সকালের আলোয় ইংলিশ চ্যানেলের জল চকচক করছে। টিসিজি আঙ্কারা তার জায়গায় অটল হয়ে দাঁড়িয়ে। রাতের আক্রমণের পর ক্রুরা ক্লান্ত, কিন্তু কেউ ঘুমায়নি। ক্যাপ্টেন আহমেদ কায়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে রাডার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। ভাইকিংরা দূরে সরে গেছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়। তারা একটি আধা-বৃত্তাকারে জাহাজকে ঘিরে রেখেছে। প্রায় পঁচিশটি লংশিপ এখনো দৃশ্যমান। কয়েকটির পাল ছেঁড়া, একটিতে আগুনের দাগ। কিন্তু তারা হাল ছাড়েনি।
লেফটেন্যান্ট এমরে একটি কফি নিয়ে এলেন। “ক্যাপ্টেন, আমরা কতদিন এখানে থাকব? জ্বালানি আছে, কিন্তু খাবার আর পানির স্টক সীমিত।” ক্যাপ্টেন আহমেদ মাথা নেড়ে বললেন, “প্রথমে বুঝতে হবে আমরা কোথায়। জিপিএস নেই, রেডিও সিগন্যাল নেই। আর এই লোকেরা... এরা যেন ইতিহাসের বই থেকে বেরিয়ে এসেছে।” তিনি একটি পুরনো নেভিগেশন যন্ত্র বের করলেন—সেক্সট্যান্ট। তারা তারার অবস্থান থেকে হিসাব করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফলাফল অদ্ভুত। যেন তারারা ভুল জায়গায়।
দূরে ভাইকিং শিবিরে রাগনার তার যোদ্ধাদের নিয়ে বসে। রাতের পরাজয় তাকে লজ্জিত করেছে। তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হারাল্ড বলল, “জার্ল, এই দানবের সাথে লড়াই করা যাবে না। তার বজ্র আর আগুন আমাদের ধ্বংস করবে।” রাগনার দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “না। আমরা ভাইকিং। আমরা ওডিনের সন্তান। পিছু হটলে আমাদের নাম চিরকালের জন্য কলঙ্কিত হবে। আর এই লুট—গির্জার সোনা আর এই খ্রিস্টান মহিলারা—এগুলো আমাদের সম্পদ। আমরা ছাড়ব না।”
সে একটি পরিকল্পনা করল। দিনের বেলা তারা আক্রমণ করবে না। তারা অপেক্ষা করবে সূর্য ডোবার পর। এবার তারা আগুনের তীর ব্যবহার করবে। কাঠের নৌকা থেকে ছোড়া আগুনের তীর লোহার জাহাজে লাগলে হয়তো আগুন ধরবে না, কিন্তু ধোঁয়া আর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। আর তার মধ্যে কয়েকটি দল গোপনে জাহাজে চড়ার চেষ্টা করবে।
সন্ন্যাসিনীদের মাঝে সিস্টার মারিয়া সবচেয়ে শান্ত। তিনি অন্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ল্যাটিন ভাষায় প্রার্থনা করছেন। কিন্তু তার চোখে একটি আশা জ্বলজ্বল করছে। তিনি দেখেছেন লোহার জাহাজের শক্তি। তিনি ভাবছেন, হয়তো ঈশ্বর তাদের রক্ষা করতে এই অলৌকিক জাহাজ পাঠিয়েছেন। কিন্তু ভাইকিংরা তাদের কঠিন পাহারায় রেখেছে। একজন যোদ্ধা তাদের দিকে তলোয়ার তুলে চিৎকার করছে যাতে তারা চুপ করে।
আঙ্কারায় দুপুরের খাওয়া চলছে। ক্রুরা ক্যান্টিনে বসে কথা বলছে। “ওদের দেখে মনে হচ্ছে মধ্যযুগের লোক। কিন্তু সেটা তো অসম্ভব।” একজন পুরনো নাবিক বলল, “আমি একবার একটা ডকুমেন্টারি দেখেছি—ভাইকিংরা এমনই পোশাক পরত। লংশিপ, ড্রাগনের মাথা। আর ওই মহিলারা—যেন নান।” কথাটা শুনে ক্যাপ্টেন আহমেদের মাথায় বাজ পড়ল। তিনি দৌড়ে লাইব্রেরিতে গেলেন। জাহাজে একটি পুরনো ইতিহাসের বই ছিল—‘Europe in the Middle Ages’। তিনি পাতা উল্টে ভাইকিং অধ্যায় খুঁজলেন। ছবিগুলো দেখে তার শরীরে কাঁটা দিল। ঠিক একই রকম জাহাজ, একই পোশাক, একই অস্ত্র। আর ৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লিন্ডিসফার্ন গির্জায় ভাইকিংদের প্রথম বড় আক্রমণের কথা লেখা। কিন্তু এটা তো ৭৯২!
তিনি ক্রুদের ডেকে বললেন, “আমরা সময় ভ্রমণ করেছি। আমরা অষ্টম শতাব্দীতে চলে এসেছি। এরা ভাইকিং। আর ওই মহিলারা সম্ভবত গির্জা থেকে বন্দী করা সন্ন্যাসিনী।” সবাই চুপ করে গেল। কেউ হাসল, কেউ ভয় পেল। কিন্তু ক্যাপ্টেনের চোখে দৃঢ়তা। “আমরা ইতিহাসে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। কিন্তু মানবতার খাতিরে ওই মহিলাদের উদ্ধার করতে হবে।”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। ভাইকিংরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করল। তারা তীরের মাথায় কাপড় জড়িয়ে তেল ঢেলে আগুন ধরাল। শত শত আগুনের তীর আকাশে উঠে আঙ্কারার দিকে ছুটে এল। আকাশ যেন তারায় ভরে গেল। কিন্তু তীরগুলো লোহার দেহে লেগে নিভে গেল বা পড়ে গেল সমুদ্রে। তবু কয়েকটি ডেকে লাগল। কাঠের কিছু অংশে আগুন ধরে গেল। ক্রুরা দৌড়ে গিয়ে ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে নেভাল।
কিন্তু এটা ছিল বিভ্রান্তি। তার মধ্যে চারটি লংশিপ গোপনে কাছে এসে জাহাজের পিছনে লুকাল। তারা দড়ি ছুড়ে চড়ার চেষ্টা করল। রাডারে ধরা পড়ল। ক্যাপ্টেন আহমেদ আদেশ দিলেন, “ফ্লাডলাইট অন। মেশিনগান ফায়ার।”
আলো জ্বলে উঠতেই ভাইকিংরা ধরা পড়ল। তারা দড়ি বেয়ে উঠছে। মেশিনগানের গুলি বর্ষিত হল। কয়েকজন পড়ে গেল সমুদ্রে। বাকিরা ভয়ে পিছিয়ে গেল। কিন্তু একজন সাহসী যোদ্ধা ডেকে উঠে এল। তার হাতে কুঠার। সে একজন তুর্কি সৈনিকের দিকে ছুটল। সৈনিক রাইফেল তাক করল, কিন্তু গুলি করল না—পায়ে লক্ষ্য করে। যোদ্ধা পড়ে গেল। কিন্তু তার চোখে ভয় নেই, শুধু বিস্ময়।
রাগনার নিজের লংশিপ থেকে দেখছে। তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হল। সে চিৎকার করে পিছু হটার আদেশ দিল। কিন্তু তার একটি লংশিপ আঙ্কারার খুব কাছে চলে এসেছে। ক্যাপ্টেন আহমেদ সিদ্ধান্ত নিলেন। “হারপুন মিসাইল প্রস্তুত। না, না—অতিরিক্ত হবে। টর্পেডো না। প্রধান কামান থেকে একটা শট। লংশিপের সামনে।”
কামান গর্জন করল। গোলাটি লংশিপের ঠিক সামনে সমুদ্রে পড়ল। বিস্ফোরণে জলের স্তম্ভ উঠল। লংশিপটি উল্টে গেল। যোদ্ধারা সমুদ্রে পড়ে গেল। কিন্তু সেই লংশিপে কয়েকজন সন্ন্যাসিনী ছিল। তারা চিৎকার করছে।
ক্যাপ্টেন আহমেদের মন খারাপ হল। “রেসকিউ বোট নামাও। তাদের তুলে আনো।” দুটি ইনফ্লেটেবল বোট নামানো হল। তুর্কি নাবিকরা দ্রুত সমুদ্রে ঝাঁপ দিল। তারা সাঁতরে গিয়ে সন্ন্যাসিনীদের তুলল। পাঁচজন মহিলাকে উদ্ধার করা হল। তারা ভিজে, কাঁপছে। কিন্তু জীবিত।
আঙ্কারার ডেকে তাদের তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে আনা হল। তারা ল্যাটিন ভাষায় কথা বলছে। ক্রুরা কিছুই বুঝছে না। একজন মহিলা—সিস্টার মারিয়া—হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা শুরু করল। তার চোখে অশ্রু। তিনি লোহার জাহাজের লোকদের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে কৃতজ্ঞতা জানালেন।
কিন্তু ভাইকিংরা এই উদ্ধার দেখে আরও রেগে গেল। রাগনার চিৎকার করল, “এরা আমাদের লুট ছিনিয়ে নিচ্ছে!” সে তার বাকি লংশিপগুলোকে এগিয়ে আসার আদেশ দিল। এবার তারা সরাসরি আক্রমণ করবে।
ক্যাপ্টেন আহমেদ বুঝলেন, শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। ভাষা নেই, বোঝাপড়া নেই। তিনি আদেশ দিলেন, “সি স্প্যারো মিসাইল প্রস্তুত। না—অতিরিক্ত। মেশিনগান আর কামান দিয়ে সতর্ক করো। কিন্তু যদি তারা কাছে আসে, তাহলে লক্ষ্য করে গুলি করো। জাহাজ রক্ষা করতে হবে।”
ভাইকিংরা এগিয়ে আসছে। তাদের ঢালের সারি, তাদের চিৎকার। তারা মৃত্যুকে ভয় করে না। রাগনারের লংশিপ সবার আগে। তার চোখে প্রতিশোধের আগুন।
যুদ্ধ এখন অবশ্যম্ভাবী। আঙ্কারার পুরনো কিন্তু নির্ভরযোগ্য অস্ত্র প্রস্তুত। ক্রুরা তাদের পোস্টে। উদ্ধারকৃত সন্ন্যাসিনীরা নিচে নিরাপদ জায়গায়। সিস্টার মারিয়া প্রার্থনা করছেন দুই পক্ষের জন্যই।
সমুদ্রের বাতাসে যুদ্ধের গন্ধ। তৃতীয় দিনের সংঘর্ষ শুরু হতে চলেছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



