
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: দাদীর মুষ্টি চালের গন্ধমাখা একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব
ক্যালেন্ডারে নামটা দেখেছেন হয়তো— ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম।
ছোটবেলায় স্কুলে পড়েছেন যারা, তাদের অনেকের কাছেই নামটা পরিচিত। কারণ, এই নামটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা খুব সাধারণ অথচ খুব প্রিয় স্মৃতি— স্কুল বন্ধ।
ছোটবেলায় ছুটির কারণটা কে আর এত বুঝত! ক্যালেন্ডারে একটা দিন লাল দাগ দেওয়া থাকলেই হলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতাম— আজ স্কুল নেই। ব্যস! এরপর আর পৃথিবীতে কোনো দুশ্চিন্তা থাকত না। ইউনিফর্ম পরতে হবে না, জুতা পালিশ করতে হবে না, ব্যাগ গোছাতে হবে না, স্যারের বকুনি খেতে হবে না। সকালের সেই অলস সময়টুকু যেন হঠাৎ নিজের হয়ে যেত।
কিন্তু আমার শৈশবের একটা অদ্ভুত ব্যাপার ছিল। আমার কাছে প্রায় প্রতিটা দিনই উৎসব ছিল। অথবা বলা ভালো— আমি ধরে নিতাম, প্রতিটা দিনই কোনো না কোনোভাবে উৎসব। আমাদের গাছের ৮৩টা নারিকেল গাছের ডাব বিক্রি হবে— এটাও আমার কাছে উৎসব। নারিকেল গাছ ঝুরানো— সেটাও উৎসব। জাল ফেলে পুকুরে মাছ ধরা হবে— সেটাও উৎসব। ঝড় এলে গাছের নিচে ছুটে গিয়ে আম কুড়াতে হবে— সেটাও উৎসব।
সুখ তখন খুব বড় কোনো ব্যাপার ছিল না। সুখ ছিল উঠানের এপাশ থেকে ওপাশে দৌড়ে যাওয়া। সুখ ছিল ঝড়ের পর কাদামাটিতে পা ডুবিয়ে আম খোঁজা। সুখ ছিল গাছে নতুন ডাব ধরেছে শুনে সেটা দেখতে ছুটে যাওয়া।
আর আমাদের বাড়ির সেই ছোট্ট উৎসবগুলোর কথা সবচেয়ে ভালো মনে রাখতেন দাদী। দাদী এইসব ধর্মীয় দিন খুব মনে রাখতেন। প্রতিদিন রান্নার চাল থেকে এক মুষ্টি করে চাল তিনি তুলে রাখতেন একটা বড় টিনের কন্টেনারে। দিনের পর দিন। এক মুষ্টি। আরেক মুষ্টি। এভাবেই ধীরে ধীরে টিনটা ভরে উঠত। কোনো বিশেষ দিন এলে সেই চাল বিক্রি করা হতো। তারপর সেই টাকা দিয়ে পাড়ার ছোট ছোট বাচ্চাদের জন্য সিন্নি বানানো হতো।
দাদী নিজের হাতে সেই সিন্নি বিলাতেন— জর্দা কখনো ক্ষীর। কারও হাতে একটু বেশি, কারও হাতে একটু কম। কেউ হয়তো আবার লজ্জায় সামনে এসে দাঁড়াত না—দাদী নিজেই ডেকে নিতেন। তখন বুঝতাম না, এই ছোট্ট আয়োজনের মধ্যে কত বড় একটা আনন্দ লুকিয়ে থাকে। এখন বুঝি। আমাদের সময়ের বড় বড় উৎসবের আয়োজন ছিল না। ছিল একটা টিনের কন্টেনার। ছিল মুষ্টি মুষ্টি চাল। ছিল দাদীর দুই হাত। আর ছিল পাড়ার কয়েকটা শিশুর মুখের হাসি।
হয়তো সেই কারণেই ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের মতো একটা দিনও আমার শৈশবে শুধু একটা ধর্মীয় দিবস ছিল না। এটা ছিল ছুটির দিন, মানুষের বাড়িতে যাওয়া-আসার দিন, দোয়া, সিন্নি, ভাগাভাগির দিন। আর সবচেয়ে বড় কথা— একটা আনন্দের দিন।
তখন অবশ্য ‘ইয়াজদাহম’ শব্দের অর্থ জানতাম না। আজ জানি। ‘ইয়াজদাহম’ ফারসি শব্দ। অর্থ—এগারোতম। আরবি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখে প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.)-কে স্মরণ করা হয়। তাঁর ইন্তেকালের সঙ্গে যুক্ত ১১ রবিউস সানির স্মরণ থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালনের প্রচলন হয়েছে।
অনেক জায়গায় দিনটি আবার গিয়ারভি শরিফ নামেও পরিচিত। ‘গিয়ারহ’ মানে এগারো। সেখান থেকেই ‘গিয়ারভি’—এগারোতম। আর ‘ফাতেহা’ বলতে বোঝানো হয় কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং সওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে স্মরণানুষ্ঠান। বাংলার মাটিতেও এই আয়োজন বহু পুরোনো। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের মিয়া সাহেবের ময়দান খানকাহ শরিফে তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালনের কথা জানা যায়।
ভাবতে ভালো লাগে— যে নামটা আমাদের কাছে একসময় শুধুই একটা স্কুলছুটির নাম ছিল, সেই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে কয়েকশ বছরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
আর ছুটিটাও একটু অদ্ভুত। সরকারি সাধারণ ছুটির সঙ্গে এর হিসাব এক নয়। ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকায় ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম ছিল মুসলিমদের জন্য ঐচ্ছিক ছুটির তালিকায়। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষাপঞ্জিতে দিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি হিসেবে রাখা হয়েছে। তাই স্কুল-কলেজ-মাদরাসা বন্ধ থাকলেও অন্য অনেক অফিস খোলা থাকতে পারে। ২০২৬ সালে দিনটি পড়েছে ২৩ সেপ্টেম্বর।
আজকের দিনে এসব তথ্য খুব সহজেই জানা যায়। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায়? ইন্টারনেট ছিল না, গুগল ছিল না, কোনো নামের অর্থ জানতে ফোন হাতে নিয়ে সার্চ করার সুযোগ ছিল না। ছিল শুধু একটা কাগজের ক্যালেন্ডার। বাবার আলমারির পাশে ঝোলানো। পাতা উল্টালে একেকটা মাস। আর তার মধ্যে কত অদ্ভুত অদ্ভুত নাম! কোনোটা বুঝতাম, কোনোটা বুঝতাম না। শুধু ছুটির পাশে একটা গোল দাগ থাকলেই— মনটা খুশি হয়ে যেত।
আজ এত বছর পর বুঝি, ছুটির আনন্দটা আসলে ছুটিতে ছিল না। আনন্দটা ছিল সেই বয়সে। যে বয়সে ৮৩টা নারিকেল গাছের ডাব বিক্রি হওয়াও উৎসব হতে পারে, ঝড়ের পর কুড়িয়ে পাওয়া পাঁচটা আমও উৎসব হতে পারে, দাদীর টিনের কন্টেনারে জমে থাকা মুষ্টি মুষ্টি চালও উৎসব হতে পারে। আর একটা ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা— ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম—হয়ে যেতে পারে সারাদিনের সবচেয়ে আনন্দের খবর।
একটা বিকেল ছিল অনেক লম্বা। একটা দুপুর ছিল অনেক গভীর। একটা বৃষ্টির শব্দ ছিল পুরো পৃথিবীর শব্দ। আর একটা ছুটির দিন— ছিল যেন নিজের জন্য পাওয়া একটা ছোট্ট পৃথিবী।
আজ ক্যালেন্ডারে আবার নামটা দেখলাম— ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম। নামটার অর্থ এখন জানি, ইতিহাসটাও কিছুটা জানি। কিন্তু নামটা দেখলেই কেন যেন ইতিহাসের আগে অন্য কিছু মনে পড়ে— একটা পুরোনো স্কুল, কালো বোর্ড, কাঠের বেঞ্চ, খাতার পাতায় পেন্সিলের দাগ। দাদীর সেই বড় টিনের কন্টেনার, এক মুষ্টি চাল, সিন্নির বাটিতে ছোট ছোট হাত। দূরে কোথাও ঝড়ের শব্দ। আর উঠানে ছুটে বেড়ানো একটা ছোট্ট ছেলে— যে জানে না ‘ইয়াজদাহম’ মানে কী, শুধু জানে— আজ স্কুল নেই।
কী অদ্ভুত! কিছু কিছু ছুটির দিন আসলে ছুটি নয়। তারা আমাদের জীবনের এমন কিছু দরজা খুলে দেয়— যে দরজার ওপাশে আজও আমাদের শৈশবটা দাঁড়িয়ে আছে।
দাদী নেই। সেই টিনের কন্টেনারটাও হয়তো নেই। ৮৩টা নারিকেল গাছের কতগুলো আর দাঁড়িয়ে আছে, জানি না। ঝড় এলে আম কুড়ানোর সেই উঠানটাও হয়তো বদলে গেছে। শুধু স্মৃতিটা রয়ে গেছে। আর রয়ে গেছে সেই অদ্ভুত ক্ষমতা— সামান্য কিছু জিনিসকে উৎসব বানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
হয়তো এটাই ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমরা খুব বেশি কিছু চাইতাম না। একটু ছুটি, একটু রোদ, একটু বৃষ্টি, গাছভরা ডাব, ঝড়ের পর কয়েকটা আম, জাল থেকে বের করা কিছু মাছ, দাদীর হাতের সিন্নি। আর একটা দিন— যেদিন স্কুলে যেতে হবে না।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম।
একটা ছুটির নাম।
একটা ধর্মীয় স্মরণ।
একটা পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাতা।
আর আমার কাছে—
দাদীর মুষ্টি মুষ্টি চালের গন্ধমাখা
একটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


