somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গলির শেষ মাথায়

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিকেল চারটা বেজে দশ। ভাদ্র মাসের আকাশ সকাল থেকেই গুমোট হয়ে ছিল। ইসলামপুরের কাপড়ের আড়তগুলোর মাথার ওপর ঝুলে থাকা মেঘটা যেন ঠিক সেই মুহূর্তেই ফাটল, যখন আনোয়ার হোসেন হিসাবের খাতা থেকে চোখ তুলে দেখলেন, দোকানের কাচের দরজার ওপারে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের গায়ে খাকি ইউনিফর্ম, তৃতীয়জনের গায়ে হালকা নীল শার্ট, কোমরে ঝোলানো ওয়্যারলেস সেট। তৃতীয়জনকে তিনি চিনতেন। গত দুই মাসে সে দুবার এই দোকানে এসেছে। দুবারই আনোয়ার সাহেব ছিলেন না, আর দুবারই মালিকের ছেলে হেসে বলেছে, "চাচা তো ব্যাংকে গেছেন, স্যার।"

আজ আর ব্যাংকের অজুহাত চলবে না। আনোয়ার নিজের ডেস্কেই বসা, সামনে খোলা লেজার, হাতে কলম। মালিকের ছেলে রফিক ক্যাশ কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। ওই এক চাহনিতেই আনোয়ার বুঝে গেলেন, আজ কেউ আগে থেকে খবর দিয়েছে, অথবা কেউ আজ খবর দিতে ভুলে গেছে। কোনটা বেশি খারাপ, সেটা ভাবার সময় ছিল না।

সাতচল্লিশ বছর বয়সে মানুষ বোধহয় নিজের শরীরের কাছে আর অবাক হয় না। কিন্তু আনোয়ার অবাক হলেন। চেয়ার থেকে উঠতে তাঁর এক সেকেন্ডও লাগল না। হাঁটুতে যে ব্যথাটা গত শীত থেকে সিঁড়ি ভাঙার সময় জানান দিত, সেটা কোথায় গেল কে জানে। নীল শার্টের লোকটা দরজা ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে বলল, "আনোয়ার হোসেন? বাবার নাম মোহাম্মদ ইউসুফ আলী?" আনোয়ার উত্তর দিলেন না। তিনি ডেস্কের পাশের ছোট দরজাটা দিয়ে পেছনের গোডাউনে ঢুকে গেলেন।

মামলাটা তাঁর নিজের ছিল না। এটাই সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার। বারো বছর আগে মালিক হাজী সোবহান সাহেব যখন কাপড় আমদানির জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন, তখন কাগজে সাক্ষী হিসেবে একটা সই লাগত। আনোয়ার সেদিন সই করেছিলেন। কারণ হাজী সাহেব বলেছিলেন, "তুমি ঘরের মানুষ, আনোয়ার, তোমার সই মানে আমার সই।" সেই সইটা এখন একটা চেক ডিসঅনারের মামলার আর ঋণ খেলাপির নালিশের নথিতে তাঁর নামটাকে আসামির তালিকায় তুলে দিয়েছে। হাজী সাহেব গত বছর মারা গেছেন। ছেলেরা বলেছে, সব ঠিক করে ফেলবে। ঠিক আর হয়নি। আদালত থেকে তিন দফা সমন এসেছিল, দুটো তাঁর কাছে পৌঁছায়নি, একটা পৌঁছেছিল, আর তিনি ভেবেছিলেন, রফিকরা সামলে নেবে। এখন পরোয়ানা।

গোডাউনের ভেতরে থানকাপড়ের গাঁটের সারি, ওপরে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ যেন কেউ হাজার মুঠো কাঁকর ছুঁড়ছে। আনোয়ার গাঁটের ফাঁক দিয়ে দৌড়ালেন। পেছনে ভারী বুটের শব্দ আর সেই নীল শার্টের গলা, "এই! দাঁড়ান! দৌড়াবেন না, আপনার জন্যই খারাপ হবে!" তিনি জানতেন খারাপ হবে। কিন্তু তিনি এটাও জানতেন, একবার ধরা পড়লে আজ রাতেই হাজতে, কাল কোর্টে, আর জামিন শুনানির তারিখ কবে পড়বে কেউ বলতে পারে না। মেয়ের এসএসসি ফর্ম ফিলাপের ফি এখনো জমা হয়নি। রোকেয়া, তাঁর স্ত্রী, আজ সকালেই বলেছিলেন, "আজ একটু আগে ফিরো, তোমার প্রিয় ইলিশ এনেছি।"

গোডাউনের পেছনের দরজাটা খুলল একটা সরু গলিতে, যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে পারে না। আনোয়ার গলিতে নামলেন, হাঁটু অবধি ময়লা পানি। জুতোর ভেতর পানি ঢুকে গেল। বাঁয়ে গেলেন, ডানে, আবার ডানে। ইসলামপুর তিনি চেনেন, সাতাশ বছর এই এলাকায় কাজ করছেন। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় দুই-তিনজন দোকানদারের অবাক দৃষ্টির সামনে দিয়ে ছুটে যাওয়া আর প্রতিদিনের চেনা রাস্তা ধরে হাঁটা এক জিনিস নয়। কেউ একজন চেঁচিয়ে বলল, "চোর! চোর ধরো!" আরেকজন বলল, "না না, পুলিশ পেছনে!" আর তারপর বৃষ্টির শব্দ সব চাপা দিয়ে দিল।

তিনি শাঁখারীবাজারের দিকে ঘুরলেন, কেন সেটা নিজেও জানেন না। হয়তো পা নিজে থেকেই সেদিকে গেল, যেদিকে গলি সবচেয়ে সরু, ঘর সবচেয়ে ঘন, আর ওপরে বারান্দাগুলো এমনভাবে ঝুঁকে আছে যে আকাশ দেখা যায় না। পেছনে হুইসেলের তীক্ষ্ণ আওয়াজ শুনলেন। একজন কনস্টেবল বোধহয় অন্য পথে ঘুরে সামনে আসার চেষ্টা করছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড এমনভাবে লাফাচ্ছে, যেন পাঁজরের খাঁচা ভেঙে বেরোতে চায়। মুখে বৃষ্টির নোনতা স্বাদ, আর তার নিচে ভয়ের একটা ধাতব স্বাদ। কলেজ জীবনের পর এভাবে তিনি আর কখনো দৌড়াননি।

গলিটা একটা বাঁক নিয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে গেল। সামনে একটা উঁচু দেয়াল, তার মাঝখানে বিশাল একটা কাঠের ফটক, যার এক পাল্লা অর্ধেক খোলা। ফটকের মাথায় খিলান, খিলানের ওপর চুন-বালির খসে পড়া অংশে দেখা যায় একটা ফলক, আধখানা অক্ষর মুছে গেছে: "নন্দী ভবন, সন ১৯০৮"। আনোয়ার আগে কখনো এই গলিতে আসেননি। বাড়িটাকে দেখলে মনে হয়, ঢাকা শহরটা এর চারপাশে গড়ে উঠেছে, কিন্তু বাড়িটা কোনোদিন সেই শহরের অংশ হতে রাজি হয়নি।

পেছনে বুটের শব্দ আবার শোনা গেল, এবার আরো কাছে। আনোয়ার আধখোলা পাল্লা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলেন।

ভেতরে ঢুকে প্রথমেই তাঁর মনে হলো, তিনি অন্য এক সময়ের ভেতর পা দিয়েছেন। বিশাল উঠোন, মাঝখানে একটা শুকনো ফোয়ারা, যার বেদিতে বট গাছের চারা গজিয়েছে। চারদিকে দোতলা বারান্দা ঘেরা, কাঠের রেলিং কালো হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও ভেঙে ঝুলছে। বৃষ্টির পানি উঠোনের ইটের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে, আর বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ, ভেজা চুন, পুরোনো কাঠ, আর কবুতরের বিষ্ঠার সঙ্গে মেশানো কিছু একটা মিষ্টি, যেটা তিনি ঠিক চিনতে পারলেন না। হয়তো আতর, হয়তো নয়।

ডানদিকের বারান্দার নিচে একটা তক্তপোশে গামছা গায়ে এক বৃদ্ধ ঘুমিয়ে আছেন, পাশে জ্বলছে একটা টিমটিমে হারিকেন, যদিও বিদ্যুতের তারও ঝুলছে ওপরে। আনোয়ার পা টিপে টিপে এগোলেন। বৃদ্ধের নাক ডাকছে। ভাবলেন, তাঁকে জাগানো উচিত কিনা, কিছু বোঝানো উচিত কিনা। কিন্তু কী বোঝাবেন? "আমি অপরাধী নই, পালিয়ে এসেছি"? সেই ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই ফটকের বাইরে জুতোর আওয়াজ থামল।

"এই যে, কাসেম মিয়া! কাসেম মিয়া!" কেউ চেঁচাল। বৃদ্ধ ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। আনোয়ার ততক্ষণে সিঁড়ির নিচের অন্ধকারে সরে গেছেন, একটা মোটা থামের আড়ালে। বৃদ্ধ, যাঁর নাম তাহলে কাসেম, চোখ কচলে ফটকের দিকে তাকালেন। "কে? কী হইছে?" ওপাশ থেকে নীল শার্টের লোকটার গলা, হাঁপাচ্ছে: "একটা লোক ঢুকেছে এদিকে? ফরসা, মাঝবয়সী, পাঞ্জাবি পরা?" আনোয়ার নিজের পাঞ্জাবির দিকে তাকালেন। হালকা ধূসর, ভিজে সপসপে, গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে।

কাসেম বুড়ো হাই তুলে বললেন, "এই বাড়িতে কেউ ঢোকে না, স্যার। কোর্টের সিল দেওয়া বাড়ি। চল্লিশ বছর ধইরা মামলা চলে, নন্দীদের তিন ঘরের। আমি এইখানে পাহারা দিই, আর কেউ আসে না। দুপুরে একটা বিড়াল আইছিল।" নীল শার্ট বিরক্ত গলায় বলল, "ভেতরে একটু দেখতে দিন।" কাসেম বললেন, "স্যার, আদেশ ছাড়া আমি কী কইরা…" আর তারপর কী হলো আনোয়ার আর শুনলেন না, কারণ তিনি ততক্ষণে সিঁড়ির পেছনের দেয়ালে হাত বুলিয়ে একটা ভাঙা কাঠের পাল্লা খুঁজে পেয়েছেন, যেটা ঠেলতেই ক্যাঁচ করে সামান্য ফাঁক হয়ে গেল।

ভেতরে একটা ঘর। ঘর বললে বাড়িয়ে বলা হয়, সেটা ছিল একটা সরু কুঠুরি, বড়জোর আড়াই ফুট চওড়া, আট-ন ফুট লম্বা, সিঁড়ির নিচের ঢালু ছাদের নিচে খোদাই করা। একসময় হয়তো ঘি-তেল রাখার জায়গা ছিল, অথবা দলিলপত্র। মেঝেতে ধুলোর পুরু আস্তরণ, দেয়ালে একটা কুলুঙ্গি, যেখানে কোনোকালে প্রদীপ বসানো হতো। আনোয়ার ভেতরে ঢুকে পাল্লাটা টেনে ভেজিয়ে দিলেন। কাঠের ফাঁক দিয়ে আসা একটা সরু আলোর রেখা ছাড়া আর কিছু নেই।

তিনি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়লেন। ফোনটা বের করলেন, ব্যাটারি এগারো শতাংশ। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিলেন। রোকেয়া নিশ্চয়ই এতক্ষণে ফোন করছে, কিন্তু একটা ভাইব্রেশনও এখন তাঁকে ধরিয়ে দিতে পারে। বাইরে কাসেমের গলা শোনা যাচ্ছে, খুব কাছে, তারপর বুটের শব্দ উঠোনের ইট মাড়িয়ে এগিয়ে আসছে। কেউ একজন বলল, "স্যার, ভেতরে একটু ঘুরে দেখি?" নীল শার্ট বলল, "দেখো। কিন্তু সিল ভেঙো না।"

আনোয়ার নিঃশ্বাস চেপে রইলেন। আর ঠিক তখনই, নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানির ওপারে, আরেকটা শব্দ শুনতে পেলেন। খুব মৃদু, প্রায় নেই-এর মতো। কারো গলা খাঁকারি দেওয়ার শব্দ।

তাঁর শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে গেল। কুঠুরিটা আড়াই ফুট চওড়া। তিনি একা। অন্তত একা ঢুকেছিলেন। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে বাঁদিকে তাকালেন, যেদিকে কুলুঙ্গি, যেদিকে ঘরের সবচেয়ে গভীর অন্ধকার। আলোর সেই সরু রেখাটা মেঝে বেয়ে একটু দূর অবধি গিয়ে থেমে গেছে। আর সেই রেখার ঠিক শেষে, যেখানে অন্ধকার শুরু, সেখানে কেউ একজন বসে আছে।

প্রথমে তিনি ভাবলেন, কোনো ভবঘুরে, কিংবা নেশাখোর, যে এই পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। শাঁখারীবাজারের এসব পুরোনো বাড়িতে এমন মানুষ থাকা অস্বাভাবিক নয়। তিনি ফিসফিস করে বলতে গেলেন, "ভাই, আমি কিছু করব না, শুধু…" কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই অন্ধকার থেকে একটা শান্ত, ভারী কণ্ঠ ভেসে এল, উর্দু-মেশানো পুরোনো ঢাকাইয়া টানে।

"দম নিতে ভুলে যাচ্ছ কেন, মিয়াঁ? ধরা তো পড়বে দম আটকে থাকলেই। মানুষ যখন খুব চুপ করে থাকে, তখন তার বুকের আওয়াজ আরো জোরে শোনা যায়।"

আনোয়ার কিছু বললেন না। বলতে পারলেন না। গলার ভেতর শব্দগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। অন্ধকারের ভেতরে লোকটার আকৃতি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, যদিও কোনো আলো বাড়েনি। লম্বা, শীর্ণ শরীর, পুরোনো ধাঁচের লম্বা আচকান, মাথায় একটা টুপি, যেটা এখন আর কেউ পরে না। বয়স আন্দাজ করা অসম্ভব। ষাটও হতে পারে, ছয়শোও। আর বাতাসে সেই মিষ্টি গন্ধ, এবার তীব্র, আতরের, সঙ্গে পোড়া কাঠের।

"আপনি… কে?" শেষমেশ তিনি ফিসফিস করে বললেন।

"সে তো লম্বা কিসসা, মিয়াঁ," লোকটা বলল। গলায় বিরক্তি নেই, বরং এক ধরনের ক্লান্ত কৌতুক, যেন অনেকদিন পর কেউ একটা সহজ প্রশ্ন করেছে আর সে উত্তর দিতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। "এই বাড়িতে আমি আছি সেই যখন থেকে নন্দী বাবুরা এখানে ইট গাঁথেন। তারপর তাঁরা গেলেন, তাঁদের ছেলেরা এল, তাঁদের ছেলেরা ঝগড়া করল, আর আমি রইলাম। লোকে আমাকে নানা নামে ডাকে। বড় মিয়াঁ বলতে পারো। আর জাতে আমি তোমাদের মতো নই। তুমি যদি এতক্ষণে ভেবে থাকো, আমি কোনো ভবঘুরে, তাহলে ভুল ভেবেছ।"

আনোয়ার হাসতে চাইলেন। মানুষ ভয় পেলে অনেক সময় হাসে। কিন্তু হাসি বেরোল না। তিনি সারা জীবন হিসাবের মানুষ। খাতায় যা মেলে না, সেটা তিনি বিশ্বাস করেন না। আর এখন তাঁর সামনে যা বসে আছে, সেটা কোনো খাতাতেই মেলে না। তিনি নিজেকে বোঝালেন: ভয়, ক্ষুধা, ক্লান্তি, আর দৌড়ানোর ধকল, এসব মিলিয়ে মস্তিষ্ক এমন কিছু দেখাতে পারে। কিন্তু মস্তিষ্ক কি পুরোনো ঢাকাইয়া টানে কথা বলে? মস্তিষ্ক কি এমন আতরের গন্ধ বানাতে পারে, যেটা তাঁর মৃত দাদার কামরায় পাওয়া যেত?

"আমি জিন," লোকটা বলল, যেন আনোয়ারের ভাবনা পড়ে ফেলেছে। "শব্দটা শুনে চমকাও না। তোমাদের বই-কিতাবে আছে, তোমার মা-নানিরাও গল্প বলতেন। বেশিরভাগ গল্প বাড়িয়ে বলা, কিছু সত্যি। আমি তোমাকে ঘাড় মটকাব না, আর তোমার সামনে আগুনের গোলাও হয়ে উঠব না। ওসব সিনেমার ব্যাপার।"

বাইরে বুটের শব্দ থেমে গেল। একেবারে কুঠুরির দরজার সামনে। কাঠের ফাঁক দিয়ে আসা আলোর রেখাটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল, কেউ একজন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আনোয়ারের মনে হলো, তাঁর হৃৎপিণ্ড এবার সত্যিই থেমে যাবে। কনস্টেবলের ভারী নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে, দরজার হাত-দুয়েক দূরে। একটা টর্চের আলো কাঠের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকল, ধুলো-ভরা মেঝেতে সাদা একটা রেখা টানল, ধীরে ধীরে আনোয়ারের জুতোর দিকে এগিয়ে আসছে।

জিনটা নড়ল না। শুধু ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি নিয়ে আঙুল তুলে টর্চের আলোর দিকে ইশারা করল। আনোয়ার লক্ষ করলেন, তার আঙুলের ছায়া দেয়ালে পড়েনি।

টর্চের আলোটা একবার কেঁপে উঠল, দুবার জ্বলে-নিভে গেল, তারপর নিভেই গেল। বাইরে কনস্টেবল বিড়বিড় করে কিছু বলল, "ধুত্তোরি, ব্যাটারি!" আর তারপর, খুব অদ্ভুতভাবে, সে যেন আর দরজার দিকে তাকাতে চাইল না। আনোয়ার শুনলেন, বুটের শব্দ পিছিয়ে যাচ্ছে, দ্রুত, প্রায় ছুটে। কেউ একজন বলল, "স্যার, এদিকে কেউ নেই। ওই কুঠুরির দিকে যেতে মন চাইছে না, কেমন যেন ঠান্ডা।" নীল শার্টের গলা: "ঠান্ডা মানে? চলো, পেছনের গলিটা দেখি। ওই বেটা ওদিকেই গেছে।"

পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। ফটকের কাছে শোনা গেল কাসেম বুড়োর গলা, "আল্লাহ হাফেজ, স্যার," আর তারপর আবার শুধু বৃষ্টি।

আনোয়ার অনেকক্ষণ পর টের পেলেন, তিনি নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিলেন। বুক ভরে বাতাস নিলেন। আতরের গন্ধটা এবার আর অস্বস্তিকর লাগল না, বরং কেমন যেন চেনা, যেন ছোটবেলার কোনো ঈদের সকাল।

"তোমার সাহায্য করলাম বলে ভেবো না আমি দয়াবান," জিনটা বলল। তার গলায় সেই ক্লান্ত কৌতুকটা এখন একটু গম্ভীর। "এই বাড়িতে বহুদিন কেউ আসেনি, যে আমার সঙ্গে দুটো কথা বলার সুযোগ দেয়। আর তুমি, আনোয়ার হোসেন, এলে এমন সময়ে, যখন আমার একটা কাজ আছে, আর কাজটা এমন যে মানুষ ছাড়া করা যায় না। বিশেষ করে এমন একজন মানুষ, যে কাগজপত্র বোঝে।"

আনোয়ার চমকে উঠলেন। "আমার নাম… আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?"

জিনটা মৃদু হাসল। "তুমি সাতাশ বছর ধরে এই পাড়ায় আসা-যাওয়া করো, মিয়াঁ। এই বাড়ির দেয়ালের ওপারে চা খাও, ওই মোড়ের হাজী বিরিয়ানির ওখানে দুপুরের খাবার খাও। আমি তোমাকে চিনি। শুধু তুমি জানতে না, এই বাড়ির ভেতর থেকে কেউ তোমাকে দেখছে।" সে একটু থামল। "পুলিশ ভোরের আগে এই এলাকা ছাড়বে না। তোমার ফটকের ওপারে একজন পাহারায় থাকবে সারারাত। তুমি আজ রাতে কোথাও যেতে পারবে না। তাই আমার কথা শোনা ছাড়া তোমার আর কোনো কাজ নেই।"

আনোয়ার কুঠুরির দেয়ালে মাথা ঠেকালেন। তাঁর মনে হলো, তিনি একটা স্বপ্নে আছেন, আর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটা এত বাস্তব। ভেজা কাপড়ের ঠান্ডা, হাঁটুর ব্যথা যা ফিরে এসেছে, ধুলোর গন্ধ, পকেটে বন্ধ হয়ে থাকা ফোন। সবকিছু বাস্তব।

"কী কাজ?" তিনি জিজ্ঞেস করলেন। নিজের গলার আওয়াজ শুনে নিজেই অবাক হলেন। ভয় কমে যাচ্ছে না, কিন্তু তার জায়গায় আরেকটা কিছু ঢুকছে। কৌতূহল, নাকি শ্রেফ ক্লান্ত মানুষের আত্মসমর্পণ, বোঝা গেল না।

জিনটা কুলুঙ্গির অন্ধকারে একটু সরে বসল, যেন গল্পটা বলার জন্য আরাম করে নিচ্ছে। "কিসসাটা লম্বা," সে আবার বলল। "আর রাতও লম্বা। কিন্তু শুরুতেই একটা কথা বলে রাখি, মিয়াঁ। আমি তোমাকে কোনো লোভ দেখাব না, তোমাকে কোনো মামলা থেকে জাদুতে উদ্ধার করব না। ওসব আমার হাতে নেই। যা আমার হাতে আছে, তা হলো এই বাড়ির স্মৃতি। আর এই বাড়ির স্মৃতির ভেতরে এমন একটা কাগজ আছে, যেটা চল্লিশ বছর ধরে কেউ খুঁজে পায়নি। কাগজটা পেলে শুধু এই বাড়ির মামলা মিটবে না। আরো কয়েকটা জীবন বদলে যাবে।"

বাইরে বৃষ্টি আরো জোরে নামল। কুঠুরির ছাদে, সিঁড়ির কাঠের ওপর, যেন কেউ আঙুলের ডগায় অবিরাম টোকা দিচ্ছে। আনোয়ার হোসেন, সাতচল্লিশ বছর বয়সী এক হিসাবরক্ষক, যাঁর নামে পরোয়ানা ঝুলছে, এক পরিত্যক্ত বাড়ির আড়াই ফুট চওড়া অন্ধকারে বসে অনুভব করলেন, তাঁর জীবনের হিসাবের খাতাটা এই প্রথমবার এমন একটা ঘরে ঢুকল, যেখানে কোনো সংখ্যা মেলে না।

"বলুন," তিনি ফিসফিস করে বললেন। "শুনছি।"

জিনটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর, একেবারে সহজ গলায়, যেন কোনো পুরোনো প্রতিবেশী বহুদিন পর বারান্দায় বসে গল্প শুরু করছে, বলল:

"১৯৮৪ সালের কথা। সেদিনও এমন বৃষ্টি হচ্ছিল…"
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:০০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়াংসান থেকে জুলাইয়ের নতুন বন্দোবস্ত

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৩৯



Youngsan সিউলের ভিতরে আমেরিকান একটি মিলিটারি বেইস। মিলিটারি বেইসের ভিতরে বার্গার কিং, KFC, Macdonald সব আছে। কোরিয়ান ভিতরে সামরিক ঘাঁটি হলে ও মিলিটারি বেইসের ভিতরে প্রধান কারেন্সি ইউএস ডলার।... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×