২০২৫ সালের এক সাধারণ দিনে ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ভেসে চলছিল তুর্কি নৌবাহিনীর গর্বের জাহাজ টিসিজি আঙ্কারা। এটি কোনো অত্যাধুনিক পরমাণু-চালিত যুদ্ধজাহাজ নয়, বরং একটি পুরনো ধাঁচের, কিন্তু অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ফ্রিগেট। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে নির্মিত এই জাহাজটি তুর্কি নৌবাহিনীর অন্যতম প্রাচীন সদস্য। তার বয়স প্রায় চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনও সে সমুদ্রের ঢেউয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার ইঞ্জিনগুলো ডিজেল-চালিত, কোনো জটিল পরমাণু রিঅ্যাক্টর নেই। তার অস্ত্রশস্ত্রও আধুনিক মানদণ্ডে পুরনো—১২৭ মিলিমিটারের একটি প্রধান কামান, কয়েকটি হারপুন মিসাইল লঞ্চার, সি স্প্যারো এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, দুটি টর্পেডো টিউব, এবং কয়েকটি মেশিনগান। কোনো লেজার, কোনো অত্যাধুনিক ড্রোন বা স্টিলথ প্রযুক্তি নেই। তবু এই জাহাজটির সবচেয়ে বড় গুণ তার অসম্ভব নির্ভরযোগ্যতা। বছরের পর বছর বড় ধরনের মেরামত ছাড়াই সে সমুদ্রে টহল দিতে পারে। তার ইঞ্জিনরুমে যান্ত্রিকেরা বলে, “আঙ্কারা কখনো হাল ছাড়ে না।” তার ধাতব দেহে মরচের দাগ পড়েছে, ডেকে রঙ উঠে গেছে অনেক জায়গায়, কিন্তু তার হৃদয়—ইঞ্জিন—এখনো অটুট।
ক্যাপ্টেন আহমেদ কায়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চল্লিশোর্ধ্ব এই অভিজ্ঞ নৌ অফিসার তুর্কি নৌবাহিনীতে ত্রিশ বছর কাটিয়েছেন। তার চোখে এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা। তার পাশে লেফটেন্যান্ট এমরে, জাহাজের নেভিগেশন অফিসার, রাডার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। মিশনটি ছিল রুটিন—ভূমধ্যসাগরে পাইরেসি প্রতিরোধ টহল। কোনো বিপদের সম্ভাবনা ছিল না।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে গেল। একটি অদ্ভুত ঝড় উঠল—এমন ঝড় যা কেউ কখনো দেখেনি। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, সমুদ্রের জল যেন উল্টে যাচ্ছে। জাহাজটি প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে লাগল। ক্রুরা চিৎকার করছে, “ক্যাপ্টেন, এটা কী?” ক্যাপ্টেন আহমেদ শান্ত গলায় বললেন, “সবাই পোস্টে থাকো। ইঞ্জিন ফুল স্পিড।” কিন্তু কোনো লাভ হল না। ঝড়ের মাঝে একটি অদৃশ্য শক্তি জাহাজকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। রাডারে সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেল। জিপিএস সিগন্যাল হারিয়ে গেল। যোগাযোগ ব্যবস্থা নিস্তব্ধ।
কয়েক মিনিট পর ঝড় থামল। আকাশ পরিষ্কার। কিন্তু চারদিকে কিছু একটা ভুল। সমুদ্র একই, কিন্তু কোনো আধুনিক জাহাজ নেই। কোনো বিমানের শব্দ নেই। ক্যাপ্টেন আহমেদ ব্রিজ থেকে দূরবিনে চারদিক দেখলেন। দূরে একটি অদ্ভুত দৃশ্য। কাঠের তৈরি লম্বা-চওড়া নৌকাগুলো, তাতে বড় বড় পাল। নৌকাগুলোর মাথায় ড্রাগনের মতো মূর্তি। লোকেরা লম্বা চুল, দাড়ি, লোহার হেলমেট পরা, হাতে তলোয়ার, কুঠার, ঢাল। তারা চিৎকার করছে এক অদ্ভুত ভাষায়—যা তুর্কি ক্রুদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা।
ক্যাপ্টেন আহমেদের মনে প্রশ্ন জাগল, “এরা কারা? কোনো ফিল্ম শুটিং?” কিন্তু না, এটা বাস্তব। রাডারে দেখা গেল প্রায় ত্রিশটি ছোট জাহাজ, সব কাঠের। তাদের মাঝে কয়েকজন মহিলা—লম্বা সাদা পোশাক পরা, মাথায় কাপড়। তারা বাঁধা, ভয়ে কাঁপছে। ক্রুরা অবাক। লেফটেন্যান্ট এমরে বলল, “ক্যাপ্টেন, এরা যেন... ভাইকিং!” ক্যাপ্টেন হাসলেন, “ভাইকিং? সে তো হাজার বছর আগের কথা। পাগল হয়েছ?” কিন্তু তার মনেও সন্দেহ জাগল। জাহাজের লাইব্রেরিতে একটি পুরনো ইতিহাসের বই ছিল। সেখানে ভাইকিংদের ছবি—ঠিক এমনই লংশিপ, এমনই পোশাক।
তারা বুঝতে পারল না এরা কী করছে। ভাইকিংরা একটি গির্জা লুট করেছে, ২৩ জন সন্ন্যাসিনীকে বন্দী করেছে, এবং তাদের স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে—এসব কিছুই তুর্কি ক্রুরা জানে না। তারা শুধু দেখছে একদল বর্বর চেহারার লোক কয়েকজন মহিলাকে জোর করে নৌকায় তুলছে। ভাইকিংরা 'আঙ্কারা'কে দেখে থমকে দাঁড়াল। তাদের কাছে এটি একটি অভূতপূর্ব দানব—লোহার তৈরি, বিশাল, ধোঁয়া ছাড়ছে। তারা চিৎকার করতে লাগল তাদের নর্স ভাষায়—“এটা কী? মিডগার্ড সার্পেন্ট? থরের শত্রু?” কিন্তু তুর্কি ক্রুরা কিছুই বুঝল না।
ক্যাপ্টেন আহমেদ মাইক্রোফোনে বললেন, “সবাই সতর্ক থাকো। অজানা জাহাজগুলো কাছে আসছে।” ভাইকিং লিডার—রাগনার নামে এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা—তার লংশিপ থেকে চিৎকার করে আদেশ দিল তার লোকদের। তারা তীর ধনুক তাক করল। কিন্তু 'আঙ্কারা'র ক্রুরা বুঝতে পারছে না এরা শত্রু না মিত্র। তারা শুধু দেখছে একদল লোক অস্ত্র তুলেছে।
হঠাৎ একটি তীর এসে জাহাজের ধাতব দেহে লাগল—কোনো ক্ষতি হল না। ক্রুরা অবাক। ক্যাপ্টেন আহমেদ বললেন, “এরা আমাদের আক্রমণ করছে। কিন্তু কেন?” তারা ভাইকিংদের উদ্দেশ্য বুঝতে পারছে না। ভাইকিংরাও বুঝতে পারছে না এই লোহার দানব কোথা থেকে এল। রাগনার ভাবল, “এটা হয়তো লোকির ছল।” সন্ন্যাসিনীরা প্রার্থনা করছে ল্যাটিন ভাষায়—“Deus nos protegat” (ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন)—কিন্তু তুর্কি ক্রুরা সেটাও বুঝল না।
'আঙ্কারা'র প্রধান কামান ধীরে ধীরে ঘুরল। ক্যাপ্টেন আহমেদ দ্বিধায় পড়লেন। “আমরা কি গুলি করব? এরা তো আধুনিক অস্ত্রের কাছে কিছুই না। কিন্তু এরা কারা? কেন আক্রমণ করছে?” জাহাজের পুরনো কিন্তু নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন গর্জন করতে লাগল। ক্রুরা তাদের পোস্টে। ভাইকিংরা আরও কাছে এল। ভাষার ব্যবধান, সময়ের ব্যবধান—সবকিছু তাদের বিপরীতে। প্রথম সংঘর্ষ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
'আঙ্কারা' তার পুরনো ধাতব দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ইংলিশ চ্যানেলের ঠাণ্ডা জলে—এক অচেনা যুগে, অচেনা শত্রুর সামনে। ক্যাপ্টেন আহমেদের মনে একটি মাত্র চিন্তা—আমরা কোথায় এসে পড়েছি?
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



