somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পর্ব ৬: লোহার দানবের কিংবদন্তি

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ইস্তানবুলের কাসিমপাশা নৌঘাঁটির কাছে একটি গোপন ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরিতে আলো জ্বলছে রাতভর। বাইরে বসফরাসের ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, কিন্তু ভিতরে বাতাস গরম—উত্তেজনা আর উদ্বেগের মিশ্রণে। প্রফেসর সেলিন ইয়ালচিন তার ল্যাব কোটের হাতা গুটিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে আছেন। তার সামনে একটা বড় মনিটরে টিসিজি আঙ্কারার রাডার ডেটা ঘুরছে—সেই দিনের, যেদিন জাহাজটা হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল, তারপর আবার ফিরে এসেছিল তেইশ জন মধ্যযুগীয় সন্ন্যাসিনী নিয়ে।

সেলিনের চোখে ঘুমের চিহ্ন নেই। গত ছয় মাস ধরে তিনি এই ডেটা নিয়ে কাজ করছেন। তার পাশে বসে আছেন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বুরাক আরসলান, নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের একজন অফিসার। বুরাকের হাতে একটা ফাইল—ক্যাপ্টেন আহমেদ কায়ার লেখা গোপন লগবুকের কপি। “প্রফেসর, আপনি নিশ্চিত?” বুরাক জিজ্ঞাসা করলেন। তার গলায় সন্দেহ।

সেলিন মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন। তার চোখে একটা অদ্ভুত আলো। “নিশ্চিত না হলে এত রাতে আপনাকে ডাকতাম না। দেখুন এই গ্রাফটা।” তিনি মনিটরে একটা লাইন দেখালেন। “এটা আঙ্কারার ইঞ্জিনের ফ্রিকোয়েন্সি। ঝড়ের সময় এটা হঠাৎ একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে পৌঁছে যায়—৪৭.৮ হার্জ। আর এই সময়েই জিপিএস সিগন্যাল হারিয়ে যায়। এটা কোনো সাধারণ ঝড় নয়। এটা একটা... টাইম পোর্টাল।”

বুরাক ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। “টাইম পোর্টাল? প্রফেসর, এটা সায়েন্স ফিকশনের মতো শোনাচ্ছে।”

সেলিন হাসলেন। একটা ক্লান্ত, কিন্তু দৃঢ় হাসি। “আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু দেখুন এই ডেটা।” তিনি আরেকটা ফাইল খুললেন। “আঙ্কারার সোনার সিস্টেমে রেকর্ড করা আওয়াজ—ঝড়ের মাঝে একটা অদ্ভুত হাম। এটা প্রাকৃতিক নয়। আর এই ফ্রিকোয়েন্সি শুধু ইংলিশ চ্যানেলের একটা নির্দিষ্ট অংশে পাওয়া যায়। আমরা স্যাটেলাইট ডেটা চেক করেছি। সেই একই জায়গায় চৌম্বকীয় অস্থিরতা আছে।”

ল্যাবের অন্য প্রান্তে দুজন তরুণ ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছে। একজনের নাম এমরে, অন্যজনের আলি। তারা একটা ছোট মডেল জাহাজের উপর পরীক্ষা করছে। একটা কয়েলের মাধ্যমে তারা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস পাঠাচ্ছে। “প্রফেসর, টেস্ট থ্রি রেডি,” এমরে বলল।
সেলিন উঠে দাঁড়ালেন। “চালাও।”

এমরে একটা বোতাম টিপল। মডেল জাহাজের চারপাশে একটা নীল আভা জ্বলে উঠল, তারপর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর আবার দেখা গেল—কিন্তু জায়গা বদলে গেছে। ল্যাবের সবাই চুপ করে গেল। বুরাকের মুখ ফ্যাকাশে। “এটা... এটা কী করলে?”
“একটা মিনি পোর্টাল,” সেলিন বললেন। “আমরা এটাকে কন্ট্রোল করতে পারি। কিন্তু বড় স্কেলে করতে হলে একটা জাহাজ লাগবে। আর সেটা হতে হবে নিউক্লিয়ার পাওয়ারড। ডিজেল ইঞ্জিনে এত পাওয়ার পাওয়া যাবে না।”

বুরাক চুপ করে রইলেন। তার মনে ক্যাপ্টেন আহমেদের কথা মনে পড়ছে। আহমেদ এখন রিটায়ার্ড, বসফরাসের ধারে একটা ছোট বাড়িতে থাকেন। তার মুখ কখনো হাসে না। তিনি জানেন সত্যটা, কিন্তু কখনো বলেন না। বুরাক নিজেও আঙ্কারার ক্রু ছিলেন না, কিন্তু গোয়েন্দা হিসেবে পুরো রিপোর্ট পড়েছেন। তেইশ জন সন্ন্যাসিনী—যারা এখন তুরস্কের বিভিন্ন শহরে নতুন পরিচয়ে বাস করছেন। তাদের মধ্যে মারিয়াম হানিম এখনো একটা স্কুলে পড়ান।

“আমরা কী করতে চাইছি, প্রফেসর?” বুরাক অবশেষে জিজ্ঞাসা করলেন। “আবার সেই পোর্টাল খুলে কী লাভ?”

সেলিন একটা গভীর শ্বাস নিলেন। “লাভ অনেক। প্রথমত, আমরা বুঝতে পারব সময় ভ্রমণের মেকানিজম। দ্বিতীয়ত, আমরা অতীত থেকে জ্ঞান নিয়ে আসতে পারি—প্রাচীন প্রযুক্তি, মেডিসিন, নেভিগেশন। ভাইকিংরা যেভাবে সমুদ্র পাড়ি দিত, সেটা আধুনিক জিপিএস ছাড়া। আর সবচেয়ে বড় কথা—যদি আমরা এটাকে কন্ট্রোল করতে পারি, তাহলে তুরস্ক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হয়ে উঠবে।”

বুরাক মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কিন্তু তার মনে একটা ভয়। “কিন্তু ইতিহাস বদলে গেলে? আঙ্কারা যা করেছে, সেটা ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে গেছে। রাগনারের সাগায় লোহার দানবের গল্প। আমরা যদি আরও বড় হস্তক্ষেপ করি?”

সেলিন চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “সেজন্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। এবার আমরা প্রস্তুত হয়ে যাব। নিউক্লিয়ার জাহাজ, দীর্ঘমেয়াদী সাপ্লাই, আর একটা ডিভাইস যাতে আমরা যখন চাই তখন ফিরে আসতে পারি।”

পরের দিন সকালে একটা গোপন মিটিং ডাকা হল। নৌবাহিনীর সদর দপ্তরে, অ্যাডমিরাল মেহমেত আলতুনের ঘরে। উপস্থিত আছেন প্রফেসর সেলিন, বুরাক, আর আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ অফিসার। অ্যাডমিরাল একটা ফাইল খুললেন। “প্রফেসর, আপনার রিপোর্ট আমি পড়েছি। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে এটা তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প। কিন্তু ঝুঁকি অনেক।”

সেলিন বললেন, “ঝুঁকি আছে, কিন্তু আমরা এটাকে মিনিমাইজ করতে পারি। আমাদের একটা নিউক্লিয়ার প্রপালশনড জাহাজ লাগবে। ইস্তিফ-ক্লাস ফ্রিগেটের মডিফাইড ভার্সন। রিয়াক্টর হবে ছোট, কিন্তু শক্তিশালী। ৩০ বছর রিফুয়েলিং ছাড়া চলবে।”

অ্যাডমিরাল ভ্রু কুঁচকালেন। “নিউক্লিয়ার? তুরস্কের কাছে এখনো এমন টেকনোলজি নেই।”

“আছে,” সেলিন বললেন। “আমরা রাশিয়ান কেএলটি-৪০ মডেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আর আমাদের নিজস্ব ইঞ্জিনিয়াররা এটা তৈরি করতে পারবে। গোপনে।”

মিটিং শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল—প্রকল্প শুরু হবে। নাম: অপারেশন টাইমলাইন II। বাজেট গোপন তহবিল থেকে। প্রথম কাজ: জাহাজ নির্বাচন এবং মডিফিকেশন।

পরের কয়েক মাস ধরে কাজ চলল গোপনে। গোলচুক নৌঘাঁটিতে একটা আলাদা শেডে টিসিজি ইস্তানবুলকে নিয়ে আসা হল। জাহাজটা নতুন, কিন্তু এখন এটাকে বদলে ফেলা হবে। ইঞ্জিনিয়াররা রাতদিন কাজ করছে। নিউক্লিয়ার রিয়াক্টরের ডিজাইন তৈরি হল। এটা হবে একটা কমপ্যাক্ট প্রেসারাইজড ওয়াটার রিয়াক্টর, যা জাহাজের পিছনে ফিট হবে। শিল্ডিংয়ের জন্য বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হল।
এদিকে প্রফেসর সেলিন ক্রোনো-কন্ট্রোলার ডিভাইস নিয়ে কাজ করছেন। এটা একটা ছোট বাক্স, যার ভিতরে কোয়ান্টাম প্রসেসর আর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক কয়েল। এটা পোর্টালের ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাডজাস্ট করে রিটার্ন টাইম সিলেক্ট করতে পারবে। “এটা যেন সময়ের চাবি,” সেলিন তার টিমকে বললেন।

কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিল। রিয়াক্টরের ফুয়েল। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তুরস্কের কাছে সীমিত। গোপনে রাশিয়া থেকে সাহায্য নেওয়া হল। একটা গোয়েন্দা অপারেশনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ম্যাটেরিয়াল আনা হল। বুরাক এই অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন।

২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে জাহাজের মডিফিকেশন শুরু হল। খাবারের স্টক রাখা হল পাঁচ বছরের জন্য। হাইড্রোপনিক গার্ডেন তৈরি হল জাহাজের নিচের ডেকে। সবজি, ফল চাষের ব্যবস্থা। ওয়াটার পিউরিফিকেশন সিস্টেম। মেডিক্যাল সাপ্লাই। সবকিছু প্রস্তুত।
এদিকে ক্যাপ্টেন নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে। অনেক নাম আলোচনায় এল। কিন্তু সবাই একমত হল—ক্যাপ্টেন ওমর ডেমির। তিনি তরুণ, কিন্তু অভিজ্ঞ। তার ইন্টেলিজেন্স ব্যাকগ্রাউন্ড এই মিশনের জন্য পারফেক্ট।

একদিন সেলিন আর বুরাক ক্যাপ্টেন আহমেদের বাড়িতে গেলেন। আহমেদ বসফরাসের ধারে একটা ছোট বাড়িতে থাকেন। তার বারান্দায় বসে সমুদ্র দেখেন। সেলিন বললেন, “ক্যাপ্টেন, আমরা আবার যাচ্ছি।”

আহমেদ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “জেনে-শুনে যাবেন? আমি তো ভাবিনি কখনো ফিরব।”

“এবার আমরা প্রস্তুত,” সেলিন বললেন। “নিউক্লিয়ার জাহাজ। রিটার্ন ডিভাইস।”

আহমেদ হাসলেন। একটা তিক্ত হাসি। “প্রস্তুতি কখনো যথেষ্ট হয় না। সময় তার নিজের নিয়মে চলে। কিন্তু... যদি যান, তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন। মানুষের জীবন ইতিহাসের চেয়ে বড়।”

সেলিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন—এটা কি সঠিক সিদ্ধান্ত?
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০২৫ ভোর ৫:৩২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সক্কাল বেলা একটা জোক্সস শোনাই

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৬


বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার আমলে যতটা নিকৃষ্ট ভাবে ভোট চুরি হয়েছে আর কারো আমলে হয় নি। এমন কি এরশাদের আমলেও না। ...বাকিটুকু পড়ুন

গো ফুলের নিয়ামত

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩


এখন নাকি বিবেক বুদ্ধির জন্ম হচ্ছে-
ঘুরপাক বুড়োরা মৃত্যুর কুলে দুল খাচ্ছে;
রঙিন খাট পালঙ্কে- মাটিতে পা হাঁটছে না
শূন্য আকাশে পাখি উড়ু উড়ু গো ফুলের গন্ধ
উঠান বুঠানে বিবেক বুদ্ধির বাগান... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট পোস্ট!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯


জুলাই সনদে স্বাক্ষরের দিন ড. ইউনুস বলেছেন, “এই সনদে স্বাক্ষর করলে আমরা বর্বরতা থেকে সভ্যতায় উন্নীত হবো।”
আর গতকাল উনি বলতেছেন বাঙালি হচ্ছে বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে জালিয়াত জাতি! তো জুলাই সনদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯

তিন শ' এক//
আমার সাহস দেখে, জানি. তুমি খুব রেগে যাবে।
ঘরহীন, সর্বহারা ভালোবাসা জানায় কিভাবে ?

তিন শ' দুই//
চোখের মালিক ঘোর নিঃশ্বতার আঁধারে ডুবেছে;
তবুও বেকুব চোখ সুন্দরের নেশায় ডুবেছে!
...বাকিটুকু পড়ুন

=দাও হেদায়েত ও আল্লাহ=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪৫


পাপ মার্জনা করো মাবুদ,
দয়া করো আমায়,
না যেন আর মোহ আমায়
মধ্যিপথে থামায়!

শুদ্ধতা দাও মনের মাঝে
ডাকি মাবুদ তোমায়
দিবানিশি আছি পড়ে
ধরার সুখের কোমায়!

হিংসা মনের দূর করে দাও
কমাও মনের অহম ,
ঈর্ষা হতে বাঁচাও আমায়
করো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×