প্রিয় শুভ্র,
লিখবো কি লিখবোনা ভাবতে ভাবতে অবশেষে লিখেই ফেললাম। তোমার হাতে পড়বে কিনা বা পড়লেও পড়ার সময় হবে কিনা আমি জানিনা। কিন্তু কথাগুলো বলতে না পেরে বোবা কান্না'য় দুমড়ে মুষড়ে যাচ্ছিলাম আমি। পড় বা নাইবা পড় সেটা'র দায় তোমার'ই। আমি আজ বলতে না পারলে হয়ত আর কখনই পারবোনা ।
সেদিনটা'র কথা মনে আছে তোমার শুভ্র ?যেদিন কাশফুলের রঙ মেখে মেখে আমাদের ভালবাসা'র শুভ্রতা ছড়িয়ে দিয়েছিলে অসীম দিগন্তে। এক ঝাঁক দুরন্ত বক হেসে হেসে স্বাগত জানিয়েছিল। তোমার বুকে মাথা রেখে শরৎ এর মাতাল জোছনায় কি অস্থিরভাবে শিহরিত হয়েছিলাম আমি, আর তুমি নির্ভরতা'র আলিঙ্গনে ফিস ফিস করে আমায় বলেছিলে ''এভাবেই নির্লিপ্ত হয়ে মিশে থাক সুলোচনা।''
তুমি আমার নাম দিয়েছিলে সুলোচনা। আমার চোখের গভীরে নাকি তুমি প্রশান্তির নদী খুঁজে পাও-শীতল হও সেই সুখের নোনাজলে। কত গোধূলি কেটে গেছে আমার, তোমার বিমুগ্ধ বাক্যবাণে। হিজল বনের পাশ দিয়ে ঘেঁষে যাওয়া সেই বিলাসী নদীটার কথা তোমার মনে আছে? কত সবুজ স্বপ্নের মালা গেঁথে গেঁথে ভাসিয়ে দিতাম উদ্বেলিত স্রোতে। তুমি বলতে ''এ্যাই মেয়ে তোমার আঁচলটা ভাসাওতো দেখি !জোনাকগুলো দিয়ে তোমার শাড়ির আঁচলের কারুকাজ করি।''আমি বলতাম ঠিক আছে।তুমি তখন জোনাকগুলো ধরে ধরে আমার আঁচলের নীচে গেঁথে দিতে। কি অদ্ভূত আলো ছড়াতো ওরা তাইনা ?
আজ এসব শুধুই রঙচটা স্মৃতি'র কাফনে মোড়ানো দুঃস্বপ্ন। আজ শরৎ এর চাঁদের রূপে আকৃষ্ট হয়না বিদগ্ধ মন ,জোনাক পোকাগুলো হাহাকার করে আমাদের খোঁজে ,কাশফুলের পাপড়িগুলো খসে খসে পড়ে অনাদরে। বিলাসী নদী কেমন যেন মিইয়ে গেছে সুতীব্র অভিমানে। আকাশসম দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার ,সমুদ্রসম ক্ষোভ আর কষ্টের নোনাজল মেখে মেখে আমি যেন নিজেই নিজের কাছে ম্রিয়মান হয়ে গেছি ।
তোমার মনে আছে যেদিন তোমাকে এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে গেলাম সেদিন তুমি বলেছিলে এইতো কটা দিন ,আমি তোমাকে শীঘ্রই নিয়ে আসব।কিন্তু সেই যে গেলে- বছর পর বছর গেলো ,না তুমি এলে,না আমি গেলাম।
মা নাকি বলেছে, ''ছেলের বৌ কিন্তু কয়েক বছর তার কাছেই থাকবে।''কিন্তু কখনও তুমি আমাকে ভুল করেও একথা বলনি ।ঠিক আছে আমি মেনে নিলাম। আমার বাবা ঐশ্বর্য দিয়ে তোমার ঘর ভরে দিতে পারেনি সেজন্য আমাকে তিলে তিলে কথা'র আগুনে পুড়তে হয়। ঠিক আছে তাও মেনে নিলাম।
তোমার একটাই কথা ,তোমার পরিবার নিয়ে কোন অভিযোগ আমার কাছ থেকে শুনতে চাও না। তাও মেনে নিলাম ,আমি আজ পর্যন্ত তোমাকে কিছু বলিনি। আমার মাষ্টার্স পরীক্ষাটাও তোমারা দিতে দিলে না। আমি জানিনা আমার অপূর্ণতা কোথায় ছিল!
এত কিছু মেনে নেবার পরও আমার আকাশ আজ মেদুর মেঘে ঢেকে যাচ্ছে কেন শুভ্র? তুমি তোমার পরিবারের সকল হাঁ'তে হাঁ করে যাচ্ছ। আমার চরিত্রে কি ঘটা করে কলংক লেপন করে যাচ্ছে আর তুমি কি নির্লিপ্ত! তুমি কি একবারও সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন মনে করলেনা? তুমি কি আমাকে তবে ভালইবাসনি? আমদের একটা স্বপ্নের মতো ভালবাসার জগৎ ছিল,বিশ্বাস ছিল,শ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু আজ এসব কোথায় গেলো? তুমি সময়ের স্রোতে কেন বদলে গেলে শুভ্র?
শুনলাম তোমার জন্য আবার পাত্রী দেখা হচ্ছে। তুমি সম্মতি দিয়েছো। আজ আমি তোমাকে ছাড়লাম ,তোমার ঘরও ছাড়লাম। বিশ্বাসের ভিত যেখানে নড়বড় ,যেখানে নারীসত্ত্বাকে অন্ধ আবেগে গিলে ফেলা হয় ,যেখানে স্বার্থের কালো থাবা ওত পেতে থাকে শিকারের লোভে সেখানে আর যাই হোক সংসার হয় না। আমি নিজেই হয়ত তোমাকে চিনতে ভুল করেছি! কোথায় যাব জানিনা!
ঠিকানা কি ছিল কোন কালে না আদৌ আছে ?
সোনার অঙ্গে গাদ পড়েছে
টিপ টিপ বুকের পাঁজর জেলারে'র দাপটে
জঞ্জাল আসলেই জঞ্জাল
এমন গুঞ্জরন বাতাসে ভাসে সেই অব্দি থেকে
মাঝে মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করি অপচ্ছায়া রূপে -----------।
ভাল থেকো এই কথাটা বলতে পারলামনা বলে দুঃখিত।
''সুলোচনা''
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মে, ২০১৪ রাত ১০:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



