
আমারও একটা ছেলেবেলা ছিল । সেই ছেলেবেলায় আমার দুয়ারেও পূজার দিন আসতো । ঢাকের বাজনায় শরতের কাশফুলগুলো দুলতো । আর ছেলে-বুড়োরা সেই ঢাকের তালে তালে আরতি করতো । পাড়ায় পাড়ায় আরতি প্রতিযোগিতা হতো । এটি ছিল পাড়ার সবার জন্য সবচেয়ে আকর্ষণের বিষয় । প্রতিযোগিতার শেষে পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকতো । বাচ্চারা খালি হাতে ফিরতো না, একটু হাত-পা দোলালেই সান্ত্বনা পুরস্কার পেতো, খাঁটি বাংলায় যাকে বলে দুধ-ভাত!
আমিও এককালে দুধ-ভাত ছিলাম । বাড়ির একেবারে সামনেই পূজা মণ্ডপ । সেখানে ছোট-বড় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঢাকের তালে কিংবা সাউন্ডবক্সের গানের সাথে আমিও হাত-পা ছুড়তাম । কেন জানি সবাইকে নাচতে দেখলে আমারও নাচতে ইচ্ছে করতো । তারপর ঘুরতে বের হতাম । উদ্দেশ্য ছিল প্রতিমা দেখা । আমাদের ফরিদপুরে বরাবরই ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার ভেতর দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হয় । পায়ে হেটে এক শহরেই ৭০-৮০টা পূজা মণ্ডপ ঘুরে দেখা যায় । সবচেয়ে মজা লাগতো মণ্ডপে কারেন্টের কারসাজি । মা দুর্গা ত্রিশূল উঁচু করছেন, অসুরের সাথে কথোপকথনের এক পর্যায়ে হঠাৎ অসুরের কাঁধ বরাবর বসিয়ে দিলেন সেই ত্রিশূল! অসুর বলল, “মা গো, মা! আমি ধন্য হলাম রে মা! তোর হাতে প্রাণ দিয়ে আমার সব পাপ মুছে গেল...”
ফরিদপুরের সেই পাড়ায় আজও পূজা উদযাপিত হয় । আজও পাড়ার সবাই মিলে মেতে ওঠে আনন্দ-উৎসবে । শুধু সেই চির পরিচিত মুখ- আমার বাবা আর আমার সামনে আসে না । নতুন জামা কিনে এনে বলে না- “আমি জানি আমি যা পছন্দ করে আনব, তোর সেটাই পছন্দ হবে । তুই না আমার ছেলে? আমার পছন্দ আর তোর পছন্দ তো একই!” আমিও আর সেই জামা গায়ে জড়িয়ে ঘুরব না । এখন আর তাই বাড়ি যেতে ভালো লাগে না । সবাই যখন মণ্ডপের সামনে আনন্দ করে, আমি তখন বাইরের শত ডাক উপেক্ষা করে ঘরের কোণায় আশ্রয় নিই । দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিটির মাঝে বাবার আদর খুঁজি...
এমনটি আর ভালো লাগে না । তাই এবার ঢাকায় থাকব বলে ঠিক করেছি । দূরে থাকলে স্মৃতি কম কাঁদায় । বন্ধুরা, সবাইকে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানাই । পূজা সবার মনে অনাবিল শান্তি বয়ে আনুক । ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পূজা যেন হয়ে ওঠে সবার উৎসব । শুভকামনা ।
(লেখাঃ ২০১৩ সাল)
দেব দুলাল গুহ
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই অক্টোবর, ২০১৬ রাত ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




