দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত এলাকা ৪,১০০ কিলোমিটার বা ২,৫৫০ মাইল, যা বিশ্বের মধ্যে পঞ্চম দীর্ঘতম। এক সময় ভারতকে স্বাধীন বাংলাদেশের দয়ালু ধাত্রী হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন ভারতের আচরণ একজন দুষ্ট সৎ মায়ের মতো। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখলেও ভারত প্রায়ই বাংলাদেশের সঙ্গে অবহেলামূলক ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেছে। চীনের উত্থান কি ভারতের পুরনো আচরণে পরিবর্তন ঘটাতে পারবে? গত চার দশকের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশে পররাষ্ট্রনীতি বলতে শুধুমাত্র বুঝিয়েছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পররাষ্ট্রনীতি কখনও বড় ইস্যু হয়ে দেখা দেয়নি। ১৯৯১ সাল থেকে এ দুই নেত্রীই পালাবদল করে বাংলাদেশকে পরিচালনা করেছেন। তবে প্রথমবারের মতো হাসিনা বনাম খালেদার পঞ্চম নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুই নেত্রীকেই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে ব্যবহার করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। ২০১৪ সালে দুই নেত্রী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন। যদি ইতিহাসকে পথপ্রদর্শক হিসেবে ধরে নেয়া হয়, তবে খালেদা জিয়া হবেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী ও তার রাজনৈতিক দল বিএনপি পরবর্তী সরকার গঠন করবে। বাংলাদেশে কোন সরকারই পর পর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আসেনি। তবে খালেদা জিয়া কঠিন সংগ্রামের সম্মুখীন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও তার নির্বাসিত পুত্র তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কোন অভিযোগে অভিযুক্ত হলে তিনি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিতে পারবেন না। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বিএনপির প্রধান নির্বাচনী মিত্র জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বছর শেষ হওয়ার আগেই ঢাকায় যুদ্ধাপরাধের যে বিচার চলছে তার রায় বের হবে। সে ক্ষেত্রে জামায়াতের পুরো নেতৃত্বই সম্ভাব্য দণ্ডের সম্মুখীন হতে পারে। তা সত্ত্বেও ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিএনপির জনপ্রিয়তা স্পষ্টভাবেই বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৩৯ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দেয়ার কথা বলেছে, যা ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ের প্রায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষে এখনও ৪২ শতাংশ মানুষের সমর্থন রয়েছে।
গত বছর খালেদা চীন ও ভারতে এক সপ্তাহব্যাপী এক সফরে গিয়েছিলেন। এটাকে খালেদার সমর্থকরা কোন প্রাপ্তির সংকেত হিসেবেই ভাবছেন। অবশ্য আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের নেত্রীর এ সফরকে উপহাসের দৃষ্টিতেই বিবেচনা করে। চীনের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান শি জিনপিং ও খালেদা জিয়া চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও বিএনপির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার ব্যাপারে পরস্পরকে কথা দিয়েছিলেন। ওই নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভিন্ন গতিপথে প্রবাহিত। চীন বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালের আগস্টে স্বীকৃতি দেয়। এর কিছু আগে বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ২০০১-০৬ সালের মেয়াদে ক্ষমতাসীন দল ছিল বিএনপি। দিল্লির ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল। ওই নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, বাংলাদেশের কৌশলগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই তিনি দ্রুত বর্ধনশীল উত্তর-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ায় মিত্র ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা খুঁজছেন। এ নীতিকে খুব বড় করে দেখার কিছু নেই। অন্যদিকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বেশ দৃঢ়ভাবেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছত্রছায়ায় রাখতে চান। ভারত বাংলাদেশের তিনটি নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে প্রাধান্য দিচ্ছে: ভারতে বাংলাদেশীদের অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্তে সন্ত্রাসবাদ ও ৪ হাজার ১০০ কিলোমিটার সীমান্তে ভূখণ্ড বিতর্ক নিয়ে কয়েকটি ইস্যু। অবশ্য শেখ হাসিনা এ সমস্যাগুলো নিষ্পত্তিতে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিবাদের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ভারতের আশঙ্কা খালেদা জিয়া পুনরায় ক্ষমতায় এলে সন্দেহজনক মিত্রদের দূরে সরিয়ে চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি ঘটাবেন। ভারতের অকথিত দুঃস্বপ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা যেখানে কোন ব্যবস্থা নেননি, সেখানে খালেদা জিয়া সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। আর সেটা হতে পারে চীনকে বাংলাদেশের একটি বিমান ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দেয়া। উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবেশাধিকার দেয়া। শেখ হাসিনার সরকার গত অক্টোবরে চীনের কাছ থেকে স্বল্প সুদে ২০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে কক্সবাজারে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের মিত্র রাষ্ট্র ভারতকে হারানোর ঝুঁকি হাসিনা নেবেন না বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কণ্টকময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেয়াটাও কঠিন মনে হয়েছে ভারতের কাছে। পানি বণ্টন ইস্যু, সীমানা নির্ধারণ ও সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাংলাদেশী হত্যার ইস্যুগুলো এখনও অমীমাংসিত সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে। ২০১২ সালে সীমান্তে বিএসএফ ৪৮ জন বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সীমান্ত সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে আপস-মীমাংসার বিষয়গুলো প্রত্যাখ্যান করায় সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট সীমান্ত এলাকা ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার বা ১ হাজার ৩৭৭ মাইল দীর্ঘ। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারও সুসম্পর্ক গড়তে চায়। মিয়ানমারের সঙ্গে চীনেরও সুসম্পর্ক রয়েছে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুই নেত্রীই তাদের ক্ষমতাধর মিত্র রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে আগ্রহী।
সূত্রঃ Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



