
খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন করি, “প্রেমে পড়তে পারে এমন দু’জন মানুষের মধ্যে, আজকাল দূরত্ব কতটুকু?”
-বলতে পারছেন না! আচ্ছা আমিই বলে দিচ্ছি- “খুব সামান্য, মাত্র একটা ১১টা ডিজিটের কিংবা মাঝে মাঝে ভার্চুয়াল জগতের একটা ফেসবুক আইডি’র”।
-আপনি নিশ্চই হেসে বলছেন, “এটা আবার কোনো দূরত্ব হলো?” হ্যাঁ, তাই তো এটা কোনো দুরত্ব হলো!!
-অথচ এই দুরত্ব জয় করতে পারলেই ক্লোজ-আপ আপনাকে নি্যে লিখবে “কাছে আসার গল্প”।
একটা সময় দু’জন মানুষের প্রেমের মধ্যে আস্ত একটা সমাজ নাক গলিয়ে বসে থাকতো। সমাজ-সংসার-পরিবার-আত্মীয়-স্বজন-পাড়া-প্রতিবেশীসহ সব্বাই একটা অধিকার বোধের জায়গা থেকে দু’জন কে দেখতো। খবর রটে যেত, অমুক বাড়ীর ছেলের সাথে তমুক বাড়ীর মেয়ের প্রেম। কি বলেন ভাইসাব! না-না-না গেলো সব রসাতলে গেলো। কিন্তু সাইদ পোলাডা তো অনেক ভা্লো পোলা, তাই বইলা এই সব। লেখাপড়া করে, কত বড় মানুষ হতে হবে, তা রাইখা এই গুলান। মেয়ের বাবা তো স্ত্রীর সাথে দুঃখ করতেন, তুমিই বলো রোজি’র আম্মা সমাজে আমি মুখ দেখাবো কিভাবে। ভয়টা ছিলো, আসলে সম্পর্ক নিয়ে না, সম্পর্কের স্বীকৃ্তি কিংবা পরিনতি নিয়ে। যে কোনো নেতিবাচক পরিনতি মানে, সারা জীবনের দূর্ভোগ।
ওদিকে ছেলেটি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েটা জানালায় দাঁড়ায়, দূর থেকে ঐ একটু দেখা। সেই এতটুকু-ই। ছেলেটা হয়তো সাহস করে একদিন চিঠি লিখে কিন্তু পৌঁছাবে কিভাবে। পৌছে দেয়ারও মানুষ পাওয়া গেলো, কিন্তু মেয়েটার হাতে ঠিক ভাবে যাবে তো। কেউ আবার দেখে ফেলবে না তো! যদি মেয়েটা কোনো উত্তর দিতে চায়, কিভাবে দিবে? দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস দেখাহীন-কথাহীন কেটে যেত। কখনো ল্যান্ড ফোনের নম্বর জোগাড় করে দুরু-দুরু বুকে নম্বরটা ঘোরনো হতো। কি জানি কে রিসিভার তুলবে, ফোনটা থাকতো বাবা-মায়ের ঘরে। যদিওবা কাংক্ষিত মানুষটি-ই ধরলো, আশে পাশে কেউ থাকলে তো দুই মিনিট হু-হা করে রেখে দিতে হবে। সময় সুযোগ বুঝে, যে সে কলব্যাক করবে তাও তো সম্ভব ছিলো না। খুব অবস্থা সম্পন্ন না হলে বাড়িতে কেউ ল্যান্ড ফোন রাখতেন না। এনালগ লাইনগুলোও ছিলো ভীষণ বেরসিক। বার কয়েক এনগেজড টোনের পর কল ঢুকতো। কারনে অকারনে লাইন ডেড হয়ে থাকতো মাসের পর মাস। আর মরার উপর খাড়ার ঘা ছিলো টিএন্ডটি অফিস থেকে চাইলেই বের করা সম্ভব ছিলো কোন কোন নম্বর থেকে আজকাল ব্লাংককল গুলো আসছে, কার কাছে আসছে।
কিংবা দেয়াল লিখন! সাদা চুনকাম করা দেয়ালে যোগ চিহ্ন দিয়ে লেখা হতো দুটো নাম। যেমন সাইদ+রোজী। সারা শহরে রটে যেত এই কাহিনী। কি লজ্জ্বা! কি লজ্জ্বা! মেয়ের কলেজ যাওয়া বন্ধ। ছেলে কে বাবা শাসন করছে। কিন্তু এই কাজ সাইদের না, সাইদের বন্ধু কিংবা রোজিকে প্রেম নিবেদনে ব্যর্থ প্রেমিক কূলের। এতো কিছুর পরেও, প্রেমটা কিন্তু ঠিক-ই থাকতো। সেই প্রেমে অপেক্ষার আনন্দ ছিলো, উপেক্ষার বেদনা ছিলো না। চিঠি লেখালিখির সেই পবিত্র দুরত্ব পেরিয়ে আজ আমরা সারাক্ষন কাছে থাকার সময়ে চলে এসেছি।
আজকাল এর আমি শুনি না মানুষ পালিয়ে বিয়ে করে, তবু ঐতিহাসিক ঐতিহ্য কে ধারন করে এখনো মেয়েদের কলেজ গুলোর পাশে দেয়ালে বিজ্ঞাপন দেয়া থাকে, “কাজী অফিস” এর ঠিকানা। মানুষ এখন ইচ্ছে হলে বিয়ে করে। আর ভালো না লাগলেই বিচ্ছেদ করে। তাই নতুন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে শহর। ডিজিটাল ব্যানারের সাইনবোর্ডে লেখা থাকে “কাজী আফিস” এখানে বিয়ে পড়ানো হয় এবং তালাক নিবন্ধন করা হয়।
বর্তমানে দাঁড়িয়ে, গ্রামীন ফোনের ‘দুরত্ব যতই হোক কাছে থাকুন’ এর যুগে সবার মধ্যে একটা ১১ সংখ্যার নম্বরের দুরত্ব। চাইলেই কল করে বন্ধু হতে চাওয়া যায়। তার পর সময় সুযোগ বুঝে মনের কথা উগরে দিলেই হলো। থাকলে আছো। না থাকলে সেই একই রেসিপি অন্য কারো সাথে ট্রাই করা। ফেসবুকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট তো আরো সহজ। ভালো লেগেছে ব্যস ‘Add Friend’ অপশনে চলে যান। তারপর কনফরমেশন এর ভিসা পেলেই সমস্ত ছবিতে চোখ বন্ধ করে লাইক দিয়ে ফেলেন। অনলাইন হলেই একটু মিথ্যে প্রশংসা করুন (যেটা মেয়েরা খুব পছন্দ করে আর ছেলেরা খুব ভাল পারে) আদারস এক্টিভিটিস গুলো ফলো করতে থাকুন। এই তো কাছে আসার গল্প শুরু হয়ে গেলো।
তারপর? ফাস্ট ফুডে দেখা করুন, রিকশাই করে হাত ধরে ঘুরে বেড়ান। রাত জেগে কথা বলুন। মাঝে মধ্যে ঝগড়া করুন। তারপর যেদিন থেকে আর ভালো লাগবে না, সেল নম্বরটা মুছে দিন, মেসেজ গুলো মুছে দিযেছেন তো? তাহলেই চলবে। সব থেকে ভালো হয় নম্বরটা বদলে ফেলতে পারলে তাহলেই “একেবারে ল্যাঠা চুকে গেলো”। ফেসবুকে চ্যাট অপশন টা কয়েকদিন বন্ধ রাখুন, নিজের সাফাই গাইতে থাকুন, কিছু তথ্য হাইড করে দিন আর একদিন শুভ দিন দেখে পুনরায় “Got Engaged” লিখে ফেলুন। মানুষ আর ভেবে প্রেমে পড়ে না, প্রেমে পড়ার পর ভাবে। ভাব দেখে মনে হয়, প্রেমে পড়াই তো প্রেমের ধর্ম, তাই না??
এক ওয়েডিং ফটোগ্রাফার কে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
-আপনাদের দিয়ে ছবি তোলানোর খরচাপাতি কেমন?
-বললো ম্যাডাম একেক ইভেন্টের প্যাকেজ একেক রকম। তবে ১০,০০০/= থেকে শুরু। ৩৫,০০০/= পর্যন্ত আছে।
-আচ্ছা, আমি যদি কখনো ডিমান্ড করি যে, সব ছবি মুছে দিতে হবে। তবে সেটার খরচাপাতি কেমন?
-কেন ম্যাডাম?
-ধরেন, কোনো কারনে বিয়েটা টিকলো না! তখন ছবি রেখে কি হবে। তাই জানতে চাইলাম।
-আমাদের এরকম কোনো প্যাকেজ নাই।
-না থাকলে চালু করেন, দিনকাল বেশি সুবিধার না। বুঝলেন!!
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ডিসেম্বর, ২০২০ রাত ৮:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



