somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফ্যামিলি নিডস ফাদার…

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এই শহরের ডাস্টবিনে এবং তার আশেপাশে প্রায়শই জীবিত কিংবা মৃত শিশু পাওয়া যায়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ভাগাড়ে জুতার বাক্সের ভোরবেলাতে পথশিশুরা কুড়িয়ে পায় এক কন্যাশিশুকে। ভৈরবে নবজাতককে ভিক্ষুকের কাছে রেখে পালিয়ে গেছেন মা। ফেনীর জেনা্রেল হাসপাতালের সিড়ির নীচে ফেলে যায় পরিবার। গতবছর ১৬মার্চ শনিবার ট্রাংকবন্দি নবজাতক উদ্ধার হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা ছাত্রী হল থেকে। কান্নার আওয়াজ শুনে ট্রাঙ্কের তালা ভেঙ্গে শিশুটিকে হাসপাতালে নেয়া হলেও সেখানে মারা যায়। শিশুটির মা জাবির উদ্ভিতবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, এবং বাবা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী। বাবা রনি মোল্লার দেয়া তথ্যানুযায়ী, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। সেলফোন নষ্ট থাকার কারণে যোগাযোগ সাময়িক বন্ধ ছিলো। ছাত্রীটি সদ্য প্রসূত নবজাতকটিকে ট্রাংকে লুকিয়ে রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত অবস্থায় সাত বছর রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আবাসন সমস্যা কিংবা পড়াশুনার সুবিধার্থে হলে বিবাহিত মেয়েরা থাকেন। তবে সন্তানসম্ভবা এবং এতো এডভ্যান্স স্টেজে এসে হলে থাকার কথা নয়। কারণ এ সময়ে মেয়েদের প্রয়োজন পারিবারিক আবহ এবং বাড়তি যত্ন। সন্তান জন্মদানের মতো একটা প্রাকৃ্তিক বিষয় লুকানো সম্ভব নয় এবং রুমমেটদের কাছ থেকে তো একেবারেই নয়। তারপরও কেন এই অনাকাঙখিত ঘটনা?

যদিও মহাভারতে কুমারী কুন্তীর গর্ভে সুর্যদেবের সন্তান আসে। কৌশলে আপন বস্ত্রাঞ্চলে গর্ভাবস্থাকে ঢেকে রেখেছিলেন কুন্তী। জন্মের পর ধাত্রীর পরামর্শে একটা বড়োসড়ো স্বর্ণপেটিকার মধ্যে নবজাতকটিকে ভাসিয়ে দেয়া হয় অশ্বনদীর জলে। শিশুটি পরবর্তীতে কর্ণ নামে বেড়ে ওঠে অন্য এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে। বলা হয় মা তো মা-ই। মায়ের আবার ধরন হয় নাকি? মায়ের ধরন না হলেও মাতৃত্বের ধরন আছে। বিবাহিত মাতৃত্ব এবং কুমারি মাতৃত্ব। বিবাহিত মাতৃত্ব সমাজের চোখে বিশুদ্ধ মাতৃত্ব হলেও কুমারি মাতৃত্বকে স্বীকৃ্তি দিতে সমাজের রয়েছে কার্পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান শুতম্যাকার ইনস্টিটিউট ২০১৪ সালে এদেশে প্রজনন স্বাস্থ্যের উপর একটি জরীপ করেন। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এদেশে বছরে ১১লাখ ৯৪ হাজার স্বপ্রণোদিত গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে এ ধরনের গর্ভপাতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৭১টি। ২০০৫ সালে এদেশে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে করা আরেক গবেষণায় গবেষক আহমদ দেখতে পান, আমাদের দেশে বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিত কিশোরীদের গর্ভপাত করানোর হার পঁয়ত্রিশ ভাগ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দেরি হয়ে যাওয়ায় গর্ভপাত আর করানো সম্ভব হয় না, তাই অনাকাংক্ষিত সন্তান বলে যাদের জন্ম হয় সেই সব নবজাতকের শরীর পাওয়া যায় ডাস্টবিনে কিংবা নর্দমায়, কখনো জীবিত কখনো বা মৃত।

পরিবার যখন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে তখন থেকে শিশু পালনের যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়েছে নারীর কাঁধে। যদিও সন্তান নারীর নিজস্ব সম্পদ নয়, বরং পরিবারে সদস্য এবং রাষ্ট্রের নাগরিক। ‘মেটারনিটি নেসেশিয়েটস উইড্রয়াল ফ্রম ওয়ার্ক’ বইয়ে জুলিয়েট মর্মান্তিক সত্যিটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। তিনি বলেন, ‘শিশু এক মধুর অভিজ্ঞতা কিন্তু শিশুপালন যখন বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে সে বড় মর্মান্তিক’। নারীর কাঁধে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে শিশু পালনের একচ্ছত্র দায়। ব্যক্তিগত আবেগজনিত সম্পর্কগুলি দেখাশোনার ভার সম্পূর্ণভাবে মেয়েদের দায়িত্ব বলে মনে করা হয়। মায়ের সাথে সন্তানের যে অদৃশ্যবন্ধন তাকে সমাজের চোখ নাড়ির টান বলে অবিহিত করলেও এই কিংবদন্তি মতামতের পেছনে কোন জৈবিক শব্দ নেই, যা আছে তার পুরোটাই শিশুর সঙ্গে মায়ের গড়ে তোলা ব্যক্তিগত সম্পর্ক। মাতৃত্বের যে দায়-দায়িত্ব সামাজিকভাবে নির্মিত, প্রতিটি মেয়েকে শৈশব থেকেই তা শিখিয়ে দেয়া হচ্ছে পরিবারের অগ্রজ নারীদের মাধ্যমে। বলে দেয়া হচ্ছে নারীর প্রধান কাজ বিবাহ নামক প্রথার মধ্য দিয়ে সন্তানের জন্মদান, ধারণ পালন এবং সামাজিকীকরণ। নারী সন্তানধারণ করে প্রত্যক্ষভাবে প্রতি মুহূর্তে ভোগ করে গর্ভধারণের ঝুঁকি ও আশা-আশঙ্কা। মানবজাতির প্রথম শিক্ষক জরায়ু শাসিত নারীরা সন্তানের জন্ম দিয়েই খালাস নয়। মায়ের দায়িত্ব বা কাজ আট ঘন্টা কাজ করলেই শেষ হয়ে যায় না। পছন্দ না হলে ধর্মঘটও করা যায় না।

নারীদের মা হওয়ার শারীরিক অভিজ্ঞতা এক হলেও পারিবারিক বা সামাজিক অভিজ্ঞতায় রয়েছে ভিন্নতা। এঙ্গেলস এর মতে ৮০০০খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের উদ্ভব হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এর আগে আদিম সাম্যবাদী যে সমাজ প্রচলিত ছিল সেই সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সেখানে পরিবার ছিল না, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি, রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল না। ব্যাকোফেন প্রথম বলেন যে, মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের শুরু হয়েছিল মাতৃতন্ত্র দিয়ে। সন্তানের জননী হিসেবে মেয়েদের স্বাভাবিক বাড়তি শক্তি তাদের অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিল, কারণ তখনও মানুষ যা প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক তাতে অভ্যস্ত ছিল। যেহেতু মায়ের ভূমিকা প্রত্যক্ষ স্পষ্ট, শিশু তার শরীর থেকে উৎপন্ন হয়, এবং বাবার ভূমিকাটি সংযোজিত তাই সন্তান লালন পালনের যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেয়া হল নারীর কাঁধে। শিল্পবিপ্লবের পর যৌথপরিবার ভেঙে যায় গ্রাম থেকে দলে দলে পুরুষ কারখানায় যোগ দিতে শহরের দিকে পা বাড়ালে পুরনো বন্ধন ভেঙে তৈরি হলো দম্পতি কেন্দ্রিক অনুপরিবার। নগরীর কিশোর-কিশোরীরা সকলে হঠাৎ অনুভব করল সমাজের চোখ তাদের আর শাসন করছে না। চটজলদি আবেগের চরম প্রকাশ ঘটেছিল। ক্ষণস্থায়ী প্রেম ও স্বল্পকালীন বিয়ের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে সন্তান জন্মালে সম্পর্কচ্ছেদের পর তার দায়িত্ব মা কিংবা বাবা কোনো একজনের ঘাড়ের উপর চেপে বসে।

আমেরিকার একটি নতুন আন্দোলনের নাম ‘ফ্যামিলি নিডস ফাদারস’ (FNF)। ‘যে জীবনে বাবা নেই; আমেরিকার বৃহত্তম সামাজিক দুর্যোগ’ নামক একটি লেখায় নিকোলাস ডেভিডসন জানাচ্ছেন বৃটেনের প্রায় ১৫মিলিয়ন ছেলেমেয়ে, যারা অনূর্ধ্ব ১৮ তারা জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ, বাবা ছাড়াই বেড়ে উঠেছে। পশ্চিম সমাজে নতুন এক সমস্যার 'কিশোর পিতৃত্ব' আর বর্তমানে যা আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নতবিশ্বে কিশোর পিতৃত্ব যেমন একটা বিশেষ সমস্যা, তৃতীয়বিশ্বে সেটা 'কিশোরী মাতৃত্ব'। উন্নতদেশে যেহেতু স্কুলগুলোতে সেক্স এডুকেশন রয়েছে, তাই ধরে নিতে পারি সেখানে যেটা হয় জেনবুঝেই হয়; তবে তৃতীয়বিশ্বে যেটা হয়, সেটা না জেনেবুঝে হয়। মার্কিন ও উইরোপীয় সরকার আবার একক মাতৃত্বের জন্য বিশেষ ভাতাও দেন সন্তানের ভরণপোষনে সুবিধার জন্য। সেসব দেশে রাষ্ট্রের বন্ধুত্বের ওপর ভরসা করে অনেক নারীই 'সিঙ্গেল প্যারেন্ট' হবার সাহস দেখেচ্ছেন। অথচ আমাদের এই শহরে একজন একা নারী বাসা ভাড়া নিতে গেলে সকলেই ভুলে যান একা মানুষেরও একটা সংসার দরকার, ছাঁদ দরকার, সমাজ দরকার।

সন্তানের দায়িত্ব কার? যে শরীরে বহন করে তার; না যিনি ব্যায়োলজিক্যাল ফাদার তার? নাকি দুজনেরই? এ প্রশ্নের মীমাংসা আজও আমরা করতে পারিনি। বাচ্চার দায়িত্ব নিয়ে ত্যাগ স্বীকার শুধু নারী করবে কেন? বাচ্চাটি তো সমাজেরও ভবিষ্যৎ নাগরিক। কল্যাণ রাষ্ট্রের কি দায়িত্ব নয় শিশু ও তার জনস্বার্থ সংরক্ষন করা?
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১০:০৬
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্রগ্রাম যে ভাবে বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সকাল ৯:১২


আরাকান আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের সমৃদ্ধি ঘটলেও সে সময় দৌরাত্ম বেড়ে যায় পর্তুগীজ এবং মগ জলদস্যুদের। এরা চট্টগ্রামের আশেপাশে সন্দ্বীপের মত দ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লুটপাট করত এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিভা

লিখেছেন রাজীব নুর, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪৩



এক শকুনের বাচ্চা তার বাপের কাছে আবদার ধরলো-
বাবা, আমি মানুষের মাংস খেতে চাই, এনে দাও না প্লিজ!
শকুন বলল, ঠিক আছে ব্যাটা সন্ধ্যার সময় এনে দেব।

শকুন উড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরুর নাড়ি ভুরি খাওয়া নিয়ে দ্বিধা জায়েজ /না জায়েজ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৩৭


কোরবানী বা ঈদ-উদ-আযহা এলে সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা বিভিন্ন পশু কোরবানী করে থাকে। মাংস ও ভুড়ি খাওয়ার ধুম পড়ে। অনেকে আবার ভুড়ি খাননা বা খেতে চাননা কারণ খাওয়া ঠিক না বেঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আলোচিত খুন , আলোচিত গুম, আলোচিত ধর্ষণ ও আলোচিত খলনায়ক।

লিখেছেন নেওয়াজ আলি, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৪০

মেজর সিনহাকে চারটা নাকি ছয়টা গুলি করেছে তা নিয়ে বিতর্ক করে কি লাভ এখন। তাকে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এটাই সত্য। আর এই হত্যা করেছে দেশের আইন শৃঙ্খলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

৮ টি প্রয়োজনীয় ও বিনোদনমূলক ওয়েবসাইটের লিংক নিয়ে সামুপাগলা হাজির! (এক্কেরে ফ্রি, ট্রাই না করলে মিস! ;) )

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৪৬



করোনার সময়ে অনেকেই ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। বড়দের অফিস চললেও অপ্রয়োজনীয় কাজে সচেতন মানুষেরা বাইরে যাচ্ছেন না। ইচ্ছেমতো বাইরে গিয়ে শপিং, ইটিং, ট্র্যাভেলিং করে ছুটির দিনটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×