somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পর্ব ৪: লোহার বজ্রপাত

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইংলিশ চ্যানেলের জল এখন রক্তের ছোপ লাল। সূর্য মাথার উপর উঠে গেছে, কিন্তু আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। টিসিজি আঙ্কারার ডেকে পাঁচজন উদ্ধারকৃত সন্ন্যাসিনী কাঁপছেন। তাদের সাদা পোশাক ভিজে গেছে, চোখে অশ্রু আর বিস্ময়। সিস্টার মারিয়া তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে অন্যদের শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তিনি ল্যাটিনে প্রার্থনা করছেন—“Gratias agimus tibi, Domine…” (আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ, প্রভু…)। কিন্তু তুর্কি নাবিকরা তার কথা বুঝতে পারছে না। তারা শুধু হাত-পা নেড়ে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা নিরাপদ। একজন নাবিক গরম চা এনে দিল। সন্ন্যাসিনীরা প্রথমে দ্বিধা করলেন, তারপর ধীরে চুমুক দিলেন। তাদের চোখে এই লোহার জাহাজ এখনো এক অলৌকিক দানব।

ব্রিজে ক্যাপ্টেন আহমেদ কায়া রাডার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। ভাইকিংরা আবার এগিয়ে আসছে। এবার তারা আরও সংগঠিত। রাগনারের লংশিপ সবার সামনে। তার পাশে হারাল্ডের নৌকা। তারা ঢালের সারি তৈরি করেছে, যেন তীর-গুলি থেকে বাঁচতে। তাদের চিৎকার সমুদ্র পেরিয়ে আসছে—“För Valhall!” (ভালহাল্লার জন্য!)। কিন্তু তুর্কি ক্রুরা শুধু অদ্ভুত গর্জন শুনছে।

“ক্যাপ্টেন, ওরা সরাসরি আক্রমণ করতে আসছে,” লেফটেন্যান্ট এমরে বললেন। “হ্যাঁ। এবার আর ওয়ার্নিং শট নয়। জাহাজ রক্ষা করতে হবে। আর ওই বন্দী মহিলাদেরও। প্রধান কামান প্রস্তুত রাখো। মেশিনগান টিম ডেকে। হারপুন মিসাইল লোড করো—কিন্তু শুধু প্রয়োজনে।” ক্যাপ্টেনের গলায় দৃঢ়তা। তিনি জানেন, এই যুদ্ধে তারা জিতবেন, কিন্তু মূল্য কী হবে?

ভাইকিংরা কাছে এল। তাদের লংশিপের গতি দ্রুত। তারা তীর ছুড়তে লাগল। শত শত তীর আকাশে উঠে আঙ্কারার দিকে পড়ল। অধিকাংশ লোহায় লেগে ভেঙে গেল। কিন্তু কয়েকটি ডেকে লাগল। একজন তুর্কি সৈনিকের কাঁধে তীর বিঁধল। সে চিৎকার করে উঠল। মেডিক্যাল টিম দৌড়ে গেল।

রাগনার তার লংশিপ থেকে চিৎকার করছে। তার পরিকল্পনা এবার জাহাজের খুব কাছে গিয়ে দড়ি ছুড়ে চড়া। তার যোদ্ধারা প্রস্তুত। তারা বিশ্বাস করে, একবার ডেকে উঠতে পারলে তাদের কুঠার আর তলোয়ারে এই দানবকে হারানো যাবে। কিন্তু তারা জানে না আধুনিক অস্ত্রের শক্তি।

ক্যাপ্টেন আহমেদ আদেশ দিলেন, “মেশিনগান ফায়ার। লংশিপের দিকে, কিন্তু যোদ্ধাদের উপর নয়—নৌকার কাঠামো লক্ষ্য করো।”
ডেকের দুই পাশে মেশিনগান গর্জন করে উঠল। গুলির বৃষ্টি লংশিপের উপর পড়ল। কাঠের দেহে ছিদ্র হয়ে গেল। পাল ছিন্নভিন্ন। কয়েকটি নৌকা ডুবে যেতে লাগল। যোদ্ধারা সমুদ্রে পড়ে গেল। কেউ কেউ সাঁতরে অন্য নৌকায় উঠার চেষ্টা করছে। রাগনারের লংশিপেও গুলি লাগল। তার পাশের এক যোদ্ধা পড়ে গেল। রাগনারের চোখে রাগ আর ভয় মিশ্রিত। সে চিৎকার করে তার লোকদের এগিয়ে যেতে বলল।

কিন্তু ভাইকিংদের সাহস ভাঙতে শুরু করেছে। তারা দেখছে তাদের অস্ত্র এই লোহার দানবে কিছুই করতে পারছে না, আর দানবের বজ্র তাদের ধ্বংস করছে। তবু রাগনার হাল ছাড়ল না। তার লংশিপ আঙ্কারার খুব কাছে চলে এল। তারা দড়ি ছুড়ল। কয়েকটি হুক লেগে গেল রেলিং-এ। দশ-বারোজন যোদ্ধা দড়ি বেয়ে উঠতে লাগল।

ডেকে তুর্কি সৈনিকরা প্রস্তুত ছিল। তারা রাইফেল তাক করল। কিন্তু ক্যাপ্টেনের আদেশ—যতটা সম্ভব কম মারাত্মকভাবে। তারা পায়ে গুলি করল। কয়েকজন ভাইকিং পড়ে গেল সমুদ্রে। কিন্তু তিনজন ডেকে উঠে এল। তাদের হাতে কুঠার। তারা চিৎকার করে ছুটল তুর্কি সৈনিকদের দিকে।

একজন তুর্কি সৈনিকের সাথে সরাসরি লড়াই হল। ভাইকিং যোদ্ধা তার কুঠার তুলল। সৈনিক রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করল। যোদ্ধা পড়ে গেল। অন্য দুজনকেও অচল করা হল। তাদের হাত-পা বাঁধা হল। প্রথমবারের মতো ভাইকিং বন্দী আঙ্কারার ডেকে।
রাগনার নিচ থেকে দেখল তার যোদ্ধারা বন্দী হচ্ছে। তার মন ভেঙে গেল। সে পিছু হটার আদেশ দিল। বাকি লংশিপগুলো দ্রুত সরে গেল। সমুদ্রে ভাসছে ভাঙা কাঠ, ঢাল, তলোয়ার। কয়েকজন যোদ্ধা সাঁতরে পালাচ্ছে।

ক্যাপ্টেন আহমেদ আদেশ দিলেন, “রেসকিউ বোট নামাও। যাদের বাঁচানো যায়, তুলে আনো।” তিনটি বোট নামানো হল। নাবিকরা সমুদ্রে ঝাঁপ দিল। তারা ভাইকিং যোদ্ধাদের তুলল। প্রায় পনেরোজনকে উদ্ধার করা হল। কেউ কেউ ভয়ে প্রতিবাদ করল, কিন্তু অধিকাংশ ক্লান্ত হয়ে উঠে এল। তাদেরও হাত বাঁধা হল।

ডেকে এখন উদ্ধারকৃত সন্ন্যাসিনী আর বন্দী ভাইকিংরা পাশাপাশি। সন্ন্যাসিনীরা ভয়ে সরে গেল। ভাইকিংরা রাগে ফুঁসছে। কিন্তু ভাষা না থাকায় কেউ কারও সাথে কথা বলতে পারছে না। সিস্টার মারিয়া সাহস করে একজন আহত ভাইকিংয়ের কাছে গেলেন। তার পায়ে গুলি লেগেছে। তিনি তার পোশাকের অংশ ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ করার চেষ্টা করলেন। ভাইকিংটি প্রথমে অবাক, তারপর মাথা নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানাল।

ক্যাপ্টেন আহমেদ ব্রিজ থেকে নেমে ডেকে এলেন। তিনি বন্দীদের দেখলেন। তাদের চোখে ভয় আর বিদ্বেষ। তিনি একজনকে ইশারায় পানি খেতে দিলেন। কিন্তু যোগাযোগের কোনো উপায় নেই।

রাগনার দূরে তার বাকি নৌবহর নিয়ে দাঁড়িয়ে। তার মাত্র বারোটি লংশিপ অবশিষ্ট। অর্ধেকের বেশি ধ্বংস বা ডুবে গেছে। তার যোদ্ধাদের অর্ধেক মারা গেছে বা বন্দী। তার মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। কিন্তু সে জানে, সরাসরি লড়াইয়ে জেতা অসম্ভব। সে হারাল্ডকে বলল, “আমরা পিছু হটব। স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় ফিরে আরও যোদ্ধা সংগ্রহ করব। তারপর এই দানবকে ধ্বংস করব।”

কিন্তু বন্দী সন্ন্যাসিনীরা—এখনো ১৮ জন—তার হাতে। সে তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করল। সে তার লংশিপগুলোকে উত্তর দিকে ঘুরিয়ে দিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার পথে।

আঙ্কারায় ক্রুরা বিশ্রাম নিচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা চলছে। ক্যাপ্টেন আহমেদ একটি মিটিং ডাকলেন। “আমরা পাঁচজনকে উদ্ধার করেছি। কিন্তু বাকিরা এখনো ওদের হাতে। আমরা কি অনুসরণ করব?” অধিকাংশ অফিসার বললেন, “হ্যাঁ। আমরা তাদের ছাড়া ফিরতে পারি না।” কিন্তু একজন বলল, “ক্যাপ্টেন, আমরা ইতিহাসে হস্তক্ষেপ করছি। ভাইকিং যুগের ইতিহাস বদলে যেতে পারে।” ক্যাপ্টেন চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “মানুষের জীবন ইতিহাসের চেয়ে বড়। আমরা অনুসরণ করব।”

জাহাজের ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। আঙ্কারা উত্তর দিকে ঘুরল। রাডারে ভাইকিংদের অবস্থান দেখা যাচ্ছে। তারা পাল তুলে দ্রুত এগোচ্ছে। কিন্তু আঙ্কারার ডিজেল ইঞ্জিন অনেক শক্তিশালী। ধীরে ধীরে দূরত্ব কমতে লাগল।

সন্ধ্যা নামল। সমুদ্র শান্ত। আঙ্কারার ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠল। দূরে ভাইকিংদের লংশিপ দেখা যাচ্ছে। রাগনার বুঝল তারা অনুসরণ করছে। সে তার লোকদের বলল, “আমরা রাতের অন্ধকারে লুকাব। উপকূলের কাছে গিয়ে লুকিয়ে পড়ব।”

কিন্তু আঙ্কারার রাডার সব দেখছে। ক্যাপ্টেন আহমেদ বললেন, “ওরা পালাতে পারবে না। কিন্তু আমরা আক্রমণ করব না যতক্ষণ না বন্দীরা বিপদে পড়ে।”

রাত গভীর হল। হঠাৎ আকাশে মেঘ জমল। একটি ঝড়ের পূর্বাভাস। বাতাস বাড়তে লাগল। ভাইকিংদের লংশিপ ঢেউয়ে দুলছে। আঙ্কারা তার পুরনো নির্ভরযোগ্য দেহ নিয়ে অটল। কিন্তু ঝড় বাড়তে লাগল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যেন সেই সময়ের ঘূর্ণিঝড় আবার ফিরে আসছে।
ক্যাপ্টেন আহমেদ চিৎকার করলেন, “সবাই সতর্ক! ঝড় আসছে!” জাহাজ কাঁপতে লাগল। রাডারে ভাইকিংদের অবস্থান অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ঝড়ের মাঝে সবকিছু হারিয়ে যেতে লাগল।

চতুর্থ দিনের যুদ্ধ শেষ হলেছে, কিন্তু লড়াই এখনো চলছে। ঝড়ের মাঝে আঙ্কারা একা। বন্দীদের ভাগ্য অজানা।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:২৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সক্কাল বেলা একটা জোক্সস শোনাই

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৬


বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার আমলে যতটা নিকৃষ্ট ভাবে ভোট চুরি হয়েছে আর কারো আমলে হয় নি। এমন কি এরশাদের আমলেও না। ...বাকিটুকু পড়ুন

গো ফুলের নিয়ামত

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩


এখন নাকি বিবেক বুদ্ধির জন্ম হচ্ছে-
ঘুরপাক বুড়োরা মৃত্যুর কুলে দুল খাচ্ছে;
রঙিন খাট পালঙ্কে- মাটিতে পা হাঁটছে না
শূন্য আকাশে পাখি উড়ু উড়ু গো ফুলের গন্ধ
উঠান বুঠানে বিবেক বুদ্ধির বাগান... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট পোস্ট!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯


জুলাই সনদে স্বাক্ষরের দিন ড. ইউনুস বলেছেন, “এই সনদে স্বাক্ষর করলে আমরা বর্বরতা থেকে সভ্যতায় উন্নীত হবো।”
আর গতকাল উনি বলতেছেন বাঙালি হচ্ছে বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে জালিয়াত জাতি! তো জুলাই সনদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯

তিন শ' এক//
আমার সাহস দেখে, জানি. তুমি খুব রেগে যাবে।
ঘরহীন, সর্বহারা ভালোবাসা জানায় কিভাবে ?

তিন শ' দুই//
চোখের মালিক ঘোর নিঃশ্বতার আঁধারে ডুবেছে;
তবুও বেকুব চোখ সুন্দরের নেশায় ডুবেছে!
...বাকিটুকু পড়ুন

=দাও হেদায়েত ও আল্লাহ=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪৫


পাপ মার্জনা করো মাবুদ,
দয়া করো আমায়,
না যেন আর মোহ আমায়
মধ্যিপথে থামায়!

শুদ্ধতা দাও মনের মাঝে
ডাকি মাবুদ তোমায়
দিবানিশি আছি পড়ে
ধরার সুখের কোমায়!

হিংসা মনের দূর করে দাও
কমাও মনের অহম ,
ঈর্ষা হতে বাঁচাও আমায়
করো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×