somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

...নিপুণ কথন...
শিক্ষক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। ফেসবুকে যুক্ত হোনঃ www.facebook.com/dev.d.nipun (DEV DULAL GUHO)

জমাট দীর্ঘশ্বাস

১৩ ই জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ২:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রাত ১১টার কিছু পরে পলাশীর থেকে চা খেয়ে টুকটাক কেনাকাটা করে ফিরছি। বুয়েটের বাজারের গেটের দুই পাশে দুটি রিক্সা। এর মধ্যে একটি রিক্সার চালক ষাটোর্ধ একজন বৃদ্ধ। এমন শীতের রাতে বড় একটা ময়লা পশমী জ্যাকেট পড়ে রিক্সার পাদানিতে বসে আছেন। একবার ভাবলাম, অন্য রিক্সায় যাই। সেটার চালক যুবক, গায়ে জোর আছে। এই বৃদ্ধর রিক্সায় চড়লে তাঁর রিক্সা টানতে কষ্ট হবে। আর এটা দেখে কষ্ট হবে আমারও। তবুও আমাকে দেখে এই বৃদ্ধাই আগে তৎপরতা দেখালো বিধায় তাঁর রিক্সাতেই চড়তে বাধ্য হলাম। তাছাড়া তাঁর নিশ্চয়ই টাকার দরকার। আমাকে না নিয়ে বসে থাকলে বরং তাঁর ক্ষতি। একটা খ্যাপ আগে মারতে পারলে হয়তো একটু আগে ঘুমাতে যেতে পারবে।

যাহোক, রিক্সায় করে ফিরতে ফিরতে জানতে চাইলাম, 'চাচা, ছেলেমেয়ে নাই?' এই প্রশ্নটা আমি বৃদ্ধ রিক্সাচালক দেখলেই করি। করেই ভাবলাম, ব্যাথার আগুনে ঘি ঢেলে দিলাম নাতো?

চাচা ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়ে বললেন, 'আছে। এক ছেলে।'
কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলাম, 'সে কি করে? কাজ করে না? নাকি আপনাকে দেখে না? এই বয়সেও কেন আপনার রিক্সা চালাতে হচ্ছে? ছোট থেকে ছেলে মানুষ করে বাপ-মা কী জন্য? বুড়ো বয়সেও যদি এমন কষ্ট করা লাগে?'

চাচা যে পিছে ফিরবেন, সেই জো নেই। প্যাডেল মারাও থামালেন না, কারণ একবার ছন্দে ছন্দে প্যাডেল না মারলে পরেরবার টানতে আরও কষ্ট হবে। আরও জোরে প্যাডেল মারতে হবে, ফলে কষ্ট দ্বিগুণ হবে।
চাচা উত্তর দিলেন, 'সে চাকরি করে।'
-কী চাকরি করে, যে বাপকে এই বয়সে রিক্সা চালাতে পাঠায় এত রাতে?
-দারোয়ানের চাকরি করে। সে বাসা ভাড়া দেয়। তাতেই টানাটানি লাইগা যায়। তাই আমারেও গতর খাটতে হয়।
-দারোয়ানের তো বেতন একেবারে কম হওয়ার কথা না! থাকেন কই? বাসা ভাড়া কতো?
-নদীর ওপারে থাকি।
-বুড়িগঙ্গার ওপারে?
-হ, জিঞ্জিরা। বাসা ভাড়া ৫ হাজার।
-তো আপনার ছেলে দারোয়ানি করে ঢাকা শহরে ৫ হাজার টাকাও পায় না?
-মালিক খারাপ। টাকা কম দেয়।
-তাহলে অন্য মালিকের বাসায় কাজ করে না কেনো? না পোষালে নিজে রিক্সা চালাক, তবু বাপকে এই বয়সে... আচ্ছা, টাকা উড়ানোর স্বভাব আছে? মানে নেশা-টেশা?
-কে জানে? কয় তো মালিকে টাকা দেয় না!
-বিয়ে করছে ছেলে?
-না।
-বিয়ের আগেই এই অবস্থা! আমার মনে হয় ছেলে মেয়ে মানুষের পিছে আর নেশার পিছে টাকা উড়ায়। খোঁজ নেন।
-কী জানি!
-বিয়ের পরে তো আপনারে আর চিনবেই না। তখন যাবেন কই!
-জানিনা বাবা।

এরই মাঝে গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। তবুও চাচাকে এক কষ্টের গল্প শোনালাম। তাঁকে বললাম, 'আপনার ছেলের বাবা জীবিত আছে, তবু সে বাবাকে ঠিকমতো দেখে না, অথচ আপনি জানেন কী, এমনও ছেলে আছে যারা বাবাকে নিজের রোজগারের টাকায় একবেলা খাওয়াতে পারেনি বলে, একটা জামা বাবাকে কিনে দিতে পারেনি বলে কষ্ট পায়?'

চাচা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। রিক্সা আরও ধীর হয়ে গেলো। বললেন, 'সবই কপাল।'

ততক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। রিক্সা থেকে নেমে মানিব্যাগে হাত দিলাম। চাচা বললেন, 'দুঃখ কইরো না বাবা... ভাতিজা...'
আমি তাঁকে চকচকে একটা নোট দিয়ে বললাম, 'আজ আর রিক্সা চালাতে হবে না। যান, ছেলের সাথে ঘুমান গিয়ে।'

চাচার মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। চলে এলাম। শুধু শুনলাম, তিনি বিরবির করে কী কী যেন দোয়া করছেন।

এই রিক্সাচালকের জন্য কিছু করা যায়। কারণ তিনি হাত পাতেননি। বানিয়ে মিথ্যেও বলেননি। টিএসসি কিংবা কার্জনে রিক্সা নিয়ে 'বাপজান, একটা কথা ছিলো...' বলে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসা বুড়ো হলে স্রেফ বলে দিতাম- 'ভণ্ডামি ছেড়ে বাসায় যান।' কিন্তু এই বৃদ্ধ আলাদা। তিনি ছেলের মিথ্যেকেও বিশ্বাস করেন এবং এই বয়সেও মা-মরা ছেলের কষ্ট লাঘবে শীতের কয়াশা ঘেরা রাতেও রিক্সা চালাতে বাধ্য হন।

এই রিক্সাচালকের জন্য শ্রদ্ধা। তাঁর ছেলের সুমতি হোক। তাঁর কষ্ট লাঘব হোক।

-দেব দুলাল গুহ (দেবু ফরিদী)।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ২:৩৯
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পিনাকী ভট্টাচার্য কেন দেশে আসে না, জানেন?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৯


Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য তিনিঞ্চি কেন দেশে আসে না জানেন? তার পাসপোর্টই তাকে সে অনুমতি দেয় না। Meghna Alam থেকে প্রাপ্ত এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে তার পাসপোর্টে স্পষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের সেই এন্টিনিয়ার।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৮

কিছু স্বপ্ন, কিছু স্মৃতি এবং নানীর বাড়ি



আমি বেশ কিছুদিন ধরে একটি বিশেষ ধরনের স্বপ্ন দেখছি। স্বপ্নের কথায় যাওয়ার আগে কিছু পেছনের গল্প বলা প্রয়োজন।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময় থেকে অনার্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×