ইংলিশ চ্যানেলের জল এখন একটি উন্মত্ত দানবে পরিণত হয়েছে। ঝড়ের প্রচণ্ডতা যেন সময়ের সেই ঘূর্ণিপথকে আবার জাগিয়ে তুলেছে, যা টিসিজি আঙ্কারাকে এই অচেনা যুগে টেনে এনেছিল। জাহাজের ধাতব দেহ প্রচণ্ড ঢেউয়ে দুলছে, কিন্তু তার পুরনো নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন গর্জন করে চলছে। ক্যাপ্টেন আহমেদ কায়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডেল ধরে আছেন। তার চোখে উদ্বেগ, কিন্তু মনে দৃঢ়তা। “সবাই পোস্টে থাকো! ইঞ্জিন ফুল স্পিড রাখো। রাডার চেক করো—ভাইকিংরা কোথায়?” তিনি চিৎকার করে বললেন।
লেফটেন্যান্ট এমরে রাডার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। স্ক্রিনে সিগন্যালগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের চমকে আকাশ আলোকিত হয়ে উঠছে, আর বজ্রপাতের গর্জন যেন থরের হাতুড়ির আঘাত। “ক্যাপ্টেন, সিগন্যাল হারিয়ে যাচ্ছে। ওরা উত্তর দিকে এগোচ্ছিল, কিন্তু এই ঝড়ে... তারা ছোট লংশিপে, এরা তো বাঁচতে পারবে না!” এমরের গলায় ভয় মিশ্রিত।
ডেকে উদ্ধারকৃত সন্ন্যাসিনীরা এবং বন্দী ভাইকিংরা নিচের কেবিনে আশ্রয় নিয়েছে। সিস্টার মারিয়া তার সঙ্গীদের ধরে রেখে প্রার্থনা করছেন। “Deus, in tempestate nos custodi!” (ঈশ্বর, এই ঝড়ে আমাদের রক্ষা করো!) তার গলা কাঁপছে, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত শান্তি। তুর্কি নাবিকরা তাদের পানি আর খাবার দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভাষার ব্যবধানে কোনো কথা হচ্ছে না। বন্দী ভাইকিংরা হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে। তাদের চোখে ভয় আর বিস্ময়। একজন যোদ্ধা, যার নাম ফ্রোডি, তার পায়ের ক্ষত থেকে রক্ত পড়ছে। সে তার সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলছে নর্স ভাষায়, “এরা কোন দেবতার সন্তান? এই লোহার দানব কখনো ডোবে না?”
দূরে, ভাইকিংদের লংশিপগুলো ঝড়ের কবলে পড়েছে। রাগনার তার নৌকার হাল ধরে আছে। তার লংশিপ ঢেউয়ে উঠে-পড়ছে। বাকি বারোটি নৌকা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বন্দী সন্ন্যাসিনীরা ভয়ে চিৎকার করছে। একটি বড় ঢেউ এসে রাগনারের লংশিপকে আঘাত করল। পাল ছিঁড়ে গেল, কয়েকজন যোদ্ধা সমুদ্রে পড়ে গেল। রাগনার চিৎকার করে বলল, “হারাল্ড! লংশিপগুলোকে একত্র করো! ওডিন আমাদের রক্ষা করুন!” কিন্তু ঝড়ের গর্জনে তার কথা হারিয়ে যাচ্ছে।
হারাল্ড তার নিজের লংশিপ থেকে চেষ্টা করছে, কিন্তু একটি বিশাল ঢেউ তার নৌকাকে উল্টিয়ে দিল। সন্ন্যাসিনীরা চিৎকার করে উঠল। কয়েকজন যোদ্ধা তাদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু সমুদ্রের শক্তি অপ্রতিরোধ্য। রাগনার দেখল তার একটি লংশিপ ডুবে যাচ্ছে। “না! আমাদের লুট!” সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল। কিন্তু প্রকৃতির সামনে তার যুদ্ধশক্তি কিছুই নয়।
আঙ্কারায় ঝড়ের মধ্যেও ক্রুরা লড়াই করছে। জাহাজের ইঞ্জিনরুমে ইঞ্জিনিয়াররা যন্ত্রপাতি চেক করছে। একটি বড় ঢেউ জাহাজকে আঘাত করল, কিন্তু তার পুরু লোহার দেহ সহ্য করল। ক্যাপ্টেন আহমেদ মাইক্রোফোনে বললেন, “সবাই শান্ত থাকো। এই জাহাজ চল্লিশ বছরের ঝড় সহ্য করেছে। এটাও পারবে।” কিন্তু তার মনে সন্দেহ জাগছে—এই ঝড় কি সেই সময়ের ঘূর্ণিপথ? তারা কি আবার ভবিষ্যতে ফিরে যাবে?
ঝড় কয়েক ঘণ্টা চলল। ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হল। সকালের আলো ফুটল। আঙ্কারা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চারদিকে ধ্বংসাবশেষ ভাসছে—কাঠের টুকরো, ছেঁড়া পাল, মানুষের দেহ। রাডারে কোনো সিগন্যাল নেই। ক্যাপ্টেন আহমেদ দূরবিনে চারদিক দেখলেন। দূরে কয়েকটি লংশিপের অবশেষ দেখা যাচ্ছে। “রেসকিউ টিম প্রস্তুত করো। যাদের বাঁচানো যায়, তুলে আনো।” তিনি আদেশ দিলেন।
তিনটি রেসকিউ বোট নামানো হল। নাবিকরা সমুদ্রে নামল। তারা ভাসমান যোদ্ধাদের তুলল। প্রায় দশজন ভাইকিংকে উদ্ধার করা হল, কয়েকজন সন্ন্যাসিনীও। মোট আটজন মহিলাকে বাঁচানো গেল। তারা অর্ধচেতন, ভিজে গেছে। ডেকে তাদের চিকিৎসা শুরু হল। সিস্টার মারিয়া দৌড়ে এসে তার সঙ্গীদের আলিঙ্গন করল। তিনি কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করছেন।
কিন্তু রাগনারের অবস্থান অজানা। তার লংশিপ ঝড়ে বেঁচে আছে কি না, কেউ জানে না। ক্যাপ্টেন আহমেদ একটি মিটিং ডাকলেন। “আমরা আরও বন্দী উদ্ধার করেছি। কিন্তু বাকিরা? আর ভাইকিং লিডার?” লেফটেন্যান্ট এমরে বলল, “ক্যাপ্টেন, আমরা উত্তরে এগোব? উপকূলের কাছে তারা লুকিয়ে থাকতে পারে।” ক্যাপ্টেন মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ। আমরা তাদের খুঁজব। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে। যদি সম্ভব হয়, যোগাযোগ করার চেষ্টা করব।”
জাহাজ উত্তর দিকে এগোল। ডেকে বন্দী ভাইকিংরা এখন আরও বেশি। তাদের হাত খোলা হয়েছে, কিন্তু পাহারায় রাখা হয়েছে। ফ্রোডি তার সঙ্গীদের সাথে বসে। সে একজন তুর্কি নাবিকের দিকে তাকিয়ে ইশারায় পানি চাইল। নাবিক দিল। ফ্রোডি মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানাল। ধীরে ধীরে ভয় কমছে, কিন্তু অবিশ্বাস রয়ে গেছে।
সন্ন্যাসিনীরা এক কেবিনে একত্র হয়েছে। সিস্টার মারিয়া তাদের নিয়ে প্রার্থনা করছেন। একজন তরুণী সন্ন্যাসিনী, নাম এলিজাবেথ, বলল, “সিস্টার, এরা কারা? এই লোহার দানব কোথা থেকে এল?” মারিয়া বললেন, “হয়তো ঈশ্বরের দূত। তারা আমাদের রক্ষা করেছে। আমরা কৃতজ্ঞ হব।” কিন্তু তাদের মনে ভয় রয়ে গেছে।
দুপুরে আঙ্কারা উপকূলের কাছে পৌঁছল। দূরে একটি ছোট উপসাগর দেখা গেল। রাডারে কয়েকটি ছোট সিগন্যাল। ক্যাপ্টেন আহমেদ দূরবিনে দেখলেন—পাঁচটি লংশিপ লুকিয়ে আছে। রাগনারের নৌবহরের অবশিষ্ট। “তারা সেখানে। বন্দীদের সাথে। আমরা কাছে যাব না। প্রথমে যোগাযোগের চেষ্টা করব।” তিনি বললেন।
জাহাজ থামল। লাউডস্পিকারে ক্যাপ্টেন তুর্কি ভাষায় বললেন, “আমরা শান্তি চাই। বন্দীদের মুক্ত করুন।” কিন্তু ভাইকিংরা কিছু বুঝল না। রাগনার উপকূল থেকে দেখছে। তার লংশিপগুলো ক্ষতিগ্রস্ত, যোদ্ধারা ক্লান্ত। তার হাতে এখনো দশজন সন্ন্যাসিনী। সে ভাবল, “এরা আমাদের অনুসরণ করেছে। কিন্তু এবার আমরা জমিতে। লড়াই করতে পারব।”
রাগনার তার যোদ্ধাদের নিয়ে উপকূলে শিবির গড়ল। সে সন্ন্যাসিনীদের বাঁধা রাখল। হারাল্ড বলল, “জার্ল, আমরা কী করব? এই দানবকে জমিতে আক্রমণ করা যাবে না।” রাগনার বলল, “আমরা অপেক্ষা করব। তারা যদি জমিতে নামে, তাহলে আমরা আক্রমণ করব। বা বিনিময়ের চেষ্টা করব—আমাদের বন্দীদের বদলে এই মহিলাদের।”
আঙ্কারায় ক্যাপ্টেন সিদ্ধান্ত নিলেন একটি ছোট দল পাঠাতে। “আমরা জমিতে যাব। বন্দী ভাইকিংদের সাথে নিয়ে। হয়তো তারা বোঝাপড়া করবে।” তিনি নিজে দলের নেতৃত্ব দিলেন। লেফটেন্যান্ট এমরে, ছয়জন সৈনিক, আর দুজন বন্দী ভাইকিং—ফ্রোডি আর অন্য একজন। সন্ন্যাসিনীদের থেকে সিস্টার মারিয়া স্বেচ্ছায় যোগ দিলেন। তিনি ভাবলেন, তার ল্যাটিন ভাষা হয়তো কাজে লাগবে, যদিও ভাইকিংরা নর্স বলে।
রেসকিউ বোটে তারা উপকূলে পৌঁছল। রাগনারের যোদ্ধারা তাদের দেখে অস্ত্র তুলল। কিন্তু ক্যাপ্টেন আহমেদ হাত তুলে শান্তির ইশারা করলেন। ফ্রোডিকে সামনে ঠেলে দিলেন। ফ্রোডি তার সঙ্গীদের দেখে চিৎকার করল, “জার্ল রাগনার! আমরা জীবিত! এরা আমাদের ক্ষতি করেনি!” রাগনার অবাক হয়ে এগিয়ে এল। তার চোখে অবিশ্বাস। সে তার যোদ্ধাদের দেখে আলিঙ্গন করল। কিন্তু তুর্কি দলের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল।
সিস্টার মারিয়া এগিয়ে এলেন। তিনি ল্যাটিনে বললেন, “Pacem volumus. Captivas liberatete.” (আমরা শান্তি চাই। বন্দীদের মুক্ত করুন।) রাগনার কিছু বুঝল না, কিন্তু তার যোদ্ধাদের মধ্যে একজন, যে কোনো এক গির্জায় ছিল, ল্যাটিনের কিছু শব্দ চেনে। সে রাগনারকে অনুবাদ করল, “জার্ল, এই মহিলা শান্তি চায়। বন্দীদের মুক্ত করতে বলছে।”
রাগনার ভাবল। সে তার যোদ্ধাদের সাথে পরামর্শ করল। “এরা শক্তিশালী। কিন্তু জমিতে আমরা সুবিধাজনক। তবু, বিনিময় করব।” সে ইশারায় বন্দী সন্ন্যাসিনীদের সামনে আনল। ক্যাপ্টেন আহমেদ বুঝলেন। তিনি নিজের দলকে বললেন, “এরা বিনিময় চায়। আমরা রাজি হব।”
ধীরে ধীরে বিনিময় হল। সন্ন্যাসিনীরা তুর্কি দলের কাছে এল। তারা কাঁদতে কাঁদতে মারিয়াকে জড়িয়ে ধরল। রাগনার তার যোদ্ধাদের ফিরে পেল। কিন্তু তার চোখে প্রতিশোধের আগুন এখনো জ্বলছে। সে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে বলল নর্সে, “আমরা যাব। কিন্তু এই লড়াই শেষ নয়।” ফ্রোডি অনুবাদ করল যতটা পারল ইশারায়।
তুর্কি দল ফিরে এল জাহাজে। সব সন্ন্যাসিনী উদ্ধার হয়েছে। ক্রুরা উল্লাস করল। কিন্তু ক্যাপ্টেন আহমেদের মনে প্রশ্ন—এখন কী? তারা কি এই যুগে আটকে থাকবে? নাকি সময়ের ঘূর্ণিপথ আবার খুলবে?
রাগনার তার লংশিপ নিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দিকে রওনা দিল। তার মনে ক্ষোভ। সে তার গ্রামে ফিরে গল্প বলবে এই লোহার দানবের। হয়তো আরও যোদ্ধা সংগ্রহ করবে। কিন্তু এখন সে ক্লান্ত।
আঙ্কারায় সন্ন্যাসিনীরা বিশ্রাম নিচ্ছে। সিস্টার মারিয়া ক্যাপ্টেনের সাথে দেখা করলেন। তিনি ইশারায় কৃতজ্ঞতা জানালেন। ক্যাপ্টেন একটি কাগজে ছবি এঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে তারা ভবিষ্যত থেকে এসেছে। মারিয়া অবাক হয়ে গেলেন। তিনি ল্যাটিনে লিখলেন একটি বাক্য। ক্রুরা একটি পুরনো বই থেকে অনুবাদ করার চেষ্টা করল। “ঈশ্বরের কাজ।” তা দেখে ক্যাপ্টেন হাসলেন।
দিন গড়িয়ে গেল। আঙ্কারা উপকূল ছেড়ে সমুদ্রে ফিরল। ক্রুরা জাহাজ মেরামত করছে। কিন্তু হঠাৎ রাডারে অদ্ভুত সিগন্যাল। আকাশ কালো হয়ে গেল। আরেকটি ঝড়। কিন্তু এবারের ঝড় ভিন্ন—যেন সময়ের দরজা খুলছে। জাহাজ কাঁপতে লাগল। সবকিছু ঘুরতে লাগল।
কয়েক মিনিট পর ঝড় থামল। আকাশ পরিষ্কার। কিন্তু চারদিকে আধুনিক জাহাজ দেখা গেল। জিপিএস সিগন্যাল ফিরে এল। তারা ২০২৫ সালে ফিরে এসেছে! ক্রুরা উল্লাস করল। কিন্তু সন্ন্যাসিনীরা? তারা এখনো জাহাজে। ক্যাপ্টেন আহমেদ ভাবলেন, “আমরা ইতিহাস বদলে দিয়েছি। কিন্তু এখন কী করব?”
সন্ন্যাসিনীরা অবাক হয়ে চারদিক দেখছে। আধুনিক বিশ্ব তাদের কাছে অলৌকিক। সিস্টার মারিয়া প্রার্থনা করছেন। ক্যাপ্টেন তাদের নিয়ে তুর্কি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলেন। গোপনীয়তা রক্ষা করে তাদের সাহায্য করা হল। তারা হয়তো নতুন জীবন শুরু করবে এই যুগে।
কিন্তু রাগনারের গল্প? ইতিহাসে একটি নতুন মিথ জন্ম নিল—লোহার দানবের কাহিনী। ভাইকিং লোককথায় সেটা রয়ে গেল। আর আঙ্কারা তার পুরনো ধাতব দেহ নিয়ে আবার টহল দিতে লাগল। ক্যাপ্টেন আহমেদের মনে চিরকালের জন্য সেই অভিজ্ঞতা রয়ে গেল—সময়ের ঘূর্ণিপথ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



