somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একেক প্রান্তে , যে যেমন আছে

২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ ভোর ৪:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্টকহোমস, সুইডেন :
নোয়াখালীর মাহমুদ , ২৬ বছরের যুবক। ২০০৩ এ দেশ ছাড়ে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে। টানা ৪ বছর ওয়েলস-এ থেকে, ১ বছর সাইপ্রাসে কাটিয়ে, আজ প্রায় আড়াই বছর সুইডেনে। একা। মা-বাবার প্রথম সন্তান, দুই ভাই বোনের বড় ভাই। আত্মীয়-স্বজনের কেউ নেই প্রবাসে। সুইডেন এসে এক বাঙ্গালীর বাসায় উঠে, পরিচিত কেউ না, আত্মীয় না - শুধু বাঙ্গালী, এই সুত্রে উঠা। পরে পার্ট-টাইম চাকরিও একই বাঙ্গালীর রেস্টুরেন্টে। কাজ-ক্লাশের পরে মাঝে মাঝে মালিকের ১০ বছরের ছেলে ইরতিজার সাথে ভিডিও গেইম বা বাস্কেটবল খেলা। কখনও সমবয়সীদের সাথে ছুটির রাতে কার্ড খেলা।হঠাৎ যখন ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়, তখন চাচী (ইরতিজার মা) ভাল-মন্দ রাঁধেন,যদিও মায়ের রান্নার মত হয় না । তবু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মাহমুদ। গতানুগতিক জীবন। প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় বাবার সাথে। মা-র সাথে তেমন হয় না। সপ্তাহে এক-দুই বার, যদিও মা'র জন্য টানটা বেশি, কিন্তু কথা বললেই, হয়ত মা-কে কোন নতুন দুশ্চিন্তা দিয়ে দিবে নিজের অজান্তেই। সব মা-ই বুঝে সন্তানের মন,তবু ওর মনে হয় মা যেন ওকে একটু বেশী বুঝেন, কখনই কিছু লুকাতে পারে না, তাই তেমন কথা বলা হয়ে উঠে না মা'র সাথে। একটু অন্তর্মুখী, তাই ভালোবাসা-আবেগ প্রকাশ করা হয়ে উঠে না অত সহজে, আপনপজনদের কাছেও না।
সময়ের সাথে চাকরি বদলায়, বদলায় আশেপাশের মানুষ। নতুন বাসায় উঠে, চাচীর সারপ্রাইজ কোন নাশতা থাকে না। নিজেই রান্না করে খেতে হয়। রান্নায় অদক্ষ নয় কিংবা আলস্যও নেই, তবে যাদের সাথে, তারা তৈরী খাবার খেতে দেরী না করলেও, অন্যবেলা নিজেরা ভালমন্দ কিছু রান্নার চেষ্টা করতেও অনেক দেরী করিয়ে দেন। একবার ,দুইবার, বারবার এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি হতে দেখে এখন আর বাসায় রান্না করেনা মাহমুদ খুব বিপদে না পরলে। কাপ নুডলস, স্যান্ডউইচ খেয়ে দিন কাটায়, মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে রেস্টুরেন্টে ফ্রাইড রাইস দিয়ে চালিয়ে নেয়।
দেশে মা কাঁদেন ছেলের স্বাস্থ্যহানির ছবি দেখে। ছেলে নির্বিকার থাকে,থাকতে হয়। ডুবে যেতে হয় পড়া শেষ করার, নিজেকে প্রতিষ্টিত করার চেষ্টায়। বাবার কাঁধ থেকে দায়িত্বের বোঝা কমানোর আপ্রান চেষ্টা। ছোট ভাই বোনদের, কখনও প্রিয় খালা-চাচাদের শখের আবদার মেটানোর প্রচেষ্টা !
এরই মাঝে যোগ হয়েছে নতুন চিন্তা, প্রিয় মানুষ-টাকে বিয়ে করার প্রস্তুতি।

ম্যানচেস্টার, ইংল্যান্ড :
আহমেদ, হবিগঞ্জের ছেলে। প্রায় ৫ বছর প্রবাসে। অনেক ছাত্রের স্বপ্নের "স্টুডেন্ট ভিসা" নিয়ে বিদেশে পড়তে আসা আরো এক বাঙ্গালী। নিঃসন্তান মামা-মামীদের বাসায় আছে প্রথম থেকেই। খাবারের অভাব না হলেও, আন্তরিকতার অভাবে ক্ষুধা থাকলেও খাওয়ার রুচি হয় না, মা-বাবা আর ছোট ২ বোনের আহলাদের এই একমাত্র ছেলে/ভাই-টির। ২৯ বছরের এই যুবক, এখনও মনের দিকে ১০ বছরের এক কিশোরের মতই সরল আর কোমল। বরাবরই মা নেওটা ছিল,তবু এখন মা'র বয়েসী মামীকে তেমন ভাল লাগে না। অবশ্য ওরই বা দোষ কি? মামী মানুষটাই জানি কেমন, কখনো মা হতে পারেন নি বলেই হয়তো 'মা'-ভাবটা নেই। অনার্স শেষ হয়েছে ২ বছর, তবু চাকরি মিলছে না মনমত। নিজের পড়াশোনার খরচ, বাবার ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে, এক বোনকে বিয়ে দিতে, ছোট বোনের ডাক্তারী পড়ার খরচ যোগান দিতে, এই কয়েক বছরে অনেক ঋণ করতে হয়েছে নানাজনের কাছ থেকে। বিন্দু বিন্দু করে করা এসব ঋণ এখন পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সাথে যোগ হয়েছে, ভিসার মেয়াদ ফুরানোর দুশ্চিন্তা। স্থানীয় কোন ব্রিটিশ সিটিজেন বাঙ্গালীকে বিয়ে করলে হয়ত সমস্যার সহজ সমাধান হত, কিন্তু কথার লোক আহমেদ। কখনো না দেখে ভালোবেসেছে আমেরিকা প্রবাসী আরেক বাঙ্গালীকে। স্বপ্ন দেখেছে দুজন একসাথে। এখন নিজের স্বার্থকে বড় করে, মেয়েটাকে একা করে দেওয়ার মত অমানবিক কাজ করতে চায় না আহমেদ। প্রতিদিন সকালে, দুপুরে, বিকেলে, কাজের আগে, মাঝে কিংবা পরে কথা বলে দেশে রেখে আসা মা-বাবা ছোট বোনের সাথে, এখানে বসেই খোঁজ নেয় বোন কখন কলেজ গেল, কখন এল। মা-বাবা ওষুধ খেলেন কিনা। কয়েক ঘন্টা দূরে বিবাহিত বোনেরও খবর নেয় দিনে অসংখ্যবার। আর দিন শেষে যখন সবাই ঘুমে তখন রাত জেগে অপেক্ষা করে, ৫ ঘন্টা পিছনে অন্য এক মহাদেশে থাকা মনের মানুষটির। পরিবারে নানা ঝামেলা এড়িয়ে যদি একবার আসে অনলাইন! মাঝে মাঝে এই অপেক্ষা ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটায়, সব সমস্যা বড় হয়ে দাঁড়ায়, ভুলে থাকার বদলে। ফলাফল অকারন ঝগড়া। সময় গড়ায়, মনের গতি বদলায়। স্বপ্ন সত্যির আশায় শুরু হয় দুঃস্বপ্নে ঘেরা আরো একটা দিনের। হিসেবের খাতা থেকে কমে যায় আরো একটা দিন।

নিউ ইয়র্ক, আমেরিকা :
ক্লাশ টেনে বাবাকে হারায় নাঈম। ২ বোনের এক ভাই, মা-বাবার ২য় সন্তান। তবে বাবা মারা যাওয়ায় হঠাৎ করেই দায়িত্বজ্ঞান চলে এল । বড় বোন থেকে ৫-৬ বছরের ছোট হয়েও, বড় ভাইয়ের মত ভাবতে হয় ওকে। আমেরিকার ডিভি ভিসা পেয়ে আসে ৭ বছর আগে। চাচার বাসায় উঠে। বেসমেন্টের একটা রুম ভাড়া নেয়। ক্লাশ, কাজ, ছুটির দিনে প্রিয় শখ ক্রিকেট খেলা র মাঝে মাঝে চাচার বাসায় আমন্ত্রিত আত্মীয়দের সাথে কিছু সন্ধ্যা। মা-বোনকে ২-৩ পর পর ফোন করা। সিলেট শহরে বেড়ে ওঠা, বিয়ানীবাজারের নাঈমের অসুবিধা হয়নি নিউ ইয়র্ক শহর ভর্তি নিজ এলাকার লোকদের সাথে খাপ খাওয়াতে। চোখে পড়ার মত তেমন কোন অসুবিধা হয়নি কখনো, তবে মা'র মত ভালোবাসা বা স্বাধীনতা দিতে পারেন নি চাচী। কিছুদিন হল বাসা বদলেছে, স্বাবলম্বী হবার বাহানায়। ক্লাশ কাজ শেষে নিজে রেঁধে খেতে হয় প্রতিদিন, যদিও রয়ে গেছে মা'র হাতের রান্না কিংবা একমাত্র ছোট্ট বোনটাকে আহ্লাদ করার সুযোগের অভাব তবু নাঈমের ভালো লাগে এই স্বাধীন জীবন।

অনেক সময়ই অভিযোগ করি আমরা নিজেদের জীবন নিয়ে। পায়ে জুতো নেই বলে চেঁচামেচি করি, ভুলে যাই তাদের কথা যাদের পা-ই নেই। মা বাবার সাথে সবসময় থেকেও ভাবি অনেক অসুখি আছি। আসলে কত সুখে আছি তা তখনই জানা যায়, যখন এই সুখের ছায়া জীবন থেকে সরে যায়। যেভাবে আছি, সুখেই আছি, ভালো আছি।



সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ২:০৭
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ক্রাউড ফান্ডিং-এর সুযোগ তৈরি করে সরকারী লাভজনক প্রজেক্টে জনগণের বিনিয়োগ নিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৩১

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত, তা বুঝা যাচ্ছে। নাহলে, খোদ প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে জনগণকে অনুরোধ করতেন না। আমার মন হয়, দেশের মানুষের কাছেই অনেক সম্পদ আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×