ইংলিশ চ্যানেলের ঠাণ্ডা জলে টিসিজি আঙ্কারা দাঁড়িয়ে আছে। তার পুরনো ধাতব দেহে সমুদ্রের লবণাক্ত হাওয়া লাগছে। ডেকের উপর ক্রুরা ছুটোছুটি করছে। ক্যাপ্টেন আহমেদ কায়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে দূরবিনে চেয়ে আছেন সেই অদ্ভুত কাঠের নৌকাগুলোর দিকে। লংশিপগুলো এখন আরও কাছে এসে গেছে। প্রায় ত্রিশটি নৌকা, প্রত্যেকটিতে ত্রিশ-চল্লিশ জন করে যোদ্ধা। তাদের পোশাক দেখে মনে হয় যেন কোনো পুরনো যুগের লোক—চামড়ার বর্ম, লোহার হেলমেট, লম্বা দাড়ি, হাতে কুঠার আর তলোয়ার। তারা চিৎকার করছে এক অদ্ভুত ভাষায়, যা তুর্কি ক্রুদের কানে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।
“ক্যাপ্টেন, এরা কারা?” লেফটেন্যান্ট এমরে জিজ্ঞাসা করল। তার গলায় উদ্বেগ। “জানি না। হয়তো কোনো উৎসবের অংশ। কিন্তু অস্ত্র হাতে নিয়ে কাছে আসছে কেন?” ক্যাপ্টেন আহমেদের কপালে ভাঁজ পড়ল।
হঠাৎ একটি তীর এসে জাহাজের পাশে লাগল। তারপর আরেকটি। তারপর শত শত তীর। কিন্তু আঙ্কারার পুরু লোহার দেহে সেগুলো কোনো ক্ষতি করতে পারল না। তীরগুলো ধাতবে লেগে ঝনঝন শব্দ করে নিচে পড়ে গেল। ক্রুরা প্রথমে অবাক হয়ে তাকাল, তারপর হাসতে লাগল। “এরা কী করছে? ধনুক-তীর দিয়ে লোহার জাহাজে আক্রমণ?” একজন সার্জেন্ট বলল।
কিন্তু ক্যাপ্টেন আহমেদ হাসলেন না। তিনি বুঝলেন, এরা সত্যিই আক্রমণ করছে। আর এদের চোখে যে ভয় মিশ্রিত ক্রোধ, সেটা কোনো নাটক নয়। ভাইকিং লিডার রাগনার তার লংশিপের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে তার লোকদের। তার গলার আওয়াজ সমুদ্র পেরিয়ে আসছে—“Árás! Árás á skrímslinu!” (আক্রমণ! এই দানবে আক্রমণ করো!) কিন্তু তুর্কি ক্রুরা শুধু অদ্ভুত শব্দ শুনতে পাচ্ছে।
রাগনারের চোখে এই লোহার দানবকে দেখে প্রথমে ভয় জেগেছিল। কিন্তু ভয়টা দ্রুত রাগে পরিণত হল। তারা সবে একটি ইংরেজ গির্জা লুট করেছে। সোনা-রুপো, ধর্মীয় পাত্র, আর ২৩ জন সন্ন্যাসিনীকে বন্দী করেছে। এই বন্দীরা তাদের কাছে মূল্যবান—কেউ দাসী হিসেবে বিক্রি হবে, কেউ উৎসর্গ। কিন্তু এখন এই অজানা দানব তাদের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে। রাগনার ভাবল, এটা নিশ্চয়ই খ্রিস্টানদের দেবতার প্রেরিত কোনো অভিশাপ। তাকে ধ্বংস করতেই হবে।
অন্যদিকে, আঙ্কারার ক্রুরা বুঝতে পারছে না এই লোকেরা কেন এত রেগে আছে। তারা দেখছে কয়েকজন মহিলা বাঁধা অবস্থায় লংশিপের মাঝে বসে আছে। তাদের পোশাক সাদা, মাথায় কাপড়—যেন কোনো ধর্মীয় পোশাক। তারা ভয়ে কাঁপছে, কেউ কেউ প্রার্থনা করছে ল্যাটিন ভাষায়—“Domine, salva nos!” (প্রভু, আমাদের রক্ষা করো!) কিন্তু তুর্কি ক্রুরা সেই ভাষাও বোঝে না। তারা শুধু দেখছে কিছু মহিলাকে জোর করে ধরে রাখা হয়েছে।
“ক্যাপ্টেন, ওদের জাহাজে কয়েকজন মহিলা বন্দী আছে মনে হচ্ছে,” একজন অফিসার বলল। “হুম। কিন্তু এরা কারা? পাইরেট? কোনো অপরাধী গ্রুপ?” ক্যাপ্টেন আহমেদ ভাবছেন।
ভাইকিংরা আরও কাছে এল। কয়েকটি লংশিপ আঙ্কারার পাশে এসে থামল। তারা দড়ি আর হুক ছুড়ে জাহাজে চড়ার চেষ্টা করল। কয়েকজন যোদ্ধা দড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। ক্রুরা এবার সতর্ক হল। ক্যাপ্টেন আহমেদ মাইক্রোফোনে আদেশ দিলেন, “ডেকে সশস্ত্র গার্ড পাঠাও। ওয়ার্নিং শট ফায়ার করো।”
ডেকে দুই দল সৈনিক দৌড়ে গেল। তাদের হাতে আধুনিক রাইফেল। তারা আকাশে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ল। গুলির শব্দ সমুদ্রে গর্জন করে উঠল। ভাইকিংরা থমকে দাঁড়াল। এমন শব্দ তারা কখনো শোনেনি। যেন আকাশ ফেটে পড়ছে। কয়েকজন ভয়ে নিচে পড়ে গেল। রাগনার চিৎকার করে বলল, “থরের বজ্র! লড়াই করো!” কিন্তু তার লোকেরা দ্বিধায় পড়েছে।
তবু কয়েকজন সাহসী যোদ্ধা দড়ি বেয়ে উঠে এল ডেকে। তারা কুঠার তুলে ছুটে এল তুর্কি সৈনিকদের দিকে। কিন্তু তুর্কি সৈনিকরা শুধু রাইফেল তাক করল। একজন সার্জেন্ট চিৎকার করে বলল, “দাঁড়াও! থামো!” কিন্তু ভাইকিংরা বুঝল না। তারা ছুটে এল। তখন সার্জেন্ট গুলি ছুড়ল—পায়ে লক্ষ্য করে। একজন ভাইকিং পড়ে গেল। বাকিরা থমকে দাঁড়াল। তারা দেখল তাদের সাথীর পায় থেকে রক্ত বেরোচ্ছে, কিন্তু কোনো তীর বা তলোয়ারের আঘাত নেই। এটা জাদু!
রাগনার নিচ থেকে দেখছে। তার মনে ভয় আর রাগ মিশ্রিত হচ্ছে। সে তার ধনুক তুলল এবং একটি তীর ছুড়ল ব্রিজের দিকে। তীরটি কাঁচে লেগে ভেঙে গেল। ক্যাপ্টেন আহমেদ এবার আর দ্বিধা করলেন না। তিনি আদেশ দিলেন, “প্রধান কামান থেকে ওয়ার্নিং শট। সমুদ্রে, জাহাজের সামনে।”
১২৭ মিলিমিটারের কামানটি ধীরে ঘুরল। তারপর গর্জন করে উঠল। গোলাটি সমুদ্রে গিয়ে পড়ল একটি খালি জায়গায়। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। জলের স্তম্ভ আকাশে উঠে গেল। ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল। তাদের কাছে এটা থরের হাতুড়ির আঘাতের মতো। কয়েকটি লংশিপ কাছাকাছি থাকায় ঢেউয়ে দুলতে লাগল। কয়েকজন যোদ্ধা সমুদ্রে পড়ে গেল।
রাগনারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে বুঝল, এই দানবের সাথে লড়াই করা অসম্ভব। কিন্তু পিছু হটলে তার সম্মান চলে যাবে। সে তার লোকদের আদেশ দিল পিছিয়ে যেতে, কিন্তু চোখে চোখ রেখে। ভাইকিংরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। কিন্তু তারা দূরে গিয়ে গোল হয়ে দাঁড়াল। যেন অপেক্ষা করছে।
আঙ্কারার ডেকে উত্তেজনা। ক্রুরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। “ক্যাপ্টেন, এরা কারা? কেন আক্রমণ করল?” “জানি না। কিন্তু ওদের জাহাজে বন্দী মহিলারা আছে। হয়তো আমরা তাদের উদ্ধার কর应对।” ক্যাপ্টেন আহমেদ বললেন।
তিনি জাহাজের লাউডস্পিকারে তুর্কি ভাষায় ঘোষণা করলেন, “আমরা শান্তি চাই। বন্দীদের মুক্ত করুন।” কিন্তু ভাইকিংরা কিছুই বুঝল না। তারা শুধু অদ্ভুত শব্দ শুনল। রাগনার ভাবল, এটা কোনো অভিশাপের মন্ত্র।
সন্ন্যাসিনীদের মধ্যে সিস্টার মারিয়া নামে একজন ছিলেন সবচেয়ে সাহসী। তিনি ল্যাটিন ভাষায় প্রার্থনা করছিলেন। কিন্তু তিনি দেখলেন এই লোহার জাহাজ থেকে আগুন আর বজ্র বেরোচ্ছে। তার মনে হল, এটা হয়তো ঈশ্বরের প্রেরিত কোনো চিহ্ন। কিন্তু ভাষা না বোঝায় কিছু বলতে পারছেন না।
সূর্য ডুবতে শুরু করল। সমুদ্র শান্ত। কিন্তু দূরে ভাইকিংরা এখনো আছে। তারা আগুন জ্বালিয়ে বসে আছে তাদের লংশিপে। রাগনার তার যোদ্ধাদের সাথে পরামর্শ করছে। তারা সিদ্ধান্ত নিল রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করবে। এই দানবকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেবে।
আঙ্কারায়ও রাতের প্রস্তুতি চলছে। ক্যাপ্টেন আহমেদ রাডারে নজর রাখছেন। “ওরা পিছু হটেনি। আবার আক্রমণ করতে পারে। সবাই সতর্ক থাকো।” জাহাজের পুরনো কিন্তু নির্ভরযোগ্য সোনার সিস্টেম চালু আছে। রাতের অন্ধকারে কোনো নৌকা কাছে এলেই সতর্কবার্তা দেবে।
ক্রুরা একে অপরের সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে। কেউ বলছে এটা স্বপ্ন, কেউ বলছে কোনো গোপন সামরিক পরীক্ষা। কিন্তু ক্যাপ্টেন আহমেদের মনে একটি ভয়ংকর সন্দেহ জাগছে। তিনি জাহাজের পুরনো নেভিগেশন চার্ট দেখলেন। তারা ইংলিশ চ্যানেলে আছে ঠিকই, কিন্তু জিপিএস কাজ করছে না। তারা তারিখ দেখার চেষ্টা করলেন—কিন্তু কোনো সিগন্যাল নেই। শুধু তারার অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা ভুল।
রাত গভীর হল। ভাইকিংরা নৌকা থেকে নেমে আগুনের তীর প্রস্তুত করতে লাগল। তারা চায় জাহাজে আগুন লাগিয়ে দিতে। রাগনার বলল, “যদি এটা দানব হয়, আগুনেই ধ্বংস হবে।”
আঙ্কারার রাডারে সিগন্যাল এল। কয়েকটি ছোট নৌকা কাছে আসছে। ক্যাপ্টেন আহমেদ আদেশ দিলেন, “ফ্লাডলাইট জ্বালাও। মেশিনগান প্রস্তুত।”
হঠাৎ জাহাজের চারদিক আলোয় ভরে গেল। ভাইকিংরা অন্ধ হয়ে গেল। তারা এমন আলো কখনো দেখেনি। তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। তারপর মেশিনগানের গুলি বর্ষণ শুরু হল—আকাশে, সতর্কবার্তা হিসেবে। কিন্তু কয়েকটি গুলি লংশিপে লাগল। কাঠের নৌকায় ছিদ্র হয়ে গেল। কয়েকজন যোদ্ধা পড়ে গেল।
রাগনার চিৎকার করে পিছু হটার আদেশ দিল। কিন্তু তার একটি লংশিপে আগুন লেগে গেছে। তারা পানি ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। সন্ন্যাসিনীরা ভয়ে কাঁদছে। সিস্টার মারিয়া প্রার্থনা করছে।
এভাবে রাত কাটল। সকাল হল। ভাইকিংরা দূরে সরে গেছে, কিন্তু এখনো চারদিকে ঘিরে আছে। আঙ্কারার ক্রুরা ক্লান্ত, কিন্তু সতর্ক। ক্যাপ্টেন আহমেদ ভাবছেন, এই অচেনা শত্রুর সাথে কীভাবে যোগাযোগ করবেন? ভাষা নেই, বোঝাপড়া নেই। শুধু ভয় আর অবিশ্বাস।
দিনের আলোয় তারা আরও স্পষ্ট দেখল বন্দী মহিলাদের। তারা ক্লান্ত, ভীত। ক্যাপ্টেন আহমেদ সিদ্ধান্ত নিলেন, যেভাবেই হোক, তাদের উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু কীভাবে? ভাইকিংরা এখনো লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।
দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



