দুবাই এয়ারপোর্ট! বেশ কড়া সিকিউরিটি, অন্যবারের তুলনায় একটু বেশীই।জ্যাকব ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে আছে সাথে ৩ জন নতুন মুখ, আগে দেখছে বলে মনে পড়ছেনা।ইমিগ্রেশন পার হতেই জিব্রিল জুনায়েদ এর সামনে পড়লো, “মিস তনিমা, সুইডেন আসলে জানাবেন কিন্তু! গুডবাই, আমার প্লেন ৪৫ মিনিট পরেই ছাড়বে না হলে কফির নিমন্ত্রণ দিতাম”। “উফফফ, আপদ বিদায় হলো”, টাটা দিতে দিতে ভাবলো তনিমা। এর মাঝে হাল্কা ব্রিফিং করে নিল তনিমা আর রাজীব, ট্রানজিট টাইম ৩ ঘণ্টা, স্পেশাল প্লেন চেয়েছিল কিন্তু পায় নাই। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু নাই করার।
- আপু, আমি একটু ওইদিক থেকে আসছি!
- হেহেহেহে, ডিউটি ফ্রি মদের দোকান এর দিক থেকে!!
- ধুর আপু, তুমি না খালি...
হাসতে হাসতে রাজীব চলে গেল, তনিমা অনেক বার দুবাই তে এসেছে, মুখস্থ প্রায়। একটি বুকশপ আছে, প্রায় ই সেখান থেকে ৫/৬ টা বই কেনে, দোকানী মেয়েটাও চেনে তাকে, সেই দিকে পা দিল। বুম! বুম!! বুম!!! পুরা এয়ারপোর্ট হাল্কা বিস্ফোরন আর সাথে সাথেই পিলে চমকানো ফায়ার এলার্ম এ কেপে উঠলো। প্রথমে ভাবলো এটা ড্রিল, কিন্তু মাইকিং শুরু হলো ৩ টা টয়লেটে আগুন ধরেছে, তার গোয়েন্দা ইন্সটিংক্ট নড়ে উঠলো। দৌড়ে প্রথম টয়লেটের কাছে চলে গেল, এটা পুরুষ টয়লেট ভিতর থেকে লোক জন প্রানের ভয়ে ছূটে বার হচ্ছে। দৌড়ে ঢুকে গেল তনিমা, কেউ ভিতরে আটকে আছে কিনা। নাহ, কেউ ছিলনা।
দমকল কর্মী রা চলে এসেছে এরই মাঝে ৫ জন কে আহত অবস্থায় বার করেছে ২ জন নারী আর তিন জন পুরুষ। আহতদের মাঝে জিব্রিল জুনায়েদ কে খুজে পেল, অজ্ঞান অবস্থায়।তার পাশের বুথে বোমা টা ফেটেছে, ইম্প্যাক্ট এ ছিটকে পড়েছে, বেশ ব্যাথা পেয়েছে কিন্তু জীবনঘাতী না, ডক্টর রেকম্যান্ড করছে ফুল বডি চেক, কোন ইন্টারন্যাল ব্লিডিং হচ্ছে কিনা।প্রাইমারি মেডিসিন কেয়ার দিয়ে ছেড়ে দেয়া হল সবাইকে। জিব্রিল এর জ্ঞান ফেরেনি এখনো, তনিমার প্লেনের টাইম বাকী দেড় ঘন্টার মত। বোম্ব স্কোয়াড এনালাইসিস করে ফেললো, ঘরে বানানো বোম, খুব একটা শক্তিশালী না।
“আমাদেরকে ডাইভার্ট করার জন্য এটা করেছে”। জ্যাকব বলে উঠলো। “তার মানে “তেইশ” আমাদের সাথেই দুবাই মেনেছিল, অতিরিক্ত সিকিউরিটি দেখে এই ব্যবস্থা করেছিল”।
“কিন্তু বোমা নিয়ে দুবাই তে নামলো কিভাবে”? তার মানে কি ওরসাথে টিম আছে, যারা ওকে সাপোর্ট দিচ্ছে? তনিমার প্রশ্ন।
“হতে পারে দুবাই এ ওর টিম আছে, ওদের কে ম্যাসেজ দিয়েছে ওরা হেল্প করেছে”। রাজীব সহমত জানালো।
-আমার ফ্লাইট!! আমার প্লেন ছেড়ে দিয়েছে? কান্নার মত বলে উঠল জিব্রিল!
- আপনি প্রানে বেঁচে আছেন তাই না কত? কি হয়েছিল মনে আছে কিছু?
- বাথরুমে একটু বসে ছিলাম, আর তার কিছু পরেই বিকট আওয়াজ। আর কিছুই মনে নাই! কি হলো? বোমা মেরেছে নাকি !!
-“কেন? আপনি না সিকিউরিটি এক্সপার্ট! কি মনে হয়?” টিপ্পনী মেরে দিল রাজীব।
- আমার তো পুরা সিডিউল পালটায় দিল যে হারামজাদারা এই কাজ করলো, এখন নেক্সট ফ্লাইট কখন কে জানে? আপনারা কোঁথায় যাবেন? আমাকে মিশরে ড্রপ দিতে পারবেন? অস্থির ভাবে জিব্রিল জানতে চাইলো।
-মিঃ জিব্রিল আমরা কংগো যাবো!!আমাদের সাথে যেয়ে হবে না আপনার। তনিমার ঠান্ডা জবাবে চুপ মেরে গেল, কি যেন ভাবলো কিছুক্ষন! “আচ্ছা!! ধন্যবাদ, দেখি অন্য কোন ভাবে যাওয়া যায় কিনা, ভালো থাকবেন”,বলে হাটা দিল জিব্রিল।
প্লেনে বোর্ডিং করার সময়ে, দেখলো জিব্রিল মুখ শুকনা করে সুদানের প্লেনে যাচ্ছে, “যাক কাছাকাছি দেশ এই যাচ্ছে”, ভেবে সামনে এগিয়ে গেল তনিমা।
প্লেনে বসে ফাইল টা আবার হাতে নিল, ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না, রাকেশ শেঠ এর আসল পরিচয় জগজিত আগারোয়াল!! বিখ্যাত হীরা ব্যবসায়ীর আড়ালে সে এক ঘৃন্য মানব পাচারকারী আর সেক্স স্লেভ ব্যবসায়ী।এই লোক এতদিন কিভাবে আড়ালে ছিল! এর নামে ইন্টারপোল এ লেভেল ফোর এর এলার্ট আছে। মাঝ খান থেকে উবে গিয়েছিল, তাহলে এই ভাবেই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ছিল রাকেশের নামে নিজেকে বিশ্বে পরিচয় তুলে দিয়েছিল। তাহলে এই লোকের ব্লাড ডায়মন্ডের কাহিনী সত্য! আসলেই সে বিভিন্ন দেশে খুন, মানব পাচার এগুলার সাথে জড়িত। কিন্তু “তেইশ” এর সাথে লাগলো কেন?
-আচ্ছা আপু!! এর নাম ‘তেইশ’ কেন? দুনিয়াতে কি নামের অভাব পড়ছে? “তেইশ” কি এমন কাহিনী? রাজীব ফাইল থেকে মুখ ঊঠায়ে জানতে চাইলো
- এই নাম্বার টা ওর কাছে গুরুত্বপুর্ন!কিছু একটা মিনিংফুল!রাকেশের প্রতি ওর একটা আক্রোশ ছিল, খুনের ধরন ই বলে দিচ্ছে।এই ভাবে সে খুন খুব কম ই করেছে, ইনফ্যাক্ট ...
কথা থামিয়ে দ্রুত ‘তেইশ’ এর ফোল্ডার ওপেন করলো ল্যাপটপে, ওখানে ৪৫ টা কেইস ফাইল স্ক্যান করা আছে, ডিটেইলস ফাইল। ১৫ মিনিট ঘাটাঘাটির পরে কাপা কাপা গলায় বললো, “রাজীব, ‘তেইশ’ প্রতিশোধ নিচ্ছে, এটা কোন কন্ট্রাক্ট না, এটা পার্সোনাল।” এই দেখো ৩ টা কেইস ফাইল পেয়েছি সেইম ভাবে খুন করেছে, হাতের আঙ্গুল কব্জি কেটেছে, পা গুড়িয়ে দিয়েছে, এবং প্রত্যেকের শরীরে ৫ টা করে ক্ষত বানিয়ে লাশগুলাকে উল্টা করে ঝুলিয়ে রেখেছিল, তারা রক্তক্ষরনে মারা গিয়েছিল।
-তার মানে কংগো তে কেউ আসবে যাকে ‘তেইশ’ খুজে বেড়াচ্ছে অনেক দিন থেকে।
- হুম, সেটাই আমার ধারণা!আমার বাবা সবসময় একটা কথা বলতেন, আমার ভাইয়ের সাথে আমার মিল দেখে, “দুই এর পিঠে তিন যেমন, তোর ভাইয়ের পিঠে তুই তেমন।
- মানে কি, আপু!
- জানি না রাজীব! আব্বা কে জিজ্ঞাস করতাম কিন্তু হেসে উড়িয়ে দিত আব্বা।ভাইয়া কে বলেছিল এটা জানি।বলেছিল, তুই গোয়েন্দা হবি যেদিন সেদিন বলব। সেই সুযোগ টা আব্বা আর পেল না।
কান্নায় কেপে ঊঠলো তনিমা, রাজীব অপ্রস্তুত ভাবে তাকিয়ে থাকলো, এইখানে স্বান্তনা দেয়া খুব ই কঠিন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো, নীল আকাশের সাদা মেঘপুঞ্জি দিয়ে প্লেন তা ছূটে চলেছে, একটা খারাপ কিছু প্রতিরোধ করতে।তাদের উপর নির্ভর করছে একজন খুনি কে ধরার, কিন্তু সেই জন্য কি আর একজন খুনি বেঁচে যাবে?ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ করে ফেললো রাজীব।প্লেন কিনসাসা তে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গভীর রাত কংগোর আকাশ সীমাতে, একটা ছোট্ট চার্টারড প্লেন ঢূকলো। দুই জন যাত্রী নিয়ে পাইলট প্রাইভেট ট্রার্ন্সপোর্ট দিচ্ছে। লোকাল ভাষায় কিছু একটা বলতেই পাইলট মাটির দিকে ডাইভ দিল প্লেন টি নিয়ে, ২৫০০ ফুটে আসার সাথে সাথে দুই যাত্রী লাফ দিল প্লেন থেকে, প্যারাসুট নিয়ে। একটি কৃষি ক্ষেতে নামলো দুইজন, কিছু একটা আলোচনা করে, কিছু বিনিময় হলো তারপর দুই জন ভিন্ন দিকে হাটা দিল! বেশী দূর যেতে না যেতেই, একজন ঘুরে দাড়ালো সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল হাতে নিখুত ভাবে গুলি মেরে নিজের মত হাটা দিল।
২ দিনের এন্টি হিউম্যান ট্রাফিকিং সামিট খুব ভালো ভাবেই শেষ হলো। একটা টায়ার ও ফাটেনি। একরাশ বিরক্তি নিয়ে বসেছিল তনিমা, বনের মোষ তাড়ালো ওকে দিয়ে ‘তেইশ’!!! জাস্ট ফালতু ভাবে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরালো।পুরা টিম ই আপসেট, কিভাবে নাকানী-চুবানী খেল।
হোটেলের সুইমিং পুলে ভেসে ভেসে ভাবছে তনিমা, কি ব্যাপার? কোথায় ভুল হলো ? ‘তেইশ’ ভুল ভাবে তাদের ঘোল খাওয়ালো নাকি এর পিছনে অন্য কোন ব্যাপার ছিল। সুইমিং পুলের শেষ মাথায় জলকেলী করছে রবার্ট ব্রাউন ম্যাকেঞ্জি, আমেরিকান ধনকুবের, এই পুরা সামিট এর পিছনে এর অবদান, আর অনেক পুরুষ্কার ও পেয়েছে মানবপাচার এবং সেক্স স্লেভ বন্ধের ব্যাপারে কাজ করেছে। ম্যাকেঞ্জি কে অনেক আগে থেকেই চেনে তনিমা, পুরান পাপী! হারামী টা ভাইয়া যে কোম্পানী তে কাজ করতো সেটা তে করপোরেট এস্পানিওজ করতে অফার দিয়েছিল, ভাইয়া রাজি হই নাই। কত ঝামেলা দিয়েছে আমাদের ফ্যামিলিটা কে। হারামী টা কি আমাকে মনে রেখেছে? এগিয়ে গেল কথা বলতে।
দুইজনের অগোচরে, ২৫ তলা থেকে কোন এক জানালা দিয়ে, শ্বাপদের মত তাকিয়ে আছে একজোড়া চোখ! সুইমিংপুলে শিকার ঘুরে বেড়াচ্ছে কিন্তু আক্রমনের সুযোগ পাচ্ছে না। চারপাশ থেকে বডিগার্ড ঘিরে আছে সবসময়, একগুলিতে ই খেলা শেষ করা যাবে, কিন্তু সেটা তো এক দানেই শেষ। পালের গোদা র জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে শ্বাপদ চোখের মালিক। আজকে রাতেই একটা ব্যবস্থা করা লাগবে।
পুরা কিনসাসা তে পাগলাঘণ্টী বেজেই চলেছে! রবার্ট ব্রাউন ম্যাকেঞ্জি নিখোঁজ, তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, সাথে পাওয়া যাচ্ছে না তনিমা শাফায়েত কেও। রাত ১০ টার দিকে একসাথে নাইটক্লাব থেকে বার হইয়েছিল দুইজন, কিন্তু হোটেলে আসার পথে তাদের ৪ জন বডিগার্ডকে গাড়ী বোমা দিয়ে মেরে, দুইজন কে তুলে নিয়ে যায় কোন এক বা একাধিক অজ্ঞাতধারী। রাস্তার ক্যামেরা গুলা নষ্ট করে রাখা ছিল আগেই, জানতো তাদের ফেরার রুট।
কিনসাসা থেকে ৬ কিমি দুরের একটা ফার্মে জ্ঞান ফিরলো তনিমা এবং ম্যাকেঞ্জির। চোখ, হাত পা বাধা। “রাইজ এন্ড সাইন, ডার্লিংস! রাইজ এন্ড সাইন!!” লেট দ্য শো বিগিন!!
- কেমন আছেন তনিমা! আপনার সংগী হিসাবে আমি এনেছি রবার্ট ব্রাউন ম্যাকেঞ্জি কে! তার পাপের বর্ননা গুলা শুনে যাবেন এবং তাকে বিচার এর ব্যবস্থা করবেন।অবশ্য আমার হাত থেকে যদি তাকে ছাড়াতে পারেন, হাহাহাহাহ।
- ‘তেইশ’, আপনি খুব ভুল করছেন এইভাবে একজন ইন্টারপোলের গোয়েন্দা কে তুলে নিয়ে এসে। আপনি ধরা দিন, ম্যাকেঞ্জি কে আমরা বিচার করবো। এইভাবে কত দিন বেঁচে থাকবেন।
- বিচার আপনারা আপনাদের ভাবে করবেন, কিন্তু আমার বিচার আমিই করে যাচ্ছি আমার মতো করে, আমার বাবা-মা-স্ত্রী এবং ২ বাচ্চাকে আমার সামনে মেরে ফেলেছে এই ইতরের ভাড়া করা বাহিনী।ঠিক যেভাবে ওদেরকে মেরেছে আমি সেইভাবেই এদের কে মেরেছি। ওদের লাশ কে ঝুলিয়ে রেখেছিল আর দেখছিল কিভাবে ওরা মারা যায়, আমাকে রেখেছিল শেষ পর্যন্ত দেখার জন্য। তারপরে আমাকে গুলি করে মেরে পাথর বেধে পানিতে ফেলে দিয়েছিল।
শশ্মানের মত নিরবতা ভেদ করে অপার্থিব, অমানূষিক চিৎকারে কেপে ঊঠলো তনিমা বেশ কয়েকবার! ম্যাকেঞ্জি কে কি মেরে ফেলছে ‘তেইশ’ ? নাকি ওকেও একই ভাবে টুকরা টুকরা করছে!! ঘৃনা, ক্ষোভে পাগলের মত হাত-পায়ের বাধন খুলতে চাচ্ছে, কিন্তু লাভ হচ্ছে না। চিৎকার একসময়ে গোঙ্গানি তে পরিনত হলো, চোখের উপর থেকে বাধন সরে গেল। রক্তাক্ত অজ্ঞান ম্যাকেঞ্জির ভাংগাচোরা, ক্ষত বিক্ষত দেহ সামনের চেয়ারে বাধা, স্লেজ হ্যামার দিয়ে পা গূড়া করে দেয়া, হাতের আঙ্গুল আর কব্জি মাটিতে পড়ে আছে। দূর থেকে পুলিশের সাইরেন শোণা যাচ্ছে!
- তুমি পালাতে পারবেনা ‘তেইশ’। তোমাকে ধরে ফেলবে, ওরা আসছে।
- আমার কাজ শেষ, তনিমা! ভালো থাকবে।আবার দেখা হবে কোন একদিন, কিনসাসা বিমানবন্দরের ৩৭ নাম্বার লকারে একটা গিফট রেখে গেলাম। আশা করি কাজে লাগবে।
কিছুক্ষনের নীরবতা, “দুই এর পিঠে তিন যেমন, আমার পিঠে তুই তেমন” মুখের মাস্ক টা খুলে সামনে দাড়ালো ‘তেইশ’।
কান্নাভেজা অবাক চোখে তনিমা তাকিয়ে দেখলো তেইশের চলে যাওয়া, তনিমার যেন শত বছর অপেক্ষার শেষ হলো এই কথা গুলা আবার শোনার মাধ্যমে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



