আজকের দিনটা থেমে গেলে বেশ হত;এ রকম অনুভূতি আজ থেকে বিশ বছর আগে আমার মাঝে অনুভূত হয়েছিল।যদিও সেদিনটার ঘটনা ছিল ভিন্ন;তবুও সেই ঘটনা মনে পড়লে এখনো মনের মাঝে কষ্ট বোধ করি। মিথ্যা কেসে ফাঁসিয়ে ছিল আমার খুব কাছের একজন মানুষ।সেদিনটার মত আজ আবার আমার মনে হয়েছিল -আজকের দিনটা থেমে গেলে বেশ ভালো হত!সেই একই অনুভূতি যেন একই রূপে ফিরে এল।অথচ মানুষ তো একই রকম করে একই অনুভূতি দ্বিতীয়বার গ্রহণ করতে পারে না,আজ কেন ভিন্নতা সে কথা বোধগম্য নয়।
এই আমি ;যে আসনে আসীন আছি সেখানে দয়া,মায়া, মমতা সমস্ত কিছুর উর্দ্ধে রেখে পথ চলতে হয়।আবেগের কোন মূল্য এখানে নেই।এখানে বিবেককে কাজে লাগিয়ে আইনের আশ্রয়ে বিচার কার্য সম্পন্ন করতে হয়।ছোট বেলা থেকে বাড়ির ছোট ছোট খাবার থেকে শুরু করে যেকোন জিনিসের ভাগের দায়িত্ব আমার উপর এসে পড়ত।মা বলতেন তার ছেলে বেশ ন্যায় বিচারক। নিজের অংশটুকু কম পড়লেও কারো কোন কিছুতে ফাঁকি দেয় না।মায়ের সেই কথাটি প্রাণে আমার সকল সময়ে বাজে। মাঝে মাঝে ভাবি ঠিক কতটুকু অন্যায়ের শাস্তি প্রদান করা হলে অন্যায়কারীর সাথে কোন জুলুম করা হবে না।পৃথিবীতে যদিও অন্যায়ের বিভিন্ন রকম শাস্তির বিধান আছে তবুও সব অন্যায়ের শুদ্ধতম শাস্তি প্রদান করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।অন্যায়ের কোন পরিমাপক নেই অথচ আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনা দিয়ে অন্যায়ের শাস্তির বিধান করে থাকি।একটু ভালো থাকার আশায় এই কঠোরতার বিধান,অথচ সেই একটু ভালো আদৌ কি থাকতে পারছি!
ঘড়িতে প্রায় এগারো টা ছুঁইছুঁই দু'মিনিট বাকি আছে।বেশ বড় সড় দুটো টিকটিকি ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে যেন।
ঘরভর্তি লোক সমাগম,সবাই গভীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছে আজকের এই বিচারে কী রায় হতে চলেছে।যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা একই সাথে কষ্টের ও সাহসিকতার দাবীদার।মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন মানুষ যারপরনাই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে;জীবনের বাকি সব কিছুই সেখানে তুচ্ছ।
আমার ভীষণ গরম লাগছে।বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে নাকের কাছটাতে।পাশে ঢেকে রাখা গ্লাসের পানিটুকু ঢকঢক শব্দে তিন শ্বাসে খেয়ে নিলাম;আর সেই সাথে দেখে নিলাম এই মামলায় অভিযুক্ত মেয়েটির দিকে। মেয়েটি নির্লিপ্ত চোখে সামনের দিকে চেয়ে আছে,তার ভেতরে কোন অপরাধ বোধ নেই।উজ্বল শ্যাম বর্ণ মেয়েটি,মিষ্টি একটা মেয়ে।মায়াবী চোখ,গোলগাল চেহারা।বাসা থেকে বের হলাম যখন তখন বেশ উচ্চ বাচ্য করেই বের হয়েছিলাম।মেয়েটি বান্ধবীদের সাথে দূরে কোথায় যেন ঘুরতে যাবে, যেটা আমার মোটেও পছন্দ নয়।
এই মেয়েটিকে দেখে আমার নিজের মেয়ের কথা মনে আসল,মনে হল আমার মেয়েও যদি এই একই অপরাধ করত তবে আমি কী শাস্তি দিতাম? আমি আবেগে পড়ে কোন মামলার রায় কখনোই ঘোষণা করিনি ;কারণ আমি জানি আমার রায়ের উপর মানুষের জীবন কিভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।আমার যেকোন ভুল সিদ্ধান্ত একজন ভালো মানুষের জীবন মুহুর্তেই তছনছ করে দিতে পারে!প্রতিটি রায় ঘোষণাদেবার আগে আমি যথাসম্ভব দু'রাকাত নফল নামায পড়ে মহান আল্লাহ্র কাছে সাহায্য চেয়ে থাকি। কারণ আমি মানি তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক,তার জমিনে আমি শুধুই প্রতিনিধিত্বকারী।প্রতিবার নামায পড়ে প্রার্থনার পর আমার মন যে সিদ্ধান্ত দেয়,আমি সেই সিদ্ধান্তে অনড় থাকি এবং আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিই।
আসামী মেয়েটির নাম মৌনতা,কলেজে পড়ে।প্রচন্ড প্রতিবাদী মেয়ে।তার কলেজে যেতে হলে প্রতিদিন বাসে করে আসা যাওয়া করতে হয়। কোন কোন দিন ফিরতে দেরি হয়ে যায়।মৌনতার ব্যাগ ভর্তি থাকে সেফটিপিন, প্রতিদিন দুষ্টু লোকগুলো যারা মেয়েদের শরীরে হাত দেয়,সে রকম অশোভন আচরণ মৌনতার সাথে কেউ করলে সে তাদের হাতে সেফটিপিন ফুটিয়ে দেয় ।আর এরপর বাস থেকে নামার আগে সে ফেলে দেয় অপারেশনকৃত সেই সেফটিপিন।দিন এইভাবে যেতে থাকে;সময়ের সাথে সাথে দেশের অবস্থা বদলেছে।বিভিন্ন মিডিয়ায় চোখ রাখলে দেখা যায় নারীরা কিভাবে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।মৌনতার ভাষ্যমতে সে তার ভাবনা বদলায়।পরবর্তীতে সে নিজের সেফটির জন্য সেফটিপিনের পাশাপাশি ব্যাগের মধ্যে কাপড় মুড়িয়ে রাখে ধারালো চিকন ছুরি।
ঘটনা যেদিন ঘটে সেদিন সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছিল।রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি কম।সমস্ত বাস জুড়ে একে একে যারা ছিলেন প্রত্যেকে নেমে যায় গন্তব্যে।এরপর হেলপার উচ্চস্বরে ওস্তাদ বলে চিৎকার করে এবং হাসে।সেই হাসি মৌনতার ভালোলাগে না। আর কেউ না থাকায় মৌনতা মনের ভেতর সাহস সঞ্চয় করে। কিছু সময় পর মৌনতা খেয়াল করে বাসের গতি পূর্বের চেয়ে ধীর হয়ে গেছে;এবং হেলপার তার দিকেই এগিয়ে আসছে। লোকটা এসে মৌনতার পাশের সিটে বসে।তার পরই অশোভন আচরণ করতে গেলে কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাসের হেলপারের হৃদপিন্ড বরাবর ছুরি বসিয়ে দেয়।হেলপারের বিকট আত্মচিৎকারে সহোযোগী বাস ড্রাইভার বাস থামিয়ে পালায়। বাসে নিথর লাশ ফেলে মৌনতা পুলিশের কাছে নিজেই স্বীকারোক্তি জানায় যে সে বাসের হেলপারের খুন করেছে।
সমস্ত ঘটনা গল্পের মত;মৌনতা হয়ত জানে না বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১০০ ধারার কথা।ধারা অনুযায়ী যদি কাউকে খুন করা হয় তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না;তবে এ ধারাটি তখনই প্রয়োগ করা যাবে যখন:
১) যদি কোন লোক আপনার উপর এমন আঘাত করতে উদ্যত হয় যার ফলে ন্যায় সঙ্গতভাবেই আপনার এরূপ আশংকার সৃষ্টি হয় যে, আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করে সে আঘাতকে প্রতিহত না করলে আপনার মৃত্যু অনিবার্য।
২) যদি কোন লোক আপনাকে এমন আঘাত বা আক্রমণ করে যার ফলে ন্যায় সঙ্গতভাবেই এরূপ আশংকার সৃষ্টি হয় যে, সে আঘাত বা আক্রমণের ফলে আপনার গুরুতর আহত হওয়া অনিবার্য।
৩) আপনি যদি নারী হন এবং আপনাকে যদি কেউ ধর্ষণ করতে আসে। (অর্থাৎ নারী ধর্ষণে উদ্ধত লোকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারেন।)
৪) যদি কেউ কোন অস্বাভাবিক কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে আঘাত বা হামলা করে।
৫) যদি কোন লোক কোন শিশু বা নারীকে অপহরণের উদ্দেশ্যে আঘাত বা হামলা করে।
৬) যদি আপনাকে কেউ বেআইনীভাবে আটক করতে উদ্যত হয় এমন পরিস্থিতিতে আপনার ন্যায়সঙ্গতভাবে আশংকা হয় যে, আপনি আটক হলে সরাসরি কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে আপনি আর উদ্ধার হতে পারবেন না, তখন আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা যাবে।
এদেশের মানুষ আইনের প্রতি এখনও শ্রদ্ধাশীল ;তবে আইন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের যথেষ্ট অভাব।আইন শুধু না জানার কারণে কত ভাবে মানুষকে হেনস্থা হতে হয়।সমস্ত সাক্ষ্য, তথ্য, ও উপযুক্ত প্রমাণাদির সাপেক্ষে এই আদালতে এটাই প্রমাণিত হয় যে মামলার আসামি মৌনতা আত্মরক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন।যা কিছু তিনি করেছেন পরিস্থিতির চাপে করতে বাধ্য হয়েছেন।আজকের এই আসামি একজন মানুষকে হত্যা করা সত্ত্বেও তিনি নির্দোষ। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে,ধর্ষণের মত অপরাধ থেকে দেশের যুব সমাজকে সতর্ক হবার জন্য আজকের এই রায় ইতিহাস হয়ে থাকবে।
এই আদালত আসামী মৌনতাকে সম্মানের সাথে বেকসুর খালাসের নির্দেশ প্রদান করল এবং একই সাথে দেশের নারী সমাজের প্রতি এই আহবান জানাল তারা যেন আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার পাশাপাশি;নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য সকল প্রকার কৌশল শিখে নেয়।আজকের আদলতের এখানেই সমাপ্তি।অর্ডার!অর্ডার!অর্ডার।
রুবাইদা গুলশান
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০১৭ রাত ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



