মাত্রই ফল প্রকাশ হল HSC পরীক্ষার। এইবারে শুরু হবে এই শিক্ষার্থীদের আসল পরীক্ষা। তাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য কোথাও ভর্তি হতে হবে। SSC এবং HSC-তে যে যতটাই A+ অথবা GPA-5 পেয়ে থাকুক না কেন, ভর্তি পরীক্ষায় ভালো কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হতে পারলে সেই ফলাফলের কোনই মূল্য থাকবে না।
আমাদের দেশের SSC ও HSC পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা, ফলাফল এবং ব্যবস্থাপনার উপরে আমাদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন ভরসা নেই। এর ছোট্ট উদাহরণ হল সরকারী কলেজগুলোতে SSC-এর ফলাফলের উপরে ভিত্তি করে HSC শ্রেণিতে ভর্তি করা হলেও এর পরে SSC ও HSC ফলাফলের উপর ভিত্তি করে কিন্তু Degree বা Honours কোর্সে ভর্তি করা হয় না।
এর কারণ হল, আমাদের নীচের দিকের এই দুইটা পাবলিক পরীক্ষায় (SSC ও HSC পর্যায়ের) মান যাচাই নিয়ে উচ্চ শিক্ষালয়গুলোর যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
এই বছরে যতজন শিক্ষার্থী পাস করেছে, তার চেয়েও কম আসন আছে সরকারী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফলে প্রতি বারের মতই এইবারেও কোন কোন উচ্চ শিক্ষালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিটি আসনে পঞ্চাশের অধিক শিক্ষার্থী প্রতিযোগীতা করবে।
শিক্ষা মন্ত্রীর একটি কথা মনে রাখতে হবে সবাইকে। উনি বলেছেন, সবাইকে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ সরকার চাইলেও করে দিতে পারবে না। তার মানেই হচ্ছে, বিভিন্ন অভিনব কায়দায় প্রশ্ন পত্র ফাঁস করে, পরীক্ষকদের মৌখিক নির্দেশ দিয়ে সহজ করে খাতা দেখিয়ে, উদার পন্থায় নম্বর বাড়িয়ে, সর্বোপরি মনগড়া নম্বর বসিয়ে সরকার হয়তো অধিক পাশের হার জনগণের সামনে হাজির করতে পারেন। কিন্তু, এতে শিক্ষার মানের যে বারোটা বেজে যাচ্ছে, তা শিক্ষা মন্ত্রী মশাই কি বুঝতে পারছেন না? যে পিচ্ছিল পথে উনি আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধাবিত করিয়েছেন, তাতে ভয় হয়, আগামীতে না আমাদের শিক্ষা বলে আদপেই কিছু আর অবশিষ্ট থাকে কি না!
পত্রিকার সংবাদ অনুসারে সদ্য প্রকাশিত HSC পরীক্ষার ফলাফলে ৭০,৬০২ জন শিক্ষার্থী A+ বা GPA-5 পেয়েছে। কতজন A পেয়েছে তা আমি জানি না। তবে অনুমান করি এই সংখ্যা আরো ৮০ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে। তাহলে প্রায় দেড় লক্ষ (কম করে হলেও) শিক্ষার্থী ভালো ফল করেছে। এদের অভিনন্দন। (কিন্তু মনের ভেতর থেকে অভিনন্দন দিতে পারছি না!)
আমার কিছু আশংকা আছে। এই যে প্রায় দেড় লক্ষ শিক্ষার্থী মাত্র ৩৬ হাজার সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে, তাদের হিসাব রাখতে হবে প্রতিটা আসনে নূন্যতম ২৪ জন প্রতিযোগীতা করবে। তারমানে এদের মূল যুদ্ধটা আসলে সামনে অপেক্ষা করছে।
এরজন্য এইসব শিক্ষার্থীরা দৌড়াবে কোচিং সেন্টারগুলোতে। দৌড়াবে কি, তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে সেই মোতাবেক বিভিন্ন কোচিং-এ ভর্তিও হয়ে গেছে। এর কারণ, আমাদের SSC ও HSC পর্যায়ের এই পাবলিক পরীক্ষাগুলোর মেধা যাচাই পদ্ধতি এখন আর মান সম্পন্ন নয় বলে কে যে ভাল ফল করেছে, তা বোঝার উপায় নেই।
আমার জানা মতে গেল বছরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় A+ বা GPA-5 পাওয়া শিক্ষার্থীদের তুলনায় সাধারণ A গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীরা অধিক সংখ্যায় সুযোগ পেয়েছে। এই বিষয়ে আমাদের UGC-র কাছে কোন উপাত্ত নেই। তারা বলতেও পারবে না কেমন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, তাদের মেধার মান কেমন।
আমি ঢাকার খুব কাছেই একটি সরকারী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিব, যেখানে অতি সম্প্রতি পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষায় ৮০% নম্বরের উপরে কেউই নম্বর পায় নাই। এই বিভাগের কোন খারাপ মানের শিক্ষার্থী কি ভর্তি করা হয়েছিল? তাহলে এমন ফলাফল বিপর্যয় হবে কেন?
এর একটা ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার্থীদের মান নেমে গেছে। যা গোড়াপত্তন হয়েছে SSC ও HSC পরিক্ষাগুলোতে সরকারের খারাপ ধরণের উদার নীতির মাধ্যমে ভালো ফলাফল তৈরী করার চেষ্টার মাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক মেধার উপরে সরকারের বিশ্বাস নেই বলেই আজ শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে।
আশেপাশে সবাই কানাকানি করেন এই বলে যে, এই সরকারের আমলে আর কিছু না হোক শিক্ষা ব্যবস্থাটা পুরাপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। এর দায় শিক্ষা মন্ত্রী মশাই এবং উনার সরাসরি বস প্রধানমন্ত্রী সাহেবান এড়াতে পারবেন না। আনুমানিক আগামী ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটা মেধাশুন্য প্রজন্ম আমাদের Workforce-এ যুক্ত হতে আসবে। ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থার চিতার ছাইয়ের ভেতরে বসে সেই পরিস্থতি মোকাবেলায় সরকার বরঞ্চ কিছু পরিকল্পনা করুন। সেই অপেক্ষাতেই না হয় থাকি!
দেখি না সরকার নিজে ভুলের মাশুল কি ভাবে দেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



