#রিটার্ন_অব_তেইশ
১.
জীবনের কিছু সময় থাকে ডিসিশন নেবার। কিন্তু সেই ডিসিশন নেবার পারিপার্শিকতা আমাদের জানা থাকে না, বা সেই ক্ষমতা থাকেনা নিজের মতো করে সেই সিধান্ত নেবার। তনিমার সামনে সেই রকম একটা মুহুর্ত। মিউরো এর থ্রেট খুবই বাস্তব সম্মত, ফাইল ওদের হাতে সুতরাং হোস্টেজ বাচিয়ে রাখার কোন যুক্তি নাই। মার্টিন না মারিয়া? কাকে বাচাবে? অথবা কাউকেই কি সে বাচাতে পারবে কি? ফোনের শব্দে সম্বিত ফিরে ফেলো তনিমা, মিউরোর সেলফোন বাজছে, ভিভালডির “উইনটার” !! আহ!! ভিভাল্ডির “উইনটার”... আত্মার সম্পর্ক এই সুরের সাথে, প্রতিবার হাই লেভেল স্টেকআউট গুলাতে ফুল ভলিউমে ভিভাল্ডি, বাখহ, যিমারম্যান এর সিম্ফোনী বাজতো। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, সেই সুর আজকে বিস্বাদ লাগছে, কারন এটা মৃত্যু পরোয়ানার সুর তাঁর দুই প্রিয় মানূষের কোন একজনের!
---- হ্যাভিয়ের!!! ……..আহ!!! ইউ আর আ জিনিয়াস মাই বয়!! ইউ আর দ্য আইনস্টাইন অফ হ্যাকিং! হা হা হা হা হা। আমি জানতাম তুমি পারবে, তোমার সার্ভিস আমাকে কখনোই নিরাশ করে নাই। শুভকামনা, ১ মিনিট পরে তুমি ৫ মিলিয়ন ডলারের মালিক হতে যাচ্ছ।
দরজায় দাঁড়ানো একজনের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারা করলো, লোকটা চলে গেল। এটাই সুযোগ, রুমে মিউরো আর একজন বডি বিল্ডার দুইজনকে সে কাবু করতে পারবে, যদিও যে ধকল গেছে, একটু কঠিন হবে,।
---- আমি জানি, তুমি কি ভাবছো তনিমা !!! তুমি যদি ভাবো আমি নিতান্তই একজন ছা পোষা প্রানীবিদ আর আমাকে এবং আজমভ কে তুমি কাবু করতে পারবে, তাহলে ভুল করবে। তোমাকে জানাতে চাচ্ছিলাম, আমি মাদার রাশিয়ার জাতীয় পর্যায়ের তাইকোয়ান্দ প্রতিযোগিতার তিন বারের গোল্ড মেডেলিস্ট। সুতরাং, বুঝে পা ফেলবে। হা হা হা হা হা।
---- কাজের কথায় আসি তনিমা, আমরা 15398T ক্র্যাক করেছি। স্যাম্পেন এনি ওয়ান? নো? আহ পার্টী পুপারস!!! কিন্তু প্রশ্ন হলো, জানাইএস্কি কোথায়!!!! আর মাই ডিয়ার তনিমা, ইউ ক্যান সেইভ অনলি ওয়ান। হা হা হা হা হা… ইউ সুড হ্যাভ টেকেন মাই অফার আরলিয়ার…… আমার ৫ মিলিয়ন বেচে যেত, তোমরাও বাচার সুযোগ পেতে পারতে। নাও চুজ, লাভ!! কাকে বাচাবে?
তনিমার মনে হচ্ছিল একটা চিৎকারে সে যদি সব কিছু ছারখার করে দিতে পারতো!! কিন্তু সে পারছে না। তাকে চূড়ান্ত এক পরিক্ষা দিতে হবে, মারিয়া না মার্টিন!! মার্টিন মাথা নিচু করে আছে! কাপছে!! আহা রে, এই মানূষ টাকেও এরা মেরেছে? এত নরম মনের মানূষ!! কারো সাথে কখনো চিল্লাতে দেখে নাই, বিনয়ী একটা ভদ্রলোক! মারিয়া, এই মহিলা তাকে যে আদরে ৭ বছর রেখেছে অনেকটা মায়ের অভাব পুরন করার মত করে। একে কিভাবে মরতে দেই আমি!! কান্না থামাতে পারছিল না তনিমা, শয়তান মিউরো খুব ই আনন্দের সাথে উপভোগ করছে এই মুহুর্ত গুলা।
---- শোনো মেয়ে!! তাকাও আমার দিকে!! আমার এক পা কবরে চলে গেছে, আমার কাছের বলতে কেউ বেঁচে নেই। ৭ বছর আগে তোমাকে পেয়ে, আমি আমার জেসিকার খালি স্থান টা পুরণ করেছিলাম, তোমার সুখ আমি বেচে থাকতে হারিয়ে যেতে দিবো না! মিউরো, ভানাটু দ্বীপেরপুঞ্জের আসানভারী বে এলাকায় খোজ নাও!।।
---- না!!! মারিয়া !!! না……
---- …… তনিমা আর মার্টিন কে ছেড়ে দাও! তোমার দেয়া কথা রাখো…… আর আমাকে তনিমার সামনে মারবে না। ওদের কে আলাদা রুমে নিয়ে যাও।
.
---- উইথ প্লেজার, আজমভ!!! মিস তনিমাকে সরিয়ে নিয়ে যাও। আর তিন টা কফিন রেডি করতে বলো। আর সরি মারিয়া, আমি একটু মিথ্যা বলেছি।
তনিমার সামনেই মারিয়ার দুই চোখের মাঝে ৯ মিলিমিটারের একটা গুলি ঢুকে গেল, তাঁরপর, বন্দুক টা তাক করলো মার্টিনের দিকে। আজমভ এর হাত থেকে ছাড়া পাবার জন্য শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করলো তনিমা, কিন্তু ৬ ফুট ৭ ইঞ্চির সাথে কোন ভাবেই পেরে উঠলো না। রুম থেকে বার হতে হতেই দুই রাউন্ড গুলির আওয়াজ পেল তনিমা!
২.
বন্দী রুমে যাবার পথে একটা হলওয়ে আছে। সেখানে অনেক গুলা জানালা আছে, এবং তনিমা খেয়াল করলো সেখানে কোন গ্রীল নাই, হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
---- প্লিজ, আমি আর পারছিনা। আমাকে হেল্প করো, প্লিজ। আমকে একটু পানি দিবে আমাকে?
---- না! কোন পানি না। নিজের রুমে যাবে ওখানে আছে পানি। উঠো।
---- নাহ, প্লিজ আমি পারছিনা, প্লিজ….
আজমভ, তনিমা কে টেনে তোলার জন্য একটু নিচু হলো, আর সেই সু্যোগে, হিংস্র শ্বাপদের থাবার মত ডান হাতের একটা আপার কাট বসালো ঠিক চোয়ালের নিচ, আচমকা ঘূষি টা আশা করেনি দৈত্যটা। কেপে উঠলো, কয়েক পা পিছিয়ে সোজা হতে চেষ্টা করছে, এক লাফে উঠে কানের নিচে আরো দুইটা ঘূ্ষি বসায়ে দিল। আর শরীরের শক্তি দিয়ে একটা লাথি দিল দুই পায়ের মাঝে। প্রায় ৭ ফূটের ১৪৫ কেজির শরীর টা ধপাস করে ভূপাতিত হলো। তনিমা, এগিয়ে এসে ঘাড় টা চেপে ধরে মোচড় দিল বাকী শক্তি দিয়ে, মচাৎ একটা হাল্কা আওয়াজ হলো এবং আজমভ নিথর ভাবে পড়ে থাকলো।
পিছনে যেতে গিয়ে থমকে দাড়ালো," নাহ! ওখানে ফেরত যাবার কিছু নাই। মার্টিন, মারিয়া দুই জনই মারা গেছে, ও দৃশ্য তার ভালো লাগবে না। হাস্যজ্জোল মানুষ দুইটা লাশে পরিনত হয়েছে। "পালাতে হবে আমাকে", প্রতিশোধ!! এর বদলা নিতে হবে। জানাইএস্কি কেও বাচাতে হবে, না পালাতেই হবে।
হলওয়ের জানালা দিয়ে নিচে থাকালো, বেশ উচু! কম পক্ষে ৫০ ফিট! এর পরেই বরফের আস্তর। যদি পাথর থাকে? খাদ? নাহ!! ভাবার টাইম শেষ, আজমভের কোমড় থেকে ব্যারেটা ৮৭ আর ২ টা ম্যাগাজিন নিয়ে নিল। পিছনের হলওয়ে তে গলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আর ভাবার সময় নাই, বাইরে ভংয়কর তূষারপাত হচ্ছে, শেষবারের মত প্রিয় মুখগূলো কে মনে করে, জানালার কাচ ভেংগে লাফ দিলো তনিমা।
৩.
---- আমাকে ছেড়ে দাও। আমি কিছু জানি না। আমি সত্যি কিছু জানি না। আমি শুধু ট্রাক ঠিক করে দিয়েছি।
---- কোথায় গেছে সেই ট্রাক? আর কে কে ছিল?
---- আমি জানি না!
---- লাহসা গংগার বিমান বন্দর এর পাশেই তোমার ব্যবসা। তোমার কাছ থেকে ট্রাক ধার নিয়েছিল কারা? ওইটা তোমার ই ট্রাক ছিল তাই না!! কোথায় গেছে সেটা? বাচতে চাইলে বলে ফেলো
---- আমি জানি না, ল্মপু লামা ট্রাক টি চালিয়েছে কিন্তু ওকে ও খূজে পাওয়া যাচ্ছে না।
---- ল্মপু, মারা গেছে। যাদের কে তুমি ট্রাক ভাড়া দিয়েছিলে তারাই মেরেছে। আমি জানি তোমার পপি চোরাচালান এর কথা। কে তোমাকে হেল্প করছে সেটা বলো?
---- কৈলাশ জানে, ওকে জিজ্ঞাস করো। ওই বাজারেই ওর দোকান, ল্মপু ওর ভাই, ও জানবে।
চীন তিব্বতের সীমান্তের কোন এক শহরের জীর্ন একটা ফ্ল্যাট থেকে কিছুক্ষন পরপর ই আর্তচিৎকার এবং কান্নার আওয়াজ পাচ্ছিল প্রতিবেশিরা। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলে নাই বা দেখতেও আসে নাই। কৈলাশের খোজে বার হয়ে গেলাম। গত তিনদিনে আমি প্রায় ৬ হাজার মাইল পাড়ি দিয়েছি। কাজ টা ভালোভাবে শেষ করা লাগবে। কোন সলিড লীড পাচ্ছিলাম না। তবে যেদিন জানলাম, ইন্টারপোল এজেন্ট মারিয়া কে কিডন্যাপ করা হয়েছে তখন ই আমার কাজ টা শুরু। আমার সোর্স থেকে খোজ পেলাম বিস এর ডিডি তনিমা ও নিখোজ। "সিনিস্টার সিন্ডিকেট" এর কাজ কোন সন্দেহ নাই। আগেই সাবধান করেছিলাম, শোনে নাই। কিন্তু মেয়েটা কে বাচাতেই হবে সাথে ওই মহিলাকেও। ওই ভিতুর ডিম থেকে খবর পেতে ১০ মিনিট লাগলো,পুমোরি পাহাড়ের পাশের গ্রামে। এখন ছূটে যাচ্ছি সেই গ্রামের দিকে।
প্রায় ১৫ দিন হয়ে গেছে তনিমা নিখোঁজ আছে। বেচে আছে কিনা সেটাও প্রশ্ন। এই গ্রামের কোথাও কি আছে মেয়েটা। তাপমাত্রা জিরোর কাছে গতকয়েক দিন ধরেই তুষারপাত হচ্ছে। এলাকার লোক জনের কাছ থেকে জানতে পারলাম ২০০০ ফিট ওপরে একটা মঠ আছে সেখানে নাকি ল্মপুর ট্রাক যেতে দেখেছে কিন্তু ফিরে আসে নাই, ২ দিন হলো এই ঘটনা হয়েছে। মঠের গেটে আবার গার্ড থাকে? জানতাম না। ২ জন পাহারা দিচ্ছে, একজন গেটের সামনে, অন্যজন পায়চারী করছে। আগে পায়চারী করা গার্ডেকে মারতে হবে, তারপর মেইন গেটের।
মানুষ কে মারা খুব একটা কঠিন ব্যাপার না, এই যে আমার ফাইবার ওয়ার, সামান্য একটা তার, কিন্তু ঠিক ভাবে গলায় চেপে বসিয়ে টান দিলে মিনিটের মাঝে খেল খতম। আমার খুব বিশ্বস্ত বন্ধু, কখনো আমাকে হতাশ করেনি, আজও না। পায়চারী করা গার্ডের পিছন থেকে গলায়ে বসিয়ে টেনে ধরে রাখলাম, বেচারা আওয়াজ ও করতে পারলো না। কিছুক্ষন হাত-পা ছুড়লো আর স্থির হয়ে গেল। দ্বিতীয় জন? ওকে ঘায়েল করতে আমার প্রিয় হার্ডবলারের একটা রাউণ্ড ই যথেষ্ট ছিল। এখন কাজ হল, লাশ দুইটা কে চাপা দেয়া আর এদের জামা পড়ে ভিতরে ঢোকা।
৪.
ঘরের ভিতরে সব চুপচাপ! একটু বেশি নিরবতা! বাইরে ঝড়ো ভারি বাতাসের সাথে তুষারপাত হচ্ছে। ফিস ফিস করে কথা বলছে কারা যেন। হাতে পায়ে বেশ ব্যাথা, মাথা টাও বেশ ভারী লাগছে। আবছা আলোতে বোঝা যাচ্ছে না কতজন এর মাঝে আমি শুয়ে আছি। ওরা আমাকে খুজে পেয়েছে? পালাতে পারি নাই আমি?
---- তুমি ইন্ডিয়ান?
“হিন্দি তে কথা বলছে? আমি কোথায়? আমি কি ইউরোপে না!!!! কারা এরা। দেখে তো এশিয়ান, চাইনিজ লাগছে।”
---- তুমি ইন্ডিয়ান?
---- নাহ! আমি বাংলাদেশী! আমি কোথায়!
---- তুমি তিব্বত আর নেপালের সীমান্তের গ্রামে পুমোরি পাহাড়ের কাছে। তুমি ৪৮ ঘন্টা ধরে অজ্ঞান ছিল, ওরা তোমাকে খুজছে তাইনা!!! কারা ওরা? কেন চাইছে তোমাকে? তোমাকে আমি একটা খাদের ধারে পড়ে থাকতে দেখেছিলাম, না হলে কাল রাতেই নেকড়ে গুলা তোমাকে ছীড়ে খেতো।
---- প্লিজ আমাকে বাচাও! ওরা আমার স্বামী এবং শ্বাশুড়িকে মেরে ফেলেছে। আমার স্বামীর সম্পত্তি নিজের নামে করতে চেয়েছিল, না পেরে ওদের মেরে ফেলছে। আমাকেও মেরে ফেলবে। দেখো আমাকে কত মেরেছে?
---- চিন্তা করো না, ওরা চলে গেছে। আর আসবে না।
---- আমার ফোন করা দরকার, কোথায় পাবো?
---- নিচের গ্রামেই আছে, কিন্তু এখন তো অনেক ঝড় কিভাবে যাবে?
---- আমার যেতেই হবে, না হলে ওরা আমার বাবাকেও মেরে ফেলব, প্লিজ আমার সাথে কাউকে দাও।
---- তুমি সন্তু কে নিয়ে যাও।
বিশ্বকাপানো ঝড়ের মাঝ দিয়ে তনিমা এগিয়ে যাচ্ছে, সন্তু খুব অবাক হয়ে দেখছে। এই বিদেশি মেয়ে টা এত সাহস কেন? আমরাও এই ঝড়ে বের হতে ভয় পাই, আর সে বীর দর্পে আগিয়ে যাচ্ছে। ১৫ মিনিটের রাস্তা পার হতে লাগলো প্রায় এক ঘন্টা। ফোনের দোকান বন্ধ, দোকানী কে ডেকে তোলা হলো। এই সময়ে কাস্টমার দেখে অবাক ই হলো, সিগ্ন্যনাল খুবি দূর্বল। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা নয়, করুনা চাইলো, মেসেজ টা যেন পায়, আমার তো সবই কেড়ে নিয়েছো। একটা বার তোমার মহানুভবতা দেখাও, আমাকে না বিশ্বের মানূষ কে। খুবই দুর্বল ভাবে কানেক্টিং সিগন্যাল দেখালো, তনিমা এক নিশ্বাসে উচ্চারন করলো
---- কন্ট্রোল! সেভেন ওমেগা থ্রি ফক্সট্রট নাইনার বেটা। যিউস ইন ট্রাবল, ওলিম্পাস আন্ডার এটাক। মাদার হ্যাজ ফলেন।
(~চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ১২:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



