somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর আলম হিরণ
ভাগ্যক্রমে আমি এই সুন্দর গ্রহের এক বাসিন্দা! তবে মাঝেমধ্যে নিজেকে এলিয়েন মনে হয়। তবে বুদ্ধিমান এলিয়েন না, কোন আজব গ্রহের বোকা এলিয়েন! [email protected]

ভয়েজার-১ অনন্ত মহাবিশ্বে ছুটে চলা এক পরম বন্ধুর নাম।

১৭ ই আগস্ট, ২০১৮ সকাল ১০:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ভয়েজার-১ নামক স্পেসক্রাফটটি পৃথিবী ত্যাগ করে ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে।
৪০ বছর কেটে গেছে। ৮২৫ কিলোগ্রাম ওজনের ভয়েজার-১ আর পৃথিবীর মধ্যকার দুরত্ব এখন প্রায় ১৪ বিলিওন মাইল!
'লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ'এর সবচেয়ে বড় উদাহারণ হয়ে ভয়েজার-১ এখনো পৃথিবীর মানুষের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছে!
ভয়েজার বৃহষ্পতি গ্রহকে অতিক্রম করেছে ১৯৭৯ সালে। যাত্রাপথে সে আমাদেরকে পাঠিয়েছে বৃহষ্পতির ছবি। আমরা দেখেছি দানবগ্রহ বৃহষ্পতির বুকে ১৮৮ বছর ধরে বয়ে চলেছে এক দানবঝড় - দ্যা গ্রেট রেড স্পট। এই ঝড়ের আয়তন তিনটা পৃথিবীর সমান!
ভয়েজার-১ শনি গ্রহ অতিক্রম করে ১৯৮০ সালে। ভয়েজার আমাদেরকে জানিয়েছে শনিকে প্রদক্ষিণ করছে আরো অনেকগুলো বরফের তৈরী চাঁদ!
ভয়েজার তাঁর সর্বশেষ ছবিটি তুলেছিলো ১৯৯০ সালের ভালোবাসার দিবসে। অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারিতে। সর্বশেষ এই ছবিটি ভয়েজার তুলেছিলো কার্ল স্যাগান নামক একজন খেয়ালী বিজ্ঞানীর অনুরোধে।
'কার্ল স্যাগান' নামটি ভয়েজার-১এর সাথে মিশে আছে একটু ভিন্নভাবে। সংক্ষেপে বলা যাক।
ভয়েজার ১ তৈরির কাজ তখন প্রায় শেষ। নাসা দ্রুত ভয়েজারকে অনন্ত মহাশূণ্যের উদ্দেশ্যে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
৪০ বছর বয়েসী কার্ল স্যাগান তখন ভাবলেন একটা ভিন্ন ব্যাপার। তিনি ভাবলেন, এই স্পেসক্রাফটটি তো চলতেই থাকবে। এর গতি কমবে না, বরং বাড়বে। এক সময় এটা আমাদের সৌর জগতকে ছেড়ে চলে যাবে। হয়তো ছেড়ে যাবে আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথকেও। এমনও সময় আসবে যখন ভয়েজার থেকে আমাদের দূরত্ব হবে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ। এই দূরতম বন্ধুর সাথে আমাদের আর কোনো যোগাযোগই তখন থাকবেনা। কে বলতে পারে এই ভয়েজার কোনোদিন কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর দেখা পাবে না!
কী হবে যদি কয়েক কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো স্বজনের সাথে দেখা হয় ভয়েজারের!
কার্ল স্যাগান দূরতম সেই স্বজনদের জন্য বার্তা এবং উপহার পাঠাতে চাইলেন।
নাসায় কমিটি তৈরী করা হলো। স্যাগান হলেন কমিটির প্রধান। এক বছর ধরে চললো ভীনগ্রহের স্বজনদের জন্য বার্তা সংগ্রহের কাজ।
৫৫ টি ভাষায় 'হাই' জানানো হলো দূরতম স্বজনদের।
প্রথম জানালেন, তৎকালিন জাতিসংঘের মহাসচিব কার্ট ওয়াল্ডহেইম। তিনি বললেন, "I send greetings on behalf of the people of our planet. We step out of our solar system into the universe seeking only peace and friendship, to teach if we are called upon, to be taught if we are fortunate."
আছে বাংলা ভাষাও। কন্ঠ দিয়েছেন সুব্রত মূখার্জি। তিনি বলেছেন 'নমস্কার, বিশ্বের শান্তি হোক।'
পাঠানো হলো বৃষ্টির শব্দ, বাতাসের শব্দ, হাসির শব্দ। হেসেছিলেন কার্ল স্যাগান নিজেই।
পাঠানো হলো পাখির ডাক, ঝিঝি পোকার ডাক।
ভয়েজারের সাথে পাঠানো হলো ৯০ মিনিট দীর্ঘ গান এবং সুর। এর মধ্যে ছিলো সাড়ে তিন মিনিটের একটি ভারতীয় সুরও।
অচেনা স্বজনদের জন্য ছবি পাঠানো হলো ১১৬টি। এর মধ্যে আছে আমাদের ডিএনএর ছবি, হাঁড়ের ছবি,পাখির ছবি, সূর্যদয়ের ছবি, সূর্যাস্তের ছবি, নারী পুরুষের জননাঙ্গের ছবি, মিলনের ছবি! খাওয়ার ছবি, পান করার ছবি, শিশুকে স্তন পান করানোর ছবি!
যুদ্ধ আর অস্ত্রের ছবি পাঠানোর কথা থাকলেও পরে আর পাঠানো হয়নি।
কার্ল স্যাগান তখন ভয়েজার-১ এর জন্য 'গোল্ডেন রেকর্ড' তৈরীর কাজে দিনরাত ব্যাস্ত এবং ভীষণ উত্তেজিত।
একদিন ভোরবেলা তিনি তার সুন্দরী সহকর্মী অ্যান ড্রুয়ানকে ফোন করলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর ফোন রেখে দিলেন।
ফোন রাখার পর স্যাগান আবিষ্কার করলেন তিনি ড্রুয়ানের প্রেমে পড়েছেন! স্যাগান মনের কথা জানালেন ড্রুয়ানকে। ড্রুয়ান জানালেন, তিনিও...।
এরপর কার্ল স্যাগান করলেন আরেক ছেলেমানুষী কাজ। তিনি তাঁর প্রেমিকাকে এক ঘন্টা চুপচাপ শুয়ে থেকে পৃথিবীর কথা, মানব সভ্যতার কথা এবং স্যাগানের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা ভাবতে বললেন।
বেচারী ড্রুয়ান এক ঘন্টা চোখ বন্ধ করে এসব ভাবলেন। এই সময় তাঁর ব্রেইনওয়েভ রেকর্ড করা হলো।
এই ব্রেইনওয়েভও জুড়ে দেয়া হলো ভয়েজার ওয়ানের সাথে!
ভয়েজার ওয়ান ৪০ বছর থেকে ছুটছে।
যাত্রার ১৩ বছর পর ভয়েজার-১ তখন পৃথিবী থেকে ৬ বিলিওন কিলোমিটার দূরে। আমাদের সৌরজগতকে শুভ বিদায় জানাচ্ছে এই স্পেসক্রাফট।
কার্ল স্যাগান তখন তাঁর শেষ পাগলামীটা করলেন। নাসার বিজ্ঞানীদের তিনি অনুরোধ করলেন এত দূরত্ব থেকে ভয়েজার-১ পৃথিবী নামক গ্রহের একটা ছবি তুলে পাঠাক।
অনেক বিজ্ঞানীদের আপত্তি ছিলো। তারা বলেছিলেন ভয়েজারের ক্যামেরা পৃথিবীর দিকে ঘুরালে সূর্যের আলোতে সেটার ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু স্যাগানের অনুরোধে শেষবারের মতো পৃথিবীর ছবি তুলেছিলো ভয়েজার-১। একটা বিন্দুর চেয়েও ছোট দেখাচ্ছিলো আমাদের প্রিয় পৃথিবীকে! (কমেন্টে ছবি দিয়ে দিলাম।)
কার্ল স্যাগান মারা গেছেন ১৯৯৬ সালে।
ভয়েজার -১ আমাদের সৌরজগতকে চির বিদায় বলেছে ১৯৯০ সালেই। হেলিওশিথকে বিদায় বলেছে ২০১২ সালে। ভয়েজার -১ এখন আছে ইন্টারস্টেলার স্পেসে। নিঃসীম শীতল অন্ধকারে ঘন্টায় ৬২ হাজার কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে ভয়েজার-১। আর মাত্র কয়েকটা বছর এরপর আমরা হারিয়ে ফেলবো আমাদের এই প্রিয় ভয়েজার-১ এর সাথে সকল যোগাযোগ এবং তারপর কোথায় যাবে ভয়েজার-১, কোথায় থাকবে আমাদের প্রিয় গ্রহের কয়েক কিলোবাইট স্মৃতি আমরা জানতে পারব না কোনদিনও।
আসছে মাসের ৫ তারিখ ভয়েজার-১ মিশনের ৪০ বছর পূর্ণ হবে। নাসা তাদের ওয়েব সাইটে ১৪ বিলিয়ন দূরের বন্ধুর স্বরণে তিনটি ছবি প্রকাশ করেছে। একটি ছবি কভার ফটোতে জুড়ে দিলাম। ভালো থেকো ভয়েজার-১, তোমার জন্য ভালোবাসা।
(লিখেছেন আলিম আল রাজী)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০১৮ সকাল ১০:২৮
১০টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঙালিয়ানা ভোজ ও রুপালি ইলিশের স্বাদ

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৫৫

বন্ধু মারফত খবর পেলাম দেশের বাজার নাকি ভারতীয় ইলিশে সয়লাব। পদ্মার ইলিশের দাম কম, তাই নিম্নচাপ উপেক্ষা করে চলে গেলাম ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরে। ঘাটে এসে দেখলাম পুরা বাজার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: দাদীর মুষ্টি চালের গন্ধমাখা একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব

লিখেছেন চারাগাছ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৪৮



ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: দাদীর মুষ্টি চালের গন্ধমাখা একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব

​ক্যালেন্ডারে নামটা দেখেছেন হয়তো— ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম।
​ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছেন যারা, তাদের অনেকের কাছেই নামটা পরিচিত। কারণ, এই নামটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৯


ভূমিকা
সকল নবি ও রাসুল প্রতি সালাম ও দুরুদ পর
দাউদের সুরে, মূসার পথে, ঈসার প্রেমের বাণী
মুহাম্মদের মরু পেরিয়ে শুনেছি যুগের ধ্বনি
কৃষ্ণের বাঁশি, বুদ্ধের ধ্যান, সুফির অন্তর সন্ধান
যোগীর তপে, মরমীর গানে খুঁজেছি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওমীলীগকে সম্পর্কে কি আপনার মনে এখন কোনো পজিটিভ চিন্তা উঁকি দেয়?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৬


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত চারটি বিষয়ের উপর মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
প্রথমত, মানুষ মনে করে এ দলটি ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এটা খুবই সত্য যে ১৯৭১ সালে আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরোনামহীন কবিতা-০৭

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

তোমাকে নিয়ে কক্সবাজারে
সমুদ্রের গান শোনা,
অথবা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে
মেঘের ভেলায় হারিয়ে যাওয়ার
কত যে ইচ্ছে—স্ব-যত্নে পুষে রেখেছিলাম
মনের গহীনতম কোণে!

কোনো এক ঈদের পড়ন্ত বিকেলে—
অকারণ কাঁপা আঙুলে
একটি খুদে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলাম
তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×