
আম্মা সরকারী চাকরীজীবি হওয়ায় বাসায় সব কাজে হেল্প করবার জন্য লোক থাকতো। তাদের মূলত আপা, ফুফু এবং খালা ডাকা হয়েছে। পাশের বাড়িতেই কাজে সাহায্য করবার লোককে বুয়া বলে ডাকতে শুনেছি; কিন্তু আব্বা-আম্মার কড়া নির্দেশ ছিলো তাদের যেন আয়া-বুয়া না ডাকা হয়।
এই আপা-ফুফু-খালারা সাধারণত আমাদের সাথেই একই সাথে খেতে বসতেন।
আম্মা মাঝে মধ্যে রান্না করতে গেলে আমার মেজাজ খারাপ হতো, কষ্ট লাগতো। গরমের মধ্যে আগুনের কাছে তিনি যাচ্ছেন এটা আমি সহ্য করতে পারতাম না। ফলশ্রুতিতে আমারও কখনও রান্নার দিকে যাওয়া হয়নি।
যখন প্রথমবারের মত ঘর ছাড়ি (আই মিন ঢাকা যাই) তখন আব্বার টেনশন ছিলো উপরের তিনটা বিষয় নিয়েই।
ঢাকায় এসে মেসে উঠেই প্রথমে কাজের খালার সাথে ঠিক করে ফেললাম যে মাসে তাকে একটা টাকা দেওয়া হবে, তিনি সপ্তাহে ২দিন আমার কাপড় কেঁচে দিবেন। একটা টেনশন শেষ।
বাকি দুইটা টেনশন সাধারণত কাজের খালারাই সামাল দেন। তাই আদতে সব টেনশন শেষ।
সমস্যা বাধলো একদিন সকালে, যখন কাজের খালা আসেন নাই। মেসে আমি আর আবির; আর কেউ নাই। আবির আলালের ঘরের দুলাল; সে রেষ্টুরেন্টে যাবে, কিন্তু রান্না করে খাবে না।
আমি ভাত চড়িয়ে দিলাম, তার আগে আব্বার কাছে ফোনে জিজ্ঞাসা করে নিলাম কিভাবে ভাত ও ডাল রান্না করতে হয়। আমার আব্বা আমার দেখা সেরা রাধূনী। তবে সে সাধারণত রান্নাবাড়া করে না; সবাইকে সাজেশন দেয় কিভাবে রান্না করতে হবে।
এবার পালা ডাল রান্না করবার। ইউটিউব তখন দেশীয় কন্টেন্টক্রিয়েটরদের কাছে একটু একটু করে জনপ্রিয় হচ্ছে। সেখানে সার্চ দিতেই একজন ভদ্রমহিলার টিউটোরিয়াল পেলাম। দেখি ৩০ মিনিটের ভিডিও! আমি ভিডিও ছেড়ে গেলাম আব্বার কথা মত ডাল রান্না করতে। যত সময়ে ডাল রান্না শেষ হয়েছে, তত সময়ে আবির ঐ ডালের ভিডিও দেখা শেষ করে অন্য কি একটা রান্নার ভিডিও দেখছে।
---------------------------------
বিদেশের মাটিতে পা দেওয়ার আগে মাথায় ছিলো যে আমাকে কাপড় ধুইতে হবে। রান্না-বাড়া ততদিনে আয়ত্ব করে ফেলেছি; এবং আমার আব্বার পরে আমি দ্বিতীয় সেরা রাধূনী! সমস্যা আরও একটা, থালা-বাসনও ধুইতে হবে।
----------------------------------
বিদেশে এসে আবিস্কার করলাম এখানে সবাই ওয়াশিং ম্যাশিন ব্যবহার করে। রিয়াদে এসে যে বাসায় উঠলাম, তার মালিক আমাকে একটা পুরাতন ওয়াশিং ম্যাশিন গিফট করলেন!
এরপর থেকে শুরু; নিয়ম করে প্রতি মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার আমি কাপড় ধুই। কাপড় ধোয়ার পরে শুকিয়ে কাপড় স্ত্রি করি। এবং এটা আমি মোটামুটি উপোভোগ করি।
কিছু দিনের মধ্যে বউ-বাচ্চা সব আমার কাছে চলে আসলো। প্রথম এক মাস বউ সব কিছুর দ্বায়িত্ব নিলো। একমাস পরে বুঝলাম তাকে দিয়ে বাকি দুইটা হলেও কাপড় ধোয়া হবে না।
এখন আমিই আবার কাপড় ধুয়ে দেই। সবারটা।
------------------------------------
মূলত কাপড় ধোয়া বিষয় না। আসল বিষয় হচ্ছে শৃঙ্খলা। কাপড় ধোয়া আমাকে একটা জিনিষে শৃঙ্খল করেছে; সেটা হচ্ছে বাইরে বের হওয়ার জন্য সব সময়ই কাপড়চোপড় রেডি থাকা।
আগে আমি হাতের কাছে যা পেতাম সেটা পরে বেরিয়ে যেতাম। ফলস্বরূপ প্রায়সই ময়লা বা স্ত্রি না করা জামা-কাপড় পরে বাইরে চলে যেতাম। নিজের জন্য যেমন বিব্রতকর হতো, অন্যের জন্য তেমন বিরক্তিকর হতো।
------------------------------------
অফিসের কাজে প্রায়ই বিভিন্ন শহরে যাওয়া লাগে। আমার লাগেজ খুব পরিপাটি করে গোছানোর অভ্যাস হয়েছে। ৫-১০ মিনিটে আমি ১০-১৫ দিনের জন্য প্যাকিং করতে পারি। লাগেজের ওয়েট বেশী কি কম হলো সেটা চিন্তা করা লাগে না; আমি জানি এলাউয়েন্সের থেকে কমই হবে।
অফিসে গত ৩ বছরে একবারও কাপড় নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় নি।
-------------------------------------
গত বছরের একদম শুরুতে দেশে গিয়েছিলাম। মেসের এক ছেলের সাথে দেখা। আমি যে আগের থেকে গোছালো হয়েছি এই মন্তব্যটা পেয়ে ভালো লেগেছে যে জীবনে অন্তত একটা বড় পরিবর্তন আনতে পেরেছি, যা আসলেই নোটিশেবল!
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



