
রক্তপাতহীন বিরল নির্বাচনে হেরেও গদি ছাড়তে নারাজ মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতাচ্যুত হলেন সাংবিধানিকভাবেই, রাজ্যের রাজ্যপাল দ্বারা। রাজ্যপাল ভারতের একটি রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। সামান্য একটা রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের হাতে বেজ্জতি হয়ে গদি হারালেন দিল্লীর মসনদে আসীন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর মমতা! তাঁর গোটা সরকারই ভ্যালিডিটি হারালো।
অন্যদিকে, নির্বাচনের (হোক বিতর্কিত) মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনা প্রাণ বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে দেশান্তরিত হয়ে নিরাপদ স্থানে আত্মোগোপনে আছেন। জানা যায়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে। সাংবিধানিকভাবে শেখ হাসিনার এখনও সরকার প্রধান হিসেবে দেশে ফেরার সুযোগ আছে। সাংবিধানিকভাবে এখনও তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার, পদত্যাগ করেননি। তিনি বেঁচেও আছেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে যে জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেছিলো, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি ও দিল্লীর অরবিন্দ কেজরিওয়াল ছিলেন তার অন্যতম বড় সমর্থক। তাঁরা দুজনই আবার নরেন্দ্র মোদি ও কংগ্রেসেরও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ও ঘোর বিরোধী। কেজরিওয়াল দিল্লীর গদি হারিয়েছেন, চেন্নাই গিয়ে ডিএমকের পক্ষে প্রচারণা করে ডিএমকেকেও হারিয়েছেন। আবার পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে মমতার পক্ষে প্রচারণা করে কুফা লাগিয়েছেন মমতার ভাগ্যেও!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিজেপির হঠাৎ এভাবে বঙ্গজয়ের পিছে শেখ হাসিনার মস্তিষ্ক নেই তো? দিল্লী বসে বসে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, রাজনাথ সিং, এস জয়শংকর ও অজিত দোভালদের তিনি মমতাবধের উপায় বাতলে দেননি তো? এটা সবারই জানা যে কংগ্রেসের সাথেও শেখ হাসিনার আছে অত্যন্ত ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক। পশ্চিমবঙ্গে এবার কংগ্রেস বেশি আসন না জিতলেও বারবার তৃণমূলের কট্টর সমালোচনা করেছে, বিজেপিকে সেভাবে করেননি কংগ্রেস মুখপাত্র অধীরবাবু। কোথাও কি কোনো রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে? তবে কি লোকাল দল তৃণমূলকে অপাংতেয় করতে সর্বভারতীয় দুই বড় দল কংগ্রেস ও বিজেপি ভেতরে ভেতরে এক হয়ে লড়ে মমতাকে হারালো? ওপাড়েও লড়াইটা কি হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মিত্রশক্তি (কংগ্রেস+বিজেপি) বনাম বিরুদ্ধশক্তির (জামায়াত+এনসিপি) মাঝে?
ভুলে গেলে চলবে না, এই মমতা ব্যানার্জির কারণেই ২০১১ সালে কংগ্রেস সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও তারপর বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে এসেও তিস্তা চুক্তি ও গঙ্গা পানিচুক্তি চূড়ান্তভাবে সাইন করতে পারেননি। দুই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ৩৭.৫% পানি দিতে রাজি হলেও শেষ মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জি রাজি না হওয়ায় সে চুক্তি আর করা সম্ভব হয়নি ভারতের কেন্দ্র সরকারের।
এখন মমতা ব্যানার্জির শোচনীয় পরাজয়ের পর, ঐ চুক্তি হতে আর কোনো বাধা রইলো না। ফলে, ভারত বিরোধিতার আর তেমন জায়গা থাকছে না। বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষের জায়গাও আর খুব একটা থাকবে না যদি তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি আসে, সীমান্তে হ-ত্যা বন্ধ হয়। মমতা ব্যানার্জির সরকার জমি দিচ্ছিলো না বলেই হাজার হাজার কি:মি: সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দেওয়া যাচ্ছিলো না, ফলে সীমান্তে গরু চোরাচালান বা অবৈধ অনুপ্রবেশ কমানো যাচ্ছিলো না। বিএসএফও উপায়ান্তর না দেখে গুলি চালাতে বাধ্য হতো। কাটাতারের বেড়া থাকলে হয়তো অনুপ্রবেশের চেষ্টা কমে যাবে, গুলি করে খু-ন (যা সমর্থনযোগ্য নয়) এরও আরও প্রয়োজন হবে না। ফলে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও উন্নত হবে। চীন বা আমেরিকা আর এই দুই প্রতিবেশী দেশের মাঝে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ঝামেলা পাকাতে পারবে না।
প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক ভালো থাকলে উভয়ের জন্যই মঙ্গল। যুদ্ধ-ঝামেলা করে সময়, অর্থ ও শ্রম নষ্ট না করে ঐ সময়টা গঠনমূলক কাজে লাগিয়ে উভয়ে মিলেই সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।
ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব অমর হোক।
লেখা : দেব দুলাল গুহ
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



