somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেঠো পথের বাঁকে – আমের প্রতিক্ষায়

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুটো দোয়েল লেজ নাড়িয়ে আমগাছের ছাপর এক ডাল থেকে অন্য ডালে ভুড়–ৎ ভুড়–ৎ করে লাফালাফি করছে। সহসাই তারা এ গাছ ছেড়ে অন্য গাছের আঁড়ালে হারিয়ে গেল। একটা পাখি ডাকছে। হলুদ রঙের পাখিটা। মাথায় কালচে দাগ। মনে হচ্ছে সে ডাকছে ‘বউ কথা কও, বউ কথা কও’ এরকম সূরে। বরই গাছের আগাডালে অসংখ্য বাবুই পাখিদের ফুড়–ৎফুড়–ৎ উড়োউড়ি করছে। গাছতলায় সকাল থেকে বসে রয়েছে দুই জমজ বোন, রেনুবেনু। তাদের একজনও কেউ একটা আমও এতক্ষণে পায় নি। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখন বাড়িতে ফিরতে হবে ভাবতেই মনটা তাদের খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই আম কুড়ানোর দিনগুলো তাদের একসময় হাত ছিনিয়ে কাছে ডাকবে, আবার হয়ত জীবনের বড় কোন ধাক্কায় এ সময়গুলো মনে করার স্মৃতীও হারিয়ে ফেলবে।
মাসুদ আর সেলিম দুই জন গলাগলি ধরে আমগাছতলের সন্নিকটবর্তী হচ্ছে। এরা এ পাড়ার মানিকজোড়। যেখানেই যায়, যাই করে প্রায় সময় একসাথেই থাকে। গাছের নিচে পুষ্প, আসমানিরা এসে তাক ধরে বসে রয়েছে। অদূরে আদরি পিয়ালেরা নিমতলে ভেঙ্গে যাওয়া খোলাপাতির ঘর থেকে টুকরি গুছিয়ে নিচ্ছে। ডাঙ্কাগাড়ি বাড়িতে রেখে এসে কাঠের খেলনা ট্রাক দড়ি ধরে টেন নিয়ে আসছে রেজা। চাকা চারটে কাঠের হলুদ রং করা। ট্রাকের উপরে দুটো আম। নীলচে গায়ের রঙের ফড়িংকে ধরার লক্ষ্যে যেই মাসুদ সামনে হাত বাড়িয়ে এগিয়েছে ওমনি ফড়িংটা ফড়ফড় করে উড়ে গেল। গাদুর মা এসে বকাবকি শুরু করে দিয়েছে ‘আম বড় না হতেই চেংরাপেংরাদের কী অত্যাচার শুরু হয়েছে বাবা। ঘর নাই বাড়ি নাই। সরাদিন এক গাছের নিচে বসে থাকে।’ বকাবকি শুরু হলে অবশ্য কেউ কেউ নড়েচড়ে বসে। সেলিম খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আঁখির মায়ের প্রস্থানের জন্য অপেক্ষা করে। ‘এই আঁখি পড়তে বসেছে, বেশি হুটপাট করিস না।’ আবারও গাদুর মায়ের কড়া হুঁসিয়ারি ভেঁসে এল। সাথে সাথেই সবার চেঁচামেচির প্রাবল্যতা খানিকটা কমে আসে।
কান্নাকাটির পরে আদরির মা আদরিকে গাছ তলায় পাঠিয়ে দিয়েছে। আদরিকে নির্ভয় দিয়ে বলে ‘যা তোর আঁখি বোনের সাথে থাক দেখি গাদু আবার কখন আসে।’ মেলা থেকে কেনা চুরি মালা পড়েছে আদরি। সে আগ্রহভরে সবাইকে তার চুরির গাছি দেখাচ্ছে। আদরির নখগুলো সব বড় হয়ে গেছে। পাড়ার ছেলেমেয়েদের সবারই নখ কেমন বড় বড়। নখ কেউ আপন ইচ্ছায় কাটতে চায় না। আঁচড়া আঁচড়ির সময় নখগুলো ধারালো মোক্ষম জুঝার হাতিয়ার বনে যায়। মারামারিতে বড় নখের প্রয়োজন অনস্কীকার্য। আদরি তার মুরগির বাচ্চাটাকে ধরতে চাইতেই মা মুরগীটাঠোকানোর জন্য তেড়ে এল। ভয়ে বাচ্চা হাত থেকে রেখেই দৌড়। মুরগীও উড়ে উঠে চোখে মুখে দিল ঠোক। আতঙ্গে কঁকিয়ে উঠল আদরি। জানটাই তার নড়ে উঠেছে।
এলি গামছা পড়ে বৌ সেজে গাছতলে এসেছে। তাকে দেখে আদরিও আবার গাছতলা এসে জটলা পাকায়। নতুন বেতের কাঠার ভেতরে মুড়ি এনেছে এলি। ফোকলা দাঁতে মিশ্রির তৈরী হাতি ঘোড়ায় একটা করে ছোট্র ছোট্র করে কামড় বসাচ্ছে। তার নাক দিয়ে বরকির ঠ্যাঙ বের হচ্ছে। পিয়াল খোলাপাতির টুকরি বাড়িতে রেখে ফিরে এসেছে। অল্পকিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা এসে হাজির। আম পড়ল ধপ্পাস করে। তবে এদিকের ডাল থেকে না , বরং ঐ পাগাড়ের উপরের ডালটা থেকে। ডালটা খানিকটা লম্বা হয়ে সন্ধ্যাদের পায়খানার উপর উঠে গেছে। সন্ধ্যাদের পায়খানা ঝোপের ভেতরে। আম পড়েছে পায়খানার উপর। আমটা নরম গুয়ে খানিকটা দেবে গেছে। এখন কি করবে সেই চিন্তা করছে রেজা। আমটা কি উঠাবে, না আবার উঠালে কে কি বলে সেই চিন্তা করছে। আমটার দিকে তাকাতেই মনটাই দুর্দশাগ্রস্থ হয়ে যায়। তাকে নিষেধ করে গাদু ‘এই ঐ গুয়ে পরা আম আর উঠাস না।’ মাসুদ সেলিমকে দূর থেকে তলব করে। ‘এই সেলু, তাড়াতাড়ি আয়।’ সেলিম আর মাসুদ মানিকজোড় হওয়ায় সে কালবিলম্ব না করে মাসুদদের বাড়ির দিকে চম্পট দৌড় দিল।
সন্ধ্যা এখন হুজুগ উঠায়, ‘চল ওয়ান, টু, থ্রি খেলি।’ সন্ধ্যা সড়গড় করে ছড়া কাটছে ‘ওয়ান টু থ্রি, পাইলাম একটা বিড়ি, বিড়তে নাই আগুন, পাইলাম একটা বেগুন, বেগুনে নাই বিচি, পাইলাম একটা কাঁচি, কাঁচিতে নাই ধার, পাইলাম একটা হার, হারেতে নাই লকেট, পাইলাম একটা পকেট, পকেটে নাই টাকা, ক্যামনে যামু ঢাকা, ঢাকাতে নাই গাড়ি, ক্যামনে যামু বাড়ি, বাড়িতে নাই ভাত, পুটকী শুকিয়ে থাক, পুটকীতে হলো ঘা, ডাক্তারখানায় যা, ডাক্তারখানা বন্ধ, পুটকীতে হলো গন্ধ।’ পুটকীতে গন্ধ হল কথাটা বলার সাথে সাথে সব নাক মুখ চেপে ধরছে। ‘কার পুটকীতে গন্ধ হল?’ ‘পুষ্পের পুটকীতে গন্ধ।’ ‘আমার না আমার না গাদুর পুটকীতে গন্ধ!’ সবাই হৈ হৈ করে উঠল। ‘গন্ধ! গন্ধ! গাদুর পুটকীতে গন্ধ! গন্ধ!’ একটা ভালো মেজাজ নিয়ে বসেছিল গাদু। পুষ্পের বাড়াবাড়িতে গায়ে এখন রাগ উঠা শুরু করল। মনে মনে সে আরও দশদিনে মতো প্রতিজ্ঞা করল, যেদিন বড় হয়ে বাপের মতো হবে, সেদিন পুষ্পদের এমন বেমক্কা এক ঘুঁষি দিবে যে তখন তারা সব বাপের নাম ভূলে যাবে। এলির দিকে রাগান্বিত চোখে তাকায়। সে এতটুকুন পুচকি, তার কত্তবড় সাহস, সেও গাদুকে ক্ষেপাচ্ছে। ‘গাদুর পুটকীতে গন্ধ, গাদুর পুটকীতে গন্ধ!’
পিয়াল বলল ‘এই তোরা কেউ গাদুর কাছে যাস না। ওর পুটকীতে গন্ধ, ও যাকে ছুঁবে সেই অচ্ছুত হয়ে যাবে।’কেউ আর গাদুর ধারে কাছে ভীড়ছে না, সে সেদিকেই যাচ্ছে সেদিকটাই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মনটা খারাপ করে চুপ করে পিছমোড়া করে গাছটা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। মনটাই বেজার হয়ে গেছে। বুদ্ধিহীন প্রাণীর মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে। চালের উপর চালকুমড়ার দিকে খেয়াল অধিশ্রিত করল। সেদিনই দেখেছিল ছোট, এই ক’দিনেই বেশ বড় হয়ে গেছে? সেদিকে গোমুখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। জঙ্গোলের ভেতরে উপর বড় একটা কানা মাটির কলসি। কাত হয়ে পড়ে রয়েছে। আর কারও দিকে তাকাচ্ছে না। পিয়ালেরা আবার ক্রোধদ্রেককর শ্লোক বলা শুরু করেছে। ‘ওয়ান টু থ্রি, পাইলাম একটা বিড়ি, বিড়তে নাই আগুন, পাইলাম একটা বেগুন, বেগুনে নাই বিচি, পাইলাম একটা কাঁচি, কাঁচিতে নাই ধার, পাইলাম একটা হার, হারেতে নাই লকেট, পাইলাম একটা পকেট, পকেটে নাই টাকা, ক্যামনে যামু ঢাকা, ঢাকাতে নাই গাড়ি, ক্যামনে যামু বাড়ি, বাড়িতে নাই ভাত, পুটকী শুকিয়ে থাক, পুটকীতে হলো ঘা, ডাক্তারখানায় যা, ডাক্তারখানা বন্ধ, পুটকীতে হলো গন্ধ।’..। শ্লোকগুলো তার ঠোঁটস্থ। সেও আওড়াতে লাগল মনে মনে। ঊল্কা নেংটো টেপাকে কোলে এসেছে। চোখ ডলতে ডলতে হাজির হল ছালাম। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কান্না করে ফিরছে। ‘ঐ আমাকে খেলতে নে রে?’ সন্ধ্যা সরাসরি অস্বীকৃতিপূর্ণ মনের ভাবে বলে ‘না না ওকে খেলতে নিস না। ও খালি মুখ খারাপ করে। মা ওর সাথে খেলতে নিষেধ করেছে।’ তবে এলি খানিকটা নরম হয়ে বলে ‘তুই আর মুখ খারাপ করবি?’ ছালাম সানন্দে রাজী হয়ে বলে ‘ধ্যাত চ্যাটের বাল, আমি কোনদিন মুখ খারাপ করি?’ ছালাম ফের মুখ খারাপ করলেও প্রতিনিয়ত এসব গালি শুনতে হয় বিধায় কারও কাছে সেটা মুখ খারাপ বলে মনে হল না, বরং স্বাভাবিক কথাবার্তাই ঠাহর হল। ছালামকে শপথ পাঠ করায়ে নিচ্ছে সন্ধ্যা। ‘আজ থেকে আমি’ ‘আজ থেকে আমি’ ‘আজ থেকে আমি আর কোন দিন’ ‘আজ থেকে আমি আর কোন দিন’ ‘বাপ মা তুলে’ ‘বাপ মা তুলে’ ‘গালি দিব না’ ‘গালি দিব।’ ‘এই ব্যাটা বল গালি দিব না।’ ‘গালি দিব না।’ ‘ঠিক আছে। এখন মাটি ছুঁয়ে বল।’ ‘এই মাটি ছুঁয়ে কিরা করলাম।’ ‘আচ্ছা, এর পরও যদি বাপ মা তুলে গালি দিস তাহলে রাতের বেলা মুখ দিয়ে রক্ত উঠে তুই সকালে মরে থাকবি।’ এখন এখানে এসে দাঁড়া আয়।’
ছালামকেও খেলায় অন্তভূক্ত করায়ে সন্ধ্যা আবার ছড়া কাটা শুরু করল ‘ওয়ান টু থ্রি, পাইলাম একটা বিড়ি, বিড়তে নাই আগুন, পাইলাম একটা বেগুন, বেগুনে নাই বিচি, পাইলাম একটা কাঁচি, কাঁচিতে নাই ধার, পাইলাম একটা হার, হারেতে নাই লকেট, পাইলাম একটা পকেট, পকেটে নাই টাকা, ক্যামনে যামু ঢাকা, ঢাকাতে নাই গাড়ি, ক্যামনে যামু বাড়ি, বাড়িতে নাই ভাত, পুটকী শুকিয়ে থাক, পুটকীতে হলো ঘা, ডাক্তারখানায় যা, ডাক্তারখানা বন্ধ, পুটকীতে হলো গন্ধ। ডাক্তারখানা বন্ধ, এলির পুটকীতে হলো গন্ধ।’ এলির গন্ধ হওয়ার কথা শুনেই আবার তড়াক করে লাফিয়ে উঠল গাদু। সাথে সাথে মনের সব দুঃখও ঘুঁচে গেল। সেও ব্যাঙের মতো ঘপাৎ করে দুই লাফ দিয়ে সবার তালে তালে বুলি আওড়াতে লাগল, ‘এলির পুটকীতে গন্ধ!’ সেও এবার নাক মুখ খুঁসে বন্ধ করে রাখল। এর পরে কে জানে কখন কার পুটকীতে গন্ধ হবে। পিয়ালদের গাছতলাটার ওদিক থেকে সেলিম ডাকাডাকি করছে। কাঠের একটা গাড়ি টেনে নিয়ে আসছে সেলিম। সেদিকে সব দৌড়ে গেলে গুয়ে পড়া আমটাকে দেখিয়ে দিচ্ছে। সবাই এক দৌড়ে গিয়ে গিয়ে দেখে আসল, একটা বড় আম পড়ে রয়েছে গুয়ের গা ঘেঁষে। কেউ আম না নিয়ে এবার জটলা পাকানো শুরু করল সন্ধ্যাদের উঠোনে। গোবরার গোলাঘরের পাশেই সন্ধ্যাদের উঠোনের অবস্থান। পারুলদের ছাগরের বাচ্চাটা মাঝে মধ্যে মাটির দেয়াল সিঁটিয়ে দৌড়ে দৌড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। দেয়ালের আলম্বে অনেকখানি লাফিয়ে উঠে শূণ্য ভারসাম্যরক্ষার মত দাঁড়িয়ে থাকে। সেলিম আদর করলে ছাগছানাটা মাথা নিচু করে চান্দি ঠেকিয়ে তাকে ঠেলতে থাকে।
ঊর্বশী এসে এলিকে ধমকায় ‘ এই দুপুরের বেলা গাছ তলায় যাস কি জন্যে? এখন খালি ভূতেরা ঢিল দেয়।’ ‘না, বাবা, আমি আর দূপুর বেলা ঐ গাছের নিচে যাব না। খালি ভূতে ঢিল দেয়।’ ঝন্ঝন্ শব্দে পাড়ার ভেতর থেকে বালা চালিয়ে এল মাসুদ। ঊর্বশীর মাথায় প্রথম বুদ্ধিটা ঝিলিক দিল। ‘এই শোন, আমরা এই খেলা বাদ দিই।’ শ্লোক বলা থামিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল এলি , ‘বাদ দিয়ে কি খেলবি?’ ‘এই খেলা বাদ দিয়ে আমরা, আমরা, চল ইচিং বিচিং খেলি।’ ইচিং বিচিং খেলার কথা শুনে এলি আর সন্ধ্যা আনন্দে ডুগডুগি বাজানো শুরু করল। গাদুর কুঁজো দাদী একবার ভুলকি মেরে দেখে গেল তার গুনধর নাতি ঠিকঠাক মতো আছে কিনা বা অন্য কারও সাথে মারামারিতে লিপ্ত হল কিনা। ততক্ষণে সেলিম আর মাসুদ আবার ফিরে এসেছে। এখন তারা কার হাত কত শক্ত সেটার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেলিম মুষ্টি পাকিয়ে হাত পেতে থাকে। মাসুদ মুষ্টি পাকিয়ে ঘুঁষি মারে। আঙ্গুলের গাঁট্রায় গাঁট্রায় লেগে কড়াত কড়াত শব্দ হয়। একটু পরেই দুই জনেরই হাত লাল হয়ে গেল। হাড্ডির উপর হাড্ডি লেগেছে। মাসুদ হাত ডলতে ডলতে বলছে ‘না এত শক্ত করা যাবে না। হাত একটু নরম করতে হবে। তাছাড়া আমি মারব না।’ ‘ঠিক আছে এই হাত নরম করেছি এখন মার।’ শেফালীর হাত থেকে ভাতের মাড় ভর্ত্তি ফিডারের বুঁটি মুখে চুষে চুষে খাচ্ছে মা মরা বাচ্চাটা। হঁঠাৎ করে বাতাসে গাছের ডালপালা নড়ে উঠল। রোদ বৃষ্টি কিছু মানে না আমকুড়ানির দল। একটু জোরে বাতাস হলেই একদৌড়ে গাছতলায়। বিরসণের পূর্বমুহুর্তে কে কোন গাছতলায় যাবে সেটা চিন্তা করতে ক্ষণকাল ইতঃস্তত করল।
আঁখি বই হাতে আমগাছতলে এসে বসে। কয়েকটা মুরগি জঞ্জাল নখে আঁচড়াআঁচড়ি করে যাচ্ছে। ঝোপগুলোর পার্শ্বে উৎফুল্ল প্রজাপতিরা উড়োউড়ি করছে। ঝোপের ভেতরে গাঢ সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ক্ষুদ্র পঁটলের মতো সবুজ লতানো গাছে তেলাকুঁজা ফল ঝুলছে। পঞ্চপত্রী সাদা সাদা ফুলগুলো তারই দিকে মুখ করে হা হয়ে ফুটে রয়েছে। লাল টসটসে পাকা আধখাওয়া ফলটা একটা বুলবুলি এসে খাওয়া শুরু করল। পাখি একটা ফল খাচ্ছে সেটা দেখতে নিজের কাছেই সুখকর মনে হচ্ছে। একটি বড় নিম গাছকে কেন্দ্র করে বুনো বেগুনী ঝুমকোলতা ফুল ঝুলে রয়েছে। তীব্র্র গন্ধ ছড়ানো চারিদিকে। বিরাট বড় একটা প্রজাপতি মাকড়সার জালে আটকা পড়েছে। সেদিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। বাপরে কী বড় প্রজাপতি। বাঁচার জন্য পাখা দুটো ঝাপটাচ্ছে। মেলে ধরা পাখায় চোখের মতো বড় বড় বৃত্তাকার দাগ। মাকড়সাটা তরঙ্গ সংকেত পেয়ে সূতা বেয়ে হাঁচড়ে আসছে। প্রজাপতিটাকে দেখে খুব মায়া হয়। তার পাখাটা ধরে জাল থেকে খুলে বাতাসে উড়িয়ে দেয়। পাখা ঝাপটায়ে ঝাপটায়ে সেটা দূরে উড়ে চলে যায়। মাকড়সাটা পৌঁছে গেছে। ক্ষুধার্ত জীবটার জন্য এখন খারাপ লাগা শুরু হয়েছে। প্রজাপতিটাকে না খেলেও তাকে তো কোন না কোন জীবই ভক্ষণ করতে হবে। নিজেকে একবার অপরাধী মনে হয়। কী দরকার ছিল অন্য জীবচক্রের মধ্যে বাম হাত ঢোকানোর? মনটাকে আবার বইয়ের মধ্যে সুস্থিত ডুবানোর চেষ্টা করছে।
দাদা লাঠিতে ভর করে পাগারের ধারে নিশ্চল হয়ে দাঁড়ায়। তার শাণিত চোখে ধরা পড়ছে, সমস্ত গাছপালাগুলো বৃষ্টির প্রতীক্ষায়। গাছপালার পরিতাপ, জীবজন্তুদের আহাজারি যা মানুষের বোধগম্য নয় তাও তার সূক্ষ্মচোখে ধরা পড়ে। দাদা বোঝে তাদের আকুতি যদি বোঝার সাধ্য থাকত তাহলে এখন চারিদিক থেকে গাছপালাগুলোর আরাধনা কানে ভেঁসে আসত। ‘এই গাছগুলোতে একটু পানি দেতো। গাছগুলো পানির অভাবে মারাই যাবে।’ দাদা আঁখিকে হেঁকে নির্দেশ দেয়। গাছতলে বসে সে বইটা বন্ধ করে এদিকে চায়। খানিকটা তাচ্ছিল্যের গলায় জিজ্ঞেস করে আঁখি ‘ও গাছগুলো দিয়ে কি হবে?’ ‘কি হবে সেটা বড় কথা না, বড় কথা শুধু পানির অভাবে একটা গাছ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাবে সেটা সহ্য করা যায় না।’ আঁখিরা দাদার কথায় আজ আর না করে না, শোনে। একটা বদনা নিয়ে আসার জন্য বাড়ির ভেতরে রওয়ানা দেয়।
সেলিম পিস্তল হাতে যখন গাছতলে ফিরল তখর দেখল বই একটা মুখের সামনে উঁচিয়ে আঁখি পড়ছে। আসমানী, ঊল্কা আর আঁখিরা গাছতলায় আগে থেকেই বসে রয়েছে। আঁখির ফুসলানো ডাকে সেলিম সাড়া দিল। ভুলিয়ে ভালিয়ে তার পিস্তলটা হাতে নিয়ে একটা গুলি করল ঠাস করে। গুলিটা করার পরই বলল, এই দ্যাখ সেলিমের প্যান্ট পেছনে ফুটো হয়ে গেছে। সবাই কৌতুকপূর্ন চোখে তাকিয়ে দেখল, আরে! সত্যিই তো, সেলিমের প্যান্টের পেছনে ঠিক ঠিকই দুইটা ফুটা। রেজা হতবাক, গুলি হল একটা আর ফুটো হল দুইটা ক্যামনে? সেটা নিয়ে তামাসা হাঁসি হাঁসছে সবাই। সেলিমের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। সময় গড়ায়। রেণু বেনু ছালাম সব চুপচাপ বসে রয়েছে গাছতলায় কখন একটা আম পড়ে পড়ে। রেণু আর বে নু দুই জমজ বোন। তাদের দুইজনকে দেখে আলাদা করে চিনতে পারে শুধু তাদেও মা। এ পাড়ার দক্ষিণ মাথায় হাটের পাশে তাদের বাড়ি। কালো কিসকিসে দাঁড়কাকটাকে ঘরের চালের উপরে বসতে দেখে বিচলিত হয়ে উঠে টেপা। এরকম কাক সে এর আগে আর কখনও দেখেনি। কাকটা যেন উড়াল দিল আর চিক্কুর দিয়ে ভয়ে দৌড়ে বোনের কাছে চলে গেল। কী মজার ব্যাপার, গোটা কতক শুকিয়ে নরম লুসা লাগানো আম পড়েছে। আদরিরা না খেতে পারলেও এগুলো তার পুতুলের খাবার। রাস্তার দুই পাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকারা ডাকছে। সেলিম ফের সবাইকে উদ্দেশ্য করে ডাকাডাকি করছে। ‘পায়খানার উপরে পড়ে থাকা আমটা উঠিয়ে নিয়েছে কেডা?’
রেজা ছালামেরা আবার গাছতলে ফিরছে। হিন্দুপাড়ার আমকুড়ানির দলেরা এল আম কুড়াতে। তাদেরকে তাড়িয়ে দিল গাদু। দ্বন্দ্বে আহ্বান জানানোর মতো সূরে ধমকালো ‘যা বাড়িতে যা। এখনও ভালো করে বলছি, যা, তাছাড়া ভালো হবে না।’ তার গলায় গলা মিলিয়ে মাও বাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠে ‘এই চেংরাপেংরারা তোরা এখন যা তো। যা তোরা বাড়িতে যা। গায়ের কত জোর? মানা করা স্বত্ত্বেও কলা গাছ হয়েছে, নড়ছে না।’ গাদুর মা রাঙা চোখে এদের দিকে তাকিয়ে শাসায়। দেখতে দেখেতে আমগাছতলা ফঁাঁকা হয়ে যায়। দূরে গিয়ে কতিপয় আমকুড়ানির দলেরা অপেক্ষা করতে থাকে ক্ষণ গড়ানোর জন্য। হিন্দুপাড়া থেকে ছোট ছোট শিশু কিশোর কিশোরীরা জাংলা ভেঙ্গে এসে তাদের সাথে যুক্ত হল। ওরা আম বিচরানোর দল। ওরা আম কুড়ানোর দল থেকেও ক্ষুদ্র, আন্ডাবাচ্চারা। সাত সকালে বাবা মা ছাড়তে চায় না বিধায় একটু বেলা বাড়লে বাড়ি থেকে ছাড়া পায়। বড় আমের লক্ষ্য না, মরা পাতা লড়ি দিয়ে উপুর হয়ে হয়ে সরিয়ে আমের কেরালীও গাছের নিচে রাখে না। চিরুনী অভিযানে মাথার উঁকুন মাটিতে হাঁচড়ে ফেলানোর মতো। একটা আমের কেরালী নিয়ে খাবলাখাবলি করে। তবে এদের মধ্যে সর্দারণী হচ্ছে রতœা নামের এই মেয়েটা। আঁখি একটা বই এনে গাছতলায় এসেছে। আস্তে আস্তে সবাই আবার গাছতলায় হাঁটিহাঁটি পা পা করে এগুতে থাকে। দোলনায় দুলছে আর হাতে বইটা নিয়ে পড়ছে আঁখি। একটু করে বইয়ের দিকে চোখ বুলায় আর অন্যক্ষণ সব দিকে খেয়াল ছুঁড়ে দেয়। আমগাছ তলে একটা ধুলির সড়ক, গাদুর একা একা সময়ে বানানো খেলনা সড়ক এটি। ভূলেও কেউ পা মাড়ায় না। সড়কটা মরা পাতায় ছেয়ে গেছে।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ দুপুর ১:১৬
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য সাইলেন্ট ইকো

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১০


এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ফিকশনাল ইনভেস্টিগেটিভ ক্রাইম থ্রিলার। গল্পের সমস্ত চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, স্থান, সাল ও অপরাধের মোটিভ লেখকের কল্পনানির্ভর। বাস্তব কোনো ব্যক্তি, পেশাজীবী বা অমীমাংসিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাপাসিটি চার্জের পর এবার নজর খাম্বায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৩


বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে কেবল একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের মাসে প্রিপেইড মিটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৯



কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি সংবিধানের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই বেশি হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×