somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাশা : বাংলাদেশের নতুন জাতীয় খেলা

০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


"ও শ্যামরে, তোমার সনে একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম, এই নিঠুর বনে। আজ পাশা খেলব রে শ্যাম।" প্রয়াত হুমায়ূন ফরীদির কণ্ঠে ছবিতে যখন এই গান শুনেছিলাম ,তখন কেউ ভাবেনি যে একদিন বাংলাদেশে পাশা খেলার এত বৈচিত্র্যময় সংস্করণ দেখা যাবে। রাধা-কৃষ্ণ হয়তো বনে বসে প্রেমের পাশা খেলতেন, কিন্তু আমরা এখন দেখছি নির্বাচনের পাশা, রাজনীতির পাশা, এনজিওর পাশা, এবং এমনকি টিভি সিরিয়ালের পাশাও।

পাশা খেলা মূলত একটা ছক্কা: ছয় পিঠওয়ালা একটা ছোট্ট জিনিস, যেটা ছুঁড়ে মারলে এক থেকে ছয় যেকোনো সংখ্যা আসতে পারে। লুডু খেলায় আমরা এটা ব্যবহার করি। কিন্তু বাংলাদেশে পাশা এখন শুধু খেলনা নয়: এটা একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট, বা সংক্ষেপে "পাশা" নামে একটা এনজিও আছে। এদের কার্যালয় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বরমপুর গ্রামে একটা বাড়ির এক কক্ষে। কর্মচারী একজন, যিনি আবার নিজেই নির্বাহী পরিচালক—সৈয়দ হুমায়ুন কবীর।

কোনো সক্রিয় প্রকল্প নেই, কোনো কাজকর্ম নেই। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই সংস্থা দশ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে ! এটা এমন যেন একজন লোক যার কোনো দোকান নেই, কোনো পণ্য নেই, কোনো কর্মচারী নেই—কিন্তু সে হঠাৎ করে বিশাল একটা শপিং মলের মালিক হয়ে গেল।

প্রথম আলোর প্রতিবেদকরা যখন পাশার কার্যালয়ে গেলেন, তখন দেখলেন দুপুর বারোটায় তালা ঝুলছে। ডাকাডাকি করেও কেউ সাড়া দিল না। প্রতিবেশীরা বললেন, "এটা তো হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি। অফিস কী জিনিস, তা আমরা জানি না।" স্থানীয় ব্যবসায়ী কাদির মিয়া বললেন, "হুমায়ুন সাহেবের বাড়িতে পাশার একটা সাইনবোর্ড লাগানো দেখি। কিন্তু পাশা কী কাজ করে, সে বিষয়ে আমাদের ধারণা নেই।"

এটা অনেকটা এমন যেন আপনি আপনার বাড়ির দরজায় একটা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিলেন, যাতে লেখা আছে "ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন হেডকোয়ার্টার্স"—কিন্তু আসলে ভেতরে আপনি শুধু ঘুমাচ্ছেন আর খাচ্ছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এই পাশাকে সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে। মোট পঁচান্ন হাজার পর্যবেক্ষকের মধ্যে পাশারই আছে দশ হাজার পাঁচশ ঊনষাট জন—যা মোট দেশি পর্যবেক্ষকের উনিশ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংস্থা কার্ডের আছে মাত্র তিন হাজার পাঁচশ একষট্টি জন।

খরচের বিষয়ে হুমায়ুন বলেছেন, তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে টাকা চেয়েছে। তারা দিলে সেখান থেকে খরচ করা হবে, না হলে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ হবে। মানে দশ হাজার মানুষ সারাদেশে ছড়িয়ে থেকে বিনা পয়সায় কাজ করবে? পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, "কারও প্রশিক্ষণ নেই। তবে দলনেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।" মানে দশ হাজার লোককে মাঠে নামানো হবে, যাদের কেউ জানে না তারা আসলে কী করবে—কিন্তু কয়েকজন দলনেতাকে শেখানো হবে।

এবার আসি এই সময়ের পপুলার ধারাবাহিক সিরিজ "ব্যাচেলর পয়েন্ট"-এর পাশার কথায়।"পাশা কাশেমপুর বাশা আইইইইইই !"মারজুক রাসেলের অভিনয় করা এই চরিত্রটা বাংলাদেশের জেন-জেডের কাছে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে তারা সকাল বিকাল এই ডায়লগ বলে। পাশা একটা মজার চরিত্র, যে কাশেমপুর কারাগার থেকে এসে কাবিলার বাসায় থাকে এবং নানা রকম হাস্যকর কাণ্ডকারখানা করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, টিভির পাশা আর বাস্তবের "পাশা" এনজিও—দুটোরই একটা মিল আছে। দুটোই এমন কিছু যেটা থাকার কথা না, কিন্তু আছে। এবং শুধু আছেই না, বরং বেশ ভালোভাবেই আছে।

রাজনীতিতেও পাশা খেলা আছে। জামায়াতের নির্বাচনী গান বের হয়েছে: " দেখে দেখে কেটে গেলো বেলা, বদলে যাচ্ছে দেখো খেলা।" আর সেই গানের একটা ফেমাস লাইন: "কার পাশা গেছে কার টেবিলে, খেলা যে চলছে কোন লেভেলে।" এই লাইন শুনলেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি আসলে একটা বিশাল পাশা খেলা। কে কার পাশা নিয়ে খেলছে, সেটাই আসল প্রশ্ন। আর এই খেলা চলছে এমন লেভেলে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই।

বাংলাদেশে পাশা মানে শুধু খেলা নয়। পাশা মানে একটা দর্শন, একটা জীবনযাত্রা, একটা ব্যবস্থা। রাধা-কৃষ্ণ যে পাশা খেলতে চেয়েছিলেন, সেটা ছিল প্রেমের পাশা। আর আমরা এখন খেলছি নির্বাচনের পাশা, এনজিওর পাশা, রাজনীতির পাশা। এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই সব পাশা খেলায় জেতা-হারার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আছে শুধু খেলা চালিয়ে যাওয়া। পাশা যেভাবেই পড়ুক, খেলা তো চলবেই। এটাই বাংলাদেশ। এটাই আমাদের পাশা খেলা।

সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:৫১
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০


এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এবং শরিয়া আইন হলো সকল পক্ষের সম্মতি বিশিষ্ট ইসলামী হুকুমতের আইন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১৯



সূরাঃ ৬ আনআম, ১১৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১৬। যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরন করে:... ...বাকিটুকু পড়ুন

'বাবু': একটি শব্দের উদ্ভব ও এগিয়ে চলা

লিখেছেন আবু সিদ, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০৮

'বাবু' আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। কয়েক শ' বছর আগেও শব্দটি ছিল। বাংলা ভাষাভাষীরা সেটা ব্যবহারও করতেন; তবে তা ভিন্ন অর্থে। 'বাবু' শব্দের উৎপত্তি ও বিবর্তনের ধাপগুলো এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:৫৮


আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×