somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সমুদ্রনীল
মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে মানবের মাঝে বাঁচিবারে চাই।

করোনা পরীক্ষার পিসিআর মেশিন আবিষ্কারের কাহিনী

২২ শে এপ্রিল, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডিএনএ (DNA) থেকে আরএনএ (RNA) তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে বলে ট্রানস্ক্রিপশন। এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আরএনএ থেকেও ডিএনএ তৈরি করা সম্ভব। এই বিপরীতমুখী প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় রিভার্স ট্রানস্ক্রিপশন (RT)। আরএনএ ভাইরাসকে শনাক্ত করার জন্য এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করা হয়।

বর্তমানে বৈশ্বিক মহামারী COVID-19 সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস SARS-CoV-2 শনাক্ত করার জন্য রিভার্স ট্রানস্ক্রিপশন প্রক্রিয়াটি এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় করোনাভাইরাসের আরএনএ থেকে রিভার্স ট্রান্সক্রিপশনের মাধ্যমে কম্প্লিমেন্টারি ডিএনএ তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে সেই ডিএনএ কে পলিমারেজ চেইন রিএ্যকশন বা পিসিআর (PCR) পদ্ধতিতে বহুগুণে বর্ধিত করে ভাইরাসটির জেনেটিক মেটেরিয়াল নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় real time RT-PCR । এটি COVID -19 রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে একটি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড টেস্ট। বৈশ্বিক মহামারী রোধে এই টেস্টের ভূমিকা অপরিহার্য।

এখানে বলে রাখি আশির দশকে আবিষ্কৃত পিসিআর (PCR) পদ্ধতিটি মলিক্যুলার বায়োলজিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলো।

মলিক্যুলার বায়োলজিস্টদের কাছে পি সি আর (PCR) বা পলিমারেজ চেইন রিএ্যকশন একটি অতি পরিচিত নাম। এটি হলো ডি এন এ (DNA) অণুকে বহুগুণে বর্ধিত করার একটি সহজ পদ্ধতি। পিসিআর পদ্ধতিটি গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে মলিক্যুলার বায়োলজির বিভিন্ন পরীক্ষায় বহুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান যুগে পিসিআর ছাড়া কোন ডি এন এ ল্যাব কল্পনা করা যায় না। ডি এন এ নিয়ে গবেষণা করার কাজটি সহজ করে দিয়েছে পি সি আর।

পি সি আর পদ্ধতিটি আবিষ্কার করেছিলেন ক্যারি মিউলিস (Kary Mullis) নামে একজন প্রাণরসায়নবিদ। প্রথাগত অর্থে তিনি কোন বিশাল বিজ্ঞানী ছিলেন না। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন কিছুটা বাউন্ডুলে প্রকৃতির । ‌ চাকরি করতেন ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বায়োটেক কোম্পানির‌‌ ডি এন এ কেমিস্ট হিসেবে। তাঁর কাজ ছিল বিভিন্ন অণুজীব থেকে ডি এন এ স্যাম্পল সংগ্রহ করার পর সেগুলোকে বর্ধিত করে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা। কাজটা ছিল খুবই সময়সাপেক্ষ এবং বিরক্তিকর।

ক্যারি ভাবলেন কিভাবে কাজটা সহজে করা যায়। ‌ এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে গিয়ে পি সি আর এর আইডিয়াটি তাঁর মাথায় হঠাৎ করেই এসেছিল। সময়টা ছিল ১৯৮৩ সাল। ক্যারি তখন হলিডে করছেন তাঁর বান্ধবীর সাথে। একদিন হাইওয়েতে গাড়ি চালাতে চালাতে তাঁর মাথায় আইডিয়াটা এলো। বিজ্ঞানীরা একেই বলেন, "দি ইউরেকা মোমেন্ট"। ক্যারি গাড়ি থামিয়ে তাঁর বান্ধবীকে বললেন, ডিএনএ নিয়ে আমি একটি বিরাট সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি।

ব্যাপারটা খুলেই বলি। ডি এন এ হলো জীবজগতের বংশগতির ধারক এবং বাহক। ডি এন এ অণুর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি নিজের মত হুবহু আরেকটি ডি এন‌ এ অণু তৈরি করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলে ডিএনএ রেপ্লিকেশন। ‌ প্রকৃতিতে এই প্রক্রিয়াটি কয়েকটি এনজাইমের সাহায্যে ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। ‌ সেজন্য ল্যাবরেটরীতে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করা ছিলো ব্যয় সাপেক্ষ এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

ক্যারি ভেবে দেখলেন হেলিকেইজ (helicase) এনজাইম ছাড়াও শুধুমাত্র তাপমাত্রা বাড়িয়েই ডিএনএ রেপ্লিকেশনের প্রাথমিক ধাপটির সূচনা করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো ওই তাপমাত্রায় রেপ্লিকেশনের মূল এনজাইম, যার নাম হলো ডিএনএ পলিমারেজ, নষ্ট হয়ে যায়। তিনি সমস্যাটির সমাধান করার জন্য ট্যাক পলিমারেজ (Taq polymerase) নামে এক বিশেষ ধরনের এনজাইমের শরণাপন্ন হলেন। ‌এই এনজাইমটি উচ্চ তাপমাত্রায় নষ্ট হয় না, বরং স্বাভাবিক ডিএনএ পলিমারেজের মতই কাজ করে। ট্যাক পলিমারেজ এনজাইমটির উৎস হলো উষ্ণ প্রস্রবণের মাঝে বসবাসকারী এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এর নাম হল Thermus aquaticus, সংক্ষেপে Taq, উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যেও এই ব্যাকটেরিয়াগুলো বেঁচে থাকে।

ক্যারি টেস্টটিউবের ভেতর টার্গেট ডিএনএ, প্রাইমার, ডিএনএ নিউক্লিওটাইড, এবং ট্যাক ডিএনএ পলিমারেজ এসব উপাদান একত্রে মিশিয়ে বাফার সলিউশনে রাখলেন। তারপর টেস্টটিউবের তাপমাত্রা একবার বাড়িয়ে, তারপর কমিয়ে এবং আবার বাড়িয়ে দেখলেন এভাবে ডিএনএ রেপ্লিকেশন করা সম্ভব। এই তাপমাত্রা বাড়ানো এবং কমানোর প্রক্রিয়াটি কয়েকবার করার পর তিনি দেখলেন তার টার্গেট ডিএনএ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ সময় লেগেছে খুবই কম। এই পদ্ধতিটির নাম তিনি দিয়েছিলেন পলিমারেজ চেইন রিএ্যকশন‌ বা পিসিআর। তিনি পদ্ধতিটি আবিষ্কার করলেও, কোম্পানির সাথে তাঁর চুক্তি অনুযায়ী তিনি এটি তাঁর নিজের নামে পেটেন্ট করতে পারেননি। পেটেন্ট হয়েছিলো তাঁর কোম্পানির নামে। তবে তাঁর কাজে খুশি হয়ে কোম্পানি তাকে দশ হাজার ডলার বোনাস দিয়েছিলো। এর কিছুদিন পর তাঁর কোম্পানি ওই পেটেন্টটি অন্য একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলো, মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলারে! যার একটি কানাকড়িও ক্যারিকে দেওয়া হয়নি। ক্যারি খুবই হতাশ হয়েছিলেন তাঁর কোম্পানির ব্যবহারে।

কিন্তু নোবেল কমিটি তাকে হতাশ করেননি, তাঁর এই আবিষ্কারটি জন্য ১৯৯৩ সালে রসায়নশাস্ত্রে তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার চেয়েও বড় পুরস্কার হলো তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি এখন মলিক্যুলার বায়োলজির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে।

সূত্র : নিউইর্য়ক টাইমস্ ১৫ আগস্ট ২০১৯ এবং গুগল

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে এপ্রিল, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:২৪
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রীবর্গের দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত নয় কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"হে কাবা! তুমি কতই না উত্তম, তোমার সুঘ্রাণ কতই না চমৎকার! তোমার মর্যাদা কতই না মহান! তবে সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একজন মুমিনের জান,... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পর্শে_ _ _ _ _

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৩ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০০

-কি পাও আমার মাঝে ?
-দুটি চোখ।
যেখানে আমার সর্বসুখ নিহিত,
ছমছমে সন্ধ্যা, ভয় জাগানিয়া অন্ধকার রাত,
এসব বৃথা হয়ে যায়,
তোমার একটি ছোঁয়ায়।
তোমার চোখের একটি পলক, আমার হাজার বছর,
আর কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরীচকাি ও নক্ষত্র

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:১০


মেয়েটি অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে টিস্যু পেপার দিয়ে ঠোঁটের কোণ মুছে নিল। তারপর সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে অবলীলায় বলল, "নীল, আমি প্রেগন্যান্ট!"
আমি তখন চায়ের কাপে সবেমাত্র একটা অসতর্ক চুমুক দিয়েছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেসুরো গলায় গান গাওয়ার অপরাধে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৩ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:০৯


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে

যে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পপুলিস্ট দিক ও ন্যায়বিচারের দিক উভয়ই খেয়াল রাখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×