
বহু অঘটনের এই দেশে ঘটনার ঘনঘটা লেগেই থাকে। বর্তমানের নিভু নিভু এক ঘটনার কর্তা ব্যক্তি মামুনুল হক। রাজনীতিবিদ এবং আলেম। তিনি যে ক্রমশ বিশাল এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন তার কারণ ধর্ম নির্ভর একটা দলের নেতৃত্ব দেয়া এবং আক্রমানত্বক ভাষার ব্যবহার। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মধ্যে বিদ্রুপ আছে, সেই সঙ্গে আছে আশ্চর্য এক স্বস্তি। বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ/প্রতিরোধ আন্দোলনের সফল আহবায়ক মামুনুল হক বর্তমানে নিজেকে ‘মানবিক স্বামী’ হিসেবে উপস্থাপনে বার বার ফেসবুক লাইভে এসে ব্যাখ্যা দাঁড় করছেন। যা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। পূর্বাপর বিবেচনা না করেই ‘মানবিক স্বামী’ মামুনুল হক সাহেব তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে অবকাশ যাপনে সোনার গাঁয়ের রয়েল রিসোর্টে গিয়েছিলেন। রিসোর্ট রেজিস্ট্রারে লিখেছিলেন প্রথম স্ত্রীর নাম। রাজনৈতিক অনুসারীদের ‘প্রিয় রুহান বাবা’ ভেবেছিলেন বিশ্বাস নির্ভর অনুসারীতে যখন দেশ ভরে গেছে তখন কি আর হবে! তবে মামুনুলের সাহেবের অবকাশ যাপনে বাধ সাধে কিছু প্রশ্ন। রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের জেরার মুখে বেরিয়ে আসে বানোয়াট তথ্যের সত্য ভার্সন।
দেহজ ভোগ-বিলাস, খাদ্য, পানীয়- সবক্ষেত্রেই চলছে অতি-উপভোগের অনুশীলন। সেই অনুশীলনে সবাই নয় কেউ কেউ তিরষ্কৃত হন। এবং মামুনুল হক ভুলে গিয়েছিলেন যে গোপনীয়তা রক্ষা করাই চরম গুরুত্বের। কারণ কে না জানে, জনতার সমর্থন ক্ষনস্থায়ী। ঠিক যেমন করে মর্যাদার আসনে কাউকে সমাসীনা করে তারা, ততোধিক আনন্দে তাকে ছুঁড়ে ফেলে। এই ঘটনা জনসম্মুখে প্রকাশ করার কৃতিত্বের দাবি করছেন অনেকে। এই কৃতিত্ব নেয়ার জন্য একসময় প্রতিদ্বন্দ্বীতা শুরু হয়। এতে করে যে দূরত্ব বা ফাঁক তৈরি হয় সেই ফাঁক গলে্ মামুনুল হক আরামসে পৌঁছে যান নিরাপদ আবাসে। সেখান থেকে ফেসবুক লাইভে তিনি একের পর এক চটুল ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে থাকেন। অপর দিকে গণমাধ্যমের হাতে পৌঁছতে থাকে একের পর এক ফোন কল রেকর্ডিং। স্পষ্ট হতে থাকে যে গনমাধ্যম আসলে ম্যাস মিডিয়া নয়, বরং ল্যাপ মিডিয়া। ক্ষমতাসীনদের কোলে চড়ে আছে।
গতকাল সংবাদে দেখলাম ‘মানবিক স্বামী’ মামুনুল সাহেবের তৃতীয় স্ত্রীর খোঁজ দিচ্ছে গণমাধ্যম। বিষয়টা গনমাধ্যমের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে ব্যাপারটা তেমন নয়। তথ্যটা গণমাধ্যমের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সাংবাদিকতায় যেটাকে ‘লিক রিপোর্ট’ বলা হয়। এই পুরো বিষয়টাকে অনেকেই ধর্ম দিয়ে ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ শাক দিয়ে মাছ ঢাকা তো সহজ ব্যাপার নয়। অনেক সময় সাফল্যের হাতে হাত ধরে আসে সমস্যা। সমস্যাটা হলো একজন আলেমের চারিত্রিক নৈতিকতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
রাজনীতি তো কেবল নির্বাচনে জেতা নয়, এটা হলো চূড়ান্ত বিজয়ী হওয়া। রাজনীতি মানেই কী দেখা গেল সেটা। আর রিসোর্টে গণশুনানীতে মামুনুল হক যা বলেছেন তা একযোগে জাতি শুনেছে। এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে এও দেখেছে মামুনুল হক সাহেব আসলে আরাম কেদারায় বসা বুদ্ধিজীবী। তিনি কর্তব্য পালনের চেয়ে সরকারের সমালোচনার করতেই বেশি পারদর্শী। সবনীতির মূল নীতি যে নৈতিকতা, সে কথা সতর্কতার সাথে এড়িয়ে যান তিনি। কারণ তার অনুসারীরা প্রমাণ নির্ভর নয়, বরং বিশ্বাস নির্ভর। তাদের কাছে যুক্তির প্রয়োজন নেই, বিশ্বাস থাকলেই হলো। এই নেতাদের সত্যিকারের ক্ষমতা দৈহিক গড়ন থেকে আসে না, আসে রাজনৈতিক সুবিধা থেকে। আর জনপ্রিয়তা লাভ করতে এদের আক্রমানত্বক ভাষার ব্যবহার, খুবই কার্যকরী একটা মাধ্যম।
মামুনুল হক সাহেব বিষয়ক ইস্যুতে গণমাধ্যমগুলোতে সব একই সংবাদ, একই বিবৃতি, একই সম্পাদকীয়। কেবল শিরোনামে শব্দের ভিন্নতা ছাড়া। অনেকটা সাংবাদিকদের দিয়ে বিভিন্ন বিষয়/ভাবনা বলিয়ে নেয়া হচ্ছে। রাজনীতির খেলায় মিডিয়া সবদেশেই একটা প্রিয় খেলনা হিসেবে বিবেচ্য। যাতে করে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায় করে নেয়া হয়। সন্দেহবাদীরা তথ্য চ্যালেঞ্জ করে বিপাকে পড়তে চায় না। অবিশ্বাসের একটা ছায়া ফেলে, কে জানে সেটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো অন্ধ বিশ্বাসের মতো বিশাল কিছুকে একটা ক্ষুদ্র ব্যাপার দিয়েই মোকাবেলা করা যায়।
অবকাশ যাপন সম্পর্কিত তথ্য তুলে ধরতে সরকার হয়েছেন সংকল্পবদ্ধ আর সন্তোষজনপক ব্যাখ্যা দিতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো সংঘবদ্ধ। সারাদেশে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালনের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ১৫জন মানুষের মৃত্যু নিয়ে আলোচনা থেমে গেল। গণমাধ্যমের হাতে যখন একের পর এক ফোনকল রেকর্ডিং আসতে শুরু হলো, কিছু নেতার ব্যাংক একাউন্ট তলব করা হলো, আতংক খামচে ধরলো মামুনুল হকের সাহেবের দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হৃদয়। ভয় আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব ইতোমধ্যে তাদের ক্ষয়িষ্ণু আত্মবিশ্বাসের মূলে আঘাত হানলো। একে চরম আঘাত ঠিক নয়, বরং সুতীক্ষ্ণ একটা খোঁচা বলা যায়।
পুরো ইস্যুতে সরকারের যে সফলতা তার ডান হাত হলো মিডিয়া। সবকিছু ছাপিয়ে মামুনুল হক সাহেবের অবকাশ যাপনকে পুরো জাতির ঝিমিয়ে পড়া অবস্থার রূপক বলা যায়। আর ঘটনা পরবর্তী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সব ব্যাখ্যাই নির্লজ্জভাবে মানসিক দেঔলিয়াপনার প্রকাশ। মাঝে মাঝে পুরনো ধর্মের /দিনের/দলের দু-একটা ব্যাপার ইচ্ছে করেই জিয়িয়ে রাখা/চর্চা করা/রেখে দেয়া হয়। যেন নতুন নিয়ম/আইন/শাসন/ বিধিনিষেধ খুব বেশি আঘাত হয়ে দেখা না দেয়। এর একটা সুন্দর নাম আছে 'ট্রান্সমিউটেশন'। এর ফলে মানুষ নতুনের উপর আস্থা রাখতে শেখে। তাতে যারা ক্ষমতায় আছে তারা জনআবেগ লাভ করে।
অন্ধকার আমাদের চোখের উপর পর্দা টেনে রেখেছে। আমরা যা দেখি তার পেছনে আরেকটা গোপন জগৎ রয়েছে। কখনো কখনো প্রাসপেক্টিভের সামান্য পরিবর্তনে অতিপরিচিত কোনো কিছুও একেবারে নতুন আলোয় দেখা যায়। সহজ করে বললে, একটা অসভ্য সময়ে বাস করছি আমরা; না বন্য- না বিজ্ঞ। এই আধাআধি ব্যাপারটাই একধরনের অভিশাপ।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই এপ্রিল, ২০২১ রাত ৩:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




