবেনা আমিনা।
আমিনার বোঝা শেষ এই বাড়িতে হবস(Hobbs),লক(John Locke) , রুশো( Rousseau) কিংবা মেকিয়াভেলির(Machiavel) থিওরী খাটবেনা। সেগুলো এখানে ভুলোনঠিতো । আমিনার প্রিয় সাবজেক্ট 'হিউম্যান রাইটস' এখানে ধুলিসাৎ । তার প্রাকটিক্যাল ক্ষেত্র এখানে নয়।
বেশির ভাগ মানুষের জ্ঞান অগভীর । জন্ম, বিয়ে, সন্তান জন্ম দেয়া, বুড়ো এবং মৃত্যু এর বাইরে ডানে বামে তারা চিন্তা করেনা আর ভাবে এটাই সব কিছু। এর বাইরে কি আছে তা তাদের মননে আসেনা।
'আরজ আলী মাতুব্বরের ' মতো চিন্তা করতে কয়জন শিখে ?
ধর্ম ধর্ম কথায় কথায় এবং একটুতেই 'ধর্ম মানা হলোনা' বলে খোঁটা কিন্তু 'নারীর উপর পুরুষের যেমন অধিকার আছে পুরুষের উপর নারীর ঠিক তেমন অধিকার আছে' ইসলাম ধর্মের এই উক্তি মানা হয় না।
এই বাড়ির ছেলের বউরা সব অর্ধ মৃত। কেন এই বাড়ির ছেলের বউরা এরকম এবং কেনই বা আমিনার শাশুড়ী মা মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয়না তার ব্যাখ্যার আর দরকার হবেনা ।সব কিছু পরিষ্কার হতে থাকে আমিনার কাছে।
মেয়েরা এখানে প্রেসার কুকারে সেদ্ধ হওয়া প্রাণী । এখানে নারী পুরুষের মধ্যে জেন্ডার ইকুইলিটি ঘুণাক্ষরও মানা হয়না। পুরুষের অসুখে চিকিৎসা হয় নারীর জন্য হয়না।
আমিনা আজ জীবনের অনেকটা পথ অতিবাহিত করেছে। অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। চারদিকে প্রায় একই অবস্থা।
ইউনাইটেড ন্যাশানের বক্তব্য ' Gender equality and the empowerment of women and girls is not just a goal in itself but a key to sustainable development, economic growth and peace and security.'
এই বক্তব্য এখানে জলাঞ্জিত । শুধু এখানে নয় প্রায় সব জায়গায়। তারপর আমিনা একদিন যে চাকুরী পায় তা আবার এই 'মানব অধিকারের' উপর । বক্তব্য দিতে হয় নানা প্রতিস্টানে। ঘুরতে হয় দেশ বিদেশ । নিজে শক্তি সঞ্চয় করে এবং নিজের অধিকার নিজেই আদায় করতে শিখে। ।প্রতিবাদ করতে শিখে অন্যায়ের ।
এইবার শাশুড়ি আম্মা আমিনার কাছে এসে বলে উঠেন 'আমি চাই ছিলাম বউমা , এই রকম একজন আইবো আর এর অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা কইবো ।'
আমিনা ভাবতে থাকে, যাক 'কার্ল মার্ক্স' এর থিওরি 'লাঙ্গল যার জমি তার' অ্যাট লিস্ট এই থিওরি সে নিজের জীবনে প্রতিস্টিত করতে পেরেছে। হয়তো এমন দিন এক দিন আসবে অনেকেই তাই পারবে।
লেখক ও গবেষকঃ হুসনুন নাহার নার্গিস, নারী ও শিশু অধিকার আর উন্নয়ন কর্মী , লন্ডন, UK

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

