১.
ময়মনসিংহ শহরের নতুন বাজারে সন্ধ্যার আলো ক্রমশ ম্লান হয়ে আসছে। বাজারের চারপাশে একটা জীবন্ত গুঞ্জন, যেন শহরের সকল হৃদস্পন্দন এখানে এসে মিলিত হয়েছে। মাছের দোকান থেকে ভেসে আসছে ঝাঁঝালো গন্ধ, সবজি পট্টি থেকে তাজা সবজির সুবাস, আর ফলের পট্টি থেকে দেশি-বিদেশি মিষ্টি ফলের ঘ্রাণ। কিন্তু রতন কান্তি সূত্রধরের জগতে সবকিছু যেন থমকে আছে। সে বসে আছে তার ছোট্ট দোকানঘরে। দোকান বলতে একটা পাঁচ ফিট বাই পাঁচ ফিটের কাঠের চৌকি। তার সামনে ঝুলছে চামড়া ছাড়ানো একটা আস্ত খাসি। দড়ি দিয়ে দোকানের পাঠাতন থেকে বাঁধা। খাসিটা সকালে জবাই করা হয়েছে। ওজন কেজি বারোর মতো হবে। কিন্তু বিক্রি হয়েছে মাত্র তিন কেজি। বেশি অংশ এখনো ঝুলে আছে। এ যেন রতন কান্তি সূত্রধরের জীবনের অসম্পূর্ণতার গল্প।
পাশের দোকানঘরটি রতনের জ্যাঠাতো ভাইয়ের। সেখানেও একটামাত্র খাসি ঝুলছে। তারা দুজন মিলে এই বাজারে ব্যবসা করে আসছে অনেক বছর। এটা তাদের পারিবারিক ব্যবসার দোকান। ব্রিটিশ আমলে তার ঠাকুরদাদা এই বাজারে প্রথম খাসির মাংসের দোকান শুরু করেছিলেন। তখন থেকেই হিন্দু ব্যবসায়ীদের দখলে ছিল এই বাজারের বেশিরভাগ দোকান। কিন্তু দেশভাগ, স্বাধীনতা যুদ্ধ, সবকিছু পেরিয়ে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। মুসলমান দোকানদারদের সংখ্যা এখন বেশি। তবে রতন ও তার জ্যাঠাতো ভাইয়ের পারিবারিক দোকানটি এখনও টিকে আছে। আগে প্রতিদিন দু-তিনটা খাসি বিক্রি হতো এই দোকানে। ক্রেতাদের লাইন লাগত। এখন মানুষের হাতে টাকা নেই। দাম বেড়েছে সবকিছুর। সবকিছু যেন এলোমেলো। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ভালো না। একটা খাসি বিক্রি করতেই রাত নয়টা-দশটা বেজে যায়।
আজ রতনের মন বিষন্ন। সে ছুরি হাতে নেড়েচেড়ে রাখছে। কিন্তু চোখ ঘুরছে বাজারের চারদিকে। “কতক্ষণ আর এভাবে বসে থাকা যায়?” ভাবছে সে।
নতুন বাজার ময়মনসিংহ শহরের একটা ঐতিহ্যবাহী পুরোনো বাজার। বিকেলবেলা থেকেই মূলত এই নতুন বাজার জমে ওঠে। এই বাজারে উকিল, মুক্তার, সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেশি। অফিস শেষ করে তারা বাসায় ফেরার পথে বাজার করে নিয়ে যায়। এখানে বাছাই করা বড় মাছ, সবজি, মিষ্টি ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই পাওয়া যায়। কিন্তু দাম অন্য বাজারের থেকে তুলনামূলক বেশি।
রতন কান্তির দোকানের সামনে মুরগির দোকান, আনন্দের। সে বসে মোবাইল টিপছে। কোনো ক্রেতা নেই। “আজ বাজার ফাঁকা, দাদা,” বলল আনন্দ। রতন মাথা নাড়ল। কিন্তু মনে মনে বিরক্ত। একটা হৃষ্টপুষ্ট কুকুর এসে বসল তার সামনে। বসেই ঝোলানো খাসির দিকে তাকিয়ে লালা ঝরা জিভ বের করে দিল। কুকুরটা রতনের চেনা। প্রায়ই তার এখানে আসে। কিন্তু আজ রতনের মেজাজ খারাপ। সে ছুরি তুলে বলল, “যা ভাগ এখান থেকে!” কুকুরটা যেন রতনের কথা বুঝল। কোনো শব্দ না করে উঠে ফল পট্টির গলির দিকে চলে গেল। কুকুরটা চলে যাওয়ার পর রতনের বিরক্তি আরও বাড়ল।
রতনের মাংসের দোকানের ঠিক পেছনে কয়েকটা মাছের দোকান। সেখানেও দেশি বড় মাছ থেকে শুরু করে ছোট মাছ, শুটকি সবকিছু পাওয়া যায়। কিন্তু দাম তুলনামূলক বেশি। তারপরও নতুন বাজারের একটা দোকানের পজিশন পাওয়া অনেক কঠিন। তার পরিবারের এই বাজারে তিনটা দোকান ছিল। দুটো মুদি দোকান আর এই মাংসের দোকান। রতনের জ্যাঠা একটা বিক্রি করে কলকাতা চলে গেছেন অনেক আগে। তারপর তার বাবা মারা যাওয়ার আগে তার বাবার অংশেরটা বিক্রি করে বড় ভাইকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিলেন। তাও বছর দশেক হয়ে গেল। মুদি দোকান হাতছাড়া হয়ে গেলেও কষ্ট করে পরিবারের এই মাংসের দোকানটা রতন এখনও ধরে রেখেছে।
রতন লেখাপড়া তেমন একটা করেনি। তাই বাবা-দাদার এই মাংস বিক্রির পেশাকেই বেছে নিয়েছেন ছোট থেকেই। তার বয়স এখন চল্লিশের কাছাকাছি। একটাই মেয়ে। বউ নিয়ে বাউন্ডারি রোডের পুরোনো বাড়িতে থাকেন। বাবা-দাদার ভিটে। ভাড়া লাগে না। ময়মনসিংহ এলাকার বাইপাস সড়কের পাশে চাষের কিছু কৃষি জমিও আছে। বর্গায় চাষ হয। ধান পাওয়া যায়। তাতে বছরের চাল হয়ে যায়। কিন্তু বাউন্ডারি রোডের এই বাড়ি নিয়ে রতন বর্তমানে খুব ঝামেলায় আছে। তার বাবা-দাদার এই বাড়ির চারপাশে আট-দশ তলা উঁচু বিল্ডিং উঠে গেছে। কিন্তু তাদের বাড়িটা এখনও একতলা টিনশেড রয়ে গেছে। টিনশেড ভেঙে বিল্ডিং করার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা রতনের নেই। ডেভেলপাররা অনেকদিন যাবৎ বিরক্ত করছে। তারা বলছে, “জমি দিলে, দশ তলা বিল্ডিং করবে, তাদেরকে চারটা ফ্ল্যাট দেবে।” রতন রাজি হচ্ছে না। “বাপ-দাদার মাটি, কী করে ছাড়ি?” তার মনে একটা অদম্য টান, এই ভিটেমাটির প্রতি।
হঠাৎ এক পরিচিত ক্রেতা এল। “রতনদা, তিন কেজি মাংস দিন, বাসায় মেহমান আসছে।” রতন তাড়াতাড়ি ছুরি চালাল। মাংস কাটল। ওজন করল। টাকা হাতে পেয়ে মনটা একটু হালকা হলো। ভাবল, আজ হয়তো তাড়াতাড়ি শেষ হবে। কিন্তু তারপর দুঘণ্টা কেটে গেল। এক কেজি মাংসও আর বিক্রি হলো না। রতন তার বাটন মোবাইল বের করে সময় দেখল। রাত নয়টা বেজে গেছে। মনে হলো, এই দোকান কতদিন টিকবে? বাবার কথা মনে পড়ল: “ব্যবসা মানে ধৈর্য, বাজার ওঠানামা করবে, তবু ধরে রাখ।” সেই কথা যেন তার বুকে বেঁধে আছে।
মোবাইল বাজল। স্ত্রীর ফোন। “কী হলো? দেরি কেন? মিতালির ওষুধ আনতে ভুলো না।” রতন ধীরে বলল, “খাসি এখনো ঝুলে আছে, শেষ হলে আসব।” ওপাশ থেকে স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল। মিতালি, তার মেয়ে, স্কুলে পড়ে। হঠাৎ রক্তশূন্যতা ধরা পড়েছে। ডাক্তার বলেছে ভালো খাবার দিতে হবে। মাছ, মাংস, ফল। রতনের দোকানে মাংস ঝুলে থাকে। অথচ পরিবারকে সপ্তাহে একদিনের বেশি মাংস খাওয়াতে পারে না।
রাত বাড়ল। বাজার ফাঁকা হয়ে এল। আনন্দ দোকান গুটিয়ে চলে গেল। মাছওয়ালারা হাঁকডাক বন্ধ করল। রতনের খাসি অর্ধেক এখনও ঝুলে আছে। রাগে-ক্ষোভে তার চোখে যেন জল চিকচিক করছে। “প্রতিদিন এত রাত পর্যন্ত বসে থেকে কী লাভ?” ভাবল সে।
হঠাৎ এক মধ্যবয়সী লোক এল। শহরের নামকরা উকিল। “রতন, পাঁচ কেজি দাও, দামাদামি করো না।” রতন তাড়াতাড়ি কাটল। টাকা পেল। মনটা একটু ভালো হলো। রাত দশটা বেজে গেল। খাসির বাকি অংশ নামিয়ে, পাশের পরিচিত দোকানে ফ্রিজে রেখে দোকান গুটাল। বাড়ি ফেরার পথে আকাশে তাকাল। অন্ধকারে তারার ঝিলিক। যেন তারা তার সঙ্গী। কষ্ট আছে, দুঃখ আছে। কিন্তু এই মাটি, এই বাজার, এই দোকানের প্রতি এক অদম্য টান আছে। রতন মনে মনে ভাবল, “আমি টিকে থাকব।”
২.
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই রতন কান্তির ঘুম ভাঙল। বাড়ির ছোট্ট উঠোনে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল। আরও একটা দিন শুরু হচ্ছে। কিন্তু তার মন ভারী। মিতালির ঘর থেকে হালকা কাশির শব্দ ভেসে এল। রতন তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকল। মিতালি বিছানায় শুয়ে। তার ফ্যাকাসে মুখে একটা দুর্বল হাসি। “বাবা, তুমি কি আজ তাড়াতাড়ি ফিরবে? আমি তোমার সঙ্গে বসে গল্প করব,” বলল সে ক্ষীণ কণ্ঠে। রতন মেয়ের মাথায় হাত রাখল। কপাল ছুঁয়ে দেখল, হালকা জ্বর। তার বুকের ভেতর যেন একটা ঝড় উঠল। “হ্যাঁ মা, আজ তাড়াতাড়ি আসব। তুই বিশ্রাম নে,” বলল সে। কিন্তু মনে মনে জানে, সেটা সম্ভব নয়। ডাক্তার বলেছে ভালো খাবার দরকার। মাংস, মাছ, ফল। কিন্তু তার হাতে টাকা কোথায়? দোকানে মাংস ঝুলে থাকে। অথচ ঘরে আনা সম্ভব হয় না। ওই তো সামান্য ব্যবসার পুঁজি। স্ত্রী এসে বলল, “মিতালির শরীর আরও খারাপ হচ্ছে। ওষুধটা আজই আনো।” রতন মাথা নাড়ল। কিন্তু উত্তর দিল না। সে ভাবতে ভাবতে বাজারের দিকে রওনা হলো। এই জীবন এমনভাবে আর কতদিন চলবে?
বাজারে পৌঁছে দোকান খুলল। আজ সকালের বাজারে হালকা ভিড়। কিন্তু তার দোকানের সামনে নীরবতা। জ্যাঠাতো ভাইয়ের সহযোগিতায় আগে থেকে কিনে রাখা একটি খাসি জবাই করে চামড়া ছাড়িয়ে ঝুলিয়ে দিল দোকানে। কিন্তু ক্রেতা নেই। পাশে আনন্দের মুরগির দোকানে দু-একজন এল। মুরগি কিনল। আনন্দ বলল, “রতনদা, আজও ফাঁকা? মানুষের পকেট খালি।” রতন হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। সে ছুরি হাতে বসে রইল। চোখ খাসির দিকে। খাসিটা যেন তার জীবনের ছবি। অর্ধেক বিক্রি হলে অর্ধেক ঝুলে থাকে। অসম্পূর্ণ। তার জীবনও তাই। পরিবারের দায়িত্ব একদিকে। বাপ-দাদার ঐতিহ্য অন্যদিকে। রতন ভাবছে, জমি যদি ডেভেলপারকে দিত। তাহলে কী হতো? দশ তলা বিল্ডিংয়ে ফ্ল্যাট পেত। টাকা আসত। মিতালির চিকিৎসা হতো। স্ত্রীর রাতের ফোনে উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শুনতে হতো না। কিন্তু তাহলে বাপ-দাদার ভিটেমাটি? এই টিনশেড বাড়ি। এই মাটির গন্ধ। সব যেন তার রক্ত ও স্মৃতিতে মিশে আছে। ছাড়তে পারবে না। মনের ভেতর একটা দ্বন্দ্ব উঠছে। ঐতিহ্য না পরিবার?
বিকেল গড়িয়ে গেল। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। বাজারে ভিড় বাড়ছে। কিন্তু রতনের দোকান ফাঁকা। হঠাৎ এক পরিচিত কাস্টমার এল। একজন সরকারি অফিসার। “রতন, দুই কেজি মাংস দাও। ভালো করে কাটো।” রতন তাড়াতাড়ি ছুরি চালাল। মাংস কাটল। ওজন করল। টাকা হাতে পেয়ে একটু স্বস্তি পেল। কিন্তু মন খুশি হলো না। খাসির অনেকটা অংশ এখনো ঝুলছে। রাত নামছে। বাজারের আলো জ্বলে উঠেছে। আনন্দ তার মুরগির দোকান গুটোয়। মাছওয়ালারা হাঁকডাক বন্ধ করে। রতন বসে আছে। ছুরি হাতে। তার চোখে অবিক্রিত ঝুলন্ত খাসি। মনে মিতালির ফ্যাকাসে মুখ। সে ভাবছে, এই লড়াইযয়ে কি মেয়ের জীবন হারাবে? বাপ-দাদার মাটির টান একদিকে। মেয়ের প্রতি দায়িত্ব অন্যদিকে। দুটোই যেন তাকে টানছে। কোনটা ছাড়বে? সে আকাশের দিকে তাকাল। যেন তারার কাছে উত্তর খুঁজছে। “ভগবান, আমি কী করব?” ফিসফিস করে বলল।
রাত নয়টা বাজল। একজন ক্রেতা এল। একজন ব্যবসায়ী। “তিন কেজি দাও, তাড়াতাড়ি।” রতন কাটল। টাকা পেল। তার মুখে হাসি ফুটল। কিন্তু খাসির বাকি অংশ এখনো আছে। সে বসে রইল। অপেক্ষায়। মোবাইল বাজল। স্ত্রীর ফোন। “মিতালির জ্বর আবার এসেছে। আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো।” রতনের বুক ধড়ফড় করে উঠল। “আসছি, আর একটু,” বলল সে। কিন্তু দোকান ছাড়তে পারছে না। খাসি বিক্রি না হলে টাকা আসবে কোথা থেকে? মিতালির ওষুধ কিনবে কীভাবে? তার মনে হাহাকার। এই জীবন কেন এত কঠিন?
রাত দশটা বাজল। আরেকজন ক্রেতা এল। দুই কেজি নিল। অবশেষে খাসি শেষ হলো। রতন দোকান গুটাল। বাড়ি ফিরল। মিতালি ঘুমিয়ে পড়েছে। কপাল গরম। সে হাত রাখল। চোখ ভিজে এল। স্ত্রী বলল, “ডাক্তার বলেছে বেশ কিছু টেস্ট করতে হবে।” রতন চুপ করে রইল। তার হাতে টাকা নেই। শুধু দোকানের আয় আর চাষের জমি। রাতে ঘুম এল না। সে বাইরে উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখল। তারার ঝিলিক যেন তার কষ্ট দেখছে। “জমি ছাড়লে মিতালি বাঁচবে,” ভাবল সে। “কিন্তু ভিটেমাটি গেলে আর কি থাকলো? বাপ-দাদার উত্তরাধিকার। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি।” তবু মিতালির মুখ ভাসল। সে কাঁপা গলায় বলল, “মিতালি, আমি তোকে বাঁচাব। যা করতে হয়, করব।” রাতের নীরবতায় তার কথা যেন প্রতিধ্বনিত হলো।
৩.
পরের দিন ভোর হলো। রতন কান্তি ঘুম থেকে উঠল। কিন্তু তার চোখ লাল। রাতে ঘুম হয়নি। মিতালির জ্বরের চিন্তাায় অস্থির ছিল। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে সে সূর্যোদয় দেখল। ধীরে ধীরে আলো ফুটছে। কিন্তু তার মনে অন্ধকার। মিতালির ঘর থেকে কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এল: “বাবা, আমার শরীর খারাপ লাগছে।” রতন তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকল। মিতালি বিছানায় শুয়ে। তার মুখ ফ্যাকাসে। চোখে জল। সে মাথা তুলে বলল, “বাবা, আমি স্কুল যাব না আজ। মাথা ঘুরছে।” রতন কপাল ছুঁল। জ্বর বেড়েছে। তার বুকের ভেতর যেন একটা পাথর চাপা পড়ল। মিতালির শরীর দিন দিন খারাপ হচ্ছে। রতন চুপ করে রইল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সব টাকা যদি আজ তার হাতে আসত। তবু এই মুহূর্তে সে অসহায়। সে বাজারের দিকে রওনা হলো। কিন্তু মন পিছনে। “আজ দোকান তাড়াতাড়ি বন্ধ করব,” ভাবল সে।
বাজারে পৌঁছে দোকান খুলল। খাসি জবাই করল। পাঠাতন থেকে ঝুলিয়ে দিল। কিন্তু হাত কাঁপছে। মন অন্যদিকে। ক্রেতা এল না। বেলা বাড়ল। সূর্য চড়া হলো। পাশের দোকান থেকে আনন্দ বলল, “রতনদা, আজ তোমাকে বিষন্ন দেখাচ্ছে। কী হয়েছে?” রতন বলল, “মিতালির শরীর খারাপ। জ্বর এসেছে।” আনন্দ সান্তনা দিল, “ডাক্তার দেখাও। টাকা লাগলে বলো।” রতন মাথা নাড়ল। কিছু বলল না।
দুপুরে রতন বাড়ি ফিরল। মেয়েকে সময় দিল। বিকেলবেলার দিকে মিতালিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। মিতালিকে দেখে ডাক্তার শান্ত গলায় বলল, “রক্তশূন্যতা বেড়েছে। জরুরি চিকিৎসা দরকার। ওকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিন।না হলে বিপদ হতে পারে।” স্ত্রী কেঁদে ফেলল। রতন মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করে দিল।
৪.
পরদিন সকালে রতন কান্তি বিছানা থেকে অনেক কষ্ট করে উঠল। তার মুখ ফ্যাকাসে। চোখে ঘুমের চিহ্ন নেই। রাতে মিতালির অবস্থা ভেবে এক মুহূর্তও চোখ বন্ধ হয়নি। দুপুরে রতন ডেভেলপারের অফিসে গেল। ডেভেলপারের লোক স্যুট পরা। সাজানো-গোছানো অফিসে বসে ছিল। তার চোখে মিতালির মুখ ভাসছে। সে ভাবল, আর না। লড়াই শেষ। বাপ-দাদার মাটি যাক। মেয়ে বাঁচুক। সে বলল, “আমি রাজি। কাগজপত্র নিয়ে আসুন।” প্রতিনিধি হাসল। রতন বলল, “আজই সই করি। আমার টাকা দরকার।”
রতনের বুক ভেঙে গেল। সে সই করল। হাত কাঁপছিল। প্রতিনিধি টাকা দিল। অ্যাডভান্স। রতন টাকা নিল। দোকান থেকে বেরিয়ে হাসপাতালে গেল। ডাক্তার বলল, “সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। এখন আপনার মেয়ে ভালো আছে।” রতনের মন হালকা হলো। কিন্তু বুক ভারী। সে ভাবল, মিতালি বাঁচল। কিন্তু আমি পৈতৃক ভিটা হারালাম।
সময় গড়িয়ে গেল। কয়েক মাস কেটে গেছে। ডেভেলপাররা কাজ শুরু করেছে। রতনের পুরোনো বাড়ি। সেই একতলা টিনশেড। ভেঙে ফেলা হয়েছে। তার জায়গায় উঠছে উঁচু বিল্ডিং। লোহার রড। সিমেন্টের গাদা। শ্রমিকদের হাঁকডাক। সবকিছু যেন রতনের স্মৃতি মুছে দিচ্ছে। রতন পরিবার নিয়ে একটা অস্থায়ী ভাড়া বাড়িতে উঠেছে। কাছাকাছি। কিন্তু তার মন পুরোনো ভিটেয়। প্রায়ই সে সেই জায়গায় যায়। দূর থেকে দেখে। বিল্ডিংয়ের ভিত্তি গাঁথা হচ্ছে। কিন্তু তার বুকের ভেতর যেন একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। “বাপ-দাদার মাটি এখন অন্যের,” ভাবে সে। কিন্তু মিতালি ভালো হয়েছে। সেটাই তার সান্তনা।
একদিন রতন পুরোনো বাজারে গেল। নাম নতুন বাজার। কিন্তু তার কাছে পুরোনো। রতন মাংসের দোকানটাও অন্য একজনের কাছে ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। দোকানের জায়গায় এখন অন্য লোক বসে আছে। তার জ্যাঠাতো ভাই এখনো আছে। কিন্তু রতনের দোকানটা ভাড়াাটিয়ার দখলে। সে দূর থেকে দেখল। আনন্দ এল। বলল, “রতনদা, কেমন আছ? মিতালি কেমন?” রতন বলল, “ভালো। তুই?” আনন্দ বলল, “বাজার একই। কিন্তু তোমাকে ছাড়া ফাঁকা লাগে।” রতন হাসল। কিন্তু চোখে জল। সে বাজার ছাড়ল। বাড়ি ফিরে মিতালিকে বলল, “আজ তোর জন্য মাংস কিনে এনেছি।” মিতালি খুশি হলো। কিন্তু রতনের মনে হলো, সে এখন ক্রেতা। বিক্রেতা নয়। জীবন উল্টে গেছে।
দেখতে দেখতে বছর দুয়েক কেটে গেছে। ডেভেলপারের অ্যাডভান্সের টাকা ব্যাংকে রেখে দিয়েছিল রতন। সেখানে থেকে প্রতিমাসে যে মুনাফা পায় তাই দিয়েই চলছিল রতনের পরিবার। এরপর একদিন ডেভেলপারের বিল্ডিং তৈরি শেষ হলো। রতন পরিবার নিয়ে ফ্ল্যাটে উঠল। কিন্তু তার মন পুরোনো টিনশেডে। সে ছাদে যায়। আকাশ দেখে। ময়মনসিংহ শহরের আলো ঝলমল। কিন্তু তার চোখে অন্ধকার। “আমি ছিন্নমূল হয়ে গেলাম,” ভাবে সে। বাপ-দাদার স্মৃতি হারালাম। কিন্তু মিতালির হাসি দেখে সান্তনা পায়। “এটাই জীবন,” বলে সে। একদিন সে চাষের জমিতে গেল। ধানের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে মাটি ছুঁল। “এটা তো আছে,” ভাবল। কিন্তু দোকানের স্মৃতি। খাসির গন্ধ। ছুরির শব্দ। সব হারিয়েছে। তার জীবন অর্ধেক অবিক্রিত খাসির মতো। কিছু ছেড়ে দিয়ে কিছু পাওয়া। কিন্তু টান তো থেকে যায়। ভিটেমাটির টান। পরিবারের টান। রতন কান্তি সূত্রধর এক সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার অদম্য লড়াই ও স্মৃতি থেকে যায় চিরকাল।

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




