গণজাগরণের নাম এখন শাহবাগ। প্রতিবাদের নাম শাহবাগ। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি জানানোর স্থান শাহবাগ। তারুণ্যের শপথ নেওয়ার জায়গা শাহবাগ। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের নাম এখন শাহবাগ।
মূলত তরুণেরাই এখানে চেতনার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন। তবে কে নেই এই শাহবাগে? মায়ের কোলে চড়ে এসেছে সন্তান, বাবার কাঁধে চড়ে শিশুপুত্র। এসেছেন ছাত্র-শিক্ষক-রাজনীতিবিদ-মুক্তিযোদ্ধা-সাংস্কৃতিক কর্মী। এসেছেন নারী-পুরুষ-তরুণ-তরুণী-শিশু-কিশোর সবাই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে গত মঙ্গলবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দাবি করে মঙ্গলবার বিকেলেই শাহবাগে জড়ো হতে থাকেন বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য ও ব্লগাররা। এরপর বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়, রাত নামে, রাত পেরিয়ে ভোর হয়, পরদিন সকাল আসে, ভোরের রোদ দুপুরে হয়ে ওঠে প্রখর, তবু ভিড় কমে না শাহবাগে।
শাহবাগের এই আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রংপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে একইভাবে আন্দোলন চলছে।
সারা দেশের মানুষের এখন একটাই দাবি—কাদের মোল্লার ফাঁসি। সারা দেশে সমবেত জনতার এখন একটাই দাবি—সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি আদায়ে তাঁরা এই আন্দোলন অব্যাহত রাখবেন।
প্রতিবাদের রাত: রায় প্রত্যাখ্যান করে মঙ্গলবার বিকেলেই শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভ শুরু করেছিল ব্লগার ও ফেসবুক অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সর্বস্তরের মানুষ তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সন্ধ্যায় প্রজ্বালিত মোমবাতি ও মশালের আলোয় শাহবাগে সৃষ্টি হয় প্রতিবাদী আবহ। বিক্ষোভকারীরা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি করে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেন। এর মাঝেই ছিল প্রতিবাদী গান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।
রাত একটার দিকে ওইদিনের মতো কর্মসূচি শেষ করে বুধবার সকাল সাতটায় আবার শাহবাগে জড়ো হওয়ার ঘোষণা দেন উদ্যোক্তারা। তবে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সাধারণ মানুষ এই সময় জানান, তাঁরা সারা রাত এখানেই থাকবেন। রাতেই কাদের মোল্লার প্রতীকী ফাঁসি দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এরপর আরও কয়েক দফায় তাঁকে প্রতীকী ফাঁসি দেওয়া হয়। এ সময় তরুণ-তরুণীরা গান প্রতিবাদী গান।
রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে অনেক ছাত্র পেপার-কম্বল নিয়ে জড়ো হন শাহবাগে। দুটি বড় পর্দায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে রাতভর চলে প্রতিবাদী গান।
মুক্তির গান চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী দেখে উদ্বুদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহমুদ হাসান রাত দুইটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেবল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আশায় আমরা এই সরকারকে ভোট দিয়েছিলাম। আমরা চাই যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি।’ মিরপুর থেকে আসা গৃহিণী শারমিন জাহান বলেন, ‘একজন ধর্ষক, একজন খুনির যদি মৃত্যুদণ্ড না হয়, তাহলে এই দেশে মৃত্যুদণ্ড আছে কার জন্য?’ শাহবাগে হাজির হয়েছিলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী নাফিসা শামসুদ্দিন। তিনি বলেন, অকুপাই লন্ডন নামে তাঁরা আট মাস রাস্তায় ক্যাম্প করেছিলেন। বাংলাদেশেও এভাবে আন্দোলন চালানো উচিত।
রাতে বিক্ষোভ সমাবেশ চলাকালেই উপস্থিত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাধ্যমতো কিছু টাকা তোলেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। রাতে সেই টাকায় খাবার কিনে এনে উপস্থিত সবাইকে খাবার দেওয়া হয়। রাত গভীর হয়, তবু শেষ হয় না স্লোগান, থামে না প্রতিবাদী গান।
অন্য রকম এক সকাল: রাতভর শাহবাগে ছিলেন কয়েক শ মানুষ। বুধবার সকালের আলো ফোটার পর সেখানে যোগ দিতে থাকেন হাজারো মানুষ। হরতালের মধ্যে কেউ হেঁটে, কেউ বা রিকশায় চড়ে এসেছেন সেখানে। সকাল নয়টার আগেই তিন থেকে চার হাজার লোক জড়ো হন শাহবাগে। এরপর বিভিন্ন সংগঠন ও নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ দলে দলে শাহবাগের জমায়েতে যোগ দিয়ে সমবেত কণ্ঠে স্লোগান তোলেন: ‘যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই’। সব মিলিয়ে অন্য রকম এক সকাল দেখল বাংলাদেশ।
সকাল পেরিয়ে বেশ তীব্র দুপুরের রোদ। ঘামছেন অনেকেই, তবু পথ ছাড়ছেন না। বরং আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন নতুন নতুন লোক। রোদের মধ্যেই গলায়, কবজিতে লাল-সবুজ পতাকা বেঁধে কাদের মোল্লার ফাঁসির স্লোগান উঠছে সমাবেশ থেকে। প্ল্যাকার্ড বুকে ঝুলিয়ে ফাঁসির দাবিও করছেন অনেকে।
দুপুরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ফকির আলমগীর শুরু করেন দেশাত্মবোধক গান। ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ এসব গান গেয়ে সমবেত জনতাকে উজ্জীবিত করেন তিনি। সমাবেশে এসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি আক্কু চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবি আরও জোরদার করতে হবে। এটি আমাদের জন্য আরেকটি যুদ্ধ।’
আন্দোলনে যোগ দেন একাত্তরে মামা গেরিলা বাহিনীর প্রধান শহীদুল হক মামা। তিনি বলেন, ‘কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় না দেওয়া এ দেশের মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করার মতো। আমরা এ রায় মানি না।’ মুক্তিযোদ্ধা সেকান্দার খান বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের কাছে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের একটি আবেদন, যত দিন পর্যন্ত রায়ের পুনর্বিবেচনা না হবে, তত দিন ঘরে যাওয়া যাবে না।’
সকাল থেকেই শাহবাগ থেকে টিএসসি পর্যন্ত প্রতিবাদী চিত্রে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিকৃত প্রতিমূর্তি তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থীরা। মোড়ে মোড়ে তৈরি হয়েছে প্রতীকী ফাঁসির মঞ্চ। শাহবাগ থেকে টিএসসি পর্যন্ত আঁকা হয়েছে প্রতিবাদী চিত্র।
এ ছাড়া ‘কাদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’, ‘মৃত্যু বুঝি না, যুদ্ধ বুঝি’, ‘কসাই কাদেরের ফাঁসি চাই’, ‘এই জানোয়ারদের ফাঁসির কোনো বিকল্প নাই’, ‘জামায়াত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’সহ নানা স্লোগান লেখা হয়েছে রাজপথে বিছিয়ে দেওয়া ব্যানারে।
সংহতি: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, নাট্য ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, সাংসদ ইসরাফিল আলম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম কুদ্দুছ, সাংবাদিক ও কলাম লেখক আবেদ খানসহ আরও অনেকে শাহবাগে এসে ফাঁসির দাবির সঙ্গে সংহতি জানান।
সাবেক সেনাপ্রধান ও সেক্টর কমান্ডার ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান কে এম শফিউল্লাহ বলেন, ‘এখানে আমি হতাশা ব্যক্ত করতে এসেছি। আমি জানতে চাই, এত খুন করার পরও যদি কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন হয়, তাহলে কত খুনের বদলে মৃত্যুদণ্ড হবে?’
সাংসদ রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘প্রত্যেক যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত না করা পর্যন্ত রাজপথে থাকতে হবে।’
তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘আমাদের দায় আপনাদের হাতে সমর্পণ করলাম। আপনারা এগিয়ে চলুন। মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ফিরিয়ে আনুন।’
শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী বলেন, ‘আপনারা এই আন্দোলন চালিয়ে যান। শাহবাগকে নাম দিন নতুন প্রজন্ম চত্বর।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলার মানুষ এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে।’
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘যে ৩৪৪ জনকে হত্যার ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে, তাতে কীভাবে মৃত্যুদণ্ড না হয়ে যাবজ্জীবন হতে পারে? একাত্তরের কসাইয়ের বিচারের রায় যদি এটা হয়, তাহলে অন্যদের বিচারের রায় কী হতে পারে, তা নিয়ে জনগণ আজ শঙ্কিত।’
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবাহান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড চাই।’
নারীনেত্রী শিরীন আক্তার বলেন, ‘এই বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।’
এ ছাড়া পঙ্কজ ভট্টাচার্য, অজয় রায়, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, মাহফুজা খানম, চলচ্চিত্রনির্মাতা মানজারে হাসিন, সাংসদ নুরুল ইসলাম, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক, কবি ম সামাদ, সাংসদ উবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী, সাংবাদিক গোলাম সারওয়ারসহ দেশের প্রগতিশীল প্রায় সব লোকই হাজির হয়েছেন শাহবাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় শ শিক্ষকও যোগ দিয়েছেন এই আন্দোলনে।
রাতে এসেছিলেন সংসদের উপনেতা সাজেদা চৌধুরী। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এসেছেন উল্লেখ করে সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’ মুহুর্মুহু স্লোগানে তাঁর বক্তৃতা চাপা পড়ে যায়।
নেই কেবল বিএনপি-ছাত্রদল: আদর্শিক মতভেদ ভুলে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে এককাট্টা হয়েছে প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্রসংগঠন। একমাত্র সেখানে নেই বিএনপি-ছাত্রদল।
ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন, কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের রায় তাঁরাও মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরাও যেতে চাইছেন এই সমাবেশে। কিন্তু দলীয় অবস্থানের কারণে তাঁরা অসহায়।
ফেসবুক-ব্লগেও শাহবাগ: শাহবাগের এই আন্দোলন ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক, ব্লগসহ অনলাইনের মাধ্যমে। গতকাল ফেসবুক আর ব্লগজুড়ে শাহবাগ নিয়েই ছিল হাজারো ‘স্ট্যাটাস’।
সন্ধ্যায় জনতার ঢল: গতকাল সারা দিন শাহবাগে মানুষ থাকলেও বিকেল থেকে জনস্রোত বাড়তে থাকে। সন্ধ্যায় চারুকলা থেকে একটি মশাল মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা। আয়োজকেরা জানান, সব যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে আবার গণসমাবেশ হবে।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে শাহবাগের চারপাশ থেকে টিএসসি পর্যন্ত ২০-২৫ হাজার জনতা একত্র হয়।
এ সময় মাইকের এক পাশ থেকে বলা হয়, ‘ক তে কাদের মোল্লা’। সমস্বরে হাজারো জনতা চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। আবার মাইকে বলা হয়, ‘ক তে কামারুজ্জামান’। সমস্বরে উত্তর, ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। তেমনিভাবে ‘গ তে গোলাম আযম’। সমস্বরে উত্তর, ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। ‘স তে সাকা’। সমস্বরে উত্তর, ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। ‘ম তে মুজাহিদ’। সমস্বরে উত্তর, ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’। ‘ন তে নিজামী’। সমস্বরে উত্তর, ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার’।
সূত্র: প্রথম আলো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


