জলের ভেতর আমি
পর্ব ১: ল্যাবের আলো
রাত তখন প্রায় একটা। রাজধানীর এক প্রান্তে, জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তিনতলা ভবনটির সকল বাতি নিভিয়া গিয়াছে, কেবল পশ্চিম কোণের একটি কক্ষের কাচের জানালা দিয়া ম্লান নীলাভ আলো বাহিরের অন্ধকারে ক্ষীণ রেখা টানিয়া দিতেছে। সেই কক্ষের দরজায় কোনো নামফলক নাই; রেজিস্টার খাতাতেও ইহার উল্লেখ নাই। ইনস্টিটিউটের পুরাতন নথিতে ইহা ‘পরিত্যক্ত ভাণ্ডারঘর’ নামে লিখিত। কিন্তু যে মানুষটি এই মুহূর্তে মাইক্রোস্কোপের নিকট ঝুঁকিয়া বসিয়া আছেন, তিনি জানেন, এই ঘরের দেওয়ালের ভিতরেই তাঁহার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নিঃশব্দে শ্বাস লইতেছে।
ড. আনিস শিকদার চোখ হইতে চশমা খুলিয়া নাকের গোড়া টিপিয়া ধরিলেন। দীর্ঘক্ষণ লেন্সের দিকে তাকাইয়া থাকিলে চক্ষুদ্বয় যেন বালুকণায় ভরিয়া যায়। টেবিলের এক পাশে একটি পুরাতন ল্যাপটপ, তাহার পর্দায় সারি সারি সংখ্যা, রেখাচিত্র ও দুর্বোধ্য সংকেত; অন্য পাশে কাচের ছোট ছোট পাত্রে সাজানো নমুনা। দেওয়ালের গায়ে হাতে লেখা একটি কাগজ সাঁটা — ‘জল কেবল পথ নয়, জল গৃহও’। কথাটি তাঁহার নিজের লেখা, কিন্তু কথাটির আদি উৎস তাঁহার দাদি।
আনিস ল্যাপটপের দিকে ফিরিয়া নোট খাতার সর্বশেষ ঘরটিতে লিখিলেন — ‘ক্ষণস্থায়ী প্রকাশ (transient expression) সন্তোষজনক; জিনোমে স্থায়ী সংযোজন নাই; প্রভাব ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু।’ লেখা শেষ করিয়া তিনি কিছুক্ষণ পর্দার দিকে চাহিয়া রহিলেন। সংখ্যাগুলি আজ প্রথমবার তাঁহাকে নিরাশ করে নাই। তবু তাঁহার বুকের ভিতর আনন্দের বদলে এক ধরনের অস্বস্তি জমিতেছিল, যেমন করিয়া কঠিন পরীক্ষার ফল হাতে পাইবার ঠিক আগের মুহূর্তে মানুষের হাতের তালু ঘামিয়া ওঠে।
ঘরের এক কোণে কাচের একটি বড় চৌবাচ্চা। তাহার ভিতরে স্বচ্ছ জল, জলের তলায় সযত্নে বিছানো ছোট ছোট নুড়ি, আর একটি ক্ষুদ্র ধূসর ইঁদুর। প্রাণীটি জলের তলায় স্থির হইয়া বসিয়া আছে। তাহার গলার দুই পাশে, আতশকাচের নিচে দেখিলে, সূক্ষ্ম গোলাপি রেখার মতো কিছু একটা অতি ধীরে স্পন্দিত হইতেছে। ফুলকার কুঁড়ি। আনিস নিজেই এখনো ইহা পুরাপুরি বিশ্বাস করিয়া উঠিতে পারেন না।
তিনি মনে মনে পুরাতন হিসাবটি আরেকবার আওড়াইলেন। মাছের ফুলকা গঠনের সময় গলার ফ্যারিঞ্জিয়াল আর্চ অঞ্চলে gcm2 নামের জিনটি সক্রিয় হয়, এবং সেই সক্রিয়তা Hox group 3-এর নির্দেশের উপর নির্ভর করে। স্থলচর প্রাণীতে সেই একই অঞ্চল হইতে জন্ম নেয় প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি — অথচ জলচরের ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলই গড়িয়া তোলে ফুলকার ফিলামেন্ট। একই মানচিত্র, ভিন্ন গন্তব্য। আনিসের প্রশ্ন ছিল — যদি সাময়িকভাবে মানচিত্রের সেই নির্দেশটি পাল্টাইয়া দেওয়া যায়, তবে? আর যদি ত্বকের ভিতরের আয়ন-নিয়ন্ত্রক কোষগুলিকেও, যাহাদের গঠন foxi3 পরিবারের ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর নিয়ন্ত্রণ করে, জলের উপযোগী কাজে নামানো যায়, তবে স্থলের প্রাণীর ত্বক জলের স্পর্শে বিদ্রোহ করিবে না।
এই সকল কথা কাগজে সহজ, গবেষণাগারে ইহার ভার পাহাড়সম। কিন্তু আজ রাতে ইঁদুরটি তাহাদের সকলকে উপেক্ষা করিয়া জলের তলায় নিশ্চিন্তে বসিয়া আছে।
আনিস চেয়ারে হেলান দিলেন। তাঁহার মনে পড়িল, বহু বৎসর আগে এক শ্রাবণের দুপুরে নীলগঞ্জের কানা দীঘির পাড়ে বসিয়া তিনি দাদিকে প্রশ্ন করিয়াছিলেন, ‘দাদি, মাছেরা জলের ভিতর ঘুমায় কেমন করিয়া?’ দাদি পানের পিক ফেলিয়া হাসিয়া বলিয়াছিলেন, ‘ওরে, জল ওদের মা। মায়ের কোলে সন্তান ডুবিবে কেন?’ তারপর সুর করিয়া ছড়া কাটিয়াছিলেন —
‘জল বলে, ওরে খোকা, ভয় কী তোর ভয়, আমার বুকে ঠাঁই আছে, সবারই পরিচয়।’
সেই ছড়া আজও তাঁহার ভিতরে কোথাও বাজে। মানুষ যখন প্রলয়ংকর বন্যায় ঘরবাড়ি হারাইয়া ছাদে, গাছের মাথায়, ভাসমান ভেলায় দিন কাটায়, তখন আনিস ভাবেন — যদি জলের সঙ্গে লড়াই না করিয়া জলের সঙ্গে বাস করিবার সামান্য ক্ষমতাও মানুষ পাইত! এই ভাবনাই তাঁহাকে রাতের পর রাত এই গোপন ঘরে টানিয়া আনে।
* * * তখন আনিসের বয়স দশ। নীলগঞ্জের দাদা বাড়ির উঠানে সেদিনও সকাল হইতে কলহ চলিতেছিল। বড়চাচা হাশেম ও ছোটচাচা কাশেম জমির সীমানা লইয়া চিৎকার করিতেছেন; দাদা, যিনি একসময় এই বিশাল বাড়ির একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন, বারান্দার ইজিচেয়ারে নীরবে বসিয়া শুধু হুঁকার ধোঁয়া ছাড়িতেছেন। তাঁহার মুখে কোনো কথা নাই, কেবল চোখের কোণে এক গভীর ক্লান্তি। বালক আনিস সেই ক্লান্তির অর্থ তখন বোঝে নাই। সে শুধু বুঝিয়াছিল, এই বাড়িতে সবকিছু ভাগ হইতেছে — জমি, ধান, গাছ, এমনকি পুকুরের পাড়টিও — আর কেহই আর কাহারও সঙ্গে আগের মতো হাসিতেছে না।
সে চুপি চুপি বাড়ির পেছন দিয়া কানা দীঘির দিকে ছুটিয়া গেল। পুকুরটি কানা, কারণ ইহার এক কোণ বহু বৎসর আগে বন্যার পলিতে ভরাট হইয়া একচক্ষু প্রাণীর মতো দেখায়। কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে কালো জল স্থির; বাতাসে শ্যাওলা ও কাদার গন্ধ। গ্রামের লোকে বলে, এই দীঘির তলায় এক সময় জলদেবতার থান ছিল, আর সেই থানের পাহারাদার এক বুড়ো মাছ নাকি আজও বাঁচিয়া আছে।
আনিস পাড়ের ঘাটে পা ঝুলাইয়া বসিল। দাদি কোথা হইতে আসিয়া তাহার পাশে বসিলেন, কাপড়ের আঁচলে বাঁধা মুড়ি আর গুড়। ‘আজও কি ঝগড়া শুনিয়া পলাইয়া আসিলি?’ আনিস উত্তর দিল না। দাদি মুড়ির একটি অংশ তাহার হাতে দিয়া বলিলেন, ‘মানুষের ঝগড়া জল শুনিতে পায় না রে। জলের কাছে সকলেই সমান।’
‘দাদি, জলের ভিতরে কতক্ষণ থাকা যায়?’
‘মানুষ থাকিতে পারে না। মাছ পারে।’
‘মাছ কেমন করিয়া পারে?’
দাদি হাসিলেন। ‘কারণ তাহাদের গলায় জলের জানালা আছে।’
সেই দিন বিকালে আনিস গোপনে পুকুরের জলে নামিয়াছিল। বুক ভরিয়া শ্বাস লইয়া সে ডুব দিয়াছিল। জলের নিচে এক অদ্ভুত নীরবতা; কানের ভিতর দপদপ করিতেছে নিজেরই নাড়ির শব্দ। সে গুনিতে লাগিল — এক, দুই, তিন… বিশ পর্যন্ত গুনিতে গুনিতে তাহার বুক জ্বলিয়া উঠিল। হঠাৎ কে যেন তাহাকে চুল ধরিয়া টানিয়া তুলিল। দাদি, শাড়ি ভিজাইয়া জলে নামিয়া, কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘পাগল ছেলে! কী করিতেছিলি?’
আনিস কাশিতে কাশিতে বলিল, ‘আমি জলের জানালা খুঁজিতেছিলাম।’
দাদি তাহাকে বুকে জড়াইয়া ধরিলেন। তাঁহার চোখে ভয় ও বিস্ময় একসঙ্গে ছিল। অনেকক্ষণ পরে তিনি আস্তে বলিলেন, ‘তোর রক্তে জল আছে, বাবা। সাবধানে থাকিস।’
সেই কথার অর্থ আনিস আজও পুরাপুরি বোঝে না। কিন্তু সেই দিনের সেই বুক-জ্বলুনি, সেই নিরুদ্দেশ নীরবতা, সেই ‘জলের জানালা’ — এইগুলিই বছরের পর বছর তাঁহাকে জীববিজ্ঞানের পথে টানিয়া আনিয়াছে। * * *
সকালবেলা আনিস নিয়ম মতো ইনস্টিটিউটের মূল ল্যাবে উপস্থিত হইলেন। রাত জাগিয়া তাঁহার চোখের নিচে কালি পড়িয়াছে, কিন্তু দিনের কাজে তাঁহার কোনো শিথিলতা নাই। দিনের আনিস সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ — কঠোর, নিখুঁত, সময়ানুবর্তী। ভোর সাতটায় তিনি সহকারী গবেষক রুবিনা ও সজলকে লইয়া বাজার হইতে সংগৃহীত নমুনার ট্রে সাজাইতে বসিলেন।
টেবিলে সারি সারি রুই, ইলিশ, পাঙাশ, আম, লিচু, দুধের প্যাকেট, হলুদ-মরিচের গুঁড়া। প্রতিটি নমুনার গায়ে বাজারের নাম, তারিখ ও সংগ্রহকারীর স্বাক্ষর। মাছের নমুনায় ফরমালিনের উপস্থিতি যাচাইয়ের জন্য রুবিনা রঞ্জক-বিক্রিয়ার কিট ব্যবহার করিতেছিল।
‘স্যার,’ রুবিনা হঠাৎ থামিয়া বলিল, ‘এই নমুনাটির রঙ তো ঠিক হইতেছে না।’
আনিস নিকটে গিয়া পাত্রটির দিকে তাকাইলেন। বর্ণ-পরিবর্তন স্পষ্ট। তিনি নীরবে পরবর্তী পাত্রটি দেখিলেন, তারপর তাহার পরেরটি। সজল তখন কাগজে লিখিতেছিল, ‘বাজার-ক — নমুনা সতেরো, ফরমালিন ধনাত্মক।’ তাহার কণ্ঠ ক্রমশ নিচু হইয়া আসিল।
‘আজ সকালের ষোলোটি মাছের নমুনার মধ্যে এগারোটি ধনাত্মক,’ রুবিনা অবশেষে বলিল। ‘স্যার, ইহা তো… ইহা তো সম্ভব নয়।’
‘সম্ভব, রুবিনা,’ আনিস শান্ত কণ্ঠে বলিলেন। ‘সম্ভব বলিয়াই ইহা ঘটিতেছে। আমরা প্রতিদিন সেই মাছ কিনিতেছি, রাঁধিতেছি, আমাদের সন্তানদের মুখে তুলিয়া দিতেছি।’
সজল জিজ্ঞাসা করিল, ‘স্যার, ইহা কি আমরা সরাসরি প্রতিবেদনে লইব?’
আনিস কিছুক্ষণ নীরব রহিলেন। ঘরের জানালা দিয়া বাহিরে গাছের পাতায় ভোরের আলো পড়িতেছিল। তিনি জানিতেন, প্রতিবেদনে ‘ফরমালিন’ শব্দটি লিখিলে কত দরজা বন্ধ হইবে, কত ফোন বাজিবে, কত মুখ কঠিন হইবে। তবু তিনি স্পষ্ট স্বরে বলিলেন, ‘যাহা পাইয়াছি তাহাই লিখিব। অক্ষরে অক্ষরে, সংখ্যায় সংখ্যায়।’
রুবিনা ও সজল পরস্পরের দিকে তাকাইল। তাহাদের চোখে প্রশংসা ও আশঙ্কা একসঙ্গে মিশিয়া ছিল।
* * *
দুপুরে খাবারের বিরতিতে আনিস ক্যান্টিনে গেলেন না। নিজের টিফিন বাক্স খুলিয়া এককোণে বসিয়া ভাত-ডাল খাইতে খাইতে মোবাইলে স্ত্রীর বার্তা পড়িলেন — ‘আজ তিতাসের স্কুলে অভিভাবক সভা। তুমি আসিতে পারিবে?’ আনিস দ্রুত লিখিলেন, ‘চেষ্টা করিব।’ কিন্তু তিনি জানিতেন, এই ‘চেষ্টা’ শব্দটি তাঁহার সংসারে ইদানীং আশ্বাসের চেয়ে অজুহাতের মতোই শোনায়।
তাঁহার স্ত্রী নাজমা একজন বিদ্যালয়-শিক্ষিকা। বিবাহের প্রথম দিকে তিনি আনিসের সৎ জেদকে ভালোবাসিতেন। এখন সেই জেদই তাঁহাকে রাত জাগাইয়া রাখে, ভাবাইয়া তোলে। গত মাসে একদিন তিনি শান্ত গলায় বলিয়াছিলেন, ‘তুমি সত্য বলিতে ভালোবাসো, আমি জানি। কিন্তু সত্যের ভাড়া কি আমরা দিতে পারিব?’ আনিস সেদিন উত্তর দিতে পারেন নাই।
খাওয়ার মাঝখানে ইনস্টিটিউটের পিয়ন আসিয়া বলিল, ‘স্যার, মহাপরিচালক সাহেব আপনাকে ডাকিতেছেন।’
আনিস হাত ধুইয়া ধীর পায়ে উপরতলায় উঠিলেন। মহাপরিচালকের কক্ষের পর্দা টানা, ভিতরে শীতাতপ যন্ত্রের মৃদু গুঞ্জন। বড় টেবিলের ওপারে বসিয়া আছেন ডক্টর রফিকুল আলম, বয়স ষাটের কাছাকাছি, মুখে সদাহাস্য, কিন্তু চক্ষুদ্বয় সন্ধানী। তাঁহার পাশে আরেকজন ভদ্রলোক বসিয়া ছিলেন, আনিস তাঁহাকে চিনিতেন না — গাঢ় রঙের স্যুট, হাতে স্বর্ণের ঘড়ি।
‘আসুন, আনিস সাহেব, আসুন,’ মহাপরিচালক হাসিয়া বলিলেন। ‘ইনি জনাব মনসুর চৌধুরী। খাদ্য সরবরাহ ব্যবসায়ী সমিতির একজন সম্মানিত সদস্য। আপনার কাজ নিয়া একটু কৌতূহল দেখাইতেছিলেন।’
আনিস মাথা নুইয়া সালাম জানাইলেন। মনসুর চৌধুরী নরম সুরে বলিলেন, ‘শুনিলাম, আপনারা নাকি দেশজোড়া এক বিশাল সমীক্ষা চালাইতেছেন? খুব ভালো উদ্যোগ। তবে কিনা, ফলাফল প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে একটু আলোচনা করিয়া লইলে সবাই উপকৃত হইত।’
আনিস স্থির দৃষ্টিতে বলিলেন, ‘আলোচনা অবশ্যই হইবে, জনাব। কিন্তু ফলাফল পরিবর্তনের কোনো আলোচনা হইবে না।’
ঘরের বাতাস মুহূর্তে ভারী হইয়া উঠিল। মহাপরিচালক কাশিলেন। ‘আনিস সাহেব, আমরা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। আমাদের সংবেদনশীলতার সঙ্গে চলিতে হয়। অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক ছড়াইলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়, শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষেরই।’
‘স্যার,’ আনিস ধীরে বলিলেন, ‘আতঙ্ক ছড়াইতেছে ফরমালিন, আমার প্রতিবেদন নয়।’
মনসুর চৌধুরী ম্লান হাসিলেন। তাঁহার চোখে এই প্রথম এক মুহূর্তের জন্য শীতল কিছু ঝিলিক দিয়া উঠিল। ‘আপনার সাহসের প্রশংসা করিতে হয়, ডক্টর। কিন্তু সাহস সবসময় বুদ্ধির সঙ্গে হাঁটে না।’
আনিস কোনো উত্তর দিলেন না। কক্ষ হইতে বাহির হইবার সময় তিনি শুনিলেন, পিছনে মহাপরিচালক মৃদুস্বরে কাহাকে বলিতেছেন, ‘উনি একটু… আদর্শবাদী। বুঝাইয়া লইব।’
সিঁড়ি দিয়া নামিতে নামিতে আনিসের মনে হইল, তিনি যেন কোনো গভীর জলের কিনারে দাঁড়াইয়া, আর তলায় কিছু একটা তাঁহার দিকে নিঃশব্দে উঠিয়া আসিতেছে।
* * * সন্ধ্যায় ইনস্টিটিউট প্রায় ফাঁকা হইয়া আসিলে রুবিনা নিজের ব্যাগ গুছাইতে গুছাইতে আনিসের কক্ষের দরজায় আসিয়া দাঁড়াইল। সে ভাবিতেছিল কথাটি বলিবে কি বলিবে না।
‘স্যার, একটা কথা জিজ্ঞাসা করিব?’
‘বলো।’
‘গত কয়েকদিন ধরিয়া রাতে ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তাকর্মী বলিতেছিল, পশ্চিম কোণের পুরাতন ভাণ্ডারঘরে নাকি আলো জ্বলে। আপনি কি জানেন কিছু?’
আনিস কাগজ হইতে মুখ তুলিলেন না। তাঁহার কলমের গতি একমুহূর্তের জন্যও থামিল না। ‘পুরাতন যন্ত্রপাতির খোঁজ লইতে গিয়াছিলাম। হয়তো সেজন্য।’
রুবিনা কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। সে আনিসকে তিন বছর ধরিয়া চেনে — তিনি মিথ্যা বলিতে অভ্যস্ত নহেন, তাই মিথ্যাটি আরও স্পষ্ট শোনাইল। কিন্তু সে কোনো প্রশ্ন করিল না। শুধু বলিল, ‘স্যার, আপনি নিজের যত্ন নিবেন। শরীর খারাপ হইলে এই সমীক্ষা কে শেষ করিবে?’
আনিস অবশেষে মুখ তুলিয়া ম্লান হাসিলেন। ‘তুমি আর সজল শেষ করিবে। তোমরা দুইজন আমার চেয়ে ভালো বিজ্ঞানী হইবে, রুবিনা।’
‘স্যার, এইভাবে বলিবেন না,’ রুবিনা অস্বস্তি লইয়া বলিল। ‘মনে হয় আপনি কোথাও চলিয়া যাইতেছেন।’
আনিস উত্তর দিলেন না। জানালার বাহিরে সন্ধ্যার আকাশ গাঢ় নীল হইয়া আসিতেছিল। তাঁহার মনে হইল, রুবিনার কথাটি কোনো অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের ছায়ার মতো ঘরের ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। তিনি জোর করিয়া হাসিয়া বলিলেন, ‘যাও, বাড়ি যাও। কাল সকালে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করিতে হইবে।’
রুবিনা মাথা নাড়িয়া বিদায় লইল। দরজা বন্ধ হইবার পরও অনেকক্ষণ আনিস সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। তাঁহার মনে প্রশ্ন জাগিল — গোপন রাখা কি সত্যিই সম্ভব? আর যদি একদিন সব প্রকাশিত হইয়া পড়ে, তাহা হইলে কে বিশ্বাস করিবে এই কাহিনি?
* * *
সেদিন সন্ধ্যায় আনিস ইনস্টিটিউট হইতে বাহির হইয়া সরাসরি বাসায় না গিয়া রাস্তার ধারে এক চায়ের দোকানে বসিলেন। দোকানি নিত্যদিনের পরিচিত মুখ দেখিয়া হাসিয়া এক কাপ লাল চা আগাইয়া দিল। বাহিরে হালকা বৃষ্টি শুরু হইয়াছে, রাস্তার আলো জলের ফোঁটায় ভাঙিয়া ভাঙিয়া পড়িতেছে।
চা-য়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে তিনি ভাবিলেন, তাঁহার জীবনে দুইটি আনিস আছে — একজন দিনের আনিস, যে সত্যের পক্ষে লড়ে, প্রতিবেদন লেখে, সমীক্ষা চালায়; আরেকজন রাতের আনিস, যে এক পরিত্যক্ত ভাণ্ডারঘরে জলের নিচে মানুষের নতুন ঠিকানা খুঁজিয়া ফেরে। দুইজনই একই মানুষ, অথচ দুইজনের মধ্যে কেহ কাহারও কথা পুরাপুরি জানে না।
নাজমাকে তিনি রাতের আনিসের কথা বলেন নাই। বলিবার সাহস পান নাই। কীভাবে বলিবেন — ‘আমি ইঁদুরের গলায় ফুলকা গজাইয়াছি’? নাজমা কি বিশ্বাস করিবে? নাকি ভাবিবে, মানুষটা অতিরিক্ত পরিশ্রমে ভাঙিয়া পড়িতেছে?
বৃষ্টির শব্দের ভিতরে তাঁহার ফোন কাঁপিল। অজানা নম্বর। তিনি ধরিলেন।
‘ড. আনিস শিকদার?’ ওপাশ হইতে ভারী, নিচু কণ্ঠ।
‘জি, বলিতেছি।’
‘আপনার প্রতিবেদনটি যদি ছাপা হয়, তাহা হইলে আপনি অনেক কিছুই হারাইবেন। চাকরি, সম্মান, সংসার। ভাবিয়া দেখুন।’
আনিস স্থির কণ্ঠে বলিলেন, ‘আপনি কে?’
‘আমি আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী।’ লাইন কাটিয়া গেল।
আনিস অনেকক্ষণ ফোনের পর্দার দিকে তাকাইয়া রহিলেন। চা ততক্ষণে ঠান্ডা হইয়া গিয়াছে। তাঁহার আঙুল হালকা কাঁপিতেছে, কিন্তু সেই কম্পন ভয়ের নয়, রাগের। সত্য প্রকাশে মানুষের এই ভয় দেখানোই তো প্রমাণ করে, সত্যটি কত সংগত।
তিনি কাপের তলানি ফেলিয়া উঠিলেন। বৃষ্টির ভিতর দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে বাসার পথ ধরিলেন।
* * *
বাসায় ফিরিয়া দেখিলেন, ছোট্ট তিতাস টেবিলে বসিয়া কাগজে কী যেন আঁকিতেছে। আনিস নিঃশব্দে তাহার পিছনে দাঁড়াইলেন। কাগজে নীল ক্রেয়নে এক বিশাল জলরাশি, তাহার ভিতরে ডোরাকাটা একটি মাছ — আর মাছটির মাথার ঠিক উপরে একটি মানুষের মুখ।
‘ইহা কী আঁকিয়াছ, বাবা?’
তিতাস ঘাড় ঘুরাইয়া বলিল, ‘ইহা তুমি। তুমি মাছ হইয়া গিয়াছ।’
আনিসের বুক ধক করিয়া উঠিল। ‘কেন, বাবা, আমি মাছ কেন?’
‘কারণ,’ তিতাস গম্ভীর মুখে বলিল, ‘তুমি রাতে এত দেরি করিয়া ফেরো যে আমার মনে হয়, তুমি জলে ঘুমাও।’
আনিস হাসিয়া উঠিলেন। হাসিতে হাসিতে তাঁহার চোখে হঠাৎ জল আসিয়া গেল। তিনি পুত্রকে বুকে টানিয়া লইয়া মাথায় চুমু খাইলেন। ছেলের চুলে বৃষ্টির মৃদু গন্ধ, কাগজে ক্রেয়নের গন্ধ।
নাজমা রান্নাঘর হইতে বাহির হইয়া সেই দৃশ্য দেখিয়া নীরবে দাঁড়াইয়া রহিলেন। কিছুক্ষণ পর বলিলেন, ‘আজ আসিতে পারিলে না কেন? স্কুলে শিক্ষকেরা তিতাসের কথা জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন।’
‘ক্ষমা করিও,’ আনিস মৃদুস্বরে বলিলেন। ‘আজ একটু জরুরি কাজ পড়িয়াছিল।’
নাজমা কিছু না বলিয়া থালায় ভাত বাড়িলেন। রাতের আহার নীরবে শেষ হইল। তিতাস ঘুমাইয়া পড়িলে নাজমা বিছানার একপাশে বসিয়া বলিলেন, ‘আনিস, তুমি কি আজকাল ভালো আছ?’
প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু আনিস উত্তর খুঁজিয়া পাইলেন না। অবশেষে বলিলেন, ‘আমি ঠিক আছি, নাজমা। একটু ক্লান্ত।’
নাজমা তাঁহার চোখের দিকে তাকাইয়া থাকিলেন। ‘তোমার ক্লান্তি আমি চিনি। এই ক্লান্তি শরীরের নয়।’
আনিস তাঁহার হাত ধরিলেন। ‘আমাকে আর কিছুদিন সময় দাও। একটা কাজ শেষ করিয়া তোমাদের সব বলিব।’
নাজমা ম্লান হাসিলেন। ‘কিছুদিন… তুমি সর্বদা এই কথাই বলো।’
আনিস কোনো উত্তর দিলেন না। জানালার বাহিরে বৃষ্টি তখনো ঝরিতেছিল।
* * * নাজমা ঘুমাইয়া পড়িলে আনিস বসার ঘরের ছোট টেবিলে বসিয়া সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনের শেষ অনুচ্ছেদটি লিখিতে বসিলেন। বাহিরে রাত্রির বৃষ্টি তখন থামিয়াছে; কেবল ছাদের কার্নিস হইতে এক-দুই ফোঁটা জল মেঝের উপর টপ টপ শব্দ তুলিতেছে।
প্রতিবেদনের সারাংশে তিনি লিখিলেন — ‘দেশের আটটি বিভাগের একশত বাষট্টিটি বাজার হইতে সংগৃহীত দুই হাজার তিনশত নমুনার পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নমুনায় ফরমালিন ও অন্যান্য ক্ষতিকর যৌগের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি গুরুতর। তৎক্ষণাৎ নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ প্রয়োজন।’ বাক্যগুলি শুষ্ক, কিন্তু প্রতিটি শব্দের পিছনে কত শিশুর অনাগত অসুখ, কত মায়ের অজানা উদ্বেগ লুকাইয়া আছে, ইহা ভাবিয়া তাঁহার হাত থামিয়া গেল।
তিনি জানিতেন, প্রতিবেদন যথারীতি জমা দিলে ইহা ফাইলের স্তূপে চাপা পড়িয়া যাইবে। অতীতে তাঁহার সহকর্মীদের একাধিক সমীক্ষার ফল এইভাবেই ‘পর্যালোচনাধীন’ থাকিয়া ধীরে ধীরে হারাইয়া গিয়াছে। এইবার তিনি ভিন্ন কিছু করিবেন। প্রতিবেদনের সমগ্র তথ্য, নমুনা-সংগ্রহের স্থান ও পদ্ধতির বিবরণসহ, তিনি উন্মুক্তভাবে অনলাইনে প্রকাশ করিবেন — যাহাতে যে কেহ তাহা দেখিতে ও যাচাই করিতে পারে।
সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। তিনি জানিতেন, ইহা কেবল সরকারি নিয়মের ব্যতিক্রম নয়, বরং এক ধরনের যুদ্ধঘোষণা। তবু তাঁহার ভিতরে এক নীরব আওয়াজ বলিল — ‘সত্য যদি কেবল ফাইলের ভিতরেই থাকে, তাহা হইলে তাহা সত্য হইয়াও মৃত।’
তিনি ল্যাপটপ বন্ধ করিয়া উঠিলেন। ঘুমন্ত তিতাসের ঘরে গিয়া দাঁড়াইলেন। শিশুর বুকের নিচে কাগজ-ক্রেয়নের সেই মাছের ছবিটি তখনো চাপা পড়িয়া আছে। আনিস ধীরে ধীরে ছবিটি টানিয়া সোজা করিয়া বালিশের পাশে রাখিলেন। তাঁহার মনে হইল, ছোট্ট এই কাগজে আঁকা মাছটির ভিতরেই যেন তাঁহার ভবিষ্যৎ নিঃশব্দে সাঁতার কাটিতেছে।
‘যদি কখনো আমি হারাইয়া যাই,’ তিনি মনে মনে বলিলেন, ‘তুই যেন আমাকে খুঁজিয়া পাস, বাবা।’
বলিয়া তিনি নিজেই চমকাইয়া উঠিলেন। কথাটি কোথা হইতে আসিল? কেন আসিল? কোনো উত্তর পাইলেন না। * * *
গভীর রাতে, সকলে ঘুমাইলে আনিস নিঃশব্দে উঠিলেন। নিজের পুরাতন ল্যাপটপের ব্যাগ কাঁধে তুলিয়া তিনি আবার ইনস্টিটিউটের পথে রওনা হইলেন। ভোরের কিছু আগে পর্যন্ত তাঁহাকে ওই ভাণ্ডারঘরে থাকিতে হইবে। সমীক্ষার প্রতিবেদন আগামীকাল জমা দিতে হইবে, কিন্তু তাহার আগে ইঁদুরটির শেষ পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
গোপন ঘরের দরজা খুলিতেই তিনি থমকিয়া গেলেন। চৌবাচ্চার জল হালকা আন্দোলিত হইতেছে। ইঁদুরটি জলের তলায় নাই; সে ভাসিয়া উঠিয়াছে, তাহার ক্ষুদ্র শরীর অসাড়ভাবে জলের উপর দুলিতেছে।
আনিসের গলা শুকাইয়া গেল। তিনি ছুটিয়া গিয়া প্রাণীটিকে তুলিয়া লইলেন। তাহার নাড়ি পরীক্ষা করিতে করিতে তাঁহার হাত কাঁপিতেছিল। কয়েক মুহূর্ত পরে ইঁদুরটির বুক অতি মৃদু স্পন্দিত হইল। সে বাঁচিয়া আছে — কিন্তু অর্ধচেতন।
আনিস তাহাকে শুকনো তোয়ালেতে মুড়িয়া সযত্নে ঘরের অন্য একটি খাঁচায় রাখিলেন। তারপর ল্যাপটপে বসিয়া পর্যবেক্ষণের তথ্য মিলাইতে লাগিলেন। সময়ের রেখাচিত্রে স্পষ্ট দেখা গেল — ইঁদুরটির গলার ফুলকার কুঁড়িগুলি গতকাল রাতের তুলনায় আজ ক্ষীণ হইয়া আসিয়াছে। এজেন্টের প্রভাব ধীরে ধীরে ক্ষয় পাইতেছে, ঠিক যেমন তাঁহার হিসাবে লেখা ছিল।
তিনি নিজের অজান্তেই মৃদু হাসিলেন। কারণ ইহাই তো তাঁহার নকশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-রেখা — প্রভাব স্থায়ী নয়; জিনোমে কোনো অপরিবর্তনীয় চিহ্ন থাকে না। বিজ্ঞানী হিসাবে ইহা তাঁহাকে স্বস্তি দিল। কিন্তু মানুষ হিসাবে, এক অদ্ভুত বিষাদও জাগিল — যেন কোনো বিস্ময় আসিয়াও ক্ষণিকের অতিথির মতো বিদায় লইতেছে।
ঘরের কোণে রাখা সিল-করা কেমিক্যাল কন্টেইনারগুলির দিকে তাঁহার দৃষ্টি পড়িল। সারি সারি পাত্র, প্রত্যেকটির গায়ে তাঁহার নিজের হাতের লেবেল। সেইগুলির ভিতরে তাঁহার বহু বছরের শ্রম, ঘাম ও ঘুমহীন রাত বন্দী। আনিস সেগুলির সামনে দাঁড়াইয়া নিচু গলায় আপনমনে বলিলেন, ‘আমি তোমাদের কোনোদিন কাহারও ক্ষতির জন্য ব্যবহার করিব না।’
কথাটি বলিয়া তিনি নিজেই বিস্মিত হইলেন — কাহাকে এই প্রতিজ্ঞা শুনাইতেছেন? ঘরের নীরবতাকে? নিজের বিবেককে? নাকি অনাগত কোনো ভাগ্যকে?
ভোরের আজান ভাসিয়া আসিল দূরের মসজিদ হইতে। জানালার কাচে ধূসর আলো লাগিল। আনিস উঠিয়া দাঁড়াইলেন, ল্যাপটপ বন্ধ করিলেন। ঘুমের অভাবে তাঁহার পা টলিতেছিল, কিন্তু মনের ভিতর স্থির সংকল্প — আজ প্রতিবেদন জমা পড়িবে। ফরমালিনের ভয়ংকর সত্য আর চাপা থাকিবে না।
তিনি জানিতেন না, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহার জীবনের স্রোত অন্যদিকে বাঁক নিতেছে, আর সেই বাঁকের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করিতেছে এক মজা পুকুর, যাহার তলদেশে লুকাইয়া আছে তাঁহার সকল প্রশ্নের উত্তর।
কক্ষ হইতে বাহির হইয়া আনিস করিডোরে পা রাখিলেন। অন্ধকার সিঁড়ির মুখে পৌঁছাইয়া একবার পিছনে তাকাইলেন। নীলাভ আলো তখনো ক্ষীণ রেখায় জানালার কাচে কাঁপিতেছে — যেন কোনো গভীর জলের ভিতর হইতে কেহ নিঃশব্দে তাঁহাকে ডাকিতেছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



