শেষ বার রুমটা দেখে নেয়া দরকার, কোঁথাও কোন কিছু থেকে যাচ্ছে কিনা। কোন ক্লু থেকে যাবে কিনা! ৬ টায় আমার বের হয়ে যেতে হবে রুম ত্থেকে, সাড়ে ৬টায় রুম সার্ভিস আসবে। অলকা, মেয়েটার নাম। ৪০-৪৫ তলার রুম গুলোর দায়িত্বে মেয়েটা, সদাহাস্যজ্জোল, মিষ্টী করে হাসি দেয়, অনেক গল্প করতে পছন্দ করে। খারাপ ই লাগছে, আজকে মেয়েটার দিন টা ভালো যাবে না। রুমে ঢূকে কি করবে অলকা? চিৎকার দিয়ে বার হয়ে যাবে? নাকি সিকিউরিটি কে ফোন দিবে?
ব্যাগ গুছিয়ে রাকেশ শেঠ কে একটু দেখে নিলাম, “নাথিং পারসোনাল রাকেশ, ইটস বিজনেস।একটা স্ট্যাটমেন্ট ছিল এইটা, বাকিরা যেন সাবধান হয়ে যায়”। বেশ প্যাড়া দিয়েছে রাকেশ আমাকে, কাজটা খুবই সুনিপুন ভাবে করতে হয়েছে।
বিকালের শেষ আলো টা ছড়িয়ে যাচ্ছে দিগন্তে।সোফাতে বসে তাকিয়ে দেখছি ডুবন্ত সূর্য্য টা কে। অভাবনীয় একটা সুন্দর সন্ধ্যা আসছে, কিছু পরে সীবিচে আতশবাজির সমাহার হবে। সব প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে। ৪৫ তলা হোটেল এর ৪৫০৪ রুমের বারান্দা থেকে আমি নিচের মানুষগুলোর হুড়াহুড়ি, ব্যস্ততা দেখছি। আমার ও যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। বিজনেস কার্ড টা রেখে বার হয়ে গেলাম। সুইমিং পুলে একটু সাতার কাটা দরকার।
তনিমা, এই দিকে প্লিজ! বাথরুম থেকে ডাক এলো, ছূটে গেল তনিমা, ৩৫ বছর বয়সী হলেও পুলিশ ফোর্সে বেশ নাম করেছে মেয়েটা, তুখোড় ডিটেকটিভ হিসবে পরিচিত। গত বছর ৮ টা খুনের কেইস সলভ করেছে। নিজের ৯ বছরের ক্যারিয়ার এ খুন খারাবী দেখা হয়েছে অনেক।কিন্তু রাকেশের লাশ টা অন্যরকম ভাবে তাকে পীড়া দিচ্ছে। সার্জিকাল ভাবে খুনটা করা হয়েছে, নিখুত ভাবে।
“তনিমা, এটা “তেইশ” এর কাজ!”, ফরেনসিক এনালিস্ট রাজীব একটা কার্ড দেখিয়ে বললো। তনিমা এই কার্ড চেনে, আগেও দেখেছে এবং এই কার্ডে থাকে যেখানে সেটা সব সময় আনসল্ভড কেস থেকে যায়। লাস্ট ৩ বছর সে ইন্টারপোলকে সাপোর্ট দিচ্ছিলো, এই “তেইশ” কে খুজে পেতে। একজন অদ্ভুত খুনী, কেউ দেখেও নি তাকে, কোন ছাপ, ডিএনএ কিছু ই নাই কোন ডেটা বেইজে। ১০ বছর আগে তেইশ এর আবির্ভাব হইয়েছিল অপরাধ জগতে, ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া বাদ নেই কোথাও।প্রায় ৪৫ টা কেইস ফাইল আছে, যেখানে এই কার্ডটা পাওয়া গেছে এবং খুব ই নিখুঁৎ ভাবে খুন গূলো করে, “কনট্রাক্ট কিলার” তবে দিল দরিয়া। কোন নারী বা বাচ্চা কে মেরেছে বলে রেকর্ড নাই। সিসিলি তে একটা কেইস ছিল, আগিরা শহরের ড্রাগ লর্ড জিওভানীর পুরা মাফিয়া ইউনিট কে মেরে ফেলেছিল “তেইশ” একাই। কারন, তার মেইন টার্গেটের ২ বাচ্চা এবং বউ কেও মারার হুমকী দিয়েছিল জিওভানী এবং “তেইশ” সেটা খুব একটা ভালো ভাবে নেয় নাই।
কিন্তু কথা হলো , “তেইশ” আবার কেন বাংলাদেশে? লাস্ট বার তেইশ যখন এসেছিল, শটগান মামুন এবং তার দলের ১২ জন কে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। প্রশ্ন হলো রাকেশের মত হীরা ব্যবসায়ী কে কেন বেচে নিল? আর এইভাবে স্টেটমেন্ট লাশ রেখে গেল কেন? কার কন্ট্রাক্ট এ কাজ করছে “তেইশ”? রাকেশের প্রতিপক্ষের হয়ে? এই লোকের হীরার ব্যবসা চেইন স্টোর এর মত, সারা বিশ্বে ১৪৫ টা আউটলেট আছে। দাম এবং ডিজাইনে অতুলনীয়। যদিও রাকেশ “ব্লাড ডায়মণ্ডের” কারবারী বলে অভিযোগ আছে কিন্তু প্রমান নাই কোন, রুয়ান্ডা, রাশিয়া, বতসওনয়া, এঙ্গোলা এমন কোন দেশ নাই যেখানে রাকেশের “ডায়মণ্ডস ফর এভার” কোম্পানীর পা পরেনি এবং খূনাখুনি হয় নাই। এটা কি সেটার বদলা?
লাশ টা কে ভালো ভাবে দেখে নিল, ডান হাতের তিনটা আঙ্গুল এবং বাম হাতের কব্জি ঊধাও। দুই পা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। উলটো করে লাশ টা বাথ টাবে ঝুলানো, ধীরে ধীরে মরেছে লোকটা, শরীরে ৫ টা কাটা জায়গা দিয়ে রক্ত পরেছে এবং খুনি সেটা বসে বসে নিশ্চিত করেছে, যাতে চোখের সামনে মারা যাচ্ছে। “তেইশ” এর এই কাজ টা অন্যতম ব্রুটাল এবং সময় নিয়ে মেরেছে লোকটা কে! হোটেলের ৪৫ তলা, লিফট এবং লবির সার্ভেইলেন্স ক্যামেরা অফ ছিল!ফলে বোঝার উপায় নাই কিভাবে “তেইশ” এই কাজ টা শেষ করে বার হয়ে গেছে।
ডিটেকটিভ, একটা পেনড্রাইভ পেয়েছি। “তেইশ” রেখে গেছে নাকি? বিড়বিড় করে নিজেকেই জিজ্ঞাস করলো তনিমা! একটা ১৫ মেগাবাইটের ভিডিও আছে, চালু করলো সেটা।
- তনিমা কেমন আছেন, আমি “তেইশ”? পরিষ্কার বাংলায় সম্বোধন শুনে থমকে গিয়েছিল। “তেইশ” তাকে নাম ধরে ডাকছে, কিভাবে সম্ভব!!!
লাশ টা পেয়ে গেছেন যেভাবে, সেভাবেই রিপোর্ট করবেন, প্লিজ।
নাহলে আমি এই খুনের ভিডিও খবরের কাগজে ছাপিয়ে দিব এবং সত্য লুকানোর জন্য আপনারা জবাবদীহী করতে বাধ্য থাকবেন।
রাকেশের ফাইল টা আপনার ডেস্ক এ রেখে এসেছি পড়ে নিবেন আর আমি জানি আপনি ইন্টারপোল কে সাহায্য করছেন ব্লুমবার্গের কেইসে,আমার পিছনে আর কত ঘুরবেন?
আমি তো আপনাদের কে সাহায্য ই করছি এই সব জঞ্জাল কে সরিয়ে। আমাকে তো পুরূষ্কার দেয়া উচিত! যাই হোক, দেখা হবে কংগো তে তনিমা !
পুরো এয়ারপোর্টের চেহারা পাল্টে গেছে "তেইশ" এর ভিডিওর কারনে, পুলিশ, আর্মি, বাংলাদেশ ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস এ গিজ গিজ করছে। সবাই এখন কংগো ছূটবে, ঢাকা থেকে আফ্রিকাগামী সব পাসপোর্টকে ভেরিফাই করা হচ্ছে, দুবাই এবং আবুধাবির ট্রানজিট এয়ারপোর্টেও সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিয়েছে ইন্টারপোল। ওরা খুব ভালো ভাবেই জানে "তেইশ" এই রুটে কংগো যাবো না। তাও সাবধানে আছে। ইমিগ্রেশন লাইনে দাড়িয়ে তনিমা আর রাজিব, স্পেশাল ভাবে যেতে পারতো কিন্তু তনিমা সাধারণ লাইন বেছে নিয়েছে, যাত্রি প্রোফাইলিং টা প্রাক্টিসের জন্য। মনোযোগ দিয়ে সামনের লোকটির ইন্টারভিউ শুনছে, "তেইশ" হয়তো এইভাবেই কোথাও ইমিগ্রেশন পার হচ্ছে।
- আপনার পাসপোর্ট আর বোর্ডিং পাস প্লিজ। আপনি সুইডিশ নাগরিক?
- চাকরী সূত্র। বাই দ্য ওয়ে, আমি কিন্তু এখনো বাংলাদেশের নাগরিক জন্মসুত্রে। ডুয়াল পাসপোর্ট আমার।
- সেটা কি সাথে আছে?
- বিজনেস ট্রিপে আমি ওটা ব্যবহার করিনা। বোঝেন ই তো।
- জ্বি, তো আপনি কিসে আছেন? মিশরে কেন যাচ্ছেন?
- আমি একজন সিকিউরিটি কনসালটেন্ট। মিশরে একটি তেল কোম্পানির সিকিউরিটি ডিটেইলস সুপারভাইজ করতে যাচ্ছি, সেখান থেকে সাউথ আফ্রিকা তারপরে ইতালি।
- ইতালি ও তেও আপনি কাজ করেন? রোমে আমার বড়বোন থাকে, ওখানেই সেটেল্ড।
- খুব ভালো! আমি অবশ্য সিসিলি যাবো, একটা পারিবারিক দাওয়াত আছে।
- আচ্ছা স্যার, হ্যাভ আ নাইস জার্নি।
- থ্যাংকস,, আপনার বোনের ঠিকানাটা দিতে পারেন আমি হেল্লো বলে আসতে পারি, যদি আপনি চান। আর আপনার ভাগ্নে-ভাগ্নীর জন্য ছোট গিফট ও দিয়ে আসবো। কিসে আছেন আপনার দুলাভাই? আমার বিজনেসের জন্য একজন ক্লায়েন্ট ও হতে পারেন উনি।
-অনেক ধন্যবাদ স্যার, দুলাভাই একটা ব্যাংকে কাজ করেন, এই যে ঠিকানা।
- ভালো থাকবেন।
বোয়িং ৭৩৭ আকাশে উড়াল দিল, ভোর হচ্ছে বাংলাদেশের আকাশে। বিগত ৮ ঘন্টা ঝড়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তনিমা এবং রাজীব। সন্ধ্যায় লাশ পাওয়ার পরেই, ঢাকা থেকে সেনাবাহিনীর প্লেনে তাদের কে কক্সবাজার নামিয়ে দেয়া হলো, ক্রাইম সিন এনালাইসিস এর এক ফাকে, "তেইশ" এর খুনের ভিডিও এবং তার কংগো প্লান শুনে তারা এখন ছটছে সাড়ে ৮ হাজার কিমি দূরের কংগো তে। দুবাই বাউন্ডে জ্যাকব তার টিম নিয়ে রন্ডেভ্যু করবে, সেখান থেকে কিনসাসা। ঘুম পাচ্ছে তনিমার, কিন্তু মাথার ভিতরের পোকাগুলা ঘুমাতে দিচ্ছে না।
- রাজিব, "তেইশ" কেন কংগো যাচ্ছে? আমাদের কেন জানালো? এইভাবে জানান দিয়ে কন্ট্রাক্ট কিলিং কেন করছে? ও কি চাচ্ছে আমরা কাউকে সেইভ করি ওর হাত থেকে?
- আপু,এইটা ফাজলামিও করতে পারে। আমাদেরকে কংগো নিয়ে যাচ্ছে আর নিজে দেখা গেল যাচ্ছে নাইজেরিয়। আমাদের মনোযোগ টা নষ্ট করে দিল, এই আর কি!
- হ্যা, সেটাও হতে পারে। ভাবছি সেটাই। তবে মারিয়া বলেছে, কংগোতে "এন্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং সামিট" আছে দুই দিন পরে। আমার ধারনা, "তেইশ" সেখানে আসবে। কোন ডেলিগেশন কে মারতে।
- কিন্তু সামিটে তো কড়া সিকিউরিটি থাকবে, ও কিভাবে ঢুকবে!!!
- জানি না। কিন্তু ও ব্যবস্থা করে নিবে।
এক্সকিউজ মি!!! আপনি তনিমা শাফায়েত, তাই না!!! আপনাকে অনেকবার টিভিতে দেখেছি। ওয়াও, নাইস টু মিট ইউ ফাইনালী, ইউ আর এ ট্যালেণ্টেড লেডি। আমি জিব্রিল জুনায়েদ, আসলে জিব্রাইল কিন্তু সাদা চামড়ারা ডাকে জিব্রিল, হাহাহাহাহা। যাই হোক, আমি একজন সিকিউরিটি কন্সাল্টেন্ট। সুইডিশ কোম্পানিতে আছি, মিশর যাচ্ছি। আমার কাজ ও কিন্তু সিকিউরিটি নিয়ে, এই আমার কার্ড ইফ ইউ এভার নিড মাই হেল্প। আমি কিন্তু ফ্রেঞ্চ ফরেন লিজিওনে সার্ভ করেছি ৩ বছর।
উফফ, এই সব গায়ে পড়া পুরুষ, ইমিগ্রশনে যে লোকটা ছিল সেই জন… তনিমা বিরক্ত হলেও টের পেতে দিলো না। ভালো করে দেখে নিল, ৫-৯, ৮০ থেকে ৮৫ কেজি হবে। ব্রোঞ্জ চামড়া, বোঝায় যাচ্ছে অনেক সানবার্ন এর শিকার, বডি ল্যাংগুয়েজ বলে দিচ্ছে অনেক কনফিডেন্ট মানুষ এবং নিয়মিত জিম করা দেহ।
ধন্যবাদ! ভালো লাগলো পরিচিত হয়ে। লাগলে আপনার সাথে যোগাযোগ করবো।
জ্বি, মাস্ট করবেন কিন্তু। আমার খুবি ইচ্ছা ছিল ডিটেকটিভ হবার কিন্তু বিভিন্ন কারনে তা আর হলো না। আমি আসলে "তেইশ" এর কেসটা দেখলাম খবরে, বছর তিনেক খানেক আগে "তেইশ" সুইডেনে এক্টা "ওয়েট ওয়ার্ক" করে, একটা ফার্মাসিউটিক্যালসের এর সিইও। লজ্জার ব্যাপার, আমার কোম্পানি ছিল সেখানকার সিকিউরিটি ডিটেইল। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা পার্সোনাল। শালা কে ধরতে পারলে…..! আচ্ছা আপনারা কথা বলুন আমি এক্টু ঘুম দেই, লম্বা সপ্তাহ যাবে আমার।
রাজিব অবজ্ঞার হাসি দিয়ে বললো এই লোকের পেটে তো কোন কথাই থাকে না, হেহেহেহে। কেমন সিকিউরিটি দিবে? এক্টু ঘাড় কাত করে দেখে নিলো লোকটা কে, হ্যা ঘুমিয়ে পড়েছে। নেভী ব্লু স্যুট, সাদা জামা, লাল টাই, অনেক টা সেই হিটম্যান গেইমস এর মতো। আব্বু, ভাইয়ার প্রিয় গেইমস ছিল, এজেন্ট ফোর্টি সেভেন এর অন্ধ ভক্ত ছিল ওরা। ছোট বেলা থেকে এগুলা দেখেই বড় হয়েছে, তাই গোয়েন্দা চাকরী বেছে নিতে চিন্তা করা লাগে নাই। কেমন আছে আব্বু, আম্মু, ভাইয়া, ভাবি, বাবুরা? ওপাড়ে যেয়ে কি আমার কথা ভুলে গেছে? আমাকে কি ভাবে? আমাকে কেন নিল না সাথে? ১২ বছর ওদের কে ছাড়া কাটাচ্ছি, আমাকে ফেলে ওরা যেতে পারলো? চোখের পানি টা হালকা করে মুছে নিয়ে আবার ফাইলে ডুবে গেল তনিমা, রাকেশের ফাইল যেটা " তেইশ" তাকে দিয়েছিল।
~ (চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



