somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই "কম্পিটিটিভ" লেখা পড়ায় আপনার ছেলে পিছিয়ে!

০৮ ই জুন, ২০২৪ দুপুর ২:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লেখাপড়া নিয়ে সাধারণ মানুষের থেকে আমার ভিউটা বেশ ভিন্ন। আমি আমার সন্তানদের উপরে লেখা পড়া নিয়ে হুদাই চাপ তৈরী করতে নারাজ।



২০২২ এ আমার ছেলেকে স্কুলে নিয়ে গেলাম। তাকে কেজিতে ভর্তি নিবে না। বলে ও এখনও সেন্টেন্স লিখতে পারে না! কেজিতে যেখানে অ-আ-ক-খ, A-B-C-D পড়তে পারার কথা না, সেখানে তার সেন্টেন্স লিখতে না পারার বিষয়ে বলায় বেজায় চটেছিলাম। জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে অ-আ-ক-খ, A-B-C-D কে পড়াবে? তাদের মুখের হাসি যদি দেখতেন, উনারা বললেন যে আমার কাছে টিউশনি করাতে পারেন, আগামী বছর নিশ্চিত ভর্তি হতে পারবে।

এমনিতেই দেশ-বিদেশ করে আমার ছেলে বয়সের তুলনায় এক ক্লাস পিছিয়ে পড়েছে, তার উপর আরও এক ক্লাস পিছিয়ে পড়া ভালো লাগেনি। তাই প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করে এক প্রকার জোর করেই স্কুলে ভর্তি করা হলো।

এক টিচার মাথা নাড়িয়ে বললেন, কাজটা ঠিক হলো না। বিল্ডিং এর ভিত যদি ঠিক না থাকে তাহলে বিল্ডিং দাড়ায় না। আমি বললাম অ-আ-ক-খ, A-B-C-D এর ভিত ভালো না থাকলেও আশাকরি আমার ছেলে লেখাপড়া করতে পারবে।

এরপর প্রায় ৩মাস টিচারেরা আমার পিছে লেগে পড়ে থাকলো। আমি টিচার-প্যারেন্ট মিটিং এ যাই না ইচ্ছা করে। তারা এ নিয়ে নানান অভিযোগ করে। শেষে একবার গেলাম। টিচার কিছু বলার আগে জিজ্ঞাসা করলাম আমার ছেলের প্রোগ্রেস কি? তিনি অবাক, তিনি নাকি আমাকে ডেকেছেন প্রোগ্রেস জানবেন বলে! আমি বললাম, ও স্কুলে আসে পড়ালেখা শিখতে, সো প্রোগ্রেসতো আপনাদের জানার কথা।

উনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন উনি কোন প্রোগ্রেস দেখেন না! আমি সুন্দর করে হেসে দিয়ে বললাম, চাকরী ছেড়ে দেন! বাচ্চাদের পড়ানো আপনার কাজ না। উনি খুব সম্ভবত এই রকম উত্তর কখনও শুনেন নাই। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে থাকলেন, পাশের টেবিল থেকে আর এক টিচারও আমার দিকে রাগ রাগ চোখ করে তাকিয়ে থাকলেন।

উনাদের ব্যাখ্যা করে দিলাম। যখন স্কুলে ভর্তি করেছিলাম, তখন আমার ছেলে স্কুলে আসতে চাইতো না। আর এখন সে আমার আগে রেডি হয়ে বসে থাকে যে স্কুলে যেতে হবে। আগে তাকে পড়তে বসতে বললে খানিক কান্নাকাটি করতো, এখন নিজে নোট বই নিয়ে এসে দেখায় স্কুল থেকে কি কি কাজ দিয়েছে। আমি ক্লিয়ার প্রোগ্রেস দেখছি, তারা প্রোগ্রেস না দেখলে বিশাল বিপদ।

এর পর আর সারা বছর আমি টিচার-প্যারেন্ট মিটিং এ যাই নাই। তারাও আমাকে আর খোঁচায় নাই।

গত বছর গ্রেড১ এ ভর্তি করা হলো, এত্তো গুলান বই। আমিতো মহা বিরক্ত। কিন্তু কিছু করার নাই। বই কিনলাম। কয়েকদিন আগে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো। গতকাল ছিলো পেপার রিভিউ। আমাকে দেখেই টিচার চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে আর এক টিচারকে পাঠালেন। বেচারী আমাকে আগে দেখে নি, খুব সম্ভবত।

পেপার রিভিউতে গিয়েতো আমি আবার টিচারদের ধরলাম। গ্রেড ১ এ গল্পের বই দিয়েছে তিনটা। কিন্তু কোনটারই আর্ধেকও শেষ করতে পারে নি। তাহলে তিনটা বই কেন দিতে হবে? টিচার কোন উত্তর না দিয়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে তাকিয়ে থাকলেন।

আমাকে পাঠানো হলো বড় টিচারের কাছে। তিনি আমার ছেলের বিষয়ে আমাকে বিশাল লেকচার দিতে গিয়ে ধপ করে বোমা ফেলে দিলেন, এই "কম্পিটিটিভ" লেখা পড়ায় আপনার ছেলে পিছিয়ে!

আমি জিজ্ঞাসা করলাম কম্পিটিশনটা কোথায়। উনি প্রশ্ন বুঝতে পারেন নাই। তাই আবার রিপিট করতে হলো। জানতে চাইলাম যে আমার ছেলে কার সাথে কম্পিটিশন করছে যে সে পিছিয়ে? টিচার এইবার প্রথম বুঝতে পারলেন যে কেন আমাকে তার কাছে পাঠানো হয়েছে।

উনি আমাকে জানালেন যে আমার ছেলে হাতের লেখায়, সোশ্যাল সাইন্স এবং সাইন্সে দুর্বল। এমন হলে বিপদ। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আমার ছেলের স্ট্রেন্থ কিসে? বেচারী আবারও বেকায়দায়।

আমার ছেলের সম্পর্কে বলি। ও ওর ইন্টারেষ্টের জিনিষ গুলি বেশ সহজে এডপ্ট করে নিতে পারে। যেমন ওর বয়স এখন ৮, প্রোগ্রামিং শিখছে ইউডেমি থেকে। গত কয়েকদিন আগে দেখলাম নিজে নিজে কিছু ক্যালকুলেশনের স্ক্রিপ্ট তৈরী করেছে। বয়স যোগ বিয়োগ করার একটা স্ক্রিপ্ট তৈরী করেছে। এদিকে কিবোর্ডে দশ আঙ্গুল দিয়ে টাইট করে। টাইপিং স্পিড টুকটাক ভালোই। কিন্তু ওর হাতের লেখার অবস্থা করুন।

বইয়ে শোস্যাল সাইন্সে সে একদমই আগ্রহী না। আর সাইন্সের বইতে বেশ কিছু কঠিন টার্ম আছে, সেগুলি উচ্চারণ করতে বেকায়দায় পড়তে হয় ওকে।

যাই হোক, টিচারের কাছে ফিরে আসি।

আমি টিচারকে আরও প্রশ্ন করলাম যে তিনি আমার বাচ্চার সাথে ইংরেজী ও আরবীতে কথা বলার চেষ্টা করেছেন কি না। তিনি ভ্যাবলার মত তাকিয়ে থাকলেন।

আমার ছেলে ইংরেজী এবং আরবী বেশ এডপ্ট করেছে। সৌদী আরবের সাইনবোর্ড গুলির লেখা খুব সহজেই পড়তে পারে। যারা শুধু কুরআন দেখে পড়তে পারেন, তাদের কাছে বিষয়টা এমন কিছু মনে হবে না। কিন্তু আপনাকে একবার সাইনবোর্ড গুলি দেখতে হবে। কোন জের-জবর-পেশ থাকে না। তার উপরে ফন্ট একএকটার এক এক রকম হয়। যা পড়া আসলেই কষ্টের।

আমার ছেলের আর একটা বিষয় বেশ সমস্যার হচ্ছে ও খুব বেশীই ইন্ট্রোভার্ট। তাকে ধীরে ধীরে এর থেকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। কিন্তু টিচারদের সেই সময় নাই।

আমার ছেলে এখনও সাইকেল চালাতে পারে না। কিন্তু সাঁতার শিখে নিয়েছে। ক্রিকেট খেলতে তার ভালো লাগে না, কিন্তু বাস্কেটবলে তার প্রচন্ড আগ্রহ। তার পড়ে ব্যাথা পাওয়ার ভয় প্রচন্ড হলেও স্কুটি নিয়ে স্ট্যান্টের চেষ্টা করে প্রতি নিয়ত।

কিন্তু যখনই কারও সাথে কথা বলতে যাই (সে হোক টিচার কিংবা বাংলাদেশী কমিউনিটির কেউ), মনে হয় যেন আমার ছেলের মত অথর্ব আর দুনিয়াতে নাই। সবাই প্রচন্ড "কম্পিটিটিভ" হতেই ভালোবাসে।

সবাই কেমন যেন আশা করে বসে থাকে যে তার বাচ্চা পয়দা হতেই জিনিয়াস হয়ে জন্মাক। তাকে সব বিষয়ে পারদর্শী হতে হবে।

Photo by Tim Gouw on Unsplash
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৩:০০
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কল্প-গল্প : প্রমিথিউসের শেষ রাত

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১১



“স্যার, কিছু কয়েন দেন!” মোলায়েম স্বরে বলেই হাত কচলায়।

কয়েনটি যিনি চাইলেন, তিনি একজন ভিক্ষুক। ব্যস্ত শহরের এই চৌরাস্তায় বসে নিয়মিত কয়েন আবদার করাই তার একমাত্র কাজ। মালদার পার্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একালের আওয়ামী লীগের সাথে সে কালের বিএনপির পার্থক্য কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



সে কালের বিএনপি বিভিন্ন সময় আন্দোলনের গল্প শুনাতো। একালের আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় আপা আসার গল্প শুনায়। এর মধ্যে দু’বছর পার হয়েছে আপা আসেননি। সামনে ডিসেম্বরের মহাক্ষণে আপা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শামারুহ মির্জারাও সত্য মেনে নেয় যখন/ যদিও এর কোনো প্রয়োজনিয়তা আমাদের নেই॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


বিএনপি ঘরানার মুখ থেকেও যখন সত্য বেরিয়ে আসে, তখন তা ইতিহাস হয়ে থাকে!

বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কন্যা ড. শামারুহ মির্জার একটি সত্য স্বীকারোক্তি......
“বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ছাড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতাদর্শের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ বড়....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:২৮

মতাদর্শের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থ বড়....

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। আমাদের রেমিট্যান্স অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কান্নার প্রতিধ্বনি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০১ লা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০৬


এই গল্পটি একটি ফিকশন ক্রাইম স্টোরী, বাস্তবের একটি ঘটনার ছায়াবলম্বনে লেখা হয়েছে।

১০ মে, ২০১৮। টেকনাফ।

কাউন্সিলর শামসুল আলমের (৪৮) দোতলা বাড়িটি আজ বেশ আলো ঝলমলে।

বসার ঘরে ছোট মেয়ে সুমাইয়া (১২) গণিতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×