somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লুকা মদ্রিচঃ শরণার্থী থেকে বিশ্বকাপ ফাইনালের ক্যাপ্টেন

১৫ ই জুলাই, ২০১৮ রাত ৯:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যদি বলা হয় ক্রোয়েশিয়ার প্লেমেকার কে? সবাই নিশ্চিত একবাক্যে জবাব দেবেন- লুকা মদ্রিচ! হ্যাঁ, তিনিই ক্রোয়েশিয়ান ফুটবল দলের অধিনায়ক, যার কাঁধে ভর দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়া, স্বপ্ন দেখছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবার। তিনিই 'গেইম চেঞ্জার'।
.
তাঁকে ঘিরে বিশ্বাস আর আবেগটা সে দেশে এতই বেশি যে সেদিন তিনি বলেই ফেলেছেন, যদি গ্যালারিতে জায়গা থাকতো, তাহলে গোটা ৪০ লাখ ক্রোয়েশিয়ানই নাকি মাঠে চলে আসতো! ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের দিন তিনি জয়ের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে বলতে গিয়ে যেমন বলেছেন, বৃটিশদের তাদেরকে ছোট করে দেখার মানসিকতাই তাদের জয়ের পথে প্রেরণা জুগিয়েছে! কিন্তু ক্রোয়েশিনদের এই প্রাণভোমরার জীবনে বড় হওয়াটা খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা ছিলো না। (লেখাঃ দেব দুলাল গুহ)
.
লুকা মদ্রিচের বয়স যখন ছয়, তখন তার দাদুকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। বৃদ্ধ ভদ্রলোক ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে অন্য দিনগুলোর মতোই সেই সকালেও তাঁর গবাদিপশু নিয়ে পাহাড়ে চড়েছিলেন। এই কাজটাই তিনি করতেন বৃষ্টি কিংবা রোদে, শীত কিংবা গ্রীষ্মে। কিন্তু সেদিন আর তিনি গবাদিপশু নিয়ে ফিরে আসেন নি। পুলিশের উর্দি পরিহিত কিছু মানুষ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিলো। যদিও তারা আসলেই পুলিশ ছিলো, নাকি পুলিশের উর্দিতে অন্য কেউ, তা জানা যায়নি। কাগজে কলমে নয়, বরং ক্ষমতাটা তখন এসেছিলো বন্দুকের ব্যারেলে।
.
বৃদ্ধ মানুষটার দোষ ছিলো ওই এলাকার অন্যদের মতোই, সাম্প্রদায়িকতা যার মূল কারণ। তিনি ওদের গোষ্ঠীর একজন ছিলেন না, ছিলেন সংখ্যালঘু। তিনি একজন ক্রোয়েশিয়ান, এটাই তাঁর দোষ ছিলো! আর তারা ছিলেন সার্বিয়ান, এজন্যই তিনি তাদের শত্রু!শুধুমাত্র এই একটা কারণেই লুকা মদ্রিচের দাদুকে এবং আরও কয়েকজনকে কাছের এক গ্রামে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হয়!
.
তিনি মৃত্যুবরণ করার আগে একটি পরিবার রেখে যান, যেখানে তাঁর প্রিয় নাতি লুকা মদ্রিচ ছিলো, যাকে তিনি গল্প শোনাতেন, যার চোখে তিনি ছিলেন নায়ক! সেই ছোট্ট ছেলেটিই আজ ৩২ বছরের সোমত্ত যুবক, ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে একটি জাতির নেতৃত্ব দিচ্ছে!
.
দাদুর মৃত্যুর পর লুকার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বছরের পর বছর তাদেরকে যাডার শহরের একটি সস্তা হোটেলে থাকতে হয়েছে। যুদ্ধের সময় যখন মর্টারের শেল এসে পড়তো, বয়সে ইয়াং লুকা মদ্রিচ তখন রুমের ভেতর বসে অপেক্ষা করতো কখন বোমা হামলা শেষ হবে। হলেই সে হোটেলের কার পার্কিংয়ে ফুটবল খেলতে নেমে যেতো, কখনও একা আবার কখনও অন্য শিশুদের সাথে।
.
লুকার উচ্চতা এতোটাই কম ছিলো, যে স্থানীয় দল বিগউইগস হ্যাজুক তাঁকে নিলো না। তারপর ১৮ বছর বয়সে বসনিয়ান-হার্সেগোভিনান লীগে জ্রিন্সকি মোস্টার এর হয়ে খেলার সুযোগ পেলো। দলের এবং প্রতিপক্ষের সবাই এই ছেলেটার মাঝে দুটি জিনিস আবিষ্কার করলোঃ চাহিদামতো সকল দক্ষতাই এই ছেলের আছে, এবং সে নিজের খেয়ালটাও নিজেই রাখতে পারে।
.
এরপর ১৫ বছর কেটে গেছে, টটেনহামসহ অন্য দল ঘুরে লুকা রিয়াল মাদ্রিদে এসেছে। যদিও এখনও তাঁকে দেখায় সেই আগের মতোই, গার্ডিয়ান পত্রিকার বার্নি রনের ভাষায় যাকে বলা হয়েছে ‘পিশাচের মতো পোষাকে একটি ছোট বালক’, কিন্তু লুকা এখন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন, একজন অসম্ভব প্রতিভাধর মিডফিল্ডার, যিনি সময় এবং স্থানকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে জানেন।
.
তাঁর আরও একটি গুণ হলো, তিনি অন্যদেরকে ভালো খেলাতে পারেন। যখন সাধারণ একটা পাস করাই সেরা অপশন, তখন তিনি পাসই দেন। যখন কিছুক্ষণের জন্য বলটা ধরে রাখা দরকার, তখন তিনি সদলবলে তাই করেন। আবার দলের অন্য কারো ভুলকে শুধরে নেয়ার প্রয়োজন পড়লেও তিনিই এগিয়ে আসেন। তিনি একজন সুপারস্টার নাহলেও তেমন একজন, যার উপস্থিতি একই শার্ট পরিহিত বাকি ১০ জনকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি নিজেই নিজেকে নেতা বানাননি, বরং তিনি হয়েছেন। তাঁকে দেখা যাবে না জয়ের পর শার্ট ছিঁড়ে গোল উদযাপন করতে, কিংবা পরাজিত হয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে। তিনি এসব মেসি নেইমার রোনালদোদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। অথচ তাঁরা সবাই বাড়ি ফিরে গেলেও তিনি এখনও বিশ্বকাপে টিকে আছেন, যেমনটি আছে তাঁর দল!
.
ক্রোয়েশিয়া দলটা তাদের ক্যাপ্টেন লুকা মদ্রিচকে ভালোবাসে। যখন ডেনমার্কের বিপক্ষে সে প্যানাল্টি মিস করে, তখনও তাঁরা তাঁর পাশে ছিলো। ফলে সাথে সাথেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন লুকা। আজকের ফাইনালেও গোটা জাতি তাঁর কাঁধেই ভর করে জয়ের স্বপ্ন দেখবে।
.
এই ক্রোয়েশিয়ান দলটা যে তাদের দেশের কাছে কী অর্থ বহন করে, তা সহজেই বোঝা যায় যখন দেখা যায় সস্তা ইকোনমিক টিকেটে রাশিয়া গিয়ে প্রায় প্রতিটি খেলা দেখা সুন্দরী রাষ্ট্রপতি নিজেই সেমিফাইনাল জয়ের পর তাদের ড্রেসিং রুমে গিয়ে কোচ ও খেলোয়াড়দের বুকে জড়িয়ে উৎসাহ দেন, কিংবা তাদের মন্ত্রীসভায় সবাই ক্রোয়েশিয়ান জার্সি পরে উপস্থিত হন, কিংবা যেই রাষ্ট্রপ্রধানের সাথেই তাঁদের প্রেসিডেন্ট দেখা করেন, তাঁকেই নিজের দেশের জার্সি উপহার দেন!
.
এই লেখাটা যখন লিখছি, তখন রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনাল শুরু হয়ে গেছে। আজ কে জিতবে? ফ্রান্স নাকি ক্রোয়েশিয়া? আমি জানি না। তবে বিশ্বের অধিকাংশ আশাবাদী মানুষের মতোই আমিও চাইবো বিশ্ব আজ নতুন চ্যাম্পিয়ন পাক। হ্যাঁ, লুকা মদ্রিচের হাতেই বিশ্বকাপের সোনার ট্রফিটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় আছি।
.
দেব দুলাল গুহ/ দেবু ফরিদী
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লুচ্চামি আর যৌন হতাশা এক বিষয় না।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২


সম্প্রতি জামায়াতের এক লুচ্চা এমপি-র অন্তত দুইজন তরুণী নিয়ে কট খাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। তিনি তরুণী নিয়ে হোটেল, কোচিং সেন্টারে রুম ডেট করতেন। নেটিজেনরা তার এই লুচ্চামি এমনভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি আমার আধো আধো সকাল হবে?

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬

তুমি আমার আধো আধো সকাল হবে?
-মোঃ মুসা (গাঙচিল)

তুমি আমার আধো আধো সকাল হবে?
ঘর কাপলের জোড়া শালিক!
শেষ শিশিরের নরম আলো
তোমার মনে মুখটা একটু ধুইতে দেবে?

তুমি আমার নৌকা বিহীন নদী হবে?
বৈঠা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রপতির বিদায়ঘণ্টা: রাজনীতি ও নৈতিকতা

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:১৩



বাংলাদেশের রাজনীতি অঙ্গনে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের গুঞ্জন। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের
পদত্যাগ কেবল একজন ব্যক্তি বা কোন একটি বিশেষ পদের পরিবর্তন নয় বরং এটি দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির ডায়েরি: শৈশবের মাছ ধরা, বৃষ্টির দিনে কইয়ের পদযাত্রা আর হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো!

লিখেছেন ওয়াদুদ সোহেল মোল্লা, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৫৯


সামহয়্যার ইন ব্লগের সবাইকে শুভেচ্ছা। শহরের যান্ত্রিক জীবনে যখন হাঁপিয়ে উঠি, তখন স্মৃতির জানালা গলে উঁকি দেয় ফেলে আসা শৈশব। আমার ছোটবেলার সবচেয়ে বড় নেশা আর শখ ছিল—মাছ ধরা! ছিপ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেনাবাহিনী যখন দেশপ্রেম দেখাতে ব্যর্থ ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৫ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১:৫০



গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে আসা বিএনপি নেতা রাশেদ খান বলেছেন, ‘ক্যান্টনমেন্টের স্পষ্ট ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর নাহিদ ইসলাম এক দফার ঘোষণা করেছিলেন।’ জুলাই বিক্ষোভ নিয়ে শুক্রবার নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×