somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভালোবাসা শুধু যে কাঁদায় / বাবু ফরিদী (২)

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজ দুদিন ধরে কী যে আনন্দ পাচ্ছি! কী ভয়ানক আনন্দ, কষ্টকর আনন্দ পাচ্ছি আমি! কী রকম আনন্দ? স্বর্গলাভের আনন্দ। কিন্তু স্বর্গলাভের পর কেমন আনন্দ হয়, তা তো মর্তবাসীর জানবার কথা নয়। তা তো শুধুই অনুভবের। পুণ্যবান মানুষ যেমন স্বর্গলাভের আশায় সৎকর্ম সম্পাদন করে আর স্বর্গসুখ আস্বাদন করে, ঠিক তেমন আনন্দের অনুভবে কাটছে আমার বর্তমান সময়।
.
কমল তাহলে মরে নি। কমল বেঁচে আছে! আমার নিজের চোখকেও আজ অবিশ্বাস করতে হচ্ছে। নিজের ত্বকে চিমটি কেটে বিশ্বাস আনতে হচ্ছে-- কমল মরেনি, কমল মরেনি, কমল এখন চল্লিশোর্ধ যুবক। আমার কমল বাংলাদেশের এক শহরে আমার স্মৃতিময় শৈশব-কৈশোরের মাটি আগলে আমার স্মৃতিকে লালন করছে।
.
আর আমি, জয়বাংলার লোক। একাত্তরে শরণার্থী হয়ে বাবা-মা ভাইবোনদের সাথে এসেছিলাম ভারতে। জয়বাংলা স্বাধীন হলে ফিরে গেলাম সেখানে, আবার বিয়ের পর স্বামীর হাত ধরে চলে গেলাম শ্বশুরবাড়ি। কদিন যেতে-না-যেতেই স্বামীর হাত ধরে আবার এলাম ভারতে। জন্মসূত্রে জয়বাংলার নাগরিক-- বিবাহসূত্রে এখন ভারতীয়। দীর্ঘ বাইশটি বছর জয়বাংলা ফেলে, পিতা-মাতা ভাইবোনদের স্মৃতিসাহচর্য ভুলতে যত কষ্ট লাগেনি, তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছিল কমলের স্মৃতিগুলো ভুলতে। সে কষ্ট কষ্টকর হলেও ভুলতে তেমন সময় লাগেনি। কারণ মৃত মানুষের স্মৃতিগুলো তো জীবিত মানুষের জন্য একটা বোঝা, সে বোঝা যত শীঘ্র সম্ভব পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। আর জীবিত মানুষ বেঁচে থাকলে একদিন দেখা হবে, এই তো সান্ত্বনা।
.
বাবা-মা ভাইবোন প্রথম যে-হারে আসা-যাওয়া করতেন, এখন আর তা তেমন হয় না। বাবা-মা বুড়ো হয়েছেন, ভাইবোনেরা বিবাহিত জীবনে নিজ নিজ সংসার নিয়েই ব্যস্ত। কালেভদ্রে যাও-বা আসেন, আমরা ভারতীয় তাঁরা বাংলাদেশী। আতিথেয়তা ও আন্তরিকতায় দুটি দেশের অবস্থান দুই মেরুতে। যদিও নৈহাটিতে দাদা একটি বাড়ি করেছেন হালে, তবু তা দূর-আত্মীয়ের মতোই সম্পর্কিত।
.
এই বাইশ বছরে কমল সম্বন্ধেও কারো কাছ থেকে কিছু জানা হয়নি। জানতে চেষ্টাও করিনি। কারণ আমি নিজ চক্ষে যেখানে কমলের থেঁতলানো লাশ দেখে এলাম, লোকজনকে চিৎকার করে করে বলতে শুনলাম-- লোকটি ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে, তার ওপর কমলকে নিয়ে আমার অভিভাবকদের যা এলার্জি-- এরকম অবস্থায় মৃত কমলকে তো আমার না ঘাঁটাই শ্রেয়। যেখানে আমি একজনের বিবাহিত স্ত্রী! আমি তো নারী, আমারও ভবিষ্যৎ আছে।
.
গতকালই জানলাম কমল সেদিন সিগন্যাল পোস্টে বারি খেয়ে পড়ে গিয়েছিক ঠিকই। কিন্তু রক্ষে, ট্রেনের নিচে কাটাও পড়েনি বা ভাংচুরও হয়নি। শরীরে একটু কেটে ফেটে গিয়েছিল। এজন্য ওকে হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিক অনেক দিন।
.
কালের গতি তো কেউ কোনোদিন থামাতে পারেনি। তার নিষ্ঠুর চাকার নিষ্পেষণে কত প্রাণ যে ঝরে যায়, কী সে ফেলে গেলো, কী রেখে গেলো; নিষ্ঠুর কাল তো তার হিসেব কষে না। কিন্তু আজ হঠাৎ সাঁইত্রিশ বছরের গণ্ডি সে তুলে নিয়েছে, আমি মহাকালে অনুপ্রবিষ্ট, আমার সামনে পিছন নেই-- আমি স্থির ধ্রুব দাঁড়িয়ে আছি এই ১৯৯৭-তে পা রেখেও ১৯৭১-এ। আমার সন্তানের জন্মদিন একুশে এপ্রিলে দাঁড়িয়েও খুঁজছি একাত্তরের একুশে এপ্রিল। যেদিন আমাদের হাতের তালুতে প্রাণ নিয়ে পাক হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের ভয়ে পালাতে হয়েছিল গ্রামে, শরণার্থী হতে হয়েছিল কল্যাণী ক্যাম্পে। জয়বাংলা স্বাধীন হলে আবার বাংলাদেশ এবং বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর, আমার কমলকে নিয়ে যত দিনরাত্রি।
.
কিন্তু এমন হল কী করে, এতদিন পরে কমলের সব স্মৃতি হৃদয় থেকে মুছে স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়ে যখন সুখময় সময় কাটছিল, তখন নতুন করে আবার কমল কেন?
[চলবে]
.
ভালোবাসা শুধু যে কাঁদায় / কবি বাবু ফরিদী।
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য সাইলেন্ট ইকো

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১০


এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ফিকশনাল ইনভেস্টিগেটিভ ক্রাইম থ্রিলার। গল্পের সমস্ত চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, স্থান, সাল ও অপরাধের মোটিভ লেখকের কল্পনানির্ভর। বাস্তব কোনো ব্যক্তি, পেশাজীবী বা অমীমাংসিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাপাসিটি চার্জের পর এবার নজর খাম্বায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৩


বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে কেবল একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের মাসে প্রিপেইড মিটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৯



কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি সংবিধানের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই বেশি হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×