"সেদিনও এমন বৃষ্টি হচ্ছিল," জিনটা আবার বলল, যেন প্রথম বাক্যটা একবার বললেই যথেষ্ট নয়, দ্বিতীয়বার বললে গল্পটা আরো বেশি সত্যি হয়ে ওঠে। "ভাদ্র মাস, রাত দুপুর। কিন্তু তার আগে তোমাকে এই বাড়ির কথা জানতে হবে, মিয়াঁ। বাড়ি না জানলে মানুষ বোঝা যায় না।"
আনোয়ার কুঠুরির দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পা দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে নিলেন। ভেজা পাঞ্জাবি শরীরের সঙ্গে সেঁটে আছে, শীত শীত করছে, অথচ ঘরের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে গরম নয়, ঠান্ডাও নয়। যেন কুঠুরির নিজস্ব একটা আবহাওয়া আছে, বাইরের বৃষ্টির সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি ঠিক করলেন, প্রশ্ন করবেন না, শুধু শুনবেন। সারা জীবন অন্যের হিসাব শুনে শুনে তিনি একটা জিনিস শিখেছেন: মানুষ যখন নিজের গল্প বলে, মাঝপথে থামালে সে আসল কথাটা আর বলে না।
"১৯০৮ সালে হরিচরণ নন্দী এই বাড়ি তোলেন," জিনটা বলল। "শাঁখারীবাজারে নন্দীদের নাম ছিল। শাঁখ কাটার কারিগরদের কাছ থেকে মাল কিনে কলকাতা আর ঢাকার বড় বড় ঘরে পাঠাতেন। টাকা ছিল, কিন্তু টাকার চেয়েও বেশি ছিল সুনাম। তিনি যখন ভিত খোঁড়ালেন, আমি তখন এই জমিতেই ছিলাম। এখানে একটা পুরোনো তেঁতুল গাছ ছিল, তার নিচে। গাছটা কেটে ফেলা হলো। রাগ করিনি। মানুষ বাড়ি বানায়, আমরা সরে বসি। কিন্তু বাড়ি যখন দাঁড়াল, দেখলাম, ভালোই বানিয়েছে। তাই থেকে গেলাম।"
আনোয়ার কিছু বললেন না, কিন্তু মনে মনে ভাবলেন, একটা অপার্থিব সত্তার মুখে বাড়ির প্রশংসা শুনতে কেমন যেন অস্বস্তিকর লাগছে। ঠিক যেমন কোনো ঠিকাদার তার নিজের বানানো সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে গর্ব করছে।
"তিন ছেলে ছিল হরিচরণের। বড় ঘর, মেজো ঘর, ছোট ঘর। উঠোনের তিন দিকে তিন ভাইয়ের মহল। চার নম্বর দিকে ঠাকুরদালান, আর ফটক। সাতচল্লিশ সালে বড় ঘর কলকাতায় চলে গেল, তারপর একটু একটু করে অন্যরাও। ছোট ঘরের সবচেয়ে ছোট ছেলে, নাম অখিলচন্দ্র, বলেছিলেন, 'যাব না। এই মাটিতে আমার নাড়ি পোঁতা।' চৌষট্টির দাঙ্গায় তাঁর দোকান পুড়ল, বাষট্টি না চৌষট্টি, আমার হিসাব গুলিয়ে যায়। তারপর একাত্তরে তাঁকে আর পাওয়া গেল না। তাঁর স্ত্রী রয়ে গেলেন। সুরবালা দেবী।"
জিনের গলা এই নামটা উচ্চারণ করার সময় কিছুটা নরম হয়ে এল। আনোয়ার লক্ষ করলেন। সাতাশ বছর বয়সে হিসাব শিখতে গিয়ে তিনি প্রথম যে জিনিসটা রপ্ত করেছিলেন, তা হলো সংখ্যার ভেতরে আবেগ খুঁজে বের করা। যেখানে একটা যোগফলে অকারণে বেশি যত্ন, সেখানে কিছু লুকানো আছে।
"সুরবালা দেবী ছিলেন ছোটখাটো মানুষ। শুকনো, পাকা চুল, সাদা থান। কিন্তু চোখ দুটো এমন যে, মিথ্যা বললে সামনে দাঁড়ানো যেত না। সন্ধ্যায় ঠাকুরদালানে প্রদীপ দিতেন, তারপর উঠোনে এসে দাঁড়াতেন, আর কারো দিকে না তাকিয়ে বলতেন, 'আছ তো?' আমি জবাব দিতাম না, বহুদিন দিইনি। তিনি তবু বলতেন, 'আছ, জানি। খাওয়া হয়েছে?' তারপর এক বাটি দুধ রেখে যেতেন সিঁড়ির নিচের এই কুঠুরির দরজায়।"
"দুধ?" আনোয়ার নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন।
"হ্যাঁ, দুধ। তোমরা যা ভাবো, সব সত্যি নয়, মিয়াঁ। আমি দুধ খাই না, তবে ব্যাপারটা দুধের নয়। ব্যাপারটা হলো, চল্লিশ বছর ধরে একজন মানুষ প্রতিদিন আমার জন্য একটা বাটি রেখে গেছেন, আমি ছুঁই বা না ছুঁই। এই বাড়িতে আমাকে আর কেউ এমন করে মনে রাখেনি।" জিনটা একটু থামল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ যেন এই ফাঁকটুকু ভরাট করার জন্যই একটু জোর হলো।
"তো ১৯৮৪ সালে এই বাড়ি নিয়ে গোলমাল শুরু হলো। ওপরে ওপরে দেখলে সহজ ব্যাপার। বাড়ির তিন ঘরের ওয়ারিশরা কেউ ঢাকায় নেই। বড় ঘরের নাতিরা কলকাতায়, মেজো ঘরের একজন লন্ডনে, ছোট ঘরের সুরবালা দেবী একাই এখানে। ভিটেটার দাম তখনই লাখ লাখ টাকা। আর তোমরা এখন যেটা বলো 'শত্রু সম্পত্তি', আজ যেটা 'অর্পিত সম্পত্তি', সেই তালিকায় এই বাড়ির নাম ওঠার আশঙ্কা ছিল। একটা মহলের লোক বলছিল, বাড়িটা ইতিমধ্যেই সরকারি খাতায় উঠে গেছে। আরেকটা মহল বলছিল, না, উঠলে তো এতদিনে দখল হয়ে যেত।"
আনোয়ার মাথা নাড়লেন। এই ধরনের গল্প তিনি জানেন। তাঁর নিজের গ্রামের বাড়িতেই এমন দুটো ঘটনা ঘটেছে। কাগজের এক লাইনের এদিক-ওদিকে একটা পরিবার শেষ হয়ে যায়, আর অন্য একটা পরিবার রাতারাতি বড়লোক। তাঁর মনে হলো, তাঁর নিজের মামলার সঙ্গে এই গল্পের কোথাও একটা মিল আছে, কিন্তু মিলটা ঠিক কোথায়, সেটা এখনো ধরা যাচ্ছে না।
"সাদেক হাওলাদার নামে একজন লোক ছিল," জিন বলল। "তখনকার বিরাট মানুষ। রেজিস্ট্রি অফিসে, ভূমি অফিসে, থানায়, সব জায়গায় তার লোক। কাপড়ের দালালি দিয়ে শুরু, তারপর জমির কারবার। সে এসে সুরবালা দেবীকে বলল, 'মাসিমা, এই বাড়ি বিক্রি করে দিন। আমি সব ঝামেলা মেটাব। আপনাকে কাশীতে পাঠিয়ে দেব, মাসে মাসে টাকা যাবে।' তিনি হাসলেন। বললেন, 'বাবা, আমি কাশী যাব না। আমার স্বামীর নাড়ি এখানে পোঁতা।' লোকটা কিছু বলল না। কিন্তু দিন কয়েক পর একটা লোক এসে নোটিশ টাঙিয়ে দিল, বাড়ির অর্ধেক নাকি সাদেক হাওলাদারের নামে ষাট সালে বিক্রি হয়ে গেছে। দলিল নাকি রেজিস্ট্রিও আছে।"
"জাল দলিল," আনোয়ার বললেন। শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মনে হলো, তিনি যেন নিজের কথাই বলছেন।
"জাল বললেই তো জাল হয় না, মিয়াঁ। জাল প্রমাণ করতে হয়। আর সুরবালা দেবীর কাছে দলিল ছিল না, ছিল শুধু তাঁর শ্বশুরের আমলের কিছু হলদে হয়ে যাওয়া রসিদ আর একটা পুরোনো খতিয়ান। তিনি দুই মাস আদালতে দৌড়ালেন। বুড়ো মানুষ, রিকশায় করে যেতেন, দুপুরে কিছু খেতেন না। আর সন্ধ্যায় ফিরে এসে উঠোনে দাঁড়াতেন, বলতেন, 'আছ তো?'"
জিনটা এবার অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। আনোয়ার শুনলেন, উঠোনের কোথাও একটা কবুতর ডানা ঝাপটাল, তারপর সব শান্ত।
"ভাদ্র মাসের সেই রাতে তিনি প্রথমবার আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বললেন। নাম ধরে ডাকলেন না, ডাকার মতো নাম তো আমার নেই। শুধু কুঠুরির দরজায় এসে বসলেন, হাতে একটা হারিকেন, আর বললেন, 'তুমি যদি শুনতে পাও, তাহলে শোনো। আমি আর বেশিদিন নেই। ডাক্তার বলেছে, হার্টের অবস্থা ভালো না।' আমি চুপ করে ছিলাম। তিনি বললেন, 'ওরা এই বাড়ি নিয়ে নেবে। কিন্তু আমি এমন একটা কাজ করে যাচ্ছি, যাতে ওরা পারে না।' তারপর তিনি কাগজ-কলম নিয়ে সেখানেই বসে লিখলেন। আমি আড়াল থেকে দেখলাম। কী লিখলেন, তা আমি জানি, কিন্তু সবটা নয়।"
"কী লিখলেন?" আনোয়ার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
"দুটো জিনিস। একটা চিঠি, আর একটা দানপত্র। দানপত্রে তিনি এই বাড়ির নিজের অংশ, আর বাকি দুই ঘরের অংশ থেকে যতটুকু আইনত তাঁর দেওয়ার এখতিয়ার ছিল, সব একটা ট্রাস্টের নামে লিখে দিলেন। মেয়েদের একটা স্কুল, আর শাঁখ-শিল্পের কারিগরদের ছেলেমেয়েদের জন্য একটা দাতব্য চিকিৎসালয়। ট্রাস্টের তিনজন ট্রাস্টি। একজন এই পাড়ার এক পুরোনো স্কুলশিক্ষক, একজন এক ডাক্তার, আর তৃতীয় নামটা…" জিন থামল। "তৃতীয় নামটা আমি মনে করতে পারি না। এটাই আমার আফসোস। আমি সব মনে রাখতে পারি, কিন্তু এই একটা জিনিস মাঝরাতের কুয়াশায় মিশে গেছে। কারণ ওই মুহূর্তে বাইরে কেউ একজন ফটকে ধাক্কা দিল, আমি সেদিকে মনোযোগ দিলাম।"
"ফটকে কে?"
"সাদেক হাওলাদারের দুজন লোক। তাদের তখন দরকার ছিল বুড়ির কাছ থেকে একটা সইয়ের, কিংবা ভয় দেখানোর। সুরবালা দেবী উঠলেন, কাগজপত্র আঁচলের নিচে গুছিয়ে নিলেন, আর ওপরে নিজের ঘরে চলে গেলেন। আমি ফটকের দিকে গেলাম, ওরা ভেতরে ঢুকতে পারল না। দরজার তালা কীভাবে যেন আটকে গেল, বাতি নিভে গেল, আর তাদের মধ্যে একজনের এমন ভয় ধরল যে সে পরের দিন আর কাজেই এল না। তোমাদের ভাষায়, আমি ওদের তাড়ালাম। তবে রাতটা আমার ওখানেই কাটল, ফটকে। যখন ভোর হলো, আমি ওপরে গিয়ে দেখি, সুরবালা দেবী তাঁর খাটে শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ, হাত দুটো বুকের ওপর জোড়া। ডাক্তার এসে বলল, হার্ট অ্যাটাক। সম্ভবত মাঝরাতেই।"
আনোয়ার ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়লেন। কুঠুরির ভেতরের বাতাস আবার ভারী লাগল।
"আর কাগজগুলো?"
"ওটাই তো কথা, মিয়াঁ। কাগজগুলো তাঁর আঁচলে ছিল না, তাঁর আলমারিতে ছিল না, কোথাও ছিল না। সাদেকের লোকেরা সেদিনই এসে সব তছনছ করেছিল। বালিশের খোল অবধি ছিঁড়ে দেখেছে। কিছু পায়নি। এখনো, এই চল্লিশ বছরে, তারা আর তাদের ছেলেরা তিনবার এই বাড়ি খুঁজেছে। আমি সরে বসে থেকেছি। আর কাগজ পায়নি।" জিনটার গলায় একটা নীরব গর্ব, আর তার নিচে গভীর ক্লান্তি। "আমি জানি, কাগজ এই বাড়ির ভেতরেই আছে। সুরবালা দেবী বাড়ির বাইরে যাননি। কিন্তু কোথায়, তা আমি জানি না। আমাকেও তিনি বলে যাননি।"
"কেন?" আনোয়ার বললেন। "আপনি তো, মানে, আপনি তো এত বছর তাঁর সঙ্গে…"
"সেই প্রশ্নটা আমি নিজেকে চল্লিশ বছর ধরে করছি।" জিন হাসল, কিন্তু এবার হাসিটা তেতো। "আমার ধারণা, তিনি আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না। হয়তো ভেবেছিলেন, আমাদের জাতের কেউ যা জানে, তা কোনো একদিন কোনো ভুল লোকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিংবা হয়তো অন্য কিছু। মানুষ যখন কিছু লুকায়, সে অনেক সময় নিজেকেও ঠিকমতো বলে না কেন।" সে একটু থামল। "কিন্তু তিনি একটা কথা আমাকে বলেছিলেন। শেষ যে রাতে আমি তাঁর মুখ থেকে কথা শুনেছি। বলেছিলেন, 'একদিন কেউ আসবে, যে হিসাব বোঝে। তাকে সাহায্য কোরো।'"
আনোয়ার হাসতে গিয়েও থেমে গেলেন। "হিসাব বোঝে? চল্লিশ বছর আগে একজন বৃদ্ধা এই কথা বলেছিলেন, আর আপনি ধরে নিলেন সেটা আমি?"
"না," জিনটা সঙ্গে সঙ্গে বলল। "আমি এত সরল নই। গত চল্লিশ বছরে হিসাব বোঝা অনেক মানুষ এসেছে এই বাড়িতে। উকিল, ঠিকাদার, সার্ভেয়ার, সরকারি অফিসের কেরানি। কেউ কাগজ খুঁজতে, কেউ বাড়ি মাপতে। আমি প্রত্যেককে দেখেছি। বেশিরভাগই টাকার হিসাব বোঝে, সততার হিসাব নয়। তুমি অন্য রকম। তোমার কথা আমি বলছি, কারণ আমি তোমাকে সাতাশ বছর ধরে দেখেছি।"
"দেখেছেন?" আনোয়ার শুকনো গলায় বললেন।
"চার বছর আগে, মনে আছে? শীতকাল। মোড়ের ওই চা-ওয়ালা ছেলেটা, নাম রহিম, তোমার কাছ থেকে ভুল করে পঞ্চাশ টাকা কম চেয়েছিল। তুমি ওকে ডেকে ফেরত দিয়েছিলে। বলেছিলে, 'তোমার ক্ষতি হবে, আবার।' ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। ওই জিনিসটা আমি দেখেছিলাম, এই বাড়ির ভেতরের বারান্দা থেকে, দেয়ালের ফাঁকে। আর আরো অনেক ছোট ছোট জিনিস, যা তুমি হয়তো নিজেও ভুলে গেছ। তোমার হাত দিয়ে কোটি কোটি টাকা গেছে, মিয়াঁ, তোমার মালিকের হিসাবে। অথচ তুমি আজ নিজের মামলা নিয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছ। তুমি জানো, এটা কী বলে?"
আনোয়ার উত্তর দিলেন না। গলার ভেতরটা কেমন যেন আটকে এল। তিনি নিজের জীবনের কথা ভাবলেন। বাবা মারা গিয়েছিলেন যখন তাঁর বয়স উনিশ। ছোট দুই বোনকে বিয়ে দিয়েছেন, মাকে শেষ বয়সে দেখেছেন, নিজের ছেলেমেয়ে মানুষ করছেন। কখনো বড়লোক হতে পারেননি, হতে চেষ্টাও করেননি। হাজী সোবহান সাহেব একবার হেসে বলেছিলেন, "আনোয়ার, তুমি এত সৎ কেন? এতে লাভ কী?" আনোয়ার তখন জবাব দিতে পারেননি। আজ, এই অন্ধকার কুঠুরিতে বসে, তাঁর মনে হলো, প্রশ্নটার একটা উত্তর হয়তো এখানেই লুকিয়ে ছিল।
ঠিক তখনই কাঠের দরজায় আলতো টোকা পড়ল।
আনোয়ার লাফিয়ে উঠতে গেলেন, মাথা ঠুকে গেল সিঁড়ির নিচের ঢালু ছাদে। "চুপ," জিন ফিসফিস করল, এই প্রথম তার গলায় হালকা তাড়া। "ওটা ভয়ের কিছু নয়।"
"স্যার?" বাইরে থেকে একটা বৃদ্ধ কণ্ঠ, কাসেম মিয়ার। খুব নিচু গলায়, প্রায় দরজার ফাঁকে ঠোঁট লাগিয়ে। "স্যার, ঘুমাইছেন নি? আমি কাসেম। পুলিশ যায় নাই পুরাপুরি, একজন গেটের বাইরে চায়ের দোকানে বইসা আছে। আপনে ভয় পাইয়েন না। একটু ভাত আর ডাল আনছি। পেটে কিছু দেন।"
আনোয়ার কী করবেন বুঝতে পারলেন না। জিনের দিকে তাকালেন। সে কুলুঙ্গির অন্ধকারে অস্পষ্ট, কিন্তু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। আনোয়ার দরজাটা এক ইঞ্চি ফাঁক করলেন। বাইরে হারিকেনের আলোয় কাসেমের সাদা দাড়ি, কোটরে বসা চোখ, আর হাতে একটা টিনের থালা, তার ওপর আরেকটা থালা উপুড় করে ঢাকা। আর এক গ্লাস পানি।
"আপনি… জানতেন আমি এখানে?" আনোয়ার ফিসফিস করে বললেন।
কাসেম মৃদু হাসলেন, দাঁতহীন মুখে। "স্যার, চল্লিশ বছর এই বাড়িতে আছি। আমার বাবাও ছিলেন। আমার বাবা ছিলেন সুরবালা মাসিমার ভাড়াটিয়া, ওই নিচতলার পেছনের ঘরে। এই বাড়ির কোন দরজা দিয়া কে ঢোকে, কে বাইরায়, আমি সব শব্দে চিনি। আপনি ঢুকছেন পাঁচটা বাজার আগে, ভিজা, হাঁপাইয়া। আমি দেখছি। কিন্তু কইলাম না, দরকার নাই। পুলিশরে আগেও একবার কইছিলাম, ভিতরে কেউ নাই। সত্য না, কিন্তু কইছি।" তিনি একটু থেমে যোগ করলেন, "বুড়া মানুষ, একটা মিথ্যা কইলে আল্লাহ মাফ করবেন। মানুষের বিপদে…"
আনোয়ার থালাটা হাতে নিলেন। হাত কাঁপছিল। গরম ভাত, ডাল, একটা ভাজা ডিম। তাঁর মনে পড়ল, সকাল থেকে কিছু খাননি, রোকেয়ার আনা ইলিশের কথা, আর গলার কাছটা আবার ভারী হয়ে এল। "ধন্যবাদ," তিনি বললেন, যদিও শব্দটা বড্ড ছোট মনে হলো। "আমি… আমি আপনার কাছে ঋণী।"
"ঋণ না, স্যার। এইটা বাড়ির নিয়ম। অতিথি আইলে খাওয়াইতে হয়।" কাসেম মিয়া ফিরে যাওয়ার আগে একটু ইতস্তত করলেন। কুঠুরির অন্ধকারের দিকে এক পলক তাকালেন, যেখানে জিন বসে আছে। "মিয়া সাহেব ভালো আছেন?" তিনি খুব সহজভাবে বললেন, যেন কোনো প্রতিবেশীর খোঁজ নিচ্ছেন।
আনোয়ারের হাত থেকে থালা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। কুলুঙ্গি থেকে জিনের ক্ষীণ, প্রায় হাসিমাখা গলা ভেসে এল, "ভালো আছি, কাসেম। তুমি এখন যাও, রাত হয়েছে।" কাসেম মাথা নুইয়ে "জি" বলে হারিকেন নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলেন, যেন এটা তাঁর কাছে সবচেয়ে সাধারণ কথোপকথন।
আনোয়ার অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারলেন না। তারপর খেতে শুরু করলেন। ডালের স্বাদ, মুখের ভেতর ভাতের উষ্ণতা, এসব এত বাস্তব যে মনে হলো, বাস্তবতা একটা অদ্ভুত দুই-মুখো জিনিস। একদিকে পুলিশ, পরোয়ানা, মামলা। অন্যদিকে এই কুঠুরি, জিন, আর একজন বৃদ্ধ, যিনি চল্লিশ বছর ধরে এক অদৃশ্য অতিথির খোঁজ রাখছেন। দুটোই সত্যি, দুটোই তাঁর সামনে।
খাওয়া শেষ করে তিনি ফোনটা বের করলেন। ব্যাটারি নয় শতাংশ। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে তিনি ফোনটা চালু করলেন। সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে ভেসে উঠল একের পর এক নোটিফিকেশন: "রোকেয়া: ২৩ মিসড কল।" "রফিক: ৭ মিসড কল।" "অজ্ঞাত নম্বর: ৪ মিসড কল।" আর রোকেয়ার পাঠানো একটা মেসেজ, বাংলায়, বানানে তাড়াহুড়ো: "কই তুমি? পুলিশ বাসায় আসছিল। কিছু বলছে না। ফোন ধরো। আল্লাহর দোহাই।"
আনোয়ারের বুকের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে গেল। পুলিশ বাসায় গিয়েছিল। মেয়ে নাবিলা কি ভয় পেয়েছে? ছেলে রাহাত? রোকেয়া একা সামলেছে?
তিনি কাঁপা আঙুলে লিখলেন: "আমি নিরাপদে আছি। ভয় পেও না। রাতে আসতে পারব না। কাল কথা হবে। বাচ্চাদের দেখো।" পাঠানোর আগে একবার পড়লেন। আরেকটু ভাবলেন, তারপর যোগ করলেন: "আমি কোনো অন্যায় করিনি, রোকেয়া।" পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফোন বন্ধ করে দিলেন।
কুলুঙ্গির অন্ধকার থেকে জিনটা শান্ত গলায় বলল, "তোমার স্ত্রী?"
"হ্যাঁ।"
"ভালো মানুষ, শুনে মনে হয়।"
"আপনি শুনলেন?" আনোয়ার তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কিন্তু ঠিক রাগ নয়, বরং ক্লান্তি। "আমি তো কিছু বলিনি।"
"তোমার মুখ বলেছে।" জিনটা একটু নড়ে বসল, আচকানের কাপড়ে খসখস শব্দ হলো। "শোনো, আনোয়ার হোসেন। আমি জানি তুমি ভাবছ, এসব কী হচ্ছে। একজন মানুষ, যার নামে পরোয়ানা, সে একটা অদ্ভুত অন্ধকার কুঠুরিতে বসে একটা জিনের গল্প শুনছে। তুমি ভাবছ, পাগল হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু যা বলছি, তা সবই সত্যি। আর আমি তোমাকে জোর করব না। ভোরে পুলিশ সরে গেলে তুমি চলে যেতে পারো, আর আমি তোমাকে আটকাব না।"
"কিন্তু?"
"কিন্তু যদি থাকো, আজ রাতে থাকো। রাতের বেলা এই বাড়ি জেগে ওঠে।" জিনের গলা এবার ফিসফিসানির কাছাকাছি। "আমি সব জানি না, তবে একটা জিনিস জানি। সুরবালা দেবী তিন ঘরের প্রত্যেকটার জন্য কিছু একটা রেখে গেছেন। বড় ঘরে, মেজো ঘরে, ছোট ঘরে। কাগজটা একটা জায়গায় নেই, মিয়াঁ। কাগজটা তিন টুকরো হয়ে আছে, আর প্রতিটা টুকরোর কাছে পৌঁছাতে হলে আগের টুকরোর সংকেত লাগে। মেজো ঘরের ঠাকুরঘরে প্রথম সংকেত থাকার কথা। আমি ওই ঘরে ঢুকতে পারি না। আমার অনুমতি নেই। কেন নেই, সেই কিসসা আরেকদিন বলব।"
আনোয়ার ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। "আপনি আমাকে বলছেন, আজ রাতে এই ভাঙা বাড়ির ভেতর দিয়ে গিয়ে একটা ঠাকুরঘর খুঁজতে?"
"আমি বলছি, তুমি চাইলে।"
ঠিক তখনই, ওপর থেকে, দোতলার কোথাও, একটা শব্দ এল। ভারী কাঠের ওপর কিছু গড়িয়ে যাওয়ার মতো, তারপর একটা দরজা ধীরে ধীরে খোলার মতো ক্যাঁচ শব্দ। কাসেম মিয়া তো এখন নিচে। আনোয়ার তাকালেন জিনের দিকে। জিনটা এই প্রথমবার, একটু চমকে, ওপরের দিকে মুখ তুলল। তার মুখের সেই ক্লান্ত কৌতুকটা মুছে গেছে।
"ওটা আমি নই," সে খুব নিচু গলায় বলল।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




